গ্রেটওয়ালের দেশে-৬ষ্ঠ পর্ব

গ্রেটওয়ালের দেশে- ৪র্থ পর্ব

নয় নভেম্বর দুহাজার ষোল। আজ সকাল সাড়ে নয়টায় ক্লাস শুরু হয়েছে।  আমাদের সাথে চীনা হুয়াদিয়ান কোম্পানীর কিছু চীনা তরুণ প্রকৌশলীও শিক্ষার্থীও আছে। তিনটি ছেলে ও তিনটি মেয়ে। ট্রেনিং শেষে এদের মধ্যে একজনকে পাঠাবে বাংলাদেশ ঘোড়াশাল পাওয়ার প্লান্টের কাজ দেখার জন্য। গত কয়েকদিন একটানা ট্রেনিং ক্লাস চলছিল। ক্লাস চলাকালিন যার যার সুবিধে এবং প্রয়োজনমতো কক্ষের একপাশে রক্ষিত টেবিল থেকে চা-বিস্কিট নিয়ে খেত। ফলে ক্লাসের ডিস্টার্বও হত। তাই পার্টিসিপ্যান্টদের অনুরোধে ট্রেনিং এর মাঝে একটু বৈচিত্র্য আনয়নের জন্য এবং ক্লাস চলাকালীন ডিস্টার্বেন্স দূর করার জন্য আজ থেকে মাঝে পনের-কুড়ি মিনিটের বিরতি  কার্যকর হলো চা পানের জন্য। এই সময়টাতে চীনা প্রশিক্ষণার্থীরা একটি খেলার অবতারণা করল। এই খেলাটির নাম চীনা ভাষায় জিয়ান-চু খেলা। ইংরেজীতে বলে শাটল কর্ক খেলা। এই ধরনের খেলা ভুটানেও দেখেছিলাম। প্লাস্টিকের কর্কের মধ্যে কয়েকটি রঙিন পালক ঢুকানো থাকে। পাখির পালক। কৃত্রিম বা প্রকৃত দুরকমই পাওয়া যায়। আর প্লাস্টিকের কর্কটিকে ভারী করার জন্য কয়েকটা মেটাল চাকতি ও রাবারের চাকতি কর্কের সাথে থাকে। অল্প জায়গার মধ্যেই আট-দশজন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে পা দিয়ে একজন আরেকজনকে পাস দিয়ে খেলা হয়। সবার লক্ষ্য থাকে কর্ক বা জিয়ান-চু যেন সবার পায়ে পায়ে থাকে, কিছুতেই মাটিতে না পড়ে।

বিকেল সোয়া চারটায় আজ প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের সাথে নগর পরিক্রমায় বের হলাম। আশরাফ এ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় যুবক, দুছর হলো চাকরিতে যোগদান করেছে বাঘাবাড়ি পাওয়ার স্টেশনে। বাড়ি ঠাকুরগাঁও। আমরা হোটেল থেকে একরকম অজানার উদ্দেশ্যেই বের হলাম। হাঁটতে হাঁটতে শিলি হো সাবওয়ে স্টেশন পেরিয়ে গেলাম।এখানে একটি বৌদ্ধধর্মীয় উপাসনালয় দেখলাম।এখানে একটি এন্টিক মার্কেট পেলাম। কিন্তু আসতে আসতে সন্ধ্যে পেরিয়ে গেছে। বেশিরভাগ দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। মার্কেটের সামনে দেখলাম দুতিন জন চীনা লোক পোষা পাখি বিক্রি করছে খাঁচাসহ। ফিরবার পথে মেট্রো শপিং মল হয়ে ফিরলাম। ভ্যানে করে অনেকে স্ট্রীট ফুড বিক্রি করছে এ রকম একটি গলির রাস্তাও দেখলাম। অধিকাংশ দোকানদার মহিলা। যখন হোটেলে ফিরি তখন ডিনারের সময় হয়ে গেছে।

দশ নভেম্বর দুহাজার ষোল। আজ ইলেক্ট্রিক্যাল পার্ট থেকে এক্সাইটেশন, রোটর, শ্যাফট, ট্রান্সফর্মার ইত্যাদি বিষয়সমূহ পড়ানো হলো।ক্লাসের মধ্যবর্তী বিরতিতে তরুণ প্রশিক্ষার্থীরা জিয়ান-চু খেলছিল। আমিও খেলায় যোগ দিলাম। পনের মিনিটের বিরতিতে চা পান বা নাস্তা খাওয়ার চেয়ে এটাই ভাল মনে হলো।পনের মিনিটে যা এক্সারসাইজ হলো তা মন্দ নয়। আজ চীনা ভাষার কোন ক্লাস হলো না। ক্লাস শেষে হোটেলে ফিরে যেতেই সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেল। সকালে হালকা গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হয়েছিল।দুপুর পর্যন্ত সূর্যের মুখ দেখা যায়নি।

এখন বেলা সাড়ে তিনটায় সূর্যের হাসিমুখ দেখতে পাচ্ছি আমার কক্ষের পশ্চিম পাশের জানালা দিয়ে।

এগারো নভেম্বর দুহাজার ষোল। গতরাতে কী এক দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম টুটে গেলঅনুভব করলাম, পেটেও একটু এসিডিটি মনে হচ্ছে। উঠে বসলাম। শিথানের পাশের সুইচ অন করে বেডসাইড টেবিল থেকে সেলফোনটি টেনে নিয়ে দেখি রাত আড়াইটা। বাজে স্বপ্ন দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেছে। মনে হলো যেন ছোট ভাই লুৎফরকে নিয়ে স্বপ্নটা দেখলাম। এত রাতে ফোনও করা যাবে না। ভাবলাম কাল দিনের বেলায় ফোন করব।বেড থেকেই রিমোট দিয়ে টিভিটা অন করলাম। কিছুক্ষণ টিভি দেখে আবার শুয়ে পড়লাম। ঘুম থেকে জেগে দেখি সকাল সাতটা। তাড়াতাড়ি বিছানা ত্যাগ করলাম। গতরাতে একটি সোয়েটার ও ইনার ভিজিয়ে সাবান মেখে রেখেছিলাম। সেসব কেচে স্নান সেরে এসে রেডি হয়ে নীচে নেমে গেলাম। লিফটে কারো সাথে দেখা হলো না। ডাইনিং এর কক্ষে ঢুকতে যাচ্ছি- মিস রু মং এর সাথে দেখা হতেই, সে বলল, -ইউ আর লেট। -স্যরি, বলে কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে গিয়ে দেখি অনেকেরই নাশতা অর্ধেকের বেশি হয়ে গেছে। আমি সরাসরি ক্রোকারি শেলফে গিয়ে বাটি, প্লেট, চামচ ইত্যাদি নিয়ে প্রয়োজনীয় স্যুপ, ভুট্টা সেদ্ধ, টমেটো, ব্রেড, সেদ্ধ ডিম ইত্যাদি নিয়ে ফাঁকা টেবিলে বসে গেলাম। নটায় গাড়ি, হাতে যে সময় আছে তা যথেষ্ট। তাড়াহুড়ো না করেই সময়মত নাশতা শেষ করে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। গাড়ি ট্রেনিং ভেন্যুর উদ্দেশ্যে ছেড়ে দিল।আজ শুক্রবার। ট্রেনিং বেলা ১২টায় শেষ করে চললাম নিউজি মসজিদের দিকে। মসজিদ ক্যাম্পাসে পৌঁছে আজ মসজিদের বিভিন্ন ভবনগুলো ঘুরে দেখলাম। ঐতিহ্যবাহী চৈনিক কারুকার্যখচিত প্রতিটি ভবন। নামাজ শেষে স্যুভেনির শপ থেকে ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি করা একটি পোর্সেলিন কেটলি ও চারটি কাপ কিনলাম একশত চল্লিশ ইউয়ান দিয়ে।

একজন শশ্রুমণ্ডিত মধ্যবয়স্ক শক্ত কাঠামোর লোক দেখে জিজ্ঞেস করলাম, হুয়িচ কান্ট্রি আর ইউ ফ্রম?-উত্তরে বলল, আই এ্যাম উইঘুর। বুঝলাম তিনি উইঘুর মুসলিম। আরো বুঝলাম উইঘুর মুসলিমরা চীনা হলেও মূল হুই মুসলিমদের চেয়ে দেখতে একটু অন্যরকম। চীনাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ হান জাতিগোষ্ঠীর; হান এবং হুইদের চেহারা প্রায় একই রকম। উভয় গোষ্ঠিরই মুখে শ্মশ্রু ও গুম্ফ খুব কম। উইঘুর পুরুষদের মুখ ঘন শ্মশ্রুমণ্ডিত আর মুখাবয়বও হান ও হুইদের চেয়ে আলাদা ধরনের। হুইদের নাক হানদের মত চ্যাপ্টা টাইপের। কিন্তু উইঘুরদের নাক তিরতিরে বা তীক্ষ্ণাগ্র। উইঘুর রমনীরাও হুইদের চেয়ে অনেক সুন্দর দেখতে। একজন ষাটের কাছাকাছি বয়স্ক ভদ্রমহিলা প্রবেশ করলেন স্যুভেনির শপটিতে। মাথায় হিজাব পরিহিতা। আমি সালাম দিতেই খুব সুন্দর আরবী উচ্চারণে ওয়া আলাইকুমুসসালাম বলে হেসে উত্তর দিলেন। তিনি কোন্‌ দেশের জানতে চাইলে জানালেন, তিনি আলজিরিয়া থেকে এসেছেন।

এই মসজিদটিতে এর আগে দুই শুক্রবার নামাজ পড়েছি। এখানে একটা আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিদ্যমান। বেইজিং সফররত পৃথিবীর নানা দেশের মুসলিম নর-নারীরা এখানে শুক্রবারের জুম’আর নামাজ পড়তে আসেন। মসজিদটির কোনো কোনো স্থাপনা ১৪০৩ সালে নির্মিত আবার কোনো ভবন ১৭০০ সালে স্থাপিত। ১৭০০ সালের পরে কোনওটি নয়। নির্মাণের সন তারিখ ভবন গাত্রে ধাতবপাতে উৎকীর্ণ আছে।

একটি বিষয় আমাকে খানিকটা বিমর্ষ করেছে, তাহলো মসজিদ চত্বরে প্রবেশপথের সামনের সড়কে বেশ কিছু দরিদ্র মুসলিম নারী ও পুরুষ ভিক্ষে করছে আগত মুসল্লিদের কাছে। প্রথমে সালাম দিচ্ছেন তারপর হাত বা থালা বাড়িয়ে ধরছেন, ‘সাদাকা সাদাকা…’ বলে। মানুষ হয়ে অন্য মানুষের কাছে ভিক্ষার হাত পাতা যে কত লজ্জার তা নিশ্চয়ই সবার চেয়ে দরিদ্র অভাবগ্রস্তদেরই বেশি জানা। দেশেও সব মসজিদের সামনেই শুক্রবারে ভিক্ষুকের ভীড় দেখে অভ্যস্ত। তবুও একটি স্বচ্ছল দেশের, বিশেষত একটি সাম্যবাদী কমিউনিস্ট দেশের  মসজিদের সামনে স্বধর্মের মানুষের ভিক্ষের হাত দেখে মর্মে বড় পীড়া লাগলোমনে হলো সেদিন কবে হবে যবে মানুষকে মানুষের কাছে জীবন ধারণের জন্য হাত পাততে হবে না।

ডিনারের পর হোটেল লবিতে দেখলাম আমাদের ট্রেইনিদের জটলা। সবাই মোবাইল ফোন টেপাটেপি করছে। কাছে গিয়ে দেখলাম, অনলাইন কেনাকাটার হিড়িক পড়ে গেছে তরুণ প্রকৌশলীগণের মধ্যে। প্রতি বছর এগারো এগারোতে অনলাইন শপিং এ ডিসকাউন্ট দেয় চীনের বিখ্যাত আলীবাবা অনলাইন শপিং কোম্পানী। আজ যারাই অনলাইন অর্ডার করবে তারাই ভাল ডিসকাউন্ট পাবে তাই এ অবস্থা। এলিস আর রুমংকে ব্যতিব্যস্ত করে ফেলেছে আমাদের অনলাইন শপারগণ। আমি অনলাইন শপিং এ আগ্রহ পাই না। একজন তরুণ প্রকৌশলী বললেন, “স্যার, কিছু কিনতে অর্ডার করবেন? আজই সুযোগ”। আমি বললাম, ‘দোকানে গিয়ে দেখে শুনে দ্রব্য টিপেটুপে দেখে কিনতেই অভ্যস্ত আমি,  মোবাইল টেপাটেপিতে আমার আগ্রহ নেই। আপনারাই কিনুন’

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts