গ্রেটওয়ালের দেশে- ৫ম পর্ব

গ্রেটওয়ালের দেশে

সাত নভেম্বর দুহাজার ষোল। আজ প্রশিক্ষণ ক্লাসে আমাদের প্রশিক্ষণ-পুস্তকসমূহের মধ্য হতে  ইলেক্ট্রিক্যাল পার্ট এর প্রথম দিকের একটি চ্যাপ্টার পড়ানো হলো। আজকের প্রশিক্ষকের নাম মিঃ চেন শি লিন(Chen Xi Lin)আগের দিন গ্যাস টারবাইন পড়িয়েছিলেন মিঃ উ চিন পিং(Wu Chin Ping)উ চিন পিং ছিলেন অল্প বয়সী যুবক আর মিঃ চেন শি লিন বয়স্ক, রিটায়ার্ড চীফ ইঞ্জিনিয়ার। শিক্ষকগণ এখানে পুরোপুরি চীনা ম্যাণ্ডারিণ ভাষায় লেকচার দেন। আর তার পাশে থাকা টিচিং এসিস্ট্যান্ট মিস এলিস তা ইংরেজী ভাষায় তরজমা করে দেন।মিস এলিস মূলত চায়না হুয়াদিয়ান করপোরেশনে কর্মরত একজন গাইড, কো-অরডিনেটর এবং অনুবাদক। তিনি লম্বা, সুন্দরী এবং অবিবাহিতা। তার একজন ফিওঁসে আছে যার সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। চীনের জিলিন প্রদেশ থেকে আগত পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান এলিসের আসল নাম ওয়াং জিং ইয়া(Wang Jing Ya)কিন্তু তিনি আমাদের সবার কাছে এলিস। বেইজিং এর একটি ইউনিভার্সিটি থেকে অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং এ গ্রাজুয়েশন করার পর মালয়েশিয়াতে ইন্টার্ণী করেছেন স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের আওতায়। এর সম্পর্কে এত বলার কারণ হলো সে আমাদের পুরো কোর্সেরই সমন্বয়ক।

 

লাঞ্চের পর বিকেল ৪টায় আজ এলিস আমাদেরকে নিয়ে গেলেন হোটেলের কাছাকাছি তা-ইয়ান-লু রোডের একটি শপিং সেন্টারে। এই শপিং সেন্টারটি শীতের কাপড়ে ঠাসা। এছাড়া আছে অন্যান্য কাপড়চোপড়, ব্যাগ ইত্যাদি। আজ আমাদেরকে সাবওয়ে ট্রান্সপোর্ট কার্ড কিনে দেয়া হবে। তাই-ইয়ান-লু এর শপিং সেন্টার থেকে বেরিয়ে হেঁটে প্রধান সড়কের একটি বাসস্ট্যাণ্ডে যাইএখানে বাসগুলো ঝকঝকে তকতকে আর  অনেক বড় বড়। কোনো কোনো বাস এত বড় যে তিনটি বা চারটি দরজা আছে। দেখতে মনে হয় প্রতিটি বাসই যেন একেবারে নতুন। টিভিতে ইউরোপ-আমেরিকায় যেমন বাস দেখা যায় সেরকমই। প্রতিটি বাসের ভেতরে দরজার কাছেই ট্রান্সপোর্ট কার্ড পাঞ্চ করার অটোমেটিক মেশিন আছে। আর দরজাগুলো বাসচালক সুইচ টিপে খোলেন ও বন্ধ করেন। গরমের দিনে শীতল ও শীতকালে গরম রাখার জন্য ব্যবস্থা আছে। যাহোক, এই বাসে করে আমরা শিলি হো নামে একটি বাসস্টপে নামলাম। এখানে আছে আমাদের হোটেলের অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি দূরত্বের পাতালরেল বা সাবওয়ে স্টেশন। এখানে আমরা প্রত্যেকে ৫০ ইউয়ান দিয়ে একটি করে ট্রান্সপোর্ট কার্ড ক্রয় করলাম। এটা আমাদের চলাচলের জন্য ভাল। কেননা এই কার্ড দিয়ে আমরা সাবওয়েতে বেইজিং এর যে কোন স্থানে যেতে পারব আবার বাসেও যেতে পারব। বাসে নগদ ভাড়ার চেয়ে এই ট্রান্সপোর্ট কার্ড ব্যবহার করলে অর্ধেক ভাড়ায় যে কোন জায়গায় যাওয়া যাবে। কার্ডে টাকা শেষ হয়ে গেলে যে কোন সাবওয়ে স্টেশনের ভেন্ডিং মেশিন থেকে রিচার্জ করা যাবে নিজে নিজেই যখন তখন।

 

প্রতিটি বাস স্ট্যাণ্ডে আধুনিক যাত্রী ছাউনির পাশে বড় ডিজিটাল বোর্ড টাঙ্গানো আছে। এই বোর্ডে ম্যাপের মত করে দেয়া আছে কত নম্বর বাসসমূহ কোথায় কোথায় থামবে। সুতরাং নম্বর দেখে বাসে উঠবেন। ওঠার সময় দরজার কাছের মেশিনে ট্রান্সপোর্ট/সাবওয়ে কার্ডটি সোয়াপ করবেন, ব্যালান্স উঠবে আবার নামার সময় আবার কার্ডটি সোয়াপ করবেন, ভাড়া কেটে কার্ডের ব্যালান্স দেখাবে মনিটরে। শুধু একটাই অসুবিধা বাসে ওঠার পর সঠিক স্টপেজে নামা। কেননা চীনের কোথাও ইংরেজীতে কোন নামের সাইনবোর্ড নেই। সব চীনা ভাষায়। কাউকে জিজ্ঞেস করে সুবিধে করতে পারবেন না। শতকরা নিরানব্বই দশমিক নয় জনই চীনা ছাড়া অন্য ভাষা জানে না। তবে এই অসুবিধে সাবওয়েতে নেই। সব সাবওয়ে স্টেশনে ইংরেজীতে স্টেশনের নাম লেখা এবং রেলের প্রতি গেটের সামনেই ডিজিটাল ম্যাপে সব স্টেশনের নাম ইংরেজীতে লেখা আছে। তীর চিহ্ন দিয়ে দেখানো হচ্ছে কোন দিকে যাচ্ছে ইংরেজীতে এনাউন্সমেন্টও হয় কখন কোন্‌ স্টেশনে আসছে। আমরা আজ পাতালরেলে কোথাও গেলাম না। শিলি হো স্টেশনের কাছাকাছি একটি ইলেকট্রোনিক মার্কেটে যাওয়া হলো। এখান থেকে আমাদের বিপিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী দিলিপ বাবু ১২৯৯ ইউয়ান দিয়ে একটি হুয়াউইএর অনার ব্রান্ডের সেলফোন কিনলেন। এখানে দৈবক্রমে একজন বাংলাদেশী ছাত্রের সাথে পরিচয় হলো। ছেলেটির ডাক নাম টুটুল, বাড়ি যশোর। সে তার চীনা বান্ধবীকে নিয়ে মার্কেটে এসেছিল। আমাদের বাংলা আওয়াজ শুনে সে আমার দিকে এগিয়ে এলে আমি জিজ্ঞেস করি, আপনি কি বাঙালি? সে হ্যাঁ বলাতে আমি বললাম, আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি। সে বলল, সেও বাংলাদেশী এবং এখানে চায়না ইউনিভার্সিটি অব পলিটিক্যাল সায়েন্স এণ্ড ল’-তে অধ্যয়ন করছে আইনশাস্ত্রে। টুটুলের সাথে পরিচয় হয়ে খুব ভাল লাগলো। সে জানালো বেইজিং এর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় শ’তিনেক বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করে। অন্যান্য প্রদেশেও আরো ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়ন করছে।

 

আট নভেম্বর দুহাজার ষোল। আজ সকালে ঘুম ভেঙে দেখি। ঠাণ্ডা লেগে গেছে, গলা ব্যথা করছে। রাতে শোবার আগে রুম যথেষ্ট গরম ছিল তাই শোবার  সময় রুমহিটার অফ করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রাত এগারোটায় বেইজিং এর তাপমাত্রা ছিল আট ডিগ্রী সেলসিয়াস। আর এখন ভোরবেলা দেখছি মাইনাস দুই ডিগ্রী। বিছানা ছেড়ে উঠে তাড়াতাড়ি রুমহিটার অন করে দিলাম। তারপর ইলেক্ট্রিক কেটলিতে পানি গরম করতে দিলাম। পানি ফুটে গেলে গ্রিন-টি তৈরি করে পান করলাম গলাটাকে একটু আরাম দেয়ার জন্য।

সাততলা হোটেল ভবনটির ৭ম তলার ৮৭২১ নাম্বার কক্ষে থাকি। আমার রুমের ডানপাশের কয়েকটা রুমে মালয়েশিয়ান কিছু ট্যুরিস্ট উঠেছে গতকাল। এরা কুয়ালালামপুরের একটি ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রী। কয়েকজন শিক্ষকও এসেছেন সাথে। রাতে ডিনারের সময় এদের একজনের সাথে পরিচয় হয়েছিল। এই হোটেলটি একটি মুসলিম হোটেল বলে মালয়েশিয়ান ট্যুরিস্টদের খুব পছন্দ। আশেপাশে আরো দুতিনটি হোটেলের চাইতে এই হোটেলটি পপুলার মনে হয়। অতিথিদের খাওয়াদাওয়ার দিকে যথেষ্ট খেয়াল রাখে হোটেল মালিকের ছেলে মিঃ লিও। লিও একজন হ্যাণ্ডসাম মুসলিম যুবক। এখানে বেশ কয়েকজন চীনা মহিলা কর্মরত থাকলেও লিও নিজেও খাবারের ডিশ বা সালাদের প্লেট নিয়ে হাজির হয় টেবিলে টেবিলে। খুবই পরিশ্রমী ও আন্তরিক।

 

আজ ট্রেনিং ক্লাসে ইলেক্ট্রিক্যাল পার্ট থেকে যা পড়ানো হলো, তার এক বর্ণও মস্তিষ্কে ধারণ করতে পারলাম না। কারণ প্রচণ্ড ঘুমে বারবার আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল। সামনের সারিতে আমার আসন হওয়ায় চোখ বন্ধ করার সুযোগও পেলাম না কিন্তু বারবার চোখ জোর করে খোলা রেখে কি আর লেখাপড়ার বিষয় মাথায় ঢুকানো যায়। মাঝে মাঝে ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে পানি দিয়ে আসি, কিন্তু কিছুক্ষণ পর পর একই অবস্থা।

তবে আজকের ক্লাসে শুধু আমার মত নন-ইঞ্জিয়ার নয়, বাঘাবাঘা প্রকৌশলীগণের অনেকেই মনোসংযোগ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে পারেননি। যাহোক, ইঞ্জিনিয়ারিং কারিকুলাম পড়ানোর পর কিছুক্ষণ আমাদের আজ চীনা ভাষার তালিম দেয়া হলো যদি টুকটাক কাজে লাগে আমাদের। এই ট্রেনিং এর আরেকজন কো-অরডিনেটর এবং গাইড মিস লিউ রু মং আমাদেরকে চীনা ভাষার সবক দিলেন।আজ আমাদের এক থেকে দশ পর্যন্ত গণনা শেখানো হলোঃ

শুন্য = লিং, এক = ই, দুই = আর, তিন = ছান, চার = ছি, পাঁচ =উয়া, ছয় = লিও, সাত = ছিয়ে, আট = পা, নয় = জ্য, দশ = শি ।

মিস লিউ রু মং চীনের শিয়ান প্রদেশ থেকে এসেছে। লেখাপড়া করেছে শিয়ান প্রদেশের একটি ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজী সাহিত্যে। খুব হাসিখুশি এই মেয়েটি বেইজিং এয়ারপোর্টে আমাদের রিসিভ করেছিল মধ্যরাতের পরীর মত। আজ সকালে বেইজিং এর আকাশে দেখেছিলেম ঝকঝকে রোদ। তাই  কলমের আগায় চলে এলো-

 

 

বেইজিং এর আকাশে ঝকঝকে রোদ

 

আট নভেম্বর দুহাজার ষোলয়

তাপমানযন্ত্র কুঁকড়ে যেতে চায়

যেন সূর্য মামা জাগার অপেক্ষায়

ছিল । অথচ এখন সকাল নটায়

বেইজিং এর রৌদ্রকরোজ্জ্বল আসমান

দ্যাখো জমিন পানে চায়

 

প্রায় মেঘমুক্ত নীলাকাশ

ফুরফুরে প্রাণ জাগায়

 

আমরা চলি চার নম্বর রিং রোড ধরে

সামনে পেছনে হাজারো শকট থামা নেই কারো

নেই কারুর অবকাশ

 

ফুটপাতে আছে কিউআর কোডের পাসওয়ার্ড

দেয়া বাইসাইকেল পার্ক করা

 

উড়ালসেতুর পাশে খালি জায়গায়

বাগান পরিচর্যায় ঘাম ঝরে সিটি করপোরেশনের

কমিউনিস্ট শ্রমিক ভাইয়ের

 

আর আমার চোখ খুঁজে বেড়ায়

জারি সারি ভাটিয়ালি লোকগান

হায়! খুঁজে নাহি পায়।।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

 

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts