গ্রেটওয়ালের দেশে-৩

পাঁচ নভেম্বর দুহাজার ষোল। শনিবার।

সকাল ন’টায় আমাদের বাস হোটেল থেকে ছেড়ে দিল তিয়ান’আনমেন স্কোয়ার ও নিষিদ্ধ নগরীর উদ্দেশ্যে। আজকে আমাদের ট্যুর গাইড মিঃ ওয়াংবো। বাস কিছুদূর চলার পর গাইড দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে জানালেন তার চীনা নাম ওয়াংবো, তবে তার ইংরেজী নাম এজরিং। তিনি জানালেন, বেইজিং চীনের বৃহত্তম শহর যেখানে লোক সংখ্যা ২২ মিলিয়ন এবং যে শহরে ৬ মিলিয়ন গাড়ি চলাচল করে। গত দুহাজার সালে লোক সংখ্যা ছিল ১৬ মিলিয়ন এবং বর্তমানে লোক সংখ্যা ২২ মিলিয়ন। অর্থাৎ খুব দ্রুত হারে বেইজিং শহর প্রসারিত হচ্ছে ও এর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেইজিং শহর পূর্ব-পশ্চিমে ১৬০ কিলোমিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে ১৮০ কিলোমিটার লম্বা। এর ডাউনটাউন থেকে সাবার্ব বড়। এ শহরে আছে পাঁচটি বড় রিং রোড। আমাদের গাড়ি চতুর্থ রিং রোড ধরে তিয়ান’আনমেন স্কোয়ারপানে ধাবিত হচ্ছে।

মিঃ ওয়াংবো জানালেন, বেইজিং এ বর্তমানে সর্বোচ্চ ৩২১ মিটার উঁচু (৮১-তলা) ভবন রয়েছে, যেটি চীনের দ্বিতীয় উচ্চতম ভবন।  সাংহাই শহরে চীনের উচ্চতম ভবন অবস্থিত। তবে বেইজিং এ ৫২০ মিটার উঁচু ভবন নির্মীয়মান আছে, নির্মাণ সম্পন্ন হলে এটিই হবে সর্বোচ্চ ভবন। বেইজিং এ আছে অনেক ঐতিহাসিক স্থান ও সৌধ। আছে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, গ্রীষ্মকালিন রাজপ্রাসাদ, প্রাচীন গুহা, সুগন্ধি পাহাড়, বেইহাই লেক আরো অনেক কিছু। প্রখ্যাত পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় ও সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় এখানেই অবস্থিত। সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিয়ন পীস হাসপাতাল মার্কিনীরা স্থাপন করে ১৯০০ সালে। এখানে রয়েছে হৃদরোগ, ক্যান্সার, অর্থোপেডিক ও চোখের ওপর বিশেষায়িত হাসপাতাল। এ ছাড়া আছে বিখ্যাত চীনা আকুপাংচার হাসপাতাল। চীনের চারপাশে প্রাচীন আমলে অনেক দেয়াল উঠিয়েছিল মঙ্গোলীয়দের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষার জন্য যার অনেক কিছুই পরবর্তীতে ভেঙ্গে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। সাক্ষী রয়ে গেছে এখনো বেইজিং এর চারপাশের গ্রেটওয়াল বা মহাপ্রাচীর।

মিঃ ওয়াংবো একটি মেটাল স্টিকের শীর্ষে উজ্জ্বল রঙিন কাপড়ের তৈরি একটি গোল্ডফিশ ঝুলিয়ে আমদেরকে বললেন, ‘গাড়ি থেকে নেমে আমার সাথে সাথেই তোমরা থাকবে। কিন্তু কেউ পিছিয়ে পড়লে এই গোল্ডফিশ ফ্লাগ দেখে চলে আসবে।’  চীনাদের কাছে গোল্ডফিশ হলো সমৃদ্ধির প্রতীক, তাই আমাদের গাইড মিঃ ওয়াংবো গোল্ডফিশ ফ্লাগ নিয়েছেন।

তিয়ান’আনমেন স্কোয়ার থেকে বেশ দূরে আমাদের গাড়ি থেকে নেমে স্কোয়ার অভিমুখে হেঁটে যেতে হলো। এই স্কোয়ারের দিকে হেঁটে যাবার পথে চওড়া রাজপথের দুধারে প্রশস্ত ফুটপাতে অনেক গাছের সারি দেখলাম। যেমন- এল্ম, জুনিপার, পাইন, গিংখো, পাকৌডা ইত্যাদি বৃক্ষ। এদের মধ্যে এল্ম গাছের পাতা আমাদের দেশের নিমগাছের মতো কিছুটা। গিংখো গাছের পাতা উজ্জ্বল হলদে রঙের, পাইনের পাতা সূচালো, জুনিপারের পাতা ঝাউগাছের মত কিছুটা। আর পাকৌডা বৃক্ষের পাতা আমাদের দেশের পাকুড় গাছের মতই কিছুটা তবে আকারে ছোট আর গাছের কান্ড তেমন মোটা নয়।

স্কোয়ারে যাবার পথে পড়লো ন্যাশনাল পারফরমেন্স সেন্টার। এখানে সঙ্গীত ও নাট্যকলার জন্য রয়েছে বিরাট হল ও গ্যালারিএই ভবনটি বিশাল ডিম্বাকৃতির বলে এটা ‘বিগ এগ’ নামেও পরিচিত। চারদিকে কৃত্রিম হ্রদ বিশিষ্ট এই বিগ-এগ ভবনটি নান্দনিক শিল্পের এক অনুপম  উদাহরণ।

১৯৮৯ সালে এই তিয়ান’আনমেন স্কোয়ারে কমিউনিস্ট সরকারবিরোধী বিক্ষোভরত জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল এবং সামরিক বাহিনীর ট্রাক উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল বিক্ষোভ দমনের জন্য। এতে বহুলোক হতাহত হয়। তখন থেকে সারা বিশ্ব তিয়ান’আনমেন স্কোয়ারকে চেনে।

যাহোক, তিয়ান’আনমেন স্কোয়ারের একপাশে ইয়ং হিরো’স মনুমেন্ট যা ১৯৫৪ সালে স্থাপিত হয়েছে। এর পেছনেই ন্যাশনাল মৌসলিয়াম বা জাতীয় সৌধ। এর ভেতরেই রয়েছে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা চেয়ারম্যান মাও সে তুং এর মমি। আর ইয়ং হিরো’স মনুমেন্টের সামনের দিকে রাজপথের অপর পারে চীনা ন্যাশনাল পার্লামেন্ট যা বিখ্যাত ‘গ্রেট হল’ নামে পরিচিত। চেয়ারম্যান মাওয়ের এই সৌধে প্রবেশ করতে হয় এক দিক দিয়ে আর বের হয়ে যেতে হয় অন্য পথে। বের হবার পর কম্পাউন্ডের দুপাশে অনেক স্যুভেনির শপ যেখানে  ঘড়ি, কয়েন, শো-পীস, লকেট, কলম ইত্যাদি পাওয়া যায় যার প্রতিটিই চেয়ারম্যান মাও এর ছবি বা প্রতিকৃতি সম্বলিত। চেয়ারম্যান মাওকে চীনে খুবই সমীহ করা হয় ও সম্মানের চোখে দেখা হয়।চেয়ারম্যান মাওয়ের এই সৌধে প্রবেশ করতে হয় সারিবদ্ধ ও সুশৃঙ্খলভাবে এবং কঠোর নিরাপত্তা চেকিং এর মাধ্যমে।বিমানবন্দরে ফাইনাল সিকিউরিটি চেকিং এ যেমন কোট, বেল্ট, ওয়ালেট ইত্যাদি খুলতে হয়, তেমনই ভাবে। আর এখানে ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ নিষেধ।সেলফোন নেয়া যায় তবে তা সুইচ অফ মোডে। আমরা যখন ভেতরে গিয়ে চেয়ারম্যান মাওয়ের মমির সামনে দিয়ে অতিক্রম করছিলাম তখন তার মমিকে লক্ষ্য করে তার আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি নিঃশব্দ আবেগে।

তিয়ান’আনমেন স্কোয়ারের পাশেই রয়েছে বেইজিং এর বিখ্যাত নিষিদ্ধ নগরী বা ফরবিডেন সিটি। আমরা এবার ফরবিডেন সিটিতে গেলাম। ফরবিডেন সিটি আর কিছুই নয়, অনেক প্রাচীন রাজপ্রাসাদ। এই প্রাসাদসমূহ ১৪০৬ হতে ১৪২০ সালের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। এখানে চীনের  সর্বশেষ সম্রাট  বাদশাহ ভোয়ি ১৯১২ সাল পর্যন্ত বসবাসরত  ছিলেন। প্রাচীন আমলে এই প্যালেস সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ ছিল, সেই থেকে এর নাম নিষিদ্ধ নগরী। এই প্যালেস তৈরি করতে ২০ হাজার শ্রমিক কাজ করেছিল ১৪ বছর ধরে। এই প্রাসাদের মূল আয়তন ৭০০*৯০০ বর্গমিটার এবং মূল প্রাসাদের চারপাশের আয়তন এর চেয়ে দশগুণ বড়। এখানে রয়েছে রাজাদের দরবার হল, খাজনা আদায়ের হল, ১০০ জন রাণীর ১০০টি আলাদা আলাদা ঘর, রান্না ঘর, চা-খানা, নাচঘর

ইত্যাদি। ঘরগুলোর ছাদ ইয়েলো-ক্লে টাইলসের, দেয়াল ও পিলার লাল রঙের। চীনা মতানুসারে ইয়েলো হলো রয়্যাল কালার আর রেড হলো হ্যাপীনেস এর প্রতীক। প্যালেস এর আঙিনাসমুহে রয়েছে মার্বেল পাথরের সেতু আর সেতুর নীচ দিয়ে কৃত্রিম নদী। সমগ্র প্যালেসটি কৃত্রিম নদী দিয়ে সুরক্ষিত। সবচেয়ে বড় হলটির নাম সুপ্রিম হারমনি হল। কোর্টইয়ার্ডে পাথরের তৈরি বৃহৎ আকৃতির কচ্ছপ(Turtle) ও বক(Crane)এর মূর্তি রয়েছে যাদের মুখে ধূপ জ্বালানোর ব্যবস্থা রয়েছে। কচ্ছপ ও ক্রেন দীর্ঘায়ুর প্রতীক। প্যালেসে রয়েছে ড্রাগণ-চিহ্নিত রাজার সিংহাসন আর রাণীর সিংহাসন হলো ফিনিক্স-পক্ষী চিহ্নিত। প্যালেসে রাজার জন্য ১০টি সিংহাসন ও রাণীর জন্য ৯টি সিংহাসন রয়েছে।  চীনা মিথ অনুযায়ী ৯ সংখ্যাটি হল ক্ষমতার প্রতীক আর ১০ সংখ্যাটি সুপ্রিম ক্ষমতার প্রতীক।

সন্ধ্যেবেলা হোটেলে ফিরে দেখলাম সিসিটিভি চ্যানেলে আইকন শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানে বিখ্যাত চৈনিক অভিনেতা ও গায়ক লুইয়ং ওয়াং এর ওপর একটি প্রতিবেদন ও সাক্ষাৎকার চলছে। মিঃ ওয়াং এর পিতা একজন মিলিটারী-ম্যান ছিলেন আর মাতা ছিলেন শিল্পের সমঝদার একজন মহিলা। মিঃ ওয়াং বলছিলেন, The source of my inspiration is my family. ছোটবেলা থেকে অভিনয়ের প্রতি এত বেশি ঝোঁক ছিল যে কষ্ট করে টাকা জমিয়ে তিনি অভিনয় শেখার জন্য আমেরিকায় পাড়ি দেন। অভিনয়ের ওপর লেখাপড়া করা সত্ত্বেও সেখানে প্রথম দিকে বলা হয়েছিল, তোমাকে দিয়ে হলিউডে অভিনয় সম্ভব নয় কারণ তোমার ইংরেজী ভাল নয়। তার কাছে অর্থকড়ি সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। তিনি ব্যর্থ মনোরথ হয়ে টাকা পয়সা ধার করে চীনে ফিরে আসতে মনস্থ করেছিলেন। হঠাৎ এমন একজন পরিচালক পেলেন যিনি তাকে এমন একটি চরিত্রের অফার দিলেন যেখানে ভাল ইংরেজী জানার দরকার ছিল না। ফলে তিনি উতরে যান। তারপর ধীরে ধীরে তার ইংরেজীতে শুদ্ধতা আসে এবং পরবর্তীতে হলিউডের নামী দামী অভিনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। পরে তিনি চীনে ফিরে আসেন ও Shanghai Theatre Academy প্রতিষ্ঠা করেন। কারণ তিনি চেয়েছিলেন যে তার সন্তানেরা যেন চীনকে ভুলে না যায়। আশির দশকে তিনি Jane Eyre নামক একটি ধারাবাহিক টিভি নাটকে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান।

শরীফ রুহুল আমীন

 

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts