গ্রেটওয়ালের দেশে-৯ম পর্ব

Frangrant Hill Park ফ্র্যাগ্রান্ট হিল পার্ক

ঊনিশ নভেম্বর দুহাজার ষোল। আজ শনিবার। ছুটির দিন। সকাল সাড়ে ন’টায় আমাদের বাস ঝাং শাং পার্ক বা ফ্র্যাগ্রান্ট হিল পার্কের দিকে যাত্রা শুরু করলো। Frangrant Hill Park বেইজিং এর উত্তর প্রান্তে। এটি তৈরি করা হয়েছিল ১১৮১ খৃষ্টাব্দে জিং ডাইন্যাস্টির শাসনামলে। এটি বেইজিং এ নির্মিত প্রথম পার্ক বলে জানা গেল। বেইজিং এর হাইদিয়ান ডিস্ট্রক্টে অবস্থিত এ পার্কটির আয়তন ১৬০ হেক্টর। এখানে আছে নানা জাতের নানা প্রজাতির পাহাড়ি বৃক্ষাদি। এদের মধ্যে, ম্যাপল, জুনিপার, পাইন, সাইপ্রাস ইত্যাদি প্রধান। পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ার উচ্চতা ৫৫৭ মিটার। পার্কে প্রবেশ মূল্য পাঁচ আরএমবি, মানে ষাট টাকা মাত্র। প্রবেশ করে পায়ে হেঁটে উঠা যায় পাহাড়ে। আরামদায়ক সিঁড়ি আছে, দুঘন্টা হাঁটলেই ওপরে ওঠা যায়। কিন্তু আমরা গেলাম ক্যাবল-কারে। এই ক্যাবল-কার প্রতিটি দুই আসন বিশিষ্ট।মাথার ওপরে ছাদহীন দুপাশে হাতলযুক্ত হেলাঞ্চি চেয়ারের মত। আজকে দিনটা ঝকমকে রৌদ্রকরোজ্জ্বল। উঠে বসার পর চলতে শুরু করার পর নীচে তাকিয়ে দেখি পাহাড়ের ঢালু তাকে তাকে বিভিন্ন গাছপালা জঙ্গল আর তার রঙবেরঙের বাহারী পাতা। ক্যাবল-কারটি কখনো কখনো একেবারে বেশে নীচ দিয়ে যাচ্ছে এবং নীচের সিঁড়িপথে হাটা পর্বতচারীদের সাথে কোথাও কোথাও হাত নেড়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ও করা যাচ্ছে। আমরা যেমন যাচ্ছি ওপরের দিকে আবার ওপর থেকে তেমনি নিচেও আসছে। দুদিকের ক্যাবল-কার সামনা সামনি হলে চলতিপথেই হ্যালো, নি-হাও ইত্যাদি বলে আমরা পরষ্পর আন্তর্জাতিক আত্মীয়তা প্রকাশ করছিলাম। সবাই সহাস্য, উৎফুল্ল আর মনে হয় যেন একজন অপরজনের কত চেনা। বিদেশ জীবনের বিশেষত ট্যুরিস্ট-জীবনের এ এক দারুণ বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পর্যটকগণ কেউ কাউকে চেনে না অথচ আত্মীয়হেন পরষ্পর শুভেচ্ছা বিনিময় হচ্ছে নারী পুরুষ শিশু আবাল বৃদ্ধ বনিতা নির্বিশেষে । কোনোরকম জড়তা আর দ্বিধাগ্রস্ততা নেই এই সম্পর্কে। অথচ দেশের মধ্যে এ ধরনের সৌজন্য বিনিময় হয় না বললেই চলে। বিদেশ ভ্রমণ মানুষের হৃদয়কে সত্যি বেশ উদার করে দেয়। চূড়ায় উঠে নামার পর দেখলাম ওদের অফিস  থেকে সব পর্যটকদের এই ক্যাবল-কার ভ্রমণের মজার ছবি তোলা হয় শক্তিশালী ক্যামেরায় যা অটোমেটিক এদের কম্পিউটারে থাকছে। আপনি প্রস্তাব দিলে পছন্দমত ছবি প্রতিটার জন্য তিরিশ আরএমবি দিয়ে নিতে পারবেন। যা হোক চূড়ায় উঠে বিভিন্ন স্পট থেকে অনেক ছবিটবি তোলা হলো। রোদ থাকায় দিনের তাপমাত্রা বেশ আরামদায়ক। চারদিকের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে আকুল হয়ে গেলাম। ফিরবার সময় সবাই আবার ক্যাবল-কারেই ফিরলো। নামা ওঠা উভয়পথের ফি-ই দেয়া আছে। তবুও কারো কারো মনে থাকে অভিযাত্রী মন। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দুজন তরুণ প্রকৌশলী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার হেঁটে নামবে। আমিও ওদের দলে শামিল হলাম। নামবার পথে মাত্র একঘন্টায় হেঁটে আমরা নীচে পৌঁছে গেলাম। আর এই হাঁটার ধকল সহ্য করাতে আমাদের মিললো প্রকৃতিকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ।

 

বিশ নভেম্বর দুহাজার ষোল। গত রাতে খুব হালকা তুষারপাত হয়েছে। সকাল সাতটায় উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখলাম পাশের ভবনের ছাদের ওপর তুষারের হালকা পরত রয়ে গেছে। রোদহীন আকাশ। বাতাসে ঠাণ্ডার পরশতাপমাত্রা সাত ডিগ্রী সেলসিয়াস। আজ রোববারযাওয়ার কথা ছিল দূরে বড় একটি উদ্যানে। কিন্তু ৯টায় শুরু হলো ঝিরঝিরে বৃষ্টি। তাই সিদ্ধান্ত বদলে আমরা বেইজিং ক্যাপিটাল মিউজিয়াম দেখতে বেরুলাম। বেইজিং ক্যাপিটাল মিউজিয়াম হোটেল থেকে ঘন্টাখানেকের ড্রাইভ। সকাল পৌনে এগারোটা থেকে বেলা একটা অব্দি ঘুরে ঘুরে সব দেখলাম। একটি পাতাল ফ্লোরসহ মোট সাতটি ফ্লোর। প্রতিটি ফ্লোরে চীনের বিভিন্ন রাজবংশের রাজরাজড়াদের ও তৎকালিন সমাজের সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে খুব অনুপমভাবে। প্রতিটা বস্তু কাচ দিয়ে ঘেরা এবং নীচে চীনা ও ইংরেজী ভাষায় সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। এই প্রথম চীনের কোথাও ইংরেজী ভাষা্য কোনো কিছুর বর্ণনা পেলাম। ইতোপূর্বে যে সব প্যালেস বা স্থাপনা দেখেছিলাম, তার সবখানে শুধু চীনা ভাষার বর্ণনা দেখে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। দেখতে এসে যদি কী দেখলাম তাই বুঝতে না পারলাম ঠিকমত তাহলে কি হয়? শুধু মনের চোখ দিয়ে দেখলে তো হয় না। ভাষায়ও কিছু প্রকাশ চাই তো। ক্যাপিটাল মিউজিয়ামে তাই ইংরেজীতে পড়তে পেরে বেশ আনন্দ হলো। এখানে দেখলাম খুব অল্প বয়সী চীনা বালিকারা ঐতিহ্যবাহী চীনা পোষাকে সজ্জিত হয়ে চীনা ভাষায় ধারা বর্ণনা দিচ্ছে বিভিন্ন গ্যালারিতে। বুঝতে না পারলেও বিষয়টি খুব ভাল লাগলো। একটি ফ্লোরে দেখলাম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, দার্শনিক ও চিত্রকরদের বিভিন্ন প্রতিকৃতি ও তাদের আবিষ্কার বা অবদানের ছবি সুন্দর করে টাঙ্গানো আছে।

 

একটি গ্যালারিতে দেখলাম একজন ভদ্রলোক আরেকজন ভদ্রমহিলাকে হুইল চেয়ারে ঠেলে নিয়ে নিয়ে সব কিছু দেখাচ্ছে। কয়েকজন মাকে দেখলাম তাদের ছোট ছেলেমেয়েদের এসব দর্শনীয় বিষয় দেখাচ্ছে ও বুঝিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ আগ্রহ হলো একজন মা আর তার শিশুর প্রতি। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, শিশুটির বয়স মাত্র ছয় বছর এবং সে এলিমেন্টারি স্কুলে যাচ্ছে। শিশুটির মা একজন এ্যাডভোকেট। শিশুটির নাম জিজ্ঞেস করাতে একটু ইতস্তত করে বললেন, ওকে জোস্লিন নামে ডাকতে পারেন।  আমি বিদেশী হিসেবে তার ইংরেজী নামটিই বললেন, বুঝতে পারলাম আমি বুঝতে পারলাম, ঐ ‘ইতস্তত’ মুহুর্তে তিনি ভেবেছিলেন চাইজিনিজ নামটা হয়ত এ বিদেশীর জন্য ধরতে কষ্টকর হবে। তার নিজের ব্যাপারে বললেন, তাকে মিসেস চেন বলে সম্বোধন করতে পারি। এদেশে এসে বুঝলাম শিক্ষিত চীনাদের মধ্যে শতকরা নিরানব্বই জনই চীনা ভাষা ছাড়া অন্য ভাষা জানেনা আর যারা ইংরেজী ভাষা জানেন তাদের প্রত্যেকের একটি করে ইংরেজী নাম আছে চীনা নাম ছাড়াও।

যে লোকটি একটি মহিলাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে ঠেলে নিয়ে সব দেখাচ্ছিল তাদের পরিচয় জানতে ইচ্ছে করেছিল। কিন্তু খানিকটা জড়তা পেয়ে বসেছিল এই ভেবে যে যদি ইংরেজী না জানে, তাহলে?  মিউজিয়ামটির নীচ তলায় একটি বুক স্টোর আছে। এবং এখানে

Frangrant Hill Park ফ্র্যাগ্রান্ট হিল পার্ক
Frangrant Hill Park ফ্র্যাগ্রান্ট হিল পার্ক

একটি কর্ণারে ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ সেকশন আছে। এর একটি শেলফে চীনা লেখকদের ইংরেজী ভাষায় লিখিত বই এবং একটি আরবী ও চীনা দ্বিভাষিক বই দেখলাম। কিছু কিছু বই পছন্দও হলো। এর মধ্যে একটি বই পছন্দ করলাম কিনবার জন্য। দাম ৭৯ আরএমবি। বইটি বিখ্যাত চীনা অনলাইন শপিং আউটলেট আলিবাবা ডট কম এর প্রতিষ্ঠাতা মিঃ মা ইয়ুন বা জ্যাক মা এর আত্মজীবনীমূলক। বইটি শেলফ থেকে নিয়ে বিলিং কাউন্টারে যাচ্ছি এমন সময় আমাদের গাইড মিস লিউ রু মং এর সাথে দেখা।

‘দেখি দেখি কি কিনছো?

-দেখো, বলে ওর হাতে দিলে ও উলটে পালটে বলল, এটার দাম অনলাইনে এখনে অনেক কমে পাবা, আমি তোমাকে কিনে দেব।আর যদি না পাও, তবে এখান থেকে আমি সংগ্রহ করে দেব পরে।

মিস রু মং যে একজন অসাধারণ চৈনিক লেডি তার প্রমান এতেই বোধ করে পাঠকগণ পেলেন। আমাদের দেশের কোন গাইড কি এরূপ করবেন? বত্রিশজন ট্রেইনির বত্রিশ রকমের আবদার পূরণে এ আর এলিস- এই দুই তরুণী মিলে দিন রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। নীচতলাতে মাঝামাঝি স্থানে একটি বড় বাঁশবাগান। কেউ হঠাৎ করে বুঝতেই পারবে না যে এটি একটি কৃত্রিম বাঁশ বাগান। মনে হচ্ছিল যেন এখনি বাঁশবাগানের মাথার ওপর হয়ত চাঁদ উঠে পড়বে

 

মিউজিয়াম দেখা শেষ হলে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো বিখ্যাত চেইনশপ ওয়ালমার্টে। এখানে ভেরাইটি জিনিস আছে বটে কিন্তু কাপড় চোপরের ব্যাপারে দেখলাম সবই শীতকালিন পুত্রের জন্য একটি টি-শার্ট বা পোলো শার্ট কেনার অভিপ্রায়ে খুঁজলাম তন্নতন্ন করে পেলাম না। শেষে ওর জন্য একজোড়া কেডস আর একটি জিয়ান-চু কিনলাম। মেয়েদের জন্য বাহারী চুড়ি মিউজিয়াম থেকেই কিনেছিলাম। স্ত্রীর হাতের উপযোগী বড় চুড়ি পাইনি, তবে ওর জন্য ক’দিন আগে একটি হাত ঘড়ি কিনেছিলাম এই যা সান্ত্বনা। আমার জন্য সুতো দিয়ে একসাথে করা একজোড়া জুতা পছন্দ করে ঝুড়িতে তুলেছিলাম। বিলিং কাউণ্টারের কাছে আরেকবার চেক করতে গিয়ে দেখি দুটার একেকটা একেক সাইজের। তাই রেখে দিলাম। কাউকে যে বলব যে ভাই, জুতা দুটো দুই সাইজের, চেঞ্জ করে দাও, বুঝবে না। তার প্রমাণ, এখানে ঢুকেই কিছুক্ষণ পর ভেবেছিলাম ওয়াশরুম থেকে টয়লেট সেরে এসে আরামে দেখব। আমার কথা শুনে মিশু বলল, স্যার কিচ্ছু ভাববেন না, আমি খুঁজে বের করছি। সে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে বোঝাতে ব্যর্থ হলো। জরুরত যেহেতু আমার, তাই আমি বুকে সাহস সঞ্চয় করে একটি মেয়ের কাছে গিয়ে বললাম, টয়লেট বা ওয়াশরুম কোথায়? সে কিছুই বুঝলো না। আবার চেষ্টা করলাম একটু বিদেশী  স্টাইলে উচ্চারণ করে ‘ঠয়লেট’ বলে। কাজ হলো না। এবারে মুখে বানান করে বললাম ‘ঠি ও আই ই ঠি’। অবস্থা তথৈবচ। সে আমার সাথে সাথে আওড়ানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। ওদিকে আমার জরুরত কষে চাপ দিচ্ছে। কী করব ভেবে না পেয়ে কলমটা পকেট থেকে বের করে বাম হাতের তালুতে লিখলাম TOILET আর তালুটা খাড়া করে তাকে দেখলাম। মনে হলো কাজ হলো। সে আমাকে নিয়ে চললো একমাথা থেকে আরেক মাথায়। গিয়ে দেখি সেখানে টয়লেট নয়, টয়লিট্রিজ সামগ্রীর সেকশন। উহ! কী করি। একবার ভাবলাম প্যান্টের চেইন খোলার অভিনয় করে মুখ দিয়ে শিইই উচ্চারণ করে বিষয়টা বুঝাই। কিন্তু দুঃখের বিষয় সে মহিলা হওয়াতে ঐ অভিনয়টা করে দেখাতে পারিনি। আরো দুঃখের বিষয় আশে পাশে কোনো চীনা ভাই বা পুরুষ নজরে এলো না যাকে আমার হালটা বোঝাতে পারব। আমি দ্রুত আবার বাম হাতের খালি জায়গায় ইংরেজীতে ওয়াশরুম কথাটা লিখে দেখালাম। এবারে সে ধরে ফেলেছে। সে খুবই লজ্জিত ভাব দেখিয়ে তাকে অনুসরণ করতে বলে উল্টোদিকে দ্রুত হাঁটা দিলে আমি পিছে পিছে দ্রুত চলি। হঠাৎ নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল সাহেবের সাথে দেখা; বললেন, স্যার কোথায় চললেন এত হন হন করে? আমি বললাম, আর বলবেন না, ১৫ মিনিট ধরে কষ্ট করছি। পরে এসে বলছি। শেষে বাঁচা গেল, সামনে দেখলাম ইংরেজীতে লেখা Rest Room আর পাশে নারীপুরুষের প্রতীকী ছবি। খোদাকে ধন্যবাদ দিলাম কাঙ্ক্ষিত স্থানে কাঙ্ক্ষিত কাজ সেরে হালকা হতে পেরে। পাঠকগণের হয়ত ‘নূনের মত প্রিয়’ গল্পটা মনে আছে আমার অবস্থা কিঞ্চিৎ অনুরূপই হয়েছিল বৈ কি ।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

 

 

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts