গ্রেটওয়ালের দেশে-৮ম পর্ব

গ্রেটওয়ালের দেশে-৮ম পর্ব

চোদ্দ নভেম্বর দুহাজার ষোল।

ঢাকা থেকে বেইজিং আসবার সময় নিয়মিত জগিং করার জন্য ট্র্যাকস্যুট ও কেডস এনেছিলাম। কিন্তু বেইজিং এ নভেম্বরের ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় বাইরে গিয়ে জগিং করা বিরাট কঠিন। আজ সকালে দ্বিতীয় দিনের মতো বাইরে গিয়েছিলাম জগিং করতে। ট্র্যাকস্যুটের নিচে-ওপরে কয়েক পরতের গরম কাপড় পরে বাইরে যাই। এত এত কাপড় শরীরে জড়িয়ে তো আর ব্যায়াম করা যায় না। তাই শুধুই প্রাতঃভ্রমণ করে আসলাম।

আজ ট্রেনিংএ  স্টিম টারবাইন এর ওপর ক্লাস হলো। আজ ক্লাস নেবেন মিঃ লুও শিয়াও ছি(Luo Xiao Qi)কিন্তু ট্র্যাফিক জ্যামের কারণে টিচার আসতে দেরি হচ্ছে। তাই এই ফাঁকে চীনা ভাষার ক্লাস নিলেন মিস লিউ রু মং। রু মং আজ শেখালেন,

সাব-ওয়ে = ডি টিয়ে

স্টেশন = ঝান

বাস = গং যাও ছো

মোবাইল ফোন = শৌ জি

কাপড়চোপর = ই ফুয়া ।

 

মিঃ লুও আসার পর ক্লাস হলো নির্ধারিত বিষয় স্টিম টারবাইনের ওপর।ক্লাস শেষে হোটেলে ফিরে লাঞ্চ শেষে আজ আর কোথাও যাওয়া হলো না। পুরো বিকেলটা রুমেই রেস্ট হলো।

 

পনের নভেম্বর দু’হাজার ষোল। আজ ট্রেনিং ক্লাস শেষে দুটো নাগাদ হোটেলে ফিরে আসা গেল। রাস্তা বেশ ফ্রি ছিল। লাঞ্চের পর একটু বিশ্রাম নিয়ে সাতজনের একটি গ্রুপে আমরা শিদান রওয়ানা হলাম। শিদান বিজনেস স্ট্রীটে রয়েছে বিভিন্ন রকমের শপিং কমপ্লেক্স। কিন্তু এই এলাকাটা ইলেক্ট্রোনিক আইটেমের মার্কেটের জন্য বিখ্যাত। হুয়াউই, স্যামসাং, সনি, এ্যাপল ইত্যাদি বিখ্যাত ব্র্যাণ্ডের চেইন শপ রয়েছে এখানে। আজকের এই শিদান যাত্রা আমাদের জন্য আনন্দের এ জন্য যে, আজ আমরা কোন গাইড ছাড়া নিজেরা এসেছি দূরের এই মার্কেটে আমাদের সাব-ওয়ে কার্ড ব্যবহার করে। আমাদের নিকটবর্তী সাব-ওয়ে স্টেশন শিলি হো গেলাম আমরা বাসে চড়ে। শিলি হো থেকে গুয়োমাও। গুয়োমাও নেমে লাইন বদল করে ১ নং লাইনের ট্রেনে করে  গেলাম শিদান। ফেরার সময় একইভাবে শিদান থেকে উঠে গুয়োমাও নেমে লাইন চেঞ্জ করে ১০ নং লাইনের ট্রেনে উঠে শিলি হো-তে নেমে গেলাম।

 

ষোল নভেম্বর দুহাজার ষোল। আজ ক্লাসে স্টিম ইঞ্জিন পার্ট এর দুটি চ্যাপ্টার পড়ানো হলো কিছুদিন পর আমাদের পাওয়ার প্লান্ট এ গিয়ে সিমুলেশন ও প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস করানো হবে। তাই প্রত্যেকের উচ্চতা ও ওজন অনুসারে বিভিন্ন সাইজের পাওয়ার প্লান্ট ড্রেস তৈরি করে এনেছে ক্লাস রুমে। এখান থেকে ট্রায়াল দিয়ে যার যার ড্রেস নিয়ে নিতে বলা হলে আমি এক্সএল সাইজের একসেট ড্রেস নিয়ে নিলাম।

আজ বিকেলে কোথাও যাওয়া হলো না। শীলার পোস্টিং নিয়ে চিন্তিত আছি। ওকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দিয়ে পদায়ন করেছে সন্দ্বীপ সরকারি কলেজে। সামনে ছেলের এসএসসি পরীক্ষা আর মেয়েদের বার্ষিক পরীক্ষা। এমতাবস্থায়, সন্দ্বীপ থাকবে কী করে। শীলা জানালো শিক্ষাসচিব মহোদয় চীনে এসেছেন। ভাবলাম শিক্ষাসচিব স্যার যদি বেইজিং এ এসে থাকেন তবে উনার সাথে দেখা করে শীলার পোস্টিং এর ব্যাপারে অনুরোধ করব। বেইজিংস্থ আমাদের দূতাবাসে ফোন করলাম। রাষ্ট্রদূত মহোদয়ের পিএস ফোন রিসিভ করেছে। তার কাছে জানলাম আমার ব্যাচমেট দেলোয়ার ভাই এখন বেইজিং এ মিনিস্টার (পলিটিক্যাল)। আমি যখন বাংলাদেশ দূতাবাস থিম্পু থেকে বদলী হয়ে কলকাতা যাই, তখন দেলোয়ার ভাই আমাকে রিপ্লেস করেছিল থিম্পুতে। দেলোয়ার ভাইয়ের নাম্বার নিয়ে তাকে ফোন করলাম। তিনি জানালেন, শিক্ষা সচিব স্যার বেইজিং এ আসেন নি, এসেছেন গুয়াংদং প্রদেশের রাজধানী গুয়াংজুতে। বেইজিং থেকে গুয়াংজু দুহাজার কিলোমিটার দূরে। উনার কোনো নাম্বার আছে কি না জিজ্ঞেস করলে জানালেন যে, আগামীকাল ফোন করলে উনি দিতে পারবেন। রাতে শীলার পোস্টিং নিয়ে সেলিম ভাইয়ের সাথেও কথা বললাম।

 

সতেরো নভেম্বর দুহাজার ষোল। আজ ঘুম থেকে উঠতে সকাল সাতটা তেইশ। রাতে বেশ ক’বার স্বপ্ন দেখছিলাম। স্বপ্নের কোনো আগামাথা নেই। হাবিজাবি, নিরানন্দ স্বপ্ন। দু’একবার আজেবাজে স্বপ্ন দেখে জেগে উঠে দোয়াদরুদ পড়ে পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সর্বশেষ ভোর চারটা একচল্লিশে ঘুম ভেঙ্গে গেলে উঠে বসে প্রায় আধাঘন্টা টিভি দেখে আবার শুয়ে পড়েছিলাম। এসব কারণে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেল।

ট্রেনিং ক্লাসে গিয়ে সকাল সাড়ে দশটায় ক্লাস থেকে বেরিয়ে কথামত দেলোয়ার ভাইকে ফোন করলাম শিক্ষাসচিব স্যারের নাম্বারের জন্য। সে বলল, ‘ভাই কিছুক্ষণ পর এসএমএস করে পাঠাচ্ছি’। এসএমএস পেয়ে চা-বিরতির সময় স্যারের সাথে থাকা প্রটোকল অফিসার মিস লি-কে ফোন করলে সে স্যারের সাথে কানেক্ট করে দিল। স্যারকে সংক্ষেপে সব জানালাম। তিনি বললেন, ‘আমি কুড়ি তারিখে দেশে ফিরব, তোমার স্ত্রীকে বলো ২২ তারিখে আমার অফিসে দরখাস্ত নিয়ে দেখা করতে’। ক্লাস শেষে আমি শীলাকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম। এখন বাদ বাকী মহান আল্লাহই ভরসা।

 

আঠারো নভেম্বর দুহাজার ষোল। আজ শুক্রবার। সকালে সিসিটিভি অন করতেই প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর ল্যাটিন আমেরিকা সফরের খবর পেলাম। ইকুয়েডর, চিলি ও পেরু সফর করছেন চীনা প্রেসিডেন্ট। ফুটেজে লেখা উঠছে পাকিস্তানের গোয়াদরে চীনা খাদ্য সাহায্য নিয়ে চীনা জাহাজ পৌঁছেছে। সেখানে ভূমিকম্পে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাই চিরবন্ধু চীনের এগিয়ে আসা।

 

আজ নিউজি মসজিদ ক্যাম্পাসে পৌঁছে দেখলাম চীনের একটি দুর্গত এলাকার বড় লেমিনেটেড ছবি দেখিয়ে সাহায়্য প্রার্থনা করা হচ্ছে। সাহায্যদাতাদের ভিডিও করা হচ্ছে। সব কিছু চীনা ভাষায় বলে কিছুই বুঝতে পারলাম না। তবে ছবি দেখে বুঝা গেল কোথাও কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

 

মসজিদ ক্যাম্পাসটির দুটো স্যুভেনির শপই মহিলারা পরিচালনা করছে। মহিলাদের পরনে জ্যাকেট এবং মাথায় স্কার্ফ। আমাদের দেশে মসজিদের স্যুভেনির শপে মহিলাদের দোকানদার হিসেবে দেখা কি সম্ভব! কোনো কোন বিদেশী মহিলা দেখলাম মোটা জিনসের প্যান্ট পরেছেন আর ওপরে জ্যাকেট ও ঢিলা জামা পরেছেন এবং মাথায় স্কার্ফ আর পায়ে লেডিজ শু । আমাদের দেশে মেয়েদের জিনসের প্যান্ট পরা রক্ষণশীল পরিবারের কেউ বরদাশত করতে চাইবে না। দুএকজন চীনা তরুণ দেখলাম মাথায় পাঙ্কু টাইপের হেয়ারকাট দিয়েও নামাজ পড়তে এসেছে। মসজিদ ক্যাম্পাসে একটি পার্সিমন গাছে বেশ কিছু পাকা পার্সিমন ঝুলে থাকতে দেখা গেল।

আজ বিকেলে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। তাপমাত্রা সাত ডিগ্রী সেলসিয়াস, এমন কিছু না। কিন্তু গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে হাঁটাহাঁটি করলেও ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে, তাই বিকেলে কোথাও বেরুলাম না।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts