গ্রেটওয়ালের দেশে – ২৪তম পর্ব

গ্রেটওয়ালের দেশে- ৪র্থ পর্ব

চার জানুয়ারি দুহাজার সতের।মঙ্গলবার। আজ আমাদের যেতে হবে চীনের একটি ভিন্ন প্রদেশ হেবেই এর ‘ছিং হুয়াং দাও (Qinghuangdao)’-এ। এটি একটি প্রিফেকচার। প্রিফেকচার হলো একটি প্রদেশের বাইরে একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ইউনিট। ফ্রান্স, জাপান, রোমান সাম্রাজ্যে পূর্বে এ ধরণের প্রিফেকচার ছিল। আমাদের হাইস্পিড রেলগাড়ির টিকেট সংগ্রহ করা ছিল সকলের জন্যই। আমাদের ট্রেন ছেড়ে দেবে সকাল সাড়ে নটায়। আমাদের দেশের মত এখানে ট্রেনের নাম নেই, আছে নাম্বার। আমাদের ট্রেনটির নাম্বার ডি ১৮ । আমার সিট পড়েছে ৪ নং বগিতে। বগির প্রথম সারির ডানদিক থেকে দ্বিতীয় সিট। প্রথম সিটটি জানালার পাশে । পেয়েছেন একজন চীনা ভদ্রলোক। তিনি সিটে উপবিষ্ট চারঘন্টার জার্নি। পাশের ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় করাটাই সৌজন্যমূলক। তাই হাত বাড়িয়ে দিলাম পরিচয়ের উদ্দেশ্যে। হ্যাণ্ডশেক হলো। কিন্তু কেউ কারো ভাষা বুঝলাম না। আমি আগবাড়িয়ে বললাম, ‘আই এ্যাম ফ্রম মানজালাগুয়ো।’ ভেবে নিলাম সে বুঝে নিয়েছে যে আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। কিছুক্ষণ পর সে তার প্যাণ্টের পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে একটি ৫০ ইউয়ানের নোট আমার সামনে মেলে ধরে কিছু বললো বা বুঝালো। কী বুঝালো তা সঠিকভাবে বুঝলাম না, বরং ভুলই বুঝলাম, কিছুক্ষণ পরেই পাঠক তা জেনে যাবেন। আমি ভাবলাম, সে বলছে, ‘যদি তুমি আমার এই উইণ্ডো সিটটিতে বসতে চাও তবে আমাকে পঞ্চাশ ইউয়ান দাও।’ আমি শুকনোভাবে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললাম, ‘নো প্রব্লেম, আই এ্যাম ফাইন হেয়ার, এখানেই ঠিক আছি।’ আমার উত্তর শুনে সে কি বুঝলো তা জানি না, তবে বেশ কিছুক্ষণ চলে গেল  আমাদের মধ্যে পরস্পর দুর্বোধ্য ভাষায় বাতচিতবিহীনদেখলাম সে ট্রান্সপারেন্ট ফ্লাস্কে করে গ্রিন টি পান শুরু করলো। তারপর হঠাৎ তার মুখ থেকে ধূমপানের বদবু এসে নাকে ধাক্কা দিলএসব ট্রেনে ধূমপানের জন্য আলাদা কক্ষ থাকে। সম্ভবত সে ট্রেনে ওঠার পূর্বে অথবা আগে থেকে ট্রেনে চড়ে থাকলে ধূমপানের কক্ষ থেকে এ কাজটা সেরে এসেছে আর গ্রিন টি এর গরমে হয়ত ধূমপানের ঝিমিয়ে যাওয়া বদবুটা আকস্মিকভাবে জেগে উঠেছে। আমি আর তার দিকে না তাকিয়ে সোজা বা একটু বামদিকে মুখ করে সামনে দৃষ্টি দিলাম।

 

কিছুক্ষণ পর দেখি ভদ্রলোক তার সেলফোনের স্ক্রীনে কি যেন লিখে ট্রান্সলেটর সফটওয়্যারের মাধ্যমে অনুবাদ করে আমার সামনে ধরল। পড়ে দেখি লেখা, ‘ডু ইউ লাইক টু  এক্সচেঞ্জ সাম ফরেন কারেন্সি উইথ মি?’ আমি ভাবলাম, সে হয়ত আমাকে চীনা ইউয়ান দিয়ে আমার কাছে মার্কিন ডলার চায়। তাই, ডান হাতের তালু দুদিকে নেড়ে বুঝালাম আর মুখে বললাম, ‘নো, নো নিড।’

এবারে সে প্রশ্ন করলো, ‘মানজালা?’ ঘাড় মাথা ওপরে নিচে করে বললাম, ‘ইয়েস।’ সে তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারেন্সির তালিকা মোবাইল-ক্রীনে দেখিয়ে বলল, কোনটা তোমাদের দেশের কারেন্সি? আমি দেখলাম তালিকায় INR আছে কিন্তু টাকা বা BDT নেই। আমি এবার তার মোবাইলটি নিয়ে ইংরেজিতে লিখলাম, নেই, কিন্তু এটা ইন্ডিয়ান কারেন্সির কাছাকাছি মানের। সে ট্রান্সলেট করে চীনা ভাষায় নিয়ে বুঝে ফেললো। সে এবার চীনা ভাষায় কিছু লিখে অনুবাদ করে চোখের সামনে ধরলে, আমি সজোরে মাথা ঝাঁকিয়ে উচ্ছ্বাস নিয়ে বললাম, ‘ইয়েস, মাই কান্ট্রি বাংলাদেশ।’  সে আবার সার্চ দিয়ে বিডিটি বের করে দেখালে আমি বললাম, ‘ইয়েস, মাই কারেন্সি।’ এবার সে লিখে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো, এক ডলার সমান ৬.৮৮ ইউয়ান বা আরএমবি। আর এক ডলার সমান কত বাংলাদেশি টাকা? আমি বলতে যাচ্ছিলাম, এক ডলার সমান ৭৮ বিডিটি। উত্তরের অপেক্ষা না করে এবার সে আরো ইন্টারনেট সার্চ দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, একশ ডলার সমান ১০ আরএমবির কম তাই না? আমি বললাম, হাঁ তবে কাছাকাছি। এবারে একই কায়দায় ইংরেজিতে অনুবাদ করে লিখে অনুরোধ করল, ‘তুমি কি আমার কাছে ছোট্ট অংকের কোনো বাংলাদেশি কারেন্সি আমার সাথে এক্সচেঞ্জ করতে পারো?’ এবার আমি সকল ভুল ভেঙ্গে বুঝলাম  বিদেশি মুদ্রা সংগ্রহের ইচ্ছেতেই তার এতক্ষণের প্রয়াস । দুঃখের বিষয় দেশ থেকে আসবার সময় আমি বাংলাদেশি টাকা পয়সা কিছু আনিনি। আমার মানিব্যাগে সাকুল্যে আছে দুটি একশ টাকার নোট।তারও আবার একটি চকচকে আরেকটি ব্যবহারজনিত ময়লাযুক্ত। ভাবলাম, শুধু স্যুভেনির হিসেবে রাখার জন্য তাকে একশ টাকা ফ্রি ফ্রি দেয়াটা ঠিক যুক্তিসঙ্গত নয়দশ বিশ টাকার নোট হলে না হয় এমনিতেই দিয়ে দিতাম লোকটি তার ওয়ালেট ওপেন করেই রেখেছে যেন আমি তার একটি নোট নিয়ে সুবিধাজনক একটি বাংলাদেশি মুদ্রার নোট তাকে দেই। এমতাবস্থায়, আমি উপায়ান্তর না দেখে তার ওয়ালেট থেকে একটি দশ আরএমবির নোট নিজ হাতে উঠিয়ে নিয়ে আমার কাছে থাকা একশ টাকার চকচকে নোটটি তার হাতে গুঁজে দিলাম। মনে মনে ভাবলাম ভাগ্যিস একটি নোট চকচকে ছিল। নচেৎ ময়লাযুক্ত নরম নোট তাকে  স্যুভেনির হিসেবে দিতে হলে বড়ই লজ্জার হত।

ভদ্রলোক ১০০ টাকার নোটটি নিয়েই তার পরিবারের কাউকে ফোন করে জানালো, আমি এখন তোমার জন্য একটি বাংলাদেশি মুদ্রা সংগ্রহ করলাম।কথার মাঝে মানজালা শব্দটি উচ্চারণে তাই বুঝলাম।

সে আবার গ্রিন টি পানে মনোযোগ দিল। এবার সৌজন্যবশত সে সামনের ওয়াশরুমের পাশের Potable hot water এর আউটলেট আর ডিসপোজেবল গ্লাস দেখিয়ে বলল, তুমি যাও গরম পানি নিয়ে পান কর, ভাল লাগবেতার পরামর্শ বন্ধুসুলভ মনে আমি সিট থেকে উঠে সামনে গেলে সেও আমার সাথে সাথে এসে আমাকে  নিজ হাতে ডিসপোজেবল গ্লাস নিয়ে আমার হাতে দিয়ে গরম পানির কল ঘুরিয়ে আমাকে পানি নিতে সাহায্য করলো। তারও গ্রিন টি এর গরম পানি শেষ হয়ে গিয়েছিলসে ফ্লাস্কের গ্রিন টি পাতার ভিতরে গরম পানি রিফিল করে নিল। পাশাপাশি দুজনই গরম জল পান করতে করতে পথ এগিয়ে চললাম হাইস্পিড ট্রেনের বেগেদুজনেই গরমজল পান করছি একজন হার্বাল আরেকজন নর্মাল।

 

বেইজিং এর সীমান্ত ছেড়ে যখন ট্রেন হেবেই প্রদেশে প্রবেশ করছে, জানালা দিয়ে দেখি বাইরের সব গাছপালা, বাড়ি গাড়ি তুষারে আবৃত হয়ে চকচক করছে। ঘন্টা দুয়েক পর আমি আমার গন্তব্য ছিং হুয়াং দাও পৌঁছে গেলাম। ভদ্রলোকের সাথে হ্যাণ্ডশেক করে, সহযাত্রী হিসেবে সঙ্গ দেবার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম হাতের ছোট ব্যাগটি নিয়ে।

চলবে

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

 

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment