গ্রেটওয়ালের দেশে – ২৫তম পর্ব

গ্রেটওয়ালের দেশে

ছিং হুয়াং দাও স্টেশনের বাইরে আমাদের জন্য একটি ট্যুরিস্ট বাস অপেক্ষমাণ ছিল। শহরটি একটি সমুদ্রের পাড়ে। পূর্ব চীন সাগরের সৈকত । আমাদের সকলের সমুদ্র দেখার আকুতি ছিল। বাস আমাদের সমুদ্রসৈকত লাগোয়া একটি সী-ফুড রেস্তোঁরায় নিয়ে এলো। রেস্তোঁরায় বিভিন্ন ধরণের সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক ইত্যাদি মজুদ ছিল। কিছু কিছু আইটেম রান্না করে সাজানো ছিল আবার কিছু আইটেম গরম গরম রান্না বা ফ্রাই করে দেয়া হচ্ছে। ভাত, চিকেন ফ্রাই, বিভিন্ন ফলমুল, চকোলেট, কেক, পেস্ট্রি, আইসক্রিম, ইয়োগার্ট, সফট ড্রিংক, চৈনিক বীয়ার, চৈনিক মদিরা সবই ছিল।যার যার পছন্দ মত খাবার নিয়ে বিশাল হোটেল ফ্লোরে স্থাপিত যে কোনো আসনে বসে খরিদ্দারদের খাওয়ার সুব্যবস্থা আছে। সামুদ্রিক মাছের প্রতি আমার চির দুর্বলতা। আমি সামান্য পরিমাণ ভাত, একটি বড় সামুদ্রিক মাছ, দুটি কাঁকড়া, কিছু পাকা পেপের টুকরো, একটি আপেল, কয়েক টুকরা মাল্টা, এক বাটি ইয়োগার্ট আর এক গ্লাস কোক নিয়ে একেবারের সৈকতের লাগোয়া জানালার পাশে একটি ফাঁকা আসনে গিয়ে বসে পড়লাম।

 

মধ্যাহ্নভোজের পর আমরা সকলে গেলাম লাওলংতু সিনিক এরিয়ায়। উল্লেখ্য সমগ্র চীনে ছড়িয়ে থাকা মিং রাজাদের আমলের চল্লিশটি পর্যটন এলাকার একটি এই লাওলংতু সিনিক এরিয়া। এখানে রয়েছে বেশ কিছু দুর্গের ন্যায় প্রাচীন ঘরবাড়ি যেখানে একসময় মিং রাজাদের সৈন্যসামন্তরা থাকত।

এখানে আরেকটি দেখবার বিষয় হলো বিখ্যাত গ্রেটওয়ালের একটি ভগ্নাবশেষ যা সমুদ্রে এসে ঠেকেছে। আরো আছে একটি প্রাচীন তাও ধর্মের মন্দির, মিং রাজাদের বন্দীদের জন্য নির্মিত কারাগার, মিং রাজাদের আমলের কোস্ট গার্ডদের ব্যবহৃত একটি প্রাচীন ছোট জাহাজ্‌, ঘোড়ার গাড়ির প্রতিকৃতি ইত্যাদি। ছিং হুয়াং দাও সৈকত আমাদের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের তুলনায় অনেক ছোট কিন্তু এটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। বেইজিং থেকে ধারণা করেছিলাম, শীতকাল হলেও সমুদ্রে পানির তাপমাত্রা হবে সহনীয় মাত্রারসমুদ্র স্নানের জন্য তাই আমি প্রয়োজনীয় সুইমিং কস্টিউম এনেছিলাম। কিন্তু হা হতস্মি! পানি স্পর্শ করে দেখি বরফ-শীতল। প্রাণে ব্যথা নিয়ে সমুদ্রজলে অবগাহণের তৃষ্ণাকে দাফন করে দিলাম।

 

ছয় জানুয়ারি দুহাজার সতের। শুক্রবার।

আজ আমাদের বাংলাদেশী রেস্তোঁরায় খাবারের আয়োজন। আবার জুম’আর নামাজেরও দিন আজ। তাই আমরা নামাজের আগেই রেস্তোঁরায় পৌঁছে গেলাম। রেস্তোঁরার কাছেই একটি পুরানো চীনা মসজিদ আছে। নিউজি মসজিদের মত অত বড় ক্যাম্পাস না হলেও যথেষ্ট বড়। এ মসজিদের সামনের রাস্তায়ও দেখলাম বেশ ক’জন পুরুষ ও নারী ভিক্ষুক। এক চৈনিক মহিলা আমাদের বিদেশী দেখে, তার ফুটফুটে সুন্দর  স্বাস্থ্যবান শিশুসন্তানকে কোলে করে মুসলিম মুসলিম শব্দ উচ্চারণ করে ছুটে এসে আমাদের কাছে সাহায্যের হাত বাড়ালো। মহিলাটির স্বাস্থ্য ভাল এবং শীতবস্ত্রে আচ্ছাদিত ছিল। খুব খারাপ লাগলো ভিক্ষা প্রার্থনার এ দৃশ্য অবলোকন করে। মসজিদের বাইরে রাখা দানবাক্সে আজ সামান্য কিছু অর্থ দান করলাম। আমাদের দেশের মত ছোট ছোট দানবাক্স মসজিদের ভেতরে কাতারে কাতারে চালিয়ে দেয়া হয় না। এখানে মসজিদের বাইরেই বড় দানবাক্স রক্ষিত থাকে ।

এ মসজিদটি নিউজি স্ট্রীটের মসজিদটির মতই প্রাচীনবহিঃ ও অভ্যন্তরভাগ ঐতিহ্যবাহী চৈনিক কারুকার্যখচিতঅভ্যন্তরভাগের দেয়াল ও ছাদে আরবী ক্যালিওগ্রাফিতে কালিমা তাইয়িবা, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ইত্যাদি লেখা সমৃদ্ধ। এখানেও ইমাম সাহেবের মতো একই পোশাকে জনাপাঁচেক পাগড়িধারী ইসলামী পণ্ডিতকে দেখলাম মসজিদের প্রথম কাতারে। ইমাম সাহেবের খুৎবা প্রদানের পূর্বে একজন ইসলামিক স্কলার মসজিদের সপ্তম বা অষ্টম কাতারে এসে চীনা ভাষায় বক্তৃতা করে গেলেন। তারপর ইমাম সাহেব মিম্বরে আরোহণ করে বাম হাতে খুৎবার কিতাব ও ডান হাতে লাঠি ধরে খুৎবা পেশ করলেন। ইকামাত দেয়ার পর ইমাম সাহেবের পেছনে সকল মুসুল্লি আমরা জামা’তে দাঁড়িয়ে ফরজ নামাজের নিয়ত করে তাকবীরে তাহরীমা বাঁধলাম। আমার বাঁ পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়কারী একজন কালো দীর্ঘকায় মুসলমান দেখলাম তাকবীরে তাহরীমা না বেঁধেই নামাজ শেষ করলেননামাজ শেষে আমি আমার নাভির ওপর তাকবীরে তাহরীমা বাঁধার ঢং-এ হাত রেখে  তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই আপনি যে এটা না করেই নামাজ পড়লেন?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘কোনো অসুবিধে নেই। তাকবীরে তাহরীমা না বেঁধে হাত দুপাশে ঝুলিয়ে রেখেও নামাজ হয়।’ আমার জীবনে আমি এই প্রথম এ ধরনের মাজহাবের একজন মুসলিমকে দেখলাম। তাই জিজ্ঞেস করলাম, ‘হোয়্যার আর ইউ ফ্রম ব্রাদার?’ বললেন, ‘আই এ্যাম ফ্রম ডাকার, সেনেগাল।’ এবারে আবারো বললেন, ‘নো প্রব্লেম, সেইম, সেইম।’ তিনি যে ভুল করেননি, সে ধারণা দেয়ার জন্য যোগ করলেন, ‘মাই ফাদার ইজ এ্যান ইমাম অফ ডাকার মস্ক ।’

 

সাত জানুয়ারি দুহাজার সতের। শনিবার।

আজ আমাদের মিং রাজাদের সমাধিক্ষেত্র বা মিং’স টম্ব দেখার কর্মসূচি। বেইজিং নগরীর উত্তরের জেলা চাংলিং এর তিয়ানশু পর্বতের পাদদেশে এ সমাধিক্ষেত্র। মিং রাজত্বকালের(১৩৬৮ – ১৬৪৪) ১৩ জন মিং রাজার সমাধি এবং স্মৃতিভবন, তোরণ ইত্যাদিতে সাজানো ৮০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ সমাধিক্ষেত্র। বেইজিং এর ডাউনটাউন থেকে ৭০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এ সমাধিক্ষেত্রটির নির্মাণ শুরু হয় ১৪০৯ সালে আর সমাপ্ত হয় ১৬৪৪ সালে। এখানে রয়েছে ১৩টি রাজকীয় সমাধি ক্ষেত্র, ৭ টি রাজ-শয্যাসংগীনিদের(concubines) সমাধিক্ষেত্র এবং একটি খোঁজা(eunuch)দের সমাধিক্ষেত্র। তবে মিং টম্ব ১৯৫৭ সাল থেকে চীন সরকারের প্রধান সংরক্ষিত কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে এবং ২০০৩ সাল থেকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। আমরা দায়ু পর্বতের পাদদেশে ডিংলিং  সমাধি এলাকায় ১৩-তম মিং রাজা চু ইজুন(১৫৬৩ – ১৬২০) এবং তার দুই স্ত্রীর সমাধি পরিদর্শন করলাম। চু ইজুন ওয়ানলি উপাধি ধারণ করে রাজত্ব করেন এবং মৃত্যুর পর তিনি শেনজিং খেতাব লাভ করেন। তিনি দশ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ৫৮ বৎসর বয়সে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত অর্থাৎ ৪৮ বছর রাজত্ব করেন। ডিংলিং সমাধিক্ষেত্রটি নির্মাণ শুরু হয় ১৫৮৪ সালে এবং এর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয় ১৫৯০ সালে। ডিংলিং এর আয়তন ১,৮০,০০০ বর্গমিটার। ১৯৫৬ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে এর ভূ-গর্ভস্থ সমাধিসমূহ আবিষ্কৃত হয় যা ১৯৬০ সাল থেকে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

 

ডিংলিং চত্ত্বরটিতে এর সুবিশাল তোরণ দিয়ে প্রবেশ করার পরই দেখা যায় ভেতরের অনেক পুরাতন সব জুনিপার আর পাইনের সারি। উদ্যান অভ্যন্তরে কয়েকটি বেড়াল আমাদের স্বাগত জানালো। বেড়ালগুলো খুব সুন্দর, পরিচ্ছন্ন এবং সুডৌল।  আমাদের দেশের তুলনায় বৃহদাকৃতির দেখে ক্যামেরা খুলে ছবি তোলার উদ্যোগ নিলাম। কিন্তু ছবি তুলবো কি? ওরা আমার কাছে এসে পায়ের সাথে ঘেঁষে ঘুরতে লাগলো। আমি ভয় পেলাম না তবে খুব অবাক হলাম এদের কাণ্ডকারখানা দেখে।আমাদের গাইড মিস এলিসকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বেড়ালগুলো কেমন নিবিড়ভাবে কাছে এসে ঘুরাঘুরি করছে আর আমার চোখের দিকে তাকাচ্ছে।’ এলিস বলল, ‘মে বি দে ওয়ান্ট ফুড ফ্রম ইউ।’ আমি বললাম, ‘হায় আমার কাছে তো কোনো খাবার নেই, তোমার কাছে আছে?’ সে বলল, ‘তার কাছেও নেই।’ খাবার না দিতে পেরে একটু আফসোস করছিলাম। এলিস বলল, ‘নো প্রব্লেম স্যার, দে আর নট হাংরি। ইউ সি, দে আর ফ্যাট।’ সে বলল, ভিজিটরদের কাছে খাবার পেয়ে পেয়ে ওদের অভ্যাস হয়ে গেছে তো, তাই অমন করছে।

 

মিং রাজাদের সমাধিক্ষেত্রের দিকে রয়েছে একটি বিশাল এ্যাপ্রোচ রোড, যে রোডটির নাম ‘স্যাকরেড ওয়ে’ বা পবিত্র পথ। এ পথের দুপাশে রয়েছে শ্বেতপাথরের তৈরি  বিশাল আকৃতির হাতি, উট, অন্যান্য প্রাণি, সৈনিক, রাজ অমর্ত্য, পণ্ডিত ইত্যাকার প্রাণি ও মানুষের সারিবদ্ধ মূর্তি। তার পর আছে পাইন, বার্চ, উইলো, জুনিপার আর সাইপ্রেস বৃক্ষের উদ্যান। এসব গাছের অনেকই এত পুরাতন যে আনুমানিক হাজার বছরের পুরাতন হবে।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

 

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment