ঘুরে আসি ঋগ্বেদের যুগ

ঘুরে আসি ঋগ্বেদের যুগ অনুপা দেওয়ানজী

ঋগ্বেদের যুগ কেমন ছিলো? এ প্রসঙ্গে আমাদের অদ্ভূত একটা ধারণা আছে।   সে ছিলো বটে এক সত্যযুগ। তখন মানুষ মিথ্যে বা পাপ কাকে বলে জানতো না।দুঃখ বা দারিদ্র্য ছিলোনা।  দেবতারা নেমে আসতেন মর্ত্যে। মানুষের সাথে তাঁদের মুখোমুখি বসে কখা হতো।
আসলেই কি তাই?
চলুন একবার দেখে আসি ঋগ্বেদের সময়ে মানুষের জীব যাত্রা কেমন ছিলো?
বইয়ের পাতা ওলটালে দেখতে পাই এটি রচিত হয়েছিলো ১২০০- ৯০০ খৃস্টপূর্বে।
পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলছে,ন ঋগ্বেদ একটি কবিতা সংকলনগ্রন্থ।     
গ্রীক স্তবের মতো এই গ্রন্থের তিন অংশ। যেখানে রয়েছে   
দেবতার রূপ, আপ্যায়ন আর প্রার্থনা।
দেবতার রূপে দেখতে পাচ্ছি তাঁরা দেখতে কেমন? তাঁদের পরিধেয় কেমন? তাঁরা কি   ধরণের অলংকার পরতেন আর সেই সাথে তাঁদের কীর্তির বর্ণনা।
আপ্যায়নে দেখতে পাচ্ছি কোন দেবতা কি নৈবেদ্যে  তুষ্ট।
প্রার্থনা অংশে বিজয়, শত্রুনাশ, পশুধন, স্বর্ণ, স্বাস্থ্য, শস্য, সন্তান,  রোগমুক্তি,আর দীর্ঘ পরমায়ুর জন্যে দেবতার কাছে প্রার্থনা।
রয়েছে নিরাপদ জীবন আর একশ বছর বাঁচার জন্যে প্রার্থনা।  
মোটের ওপরে প্রার্থনা ছিলো আমাদের মতোই জীবনমুখী।
পরবর্তীকালের জীবনবিমুখতার চিহ্নমাত্র ঋগ্বেদে নেই। এমন কি স্বর্গের প্রার্থনা – যা  আসলে পরে সংযোজন করা হয়েছে তাও সুখ আর ভোগের অনিঃশেষ বিস্তার ছাড়া আর কিছুই নয়।

প্রকৃতি সম্পর্কে ছিলো তাদের সূক্ষ্ম একধরণের বোধ ও আনন্দ।     
জীবন সম্পর্কে এ যুগের মতো সে যুগের মানুষেরও  চিন্তা, উপলব্ধি আর অনুসন্ধিৎসা।ছিলো কৌতূহল আর বিস্ময়।প্রাকৃতিক নানা বিপদ আপদের মধ্যেও তাদের ছিলো প্রকৃতিকে নিয়ে বিস্ময় আর আনন্দ।  
সভ্যতার প্রথম পর্যায়ে  আগুন আবিষ্কারের বিস্ময় থেকেই অগ্নিরক্ষক আদিম পুরোহিতের মর্যাদা আর আগুনের সাহায্যে প্রথম সংক্ষিপ্ত যজ্ঞ অনুষ্ঠান  ঋগ্বেদের আগের যুগের আভাস দেয়।
গরুর দুধের উষ্ণতায় ঋগ্বেদের যুগের মানুষ বিস্ময়ে ভাবতেন কাঁচা গরুর পেট থেকে রান্না করা মিষ্টি দুধ কিভাবে আসে?
দেবতারা সামাজিক মুল্যবোধ দ্বারা প্রশংসিত হতেন।  তাঁদের প্রধান গুণ ছিলো শত্রুনাশ,লুন্ঠন, শত্রুর সম্পত্তি অপহরণ  ,হত্যা ইত্যাদ। স্বয়ং ইন্দ্র যে সব ভূষণে ভূষিত ছিলেন।
ইন্দ্র ছিলেন যাযাবর আক্রমণকারী আর্যদলের একজন প্রধানযোদ্ধা ও সেনাপতি। যিনি আকন্ঠ মদ পান করে প্রাক আর্য গোষ্ঠির অগণিত দলপতিকে হত্যা করে তাদের  নগরে প্রবেশ করে, সম্পত্তি লুন্ঠন করে আর্যদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। এজন্যে প্রায় পুরো ঋগ্বেদ জুড়ে তাঁর অক্ষয় গৌরব কীর্তন করা হয়েছে।
উন্নততর কৃষিজীবী সভ্যতার অধিকারী সিন্ধু সভ্যতার বিরুদ্ধে যাযাবর, পশুচারী  আর্যরা তাদের ঘোড়ায় টানা রথ আর লোহার অস্ত্রের জোরে পাক আর্যদের গ্রাম, নগর দখল করে, তাদের দাস, দস্যু ,রাক্ষস,অশুভ বা  অসুর নাম দিয়ে আর সেই অসুরশক্তিকে বিনাশ করার নামে আগুন জ্বালিয়ে যজ্ঞ করাকে পুণ্য নামে অভিহিত করা।
এর বাইরে পাপ আর পুণ্যের বোধ ছিলো না।
পুরুষের বহুবিবাহ সমাজে প্রচলিত ছিলো। বিধবাদের দেবররা বিয়ে করতে পারতো।সহমরণ ছিলো না। পরনারী হরণ ছিলো, চোরের কথা বারে বারে  আছে।প্রচন্ড বৈষম্য ছিলো বলে ধনীদের নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ সাবধানে রাখতে হত।
পথে ঘাটে ডাকাতের উৎপাত ছিলো।
এমন কি বুড়ো বাপের টাকা পয়সা ছেলেরা কেড়ে কুড়ে নিয়ে নিতো।
জুয়া খেলে রাতারাতি বড়লোক হবার চেষ্টা ছিলো।  
যজ্ঞ করলেই পুণ্য তবে সেই যজ্ঞ একসময়ে অতিরিক্ত ব্যয়সাধ্য হয়ে ওঠায় শুধুমাত্র ধনীরাই তা করতে সক্ষম হত।
সোমযোগের রীতি ছিলো কোন শুদ্র সোম বা মাদক বিক্রি করতে আসলে একটি বাছুরের মূল্যে তা কেনা হবে ।কিন্তু শূদ্রটি যখন বাছুর নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হত তখন তাকে মেরে ধরে তাড়িয়ে দেয়া হত।
দরিদ্র শ্রমজীবীর একটি করুণ চিত্র অমর হয়ে আছে এখানে।  
আর্যরা প্রাক আর্যদের কাছ থেকে কৃষি শেখার পরে স্থায়ীভাবে যখন বসবাস শুরু করে  তখন নগর কেন্দ্রিক গ্রামণন জনপদের বিস্তার ঘটতে লাগলো।
কৃষিজীবী সভ্যতায় খাবার সংস্থানের কোন স্থিরতা ছিলো না।  অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, পঙ্গপাল ইত্যাদিতে শস্য উৎপাদন ব্যাহত হত। এতে গরীব সংখ্যা গরিষ্ঠরাই ভুগত।  তাদের কান্না ঋগ্বেদের কোথাও ধরা পড়েনি। কিন্তু যখন বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটত তখন পুরো সমাজকেই তা স্পর্শ করতো তাই ঋগবেদ জুড়ে দেখা যায় অন্নের জন্যে দেবতার কৃপাভিক্ষা। অন্নকেও তাই প্রায় দেবত্বে উন্নীত করা হয়েছে।
বাণিজ্য সমাজে ছিলো সেই সাথে ছিলো শঠতাও।
পরবর্তী কালে সমাজে মদ্যপান পাপের কাজ বলে গণ্য হলেও ইন্দ্রের সোমপানে অত্যধিক আসক্তিতে ঋগ্বেদে কোন সংকোচ নেই।
বৈদিক সমাজ বলতে যে সর্ব সুখময় আদর্শ, নিষ্পাপ সমাজের কল্পনা আমাদের মনে উদিত হয় ঋগ্বেদের চিত্রিত সমাজে তার কোন সমর্থন নেই।
ঋগ্বেদের প্রধান আকর্ষণ এখানেই। সুখে, দুখে, পাপে, পুণ্যে সাধারণ   প্রণনবন্ত সমাজের যে রূপ তাই এখানে প্রতিভাত। এই বাস্তবতার জন্যেই ঋগ্বেদ এত  মূল্যবান যার আলেখ্য আমরা আর কোথাও পাই না। হোমারও অন্তত তিন শতক পরের।
অন্য পাঁচটা সমাজের আদর্শবাদের মতো এ সমাজেও আদর্শবাদ ছিলো।ছিলো অন্য সব   সমাজের মতো শঠতা, ক্রুরতা, প্রতিহিংসা। অর্থাৎ প্রাণবন্ত এক সমাজের রূপ। এরা দেবতাকে প্রলোভন দেখায়, এদের দেবতাও প্র্লুব্ধ হন,  তেমনি আবার সৃষ্টি রহস্যের আদিবিন্দুতে পৌঁছাবার জন্যেও এরা ব্যাকুল।বহুধা বিভক্ত সমাজে থেকেও এরা সৃষ্টি করেছে পুরুষকে, ব্রহ্মাকে, বৃহস্পতিকে, পরমাত্মাকে।
   

তেত্রিশ কোটি দেবতার পরেও সন্ধান করেছে একক কোন স্রষ্টার।কার স্তব করি  আমরা? কোথা থেকে এই সৃষ্টির উৎস জানার প্রবল এক অনুসন্ধিৎসা।
এই সংশয়ের জন্যেই ঋগ্বেদের ঋষিরা আমাদের কাছে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠেন।  কারণ চক্ষুষ্মান মানুষ কোন যুগেই অন্ধ বিশ্বাসে সব কিছু মেনে নিয়েছে এটা ভাবতে হলে হতাশ লাগতো আমাদের।
ভক্তির যুগ ছিলো না সেটা বরং ইষ্ট সিদ্ধির জন্যে যে এক ধরনের বিশ্বাস দরকার  তাই ছিলো। কিন্তু বহু বহুবার যজ্ঞ করেও যখন অভীষ্ট লাভ হয় নি অথবা কাক তালী ভাবে লাভ হয়েছে তখন মানুষের মনে যে সন্দেহ করবার ক্ষমতা তার মধ্যেই যে অগ্রগতির বীজ নিহিত সেই ঐশী অতৃপ্তির পরিচয়েই সে যুগে সে যুগের মানুষ আমাদের কাছে বাস্তবের চুড়ান্ত স্বীকৃতি পায়।
পুরো ঋগবেদ জুড়ে সমস্ত যজ্ঞে মানুষ প্রার্থনা করেছে এই পৃথিবীতে দীর্ঘকাল ধরে সুস্থ,নির্বিঘ্ন আর স্বচ্ছন্দ এক জীবন যাপন করতে।
মধ্য যুগের শেষে অন্নদা মংগল কাব্যেও এই আকুতিই দেখি।
“আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।”
দুধভাতের সাথে তার ক্ষুন্নিবৃত্তিও সে অপরিহার্য ভাবেই চেয়েছে।
ঋগবেদ কখনো বলেনি যে মর্ত্যজীবনের বন্ধনের থেকে মুক্তিই হচ্ছে পরম লক্ষ্য।বরং বারবার দ্বিধাহীন ভাবে ঘোষণা করেছে জীবন আনন্দের,যতদিন আর যতভাবে নির্মল আনন্দ ভোগ করা যায় তার চেষ্টা করতে।
কবিগুরুও সেই একই কথা আবার একবার বলেছেন।” মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভূবনে মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।”
তিন হাজার বছর আগে ঋগবেদে উচ্চারিত হয়েছিলো জীবনের লক্ষ্য বলতে বোঝায় “জীবাতব্যে ন মৃতব্যে।”
জীবন বাঁচবার জন্যে। মরবার জন্যে নয়।
এখানেই ঋগবেদ অমর হয়ে আছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার
সুকুমারি ভট্টচার্য।

অনুপা দেওয়ানজী
অনুপা দেওয়ানজী

 

Author: অনুপা দেওয়ানজী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment