গ্রেটওয়ালের দেশে – ২৬তম পর্ব

আরেকটু এগিয়ে গেলেই একটি স্কি রিসোর্ট। নান্দনিক এ স্কি রিসোর্টটি ব্যক্তি উদ্যোগে তৈরি। চীনের হারবিন প্রদেশ হলো তুষারের স্বর্গরাজ্য। পুরো শীত ঋতু জুড়ে এখানে ব্যাপক তুষারপাত হয় আর বছর জুড়েই এখানে বরফের আস্তর থাকে। কিন্তু বেইজিং ঠিক সেরকম নয়। শীতকালে তাপমাত্রা শূন্যের নিচে চলে গেলেও গত দুমাসে এখানে তুষারপাত প্রত্যক্ষ করলাম মাত্র দুবার দুদিন। তাই স্কি রিসোর্টটি হারবিন বা অন্য কোনো প্রদেশ থেকে বরফ ও তুষার এনে তৈরি করা হয়েছে উৎসাহী বেইজিংবাসীর স্কি বা স্কেটিং- এর শখ মেটাবার জন্য।

পাশেই রয়েছে সুবিশাল হ্রদ। হ্রদের পানির ওপর পুরু বরফের আস্তর । হেঁটে এই  বরফের ওপর দিয়ে হ্রদের মাঝামাঝি বা বেশি দূরে যাওয়া বিপজ্জনক। অত্যন্ত পিচ্ছিল। একটু অসতর্ক হলেই পা পিছলে চিৎপাটাং হয়ে হাত পা ভাঙ্গার নির্ঘাত সম্ভাবনা। কিন্তু শখের তোলা নাকি আশি টাকা। এক্ষেত্রে চীনা বা বাঙালি বা কোনো জাতপাতের বাছবিচার নেই। কতিপয় চীনা ও অন্যান্য পর্যটকের দেখাদেখি আমরা বাঙালিরাও বরফের হ্রদে নেমে দু’চার গজ দূরে দাঁড়িয়ে ক্লিক ক্লিক ছবি তুলে নিলাম অত্যন্ত সতর্কতার সাথে।

হ্রদের ওপর দিয়ে এর প্রস্থ বরাবর মাঝামাঝি একটি সেঁতু আছে। শ্বেতপাথরে নির্মিত। সেখানে উঠেও চারপাশের ছবি তোলা যায়। হ্রদের চারপাশ ঘিরে হাঁটার ট্র্যাকটিও গাড়ি চলাচলের মত দুই লেনের সমান চওড়া। পাথর বসানো এ রাস্তার পার্শ্ব জুড়ে চেরি ব্লোসমের সারি। এ ফুলের আরেক নাম সাকুরা ফ্লাওয়ার। নীল, বেগুনি, মেরুন, সাদা হরেক রঙের অপূর্ব শোভাবিস্তারী ফুল। তবে এখন শীতকাল বলে সব গাছই পত্রপল্লবহীন দিগম্বর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হ্রদ এবং স্কি রিসোর্ট এর মাঝামাঝি উদ্যানের পাশে ফাঁকা স্থানে বেশ কিছু নারী পুরুষ এক ধরনের চাইনিজ  মার্শাল আর্টের মত করে ব্যায়াম করছে। জিজ্ঞেস করে করে জানা গেল এই ব্যায়ামের নাম তাই-জি। এটি মূলত মার্শাল আর্ট, নাচ আর যোগাসন একসাথে মিলিয়ে মনস্থির করার একটি ব্যায়ামায়োজন বলে মনে হলো। পাশে একটি ঢাউস আকৃতির পেতলের ভাস্কর্য। বিমূর্ত এই ভাস্কর্যটির নাম ‘মনিউমেন্ট অফ ইয়ং হিরো’। বিশেষ কোনো প্রাণীর আকৃতির নয়। আমাদের সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ যেমন বিমূর্ত কিন্তু এর অর্থ অত্যন্ত গূঢ়, এটিও সেরকম গূঢ় অর্থবোধক তবে আকৃতিতে ভিন্ন।

আমাদের ট্রেইনিদের বেশিরভাগই ব্যাচে ব্যাচে ইতোমধ্যে ঢাকায় চলে গেছে। আমরা ক’জন যখন ট্রেনিং এ যোগদান করি, তখন দেখি আমাদের আগেই আটাশজন এসে ট্রেনিং শুরু করে দিয়েছে। আমরা চারজন আসার পর হয়েছিলাম বত্রিশ জন। এখন কমতে কমতে আবার ঐ চারজনে এসে ঠেকেছি। যারা আগে এসেছিল তারা আগে চলে গেছে। আমাদের এ সর্বশেষ গ্রুপের দেশে প্রত্যাবর্তন হবে ষোলই জানুয়ারি।

যাহোক, আজ আমাদের ডিনার হলো ‘পামিয়ের’ নামে একটি মুসলিম রেস্তোঁরায়। আগেই বলেছি, বেইজিং এ মুসলিম রেস্তোঁরাগুলো খুব জনপ্রিয় খাবারের ভ্যারাইটি ও স্বাদের জন্য এবং বিশেষ করে নন-ভেজ আইটেমের খাবারের জন্য। পামিয়ের রেস্তোঁরার সব পুরুষ ও নারী ওয়েটারই মাথায় টুপি পরা। এরকম রেস্তোঁরাগুলোর ওয়েটারদের সবাই চীনা এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে চীনের অন্যান্য প্রদেশ থেকে আসাঅবয়ব চীনা বা মঙ্গোলয়েড হয়ে থাকে। কিন্তু এ রেস্তোঁরার একটি মেয়েকে একটু ভিন্ন গড়নের মনে হলো। নাক মুখ ভারতীয়দের মত শার্প। ইংরেজীতে নাম জিজ্ঞেস করলে কিছু বুঝলো না। তবে আমাদের এশীয়দের একটা কালচারে বড় ধরনের মিল আছে যে, এখানে রাখঢাক না করে কাউকে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করা যায়, একেবারে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় ছাড়া মোটামুটি সবই। এটি আমাদের জন্য বেশ স্বস্তিদায়ক। তাই এখানে রেস্তোঁরার একজন ওয়েট্রেসকে নাম জিজ্ঞেস করতে চীনা বা বাঙালি কোনো কালচারেই অসুবিধের কিছু নেই। আমাদের আগ্রহের কারণে আমাদের গাইড মিস লিউ রুমং চীনা ভাষায় আমাদের হয়ে জিজ্ঞেস করলে  মেয়েটি তার নাম জানালো- রুজ গুল। সাধারণ চীনা দেহকাঠামোর সাথে খাড়া অমিল দেখেই এই ঔৎসুক্য। আমাদের মধ্যে একজন জিজ্ঞেস করলো, সে কি চীনা? রুমং তাকে জিজ্ঞেস না করেই বললো, হ্যাঁ। আর সে তোমাদের মুসলিম মনে করেই তার মুসলিম নামটি বলেছে। তবে নিশ্চয়ই তার একটি চৈনিক নামও আছে। কেননা সকল চীনাদেরই একটি করে চৈনিক নাম আছে। সে সম্ভবত শিনচিয়াং প্রদেশের চীনা। ঐ প্রদেশে কিছু কিছু মানুষের পূর্বপুরুষেরা তুর্কিস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান,  কাজাকিস্তান, কিরঘিজিস্তান বা তাতারিস্তান এসব এলাকা থেকে এসেছে। বিশেষত তাতারী মেয়েরা অনিন্দ্য সুন্দরী হয়ে থাকে। তাকে মুসলিম জেনে আমাদের মধ্যে একজন বললো, আমরাও মুসলিম। যদিও আমাদের চারজনের মধ্যে একজন হিন্দু। আমাদের মুসলিম ঠাহর করেই সে এবার দুষ্টুমি করে যা বললো, তার ভাষান্তর করলে দাঁড়ালো, ‘ তোমাদের দেখে তো মুসলিম মনে হয় না। আমাদের গ্রামে পুরুষরা ছোট করে ছাটা দাড়ি রাখে, তোমাদের মুখে তো তা নেই’। আমাদের একজন বললো, আমাদের দাড়ি নেই ঠিকই, কিন্তু আমাদের দেশের অনেকেরই আছে। আমরা আরও দেখলাম মিস রুমং এর অনুমান সত্য। রুজ গুলের বাড়ি শিনচিয়াং প্রদেশের একটি নিভৃত গ্রামে বলে সে এবার নিজেই জানালো। উল্লেখ্য, শিনচিয়াং চীনের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি প্রদেশ যার রাজধানী উরুমচি। আর এখানে রয়েছে বিপুল সংখ্যক উইঘুর জাতির মুসলিম।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts