গ্রেটওয়ালের দেশে- ৪র্থ পর্ব

Great-wall-of-China-beijing-bookmundi

০৬ নভেম্বর দুহাজার ষোল। আজ রোববার। ছুটির দিন। বেইজিং এ আসার পর থেকে ছুটির দিনে যে আরাম করে ঘুমুবো তার জো নেই। প্রতি উইকেন্ডেই কোথাও না কোথাও প্রোগ্রাম আছেই। ঘুম থেকে জেগে দেখি সকাল ৭টা। বেড থেকেই টিভি অন করে দেখি বিখ্যাত ভারতীয় আফ্রিকান ফিল্ম-মেকার, লেখক ও এ্যাক্টিভিস্ট মীরা নায়ার এর ইন্টারভিউ প্রচারিত হচ্ছে। মীরা নায়ার পরিচালিত অনেক বিখ্যাত চলচ্চিত্র আছে, তন্মধ্যে Salam Bombay খুব হিট হয়েছিল। মীরা নায়ার সিনেমার কাজ শেখার জন্য আঠারো বছর বয়সে ভারত ছেড়ে আমেরিকা পাড়ি দেন। আমেরিকায় লেখাপড়া শেষ করে পরবর্তীতে তিনি আফ্রিকার উগাণ্ডার কাম্পালায় স্থায়ী হন। তিনি গত ২৭ বছর ধরে কাম্পালায় আছেন এবং তিনি কাম্পালায় একটি ফ্রি মুভি স্কুল স্থাপন করেন। চলচ্চিত্রের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা থেকে তিনি এটি স্থাপন করেছেন।

 

সকাল সাড়ে নয়টায় আমাদের বাস ছাড়ল চীনের বিখ্যাত গ্রেটওয়াল অভিমুখে। চীনের এই মহাপ্রাচীর পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের একটি। আজ আমাদের ট্যুর গাইড হিসেবে আছেন মিস জেসি। মিস জেসির ইংরেজীতে আমেরিকান এ্যাকসেন্ট। যাত্রাপথে তিনি তার পরিচয় দিয়ে জানালেন যে, গ্রেটওয়ালের অনেকগুলো গেট আছে। তন্মধ্যে মাত্র তিনটি গেট জনসাধারণের বা পর্যটকগণের জন্য খুলে দেয়া আছে। এই তিনটি সেকশনের মধ্যে আমরা যাচ্ছি অপেক্ষাকৃত দূরের পাদালিং(Badaling)সেকশনে। উল্লেখ্য এরা মুখে উচ্চারণ পাদালিং করে কিন্তু ইংরেজীতে লিখবার সময় লেখে বি দিয়ে আমাদের কাছে যার উচ্চারণ হয় বাদালিং। সে যা হোক, মিস জেসির ভাষ্য মোতাবেক গ্রেটওয়াল ৩৭৪ কিলোমিটার লম্বা এবং এই মহাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে পাহাড়ের ওপর দিয়ে সমুদ্র সমমতল থেকে এক হাজার মিটার উঁচুতে। এই মহাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয় শক্তিশালী প্রাচীন চীনা ডাইন্যাস্টি মিং রাজা ও চিং রাজাদের আমলে। বহিঃশত্রু বিশেষত মোঙ্গল দস্যুদের হাত থেকে বেইজিংকে রক্ষার জন্য এই প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছিল।এর উপরিভাগ এত চওড়া যে এর ওপর দিয়ে চারটি আরবী ঘোড়া একসাথে ছুটে যেতে পারবে । আরবী ঘোড়ার ছুটে চলার সাথে এই তুলনা ঐতিহাসিকভাবে দেয়া হয়। কারণ প্রাচীন চৈনিক রাজাদের সময় আরবদেশের সাথে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক খুব মজবুত ছিল।। এর প্রমাণ গোটা চীন জুড়ে বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক প্রাচীন মসজিদ। উদাহরণস্বরূপ চীনের গুয়াংদং প্রদেশের প্রাচীন ক্যান্টন শহরে মহানবীর সময়েই মহানবীর সাহাবারা আসেন ইসলাম ধর্ম প্রচার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে। মহানবীর আপন মামা ও ঘনিষ্ঠ সাহাবী হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস মহানবীর ওফাতের পর ৬৪১ খৃষ্টাব্দে এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এই মসজিদটি আবি ওয়াক্কাস মসজিদ নামে খ্যাত। এই মসজিদ ক্যাম্পাসেই হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস ও তার সহযোগী আরেকজন সাহাবীর কবরও আছে।

 

যাহোক, গ্রেটওয়ালের পাদদেশে আমাদের গাড়ি থেকে নামতেই প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আমাদের অভিযাত্রীদের কাবু করে ফেললো। আমি প্যান্টের নীচে মোটা ইনার, দেহের উর্ধ্বাংশে শার্টের নীচে তিন পরতের গেঞ্জি আর টি-শার্ট পরে ফুল-শার্টের ওপরে উলেন ব্লেজার ও তার ওপরে ফোমের মোটা জ্যাকেট পরেছিলাম; এছাড়াও গলায়-মাথায় বানরটুপি, হাতে উলেন গ্লাভস, নাকে মুখে মাস্ক পরতে ভুলিনি। কাজেই আসুক ঠাণ্ডা, ঠাণ্ডারে আর ডরাই না……এরকম একটা ভাব নিলাম। যাদের জ্যাকেট ব্লেজার, সোয়েটার গ্রেটওয়ালের শীতের ধমক সহ্য করতে পারছিল না তারা বাধ্য হয়ে গ্রেটওয়ালের পাদদেশের গরম কাপড়ের দোকানগুলোতে ভীড় লাগিয়ে দিল আরো অধিক টুপি জ্যাকেট মাফলার ইত্যাদির জন্য।

তারপর সবাই ঠাণ্ডার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে চললাম ক্যাবল-কার স্টেশনের দিকে। ক্যাবল-কারে চড়ে আমরা সহজেই গ্রেটওয়ালের ওপরে উঠে গেলাম। অত্যন্ত আধুনিক ক্যাবল-কার। প্রতিটিতে ৬ থেকে ৮ জন বসা যায়। মোটা কাচের ঘরের মতো। ভেতরে উঠলেই আরাম। একটি নির্দিষ্ট স্থানে এসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজা খুলে গেলে উঠে পড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ক্যাবল-কার থেকে নেমে আরো প্রায় দুইশত ফুট ওপরে উঠতে হয় পায়ে হেঁটে এর সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছুতে। দেশ-বিদেশের অনেক পর্যটক এই গ্রেটওয়ালে উঠে কতজন যে কত ভঙ্গিতে ছবি, সেলফি তুলছে এই প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যে সে এক সাংঘাতিক ব্যাপার।আমিও পকেট থেকে সেলফোন বের করে ডানহাতের দস্তানা খুলে বানরটুপি মাথা থেকে উপড়ে ফেলে পেছনে দিয়ে যথারীতি কয়েকটি সেলফি তোলার খায়েশ সংবরণ করতে পারলাম না। আবার কবে এই মহাপ্রাচীরের সাক্ষাৎ পাবো কি পাবো না। সুযোগ তো হেলায় হারিয়ে লাভ কি? নভেম্বর মাসের হাঁড়কাঁপা শীতে মহাপ্রাচীর ধারণকারী পাহাড়ের সব গাছপালাই পত্রপল্লববিহীন। শুধু সাইপ্রেস আর পাইনের চিরহরিৎ সূঁচালো পাতাগুলোই

পর্যটকদের দিকে তীর্যকবাণ হেনে তাকিয়ে বলছে- সুষমাময় পুষ্পপল্লব ঝরে গেছে কিন্তু কন্টকযুক্ত হলেও আমরা আছি হে পর্যটকবৃন্দ তোমাদের নয়নে একটু হলেও সবুজের ঝলক দিতে।মনে মনে বললাম, ধন্যবাদ সাইপ্রেস, ধন্যবাদ পাইন- ধন্যবাদ তোমাদের সবুজ সূুঁচলো পত্রপল্লবের জন্য।

 

গ্রেটওয়াল দেখা শেষ করে ক্যাবল-কারে চড়ে নেমে এসে দেখি মধ্যাহ্ন ভোজের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। ক্ষুধার্ত সবাই নিকটস্থ একটি কে.এফ.সি রেস্তোঁরায় ঢুকে দুপুরের আহার সেরে বাসে এসে উঠলাম। বাস টারমিনালের কাছে দেখলাম এক চীনা-ম্যান দুই কুঁজওয়ালা একটি মস্ত বড় লাল উট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকেই এই উটের পিঠে চড়ে ছবি তুলছিল। আমাদের কারো শখ হলো না ওতে চড়তে। আমরা এই ঠাণ্ডা আবহাওয়া ছেড়ে হোটেলের উদ্দেশে বাসে চড়তেই বেশি ভালোবাসলাম। বাসে চড়ে বসতেই বাস ছেড়ে দিল। গ্রেটওয়ালে আসবার পথে আমাদের বাস কয়েকটি পাহাড়ী সুরঙ্গপথ অতিক্রম করে এসেছিল। আর ফিরবার পথে দেখলাম অনেক বড় একটি সুরঙ্গ পথ যার দৈর্ঘ্য আমাদের যমুনা সেতুর চেয়ে বেশি বৈ কম হবে না। যাওয়ার পথে দুপাশে পাহাড়ের ওপর বিভিন্ন স্থানে পার্সিমন গাছে অনেক পাকা পার্সিমন ধরে আছে দেখলাম। পেকে গাছেই শুকিয়ে যাচ্ছে, এত ওপর থেকে পেড়ে খাবার লোক নেইপাক্কা দুঘন্টা লেগে গেল আমাদের হোটেলে ফিরতে। হোটেলের রুমে বসে কবিতা চলে এলো-

 

চীনের মহাপ্রাচীর

 

কখনো ভাবিনি তোমার সাথে মিলব
এমনি এক রক্ত জমাট করা শীতের বেলায় 
দেখা হলো তোমার সাথে দৈবাৎ
পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের একটি
গ্রেটওয়াল তুমি।

 

এসেছে ইন্টারনেট, গুগল আরো কত কী
তোমার আকর্ষণ তবু  রয় নিরবধি

অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে,  তুমি প্রাকার
সাধ্য নেই আধুনিক মানব করবে অস্বীকার


আজ এই উন্মাতাল ইলেকট্রোনিক সভ্যতার মাঝে
গ্রেটওয়াল তুমি দাঁড়িয়ে নির্বিকার

 

উচ্চ করি শির, হুঁশিয়ার
সাক্ষী রোজকার মানব সভ্যতার
জয়তু বিধাতার মানব ক্ষমতার ।।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

 

 

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment