গ্রেটওয়ালের দেশে- ২৭তম পর্ব / শরীফ রুহুল আমীন

আট জানুয়ারি দুহাজার সতেরো। রোববার। আজ আমরা পিকিং ইউনিভার্সিটি দেখবো বলে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু পিকিং ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক বন্ধ ছিল বলে সেটি সম্ভব হলো না। ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষা চলছিল বিধায় এসময় ক্যাম্পাসে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ বলে গেটকিপার জানালেন। সুতরাং সেখান থেকে আমরা বেইজিং এর বিখ্যাত ল্যাণ্ডমার্ক সিসিটিভি দেখতে চললাম। সিসিটিভি চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন টাওয়ার যা বেইজিং এর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। ৪০৫ মিটার উঁচু এই টাওয়ার শীর্ষে রয়েছে একটি ঘূর্ণায়মান রেস্তোঁরা বা রোটেটিং রেস্টুরেন্ট। পর্যটকরা এ রেস্তোঁরায় আরোহন করে ঘুরতে ঘুরতে চা নাশতা বা ভোজন করতে পারেন। তবে তা বেশ ব্যয়বহুল। এখানে কিছু স্যুভেনির শপও আছে। টাওয়ারে উঠে পুরো বেইজিং শহরটিকে পাখির দৃষ্টিতে দেখা যায়। আমরা দেখেছি সূর্যলোকে। রাত্রিতে থাকে মাথার ওপর তারকাখচিত আকাশ(যদি মেঘমুক্ত থাকে) আর নিচে চারদিকে দিকচক্রবাল রেখাস্পর্শী বৈদ্যুতিক আলোতে ঝলমল বেইজিং। ভাবুন একবার কী অপূর্ব সে দৃশ্!

এগারো জানুয়ারি দুহাজার সতেরো। বুধবার। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি মোতাবেক আজ চীন আন্তর্জাতিক বেতার বা China Radio International(CRI) পরিদর্শন করতে যাই। এই বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় রেডিও প্রোগ্রাম প্রচার করা হয়। এখানে বাংলা বিভাগে বাংলাদেশের চারজন সাংবাদিক চাকরি করেন। একজন আইরিন নিয়াজি মান্না আপা, ঢাকার মুন্সিগঞ্জের। একজন টুটুল ভাই, বাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে। আরো দুজন বাঙালি ছাড়াও আছেন কয়েকজন চীনা বাঙালি। চীনা হলেও এরা বাঙালির মতই সর্বদা কথা বলেন। এরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা  ইনষ্টিটিউট থেকে সবাই ডিপ্লোমা করা। বাংলা ভাল বলতে নয় শুধু লিখতেও পারেন। এই চীনা বাঙালিরা এখানে বাঙালি নাম ধারণ করেছেন। একজনের নাম মিস স্বর্ণা, একজন সুবর্ণা আর একজন মিস রুবি। বাংলাবিভাগের পরিচালকও চীনা বাঙালি, নাম মিস আনন্দী। এদের প্রত্যেকের চীনা নাম থাকলেও, অফিসে এদের বাঙালি নামেই ডাকা হয়। পরিচালক মিস আনন্দী বেতার কেন্দ্রটি ঘুরে দেখালেন। একটি মিউজিয়ামে এই কেন্দ্রে ব্যবহৃত ষাটের দশকের হারমনিয়াম, রেকর্ডার , টাইপরাইটার ও অন্যান্য ইকুইপমেন্টস সুন্দর করে সংরক্ষিত আছে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন আন্তর্জাতিক বেতার পরিদর্শন করেন। সে সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছিল। দেয়ালে টানানো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে মিস আনন্দীর যুগলবন্দী ছবি দেখিয়ে তিনি সে কথা জানালেন। এসব ঘুরে দেখানোর পর মিস আনন্দী আমাকে রেকর্ড রুমে নিয়ে গেলেন ও বেতারে সম্প্রচারের উদ্দ্যেশ্যে আমার একটি সাক্ষাৎকার নিলেন। সাক্ষাৎকারে চীনে আমাদের প্রশিক্ষণ,  ভ্রমণ ও আমার সাহিত্যচর্চার বিষয়ে প্রশ্ন করেন তিনি।

বারো জানুয়ারি দু’হাজার সতেরো। বৃহস্পতিবার। আমাদের এবারের যাত্রা চীনের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী শহর নানজিং। জিয়াংশু প্রদেশের রাজধানী। যাত্রা শুরু বেইজিং নান স্টেশন থেকে। চীনা ভাষায় নান অর্থ দক্ষিণ। আগেই বলেছিলাম আমাদের দেশের মত এখানে রেলগাড়ির কোনো নাম নেই। এখানে আছে রেলগাড়ির নাম্বার। আমাদের রেলগাড়িটির নাম্বার ১৬৫-জি। এটি একটি হাইস্পিড ট্রেন যাকে আমরা বুলেট ট্রেন নামে জানি।  ট্রেনটির ৬ নম্বর কামরায় আমার আসন নম্বর ৪এফ। সৌভাগ্যক্রমে আসনটি উইণ্ডোসাইড ছিল। ট্রেন ছাড়ার সময় সকাল আটটা কুড়ি। নির্ধারিত সময়ে অর্থাৎ আটটা ঊনষাট মিনিট ষাট সেকেণ্ডে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। এটি যাবে হাংজু দং অর্থাৎ হাংজু পূর্ব স্টেশন অব্দি আর আমাদের গন্তব্যস্থল নানজিং নান অর্থাৎ নানজিং দক্ষিণ স্টেশন যেটি শেষ গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর দুঘন্টা আগেই আমরা পেয়ে যাবো। ট্রেনটির গতিবেগ ঘন্টায় ৩০০ কিলোমিটারের বেশি। গতিবেগ সবসময় কামরার মনিটরে ভেসে উঠছে। একটু আগেই দেখলাম গতিবেগ ৩০৯ কিলোমিটার/ঘন্টা। পুরো পাঁচঘন্টা পর আমরা নানজিং নান স্টেশনে এসে নামলাম। একটি ট্যাক্সি নিয়ে আমরা হোটেলের অন্বেষণে বের হলাম। এই সফরে আমরা চারজন ট্রেইনি আর আমাদের সাথে আছে গাইড হিসেবে মিস লিউ রু মং। বেইজিংসহ অন্যান্য  যে ক’টি চীনা শহরে আমাদের সফর হলো সবগুলোতেই গাইড ছাড়া বিদেশীদের চলাচল সম্ভব নয় যদি না সফরকারীর চীনা ভাষা জানা না থাকে। কোনো চৈনিক নাগরিকই চীনা ভাষা ছাড়া আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পারবে না সে ট্যাক্সিচালক, দোকানদার বা পথচারী যাই-ই হোক না কেন । ইশারা ইঙ্গিত দিয়ে তো আর সফর চলে না। গাইড রু মং এর নির্দেশনায় আমাদের ট্যাক্সিচালক হোটেল ফুচাং-এ এনে নামিয়ে দিলো। ইতোমধ্যে দুপুর গড়িয়ে গেছে। পেটে চামচিকে লাথি মারছে। তাই হোটেলে চেকইন করেই আমরা লাঞ্চের জন্য বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের গাইডও এ শহরে নবাগতা। গাইড প্রায় কিলোমিটারখানেক হাঁটিয়ে মোবাইল জিপিএস ব্যবহার করে একটি মুসলিম রেস্তোঁরার সামনে নিয়ে এলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় হোটেল কর্মচারীরা হোটেলের আসনগুলো উলটো করে দিয়ে বেশিরভাগই বিশ্রামে চলে গেছে। ক্যাশ কাউন্টারে একজন মহিলাকে পাওয়া গেল। আর একজন দেখলাম তিনচারটি চেয়ার পাশাপাশি পেতে তার ওপর শুয়ে মধ্যাহ্ন-ভোজনোত্তর হালকা ঘুম ঘুমুচ্ছে। এখানকার নিয়মানুযায়ী লাঞ্চ টাইম  দুপুর বারোটা। আবার খুলবে বিকেল চারটায়। আরো কয়েকটি মুসলিম অমুসলিম বাছবিচার ছাড়া রেস্তোঁরার অনুসন্ধান করা হলো কারণ সবাই ক্ষুধার্ত। ইতোমধ্যে সাড়ে তিনটা বেজে গেছে। পথে একটি দোকানে দেখলাম একধরনের পিঠা ভাজা হচ্ছে। তারই গরম গরম দু’চারখানা কিনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সবাই খেয়ে নিলাম। তারপর ঐ মুসলিম রেস্তোঁরাটিতে গিয়ে বসে সময়ের অপেক্ষা করতে থাকলাম। আর এই অবসরে বেইজিং থেকে আমার বয়ে আনা আপেল, নাশপাতি ও ড্রাগনফ্রুট রেস্তোঁরাওয়ালীকে কেটে পরিবেশন করতে বললাম। ক্ষুধা থাকায় সব সাবাড় হয়ে গেল দ্রুত। পরে মূল খাবার এলে কেউই আর তেমন খেতে পারলাম না।

জিয়াংশু প্রদেশের রাজধানী নানজিং একটি প্রাচীন শহর। অত্যন্ত সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন। বেইজিং এর মত অত জৌলুস না থাকলেও মফস্বল শহরের সুখ ও সৌন্দর্য দুই-ই আছে। আটানব্বই লক্ষ নাগরিকের  এ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ইয়াংসী নদী। আরো আছে বেশ ক’টি নয়নাভিরাম হ্রদ ও দৃষ্টিনন্দন পার্ক। পার্ক মানে আমাদের রমনা পার্কের মত ছোট পার্ক নয়। ঢাকার চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের  সম্মিলিত আয়তনের কমপক্ষে কুড়িটির সমান একটি পার্ক। আরো আছে বিখ্যাত পার্পল মাউন্টেন ও আরো কয়েকটি মাউন্টেন। উদাহরণস্বরূপ ড. সান-ইয়াৎ-সেন এর স্মৃতিসৌধ ও এর চারপাশের চারপাশের পার্ক এরিয়া ঘুরলেই সারাদিনে ঘুরে শেষ করা যাবে না। এসব পার্কে আবার আছে লেক ও প্রাকৃতিক ঝরনাধারা।

প্রথমদিন কোনো পার্ক ভ্রমণ সম্ভব ছিল না সময়াভাবে। লাঞ্চ সেরে আমরা গেলাম কনফুসিয়াস টেম্পল। কনফুসিয়াস টেম্পল দেখার মোক্ষম সময় হলো সন্ধ্যেবেলা। টেম্পল চত্বরের আলোকসজ্জা বড়ই মনোরম আর পরিবেশ বড়ই রোমাঞ্চকর। টেম্পলের পাশ ঘেঁষেই বয়ে চলেছে সুন্দর ছোট নদীর মত হ্রদ। টেম্পল ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেই আমাদের তরুণী গাইড বেশ রোমান্টিক হয়ে উঠলো। সে নিজেই  এখানে সেখানে আমাদের সাথে যুগলবন্দী হয়ে বা গ্রুপের সাথে সেলফি তুলতে লাগলো। সত্যি বলতে কি এখানকার আলোঝলমল পরিবেশটাই এমন ছিল যে, আমার মত নিরাসক্ত লোকের মনও সন্ধ্যেবেলা রোমান্টিক হয়ে গেল। ফলে আমি একটি মেয়েদের গার্মেন্টসের দোকানে প্রবেশ করে আমার স্ত্রীর জন্য বেশ কিছু দামী অন্তর্বাস খরিদ করে ফেললাম। পরদিন রোমাঞ্চ কেটে গেল এই ভেবে যে, এত দামী পার্সোনাল এ্যাটায়ার কেনার জন্য  দেশে গিয়ে স্ত্রীর মিঠেকড়া কথা শুনতে হয় কিনা।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts