গ্রেটওয়ালের দেশে-২

দুই নভেম্বর দুহাজার ষোল।

সকাল সাতটায় ঘুম ভেঙ্গে উঠে প্রাতঃক্রিয়াদি এবং গোসল সেরে ড্রেস-আপ করে দেখি ব্রেকফাস্টের সময় শেষের দিকে। নীচে রিসেপশনের বাইরে ক্যান্টিনে আমাদের ব্রেকফাস্টের আয়োজন। তাড়াতাড়ি নাশতা সেরে নিলাম। আজকে আমাদের কোনো ক্লাস নেই। সুতরাং নাশতা করার পর হাতে অনেক সময়। তাই সালাহউদ্দিনকে সাথে নিয়ে বাইরে একটু হাঁটতে গেলাম। বেইজিং এ আমাদের প্রথম পরিচয়-সূচক হাঁটা, হোটেলটার আশপাশটা সম্পর্কে একটু ধারণা নেয়া আর কি। দুপুরে এখানে লাঞ্চ করার পর মিস রু মং আমাদের নিয়ে গেল বাসে করে একটি মার্কেট এলাকায়। এখান থেকে আমাদেরকে চায়না মোবাইল এর সিমকার্ড কিনে দেয়া হলোফেরার পথে হেঁটেই এলামহোটলের পাশের গলিতে একধরণের সবুজ ছোট গাছের সারি দেখলাম। জিজ্ঞেস করে জানলাম এ গাছের নাম ‘জুজি চিন’ যার অর্থ ‘এভারগ্রিন’ বা চিরসবুজ। বড় রাস্তার পাশে একটি দোকানের সামনে বড় খোলা জায়গায় দেখলাম বিভিন্ন বয়সী নারী পুরুষ নাচছে হাত ধরাধরি করে। পরে দেখেছি বেইজিং এর সবখানেই বিভিন্ন খোলা জায়গায় মিউজিক বাজিয়ে মিউজিকের তালে তালে বিভিন্ন বয়সী নারী ও পুরুষ সন্ধ্যেবেলা নাচানাচি করেন। আনন্দ বিনোদন হলো আবার শরীর চর্চারও কাজ হলো। আবার একটা পার্কের ভেতর খোলা জায়গায় দেখলাম একটি বয়স্ক পুরুষ হাতে একটি লম্বা প্লাস্টিকের চাবুকের মত কিছু একটা দিয়ে মাটিতে আঘাত করছে আর চাবুকটির মাথায় ফোমের মত অংশ মাটিতে লেগে টাস টাস করে আওয়াজ হচ্ছে। জিজ্ঞেস করে জানলাম এটা একটি খেলা, যা বয়স্ক চীনারা ব্যায়ামের জন্য খেলে থাকে।

 

তিন নভেম্বর দুহাজার ষোল।বৃহষ্পতিবার।

আজ সকালে ঘুম ভেঙ্গে যাবার পর শিথানের পাশে বেডসাইট টেবিলে রাখা সেলফোনটি হাতে নিয়ে দেখি তাপমাত্রা তিন ডিগ্রী সেলসিয়াস। সময় সকাল ৮টা। তার মানে বেইজিং সময় সকাল ১০টা? হায় হায়! উপায় কি? গোসল, নাশতা কিছুই হয়নি। আজ ব্রেকফাস্ট না খেয়েই থাকতে হবে। কিন্তু এটা কি করে হলো? এত ঘুমালাম! ইন্টারকমে ৮৭২৭ এ ফোন করলাম। নাহ্‌, সালাহউদ্দিন ধরলো না। তবে কি ওরা চলে গেল সবাই ট্রেনিং ক্লাসে? আমাকে কি ওরা বাসে খোঁজ করেছিল? আজ থেকে আমাদের চারজনের ক্লাসে যোগদান করবার কথা।আমার মাথা খারাপ অবস্থা। ফোন করলাম, হ্যালো মিশু, কয়টা বাজে?

-কেন স্যার ৮টা।

‘চায়না টাইম না বাংলাদেশ টাইম?’

-স্যার, চায়না টাইম।

‘ওহ্‌, বেঁচে গেলামরে ভাই। আমি ভেবেছিলাম এটা বাংলাদেশ টাইম, দু’ঘন্টা যোগ করে চায়না টাইম’। সে আরো বলল – স্যার, সাড়ে আটটায় ব্রেকফাস্ট টাইম ওভার হয়ে যাবে, তাই আগে ব্রেকফাস্টে যাচ্ছি।

‘ঠিক আছে, চলো’ বলে ফোন রেখে দিলাম। মুহূর্তে ভাবলাম, ব্যাপার কী? গতকাল তো ছিল বাংলাদেশ টাইম। আমি তো টাইম এডজাস্ট করিনি, দুঘন্টা যোগ করে করে চলছি। পরক্ষণেই মনে হলো, আরে তাই তো, গতকাল বিকেলেই তো চায়না মোবাইল সিম ঢুকালাম, তাই তো টাইমটা অটোমেটিক চেঞ্জ হয়ে গেছে।

মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিলাম এই ভেবে যে, নাহ্‌ কোন অসুবিধে নেই।

আমি তাড়াতাড়ি করে গোসল টোসল সেরে ক্যান্টিনে গেলাম। এবং দেখলাম আমার পরেও দু’তিন জন নাশতা করতে আসলো। যাক, ঠিক ঠাক মত খেয়েদেয়ে ট্রেনিং ভেন্যুগামী বাসে উঠতেই বাস যথারীতি ছেড়ে দিল।

প্রায় ৪৫ মিনিট পর বাস ট্রেনিং ভেন্যুতে পৌঁছলো। একটি হাইরাইজ ভবনের ১২-তলায় আমাদের ট্রেনিং ক্লাস। প্রশিক্ষণার্থীদের সামনে একপাশে বসেছেন প্রশিক্ষকগণ। একজন ম্যাণ্ডারিন চাইনিজ ভাষায় বলছেন, তিনি পুরুষ আর একজন ইংরেজীতে অনুবাদ করে দিচ্ছেন, তিনি তরুণী মহিলা।

ক্লাসে গরম পানি, চা আর স্ন্যাক্স আছে। ভবনটিতে সেন্ট্রালি হিটিং সিস্টেম বিদ্যমান। তবে রুম টেম্পারেচার এমন যে, যথেষ্ট গরমকাপড় গায়ে জড়িয়েই ক্লাস করতে হয়।

বেলা দুটোয় ক্লাস শেষ হলে একই বাসে করে হোটেলে প্রত্যাবর্তন করে সবাই একবারে লাঞ্চ সেরে যে যার রুমে গেলাম।

 

চার নভেম্বর দুহাজার ষোল।

আজ ভোরে সূর্যদয়ের পূর্বে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে আবার শুয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভেঙ্গে দেখি সকাল পৌনে আটটা। সময় কম, তারপরেও ১০-১৫ মিনিট যোগাসন করলাম। কারণ শুরুটা করা দরকারতারপর গোসল সেরে ক্যান্টিনে গিয়ে দ্রুত নাশতা করে নিলাম। কিন্তু চা বা পানি খাবার সময় পেলাম না। দু’টুকরো আপেলের একটুকরো প্লেটে রেখেই অন্য টুকরোটি মুখে পুরতে পুরতে দ্রুত বাইরে এলাম ট্রেনিং এর বাস ধরতে। বাসে উঠতেই বাস ছেড়ে দিল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র অভিমুখে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি যে এলাকায় তার নাম  ‘জি তান দা শা।’ যাবার পথে ইয়াংডিঙান সড়ক সেতু,  বেইজিং স্পোর্টস লটারি এডমিনিস্ট্রেশন সেন্টার ও চায়না ইন্সটিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস এর ক্যান্সার হাসপাতাল নজরে এল বাসের জানালা দিয়ে।

ক্লাস হলো বেলা পৌনে বারোটা পর্যন্ত।

কারণ আজ শুক্রবার। আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে প্রায় ঘন্টাখানেকের ড্রাইভ দূরে একটি মসজিদে জুমা’র নামাজ পড়বার জন্য। এটি একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী চীনা মসজিদ। মসজজিদটি যে এলাকায় অবস্থিত তার নাম ‘নিউজি স্ট্রিট’। আর মসজিদটির নাম ‘নিউজি মসজিদ’। প্রাচীন এ মসজিদটির নির্মাণকাল চতুর্দশ শতাব্দী। বেশ বড় ক্যাম্পাস। মূল মসজিদ ভবনে আড়াইহাজার মুসল্লি একসাথে নামাজ পড়তে পারে। মূলভবনের সামনে খোলা মাঠ তারপর একটি ছোট ভবন, তারপরে আরো খোলা জায়গা এবং তারপরে আরো অন্যান্য ভবন। এখানে আছে দুটি স্যুভেনির শপ এর জন্য দুটো পৃথক ভবন। আর আছে বড় ওয়াশরুম ও অজুখানা ভবন। যেখানে অন্তত ১০-১২টি প্রক্ষালন কক্ষ আছে। অজুখানায় আনুমানিক ৩০-৩৫ জন একসাথে অজু করতে পারে।  

একটু ফাঁকে মহিলাদের জন্য আলাদা ভবন। ইচ্ছে করলে মসজিদের চত্তরে দশহাজার লোক একসাথে নামাজ আদায় করতে পারবে। আমরা প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিনহাজার মুসল্লী একসাথে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করলামমসজিদের অভ্যন্তরভাগের দেয়াল ও ছাদে ঐতিহ্যবাহী চীনা নকশা এবং চীনা ও আরবী ক্যালিগ্রাফি করা।হুজুর দেখলাম বেশ কয়েকজন যারা প্রথম কাতারে পূর্বমুখী হয়ে বসেছেন। প্রত্যেকে শার্টের ওপর ঢিলেঢালা আলখাল্লা ও তার ওপর ওভারকোট পরিহিত। প্রত্যেকের মাথায় পাগড়ি বাঁধা, পাগড়ি  পৃষ্ঠদেশ দিয়ে কোমড় পর্যন্ত লম্বা। হুজুরগণ পাগড়িধারী হলেও কেউই শশ্রুমণ্ডিত নন তবে মুসল্লীদের ভেতর অনেকের এমনকি চীনা মুসল্লীদের মধ্যেও অনেককে দেখলাম শশ্রুধারী। প্রথমে এই হুজুরদের প্রত্যেকে নিজনিজ বসার স্থান থেকে মাইক্রোফোনে পবিত্র কুর’আন থেকে বিভিন্ন সুরা আবৃত্তি করলেন। এর পর প্রায় দশম কাতার বরাবর একটি টেবিল এনে স্থাপন করলেন দুজন খাদেম। এই কাতার বরাবরই একটু উত্তরদিকে মসজিদের মিম্বর যেখানে দাঁড়িয়ে ইমাম সাহেব খুৎবা পড়েন। আমাদের দেশের সাথে এটি একটি ব্যতিক্রম। আমাদের দেশে প্রথম কাতারেরও সামনে মিম্বর থাকে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মিম্বর তেমন বড় নয়আর এদেশে অষ্টম-দশম কাতার বরাবর মিম্বর এবং এটা বেশ বড় ও উঁচু। টেবিলটি মিম্বর বরাবরই একটি দক্ষিণ দিকে স্থাপন করা হলো।

তারপর একজন পাগড়িধারী হুজুর হাতে একখানা প্লাষ্টিকের নোট ফাইল নিয়ে এলেন। টেবিলে ফাইলটি রেখে একটানা অনেকক্ষণ বক্তৃতা দিলেন চীনা ভাষায়। বক্তৃতা ঠিক নয়, বয়ান করলেন চীনা ভাষায়মাঝে মাঝে ফাইল দেখে উদ্ধৃতি দিলেন। মাঝে মাঝে যে আরবী ভাষায় কুর’আন বা হাদীসের রেফারেন্স দিলেন তা ছাড়া আর কিছুই বুঝা গেল না। তার বয়ান শেষ হলে তিনি চলে গেলেন ও খাদেমদ্বয় টেবিলটি যথাস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন। এবারে ইমাম সাহেব এলেন প্রথম কাতার থেকে মিম্বরের দিকেইমামসাহেবের পেছন পেছন মুয়াজ্জিন সাহেব এলেন। ইমাম সাহেব সিঁড়ি বেয়ে মিম্বরে আরোহন করে বসলে মুয়াজ্জিন সাহেব ছানি আজান দিলেন। এরপর ইমাম সাহেব সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পাশে রক্ষিত  লম্বা লাঠিটি ডান হাতে ধারণ করে বাম হাতে খুৎবার বই ধরে আরবীতে খুৎবা প্রদান করলেন। খুৎবা প্রদান শেষ হলে ইমাম সাহেব মিম্বর থেকে নেমে ইমামতির

স্থানে গেলেন। পেছনে পেছনে মুয়াজ্জিন সাহেব গেলেন। মুয়াজ্জিন সাহেব ইকামাত দিলে সব মুসল্লী উঠে ফরজ নামাজের জন্য দন্ডায়মান হলেনযথারীতি সালাম ফিরিয়ে ইমাম সাহেব নামাজ শেষ করলেন এবং কোন মুনাজাত ধরা হলো না। সবাই উঠে বাকী সুন্নত নামাজ যার যার মত আদায় করলেন। এই মসজিদে চীনারা ছাড়াও বেইজিং এ কর্মরত বা ভ্রমণরত বিভিন্ন দেশের মুসলিমগণ নামাজ আদায় করলেন। ব্যাপারটা বেশ ভাল লাগলোএকটা আন্তর্জাতিক পরিবেশে নামাজ পড়ে অন্যরকম এক তৃপ্তি হলো।

 

জুম’আর নামাজের পর আমাদেরকে কাছাকাছি একটি রেস্তোঁরায় নিয়ে যাওয়া হলো মধ্যাহ্নভোজের জন্য। মধ্যাহ্নভোজের জন্য যে রেস্তোঁরায় নিয়ে যাওয়া হলো সেটি একটি মুসলিম হোটেল। খাবারের পর আমাদের সবাইকে প্রশিক্ষণ ব্যাগ দেয়া হলো এবং প্রশিক্ষণের বিষয়সূচি, ফিল্ডভিজিট ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক আলোচনা হলো

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

One thought on “গ্রেটওয়ালের দেশে-২

  1. শরীফ শেখ

    শেয়ার করলাম