চিরকালের বীর নায়ক মুক্তিযোদ্ধা সিরাজউদ্দিন লস্কর / লে: কর্ণেল সৈয়দ হাসান ইকবাল (অব.)

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সামান্য অস্ত্র নিয়ে রাজশাহীর বিড়ালদহ গ্রামে আসামান্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তদানীন্তন ইপিআরের (বর্তমান বিজিবি) সদস্যরা। সেই যুদ্ধে অংশ নেওয়া ইপিআর সদস্য দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে ৩৬ বছর ধরে খুঁজতে থাকে রাজশাহীর লোকজন। অবশেষে তাদের একজনকে খুঁজে পাওয়ার গল্প নিয়ে এই লেখা ।

এই কৃতি সন্তান আর কেউ নয়,  তিনি নড়াইলের লোহাগড়া থানার পাঁচুড়িয়া গ্রামের আলহাজ্ব সিরাজউদ্দিন লস্কর।৭১ এ তাঁর বীরত্ব নিয়ে লিখেছেন. আবুল কাশেম মুহাম্মদ আজাদ, ডা: নওশাদ, বিড়ালদহ, পুটিয়া, রাজশাহী এবং ওয়ালিউর রহমান বাবু। আমি সকলের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ ।ও গর্বিত,  আমার বাড়িও এই পাঁচুড়িয়া গ্রামে। শুধু আমি কেন, এই বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্য গর্বিত নড়াইলবাসী তথা দেশবাসী।

বলতে পারেন,  কেমন হবে, হঠাৎ একদিন যদি শফি ইমাম রুমী ফিরে এসে আমারদের বলতে শুরু করেন একাত্তরের দিনগুলোর কথা! কেমন হবে, যদি আমাদের মধ্যে হঠাৎ ফিরে আসেন একাত্তরে হারিয়ে যাওয়া অন্য কোন নায়ক? এসব প্রশ্নের জবাব হয় না। কারণ, হারিয়ে যাওয়া নায়করা আর ফিরে আসেন না। আমরা স্বপ্ন দেখতে পারি, তাঁদের ফেরার। কিন্তু সে স্বপ্ন সত্যি হয় না। এটাই নিয়ম, কিন্তু নিয়মেরও যে ব্যতিক্রম আছে। এই ব্যতিক্রমকে প্রমাণ করতেই মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া এক বীর ফিরে আসেন সাড়ে তিন দশক পার করে।

 

৩৬ বছর পর আবার যুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত জায়গায় ফিরে আসেন মুক্তিযোদ্ধা লস্কর সিরাউদ্দিন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে রাজশাহীর বিড়ালদহ গ্রামে অসামান্য এক প্রতিরোধযুদ্ধ গড়ে তুলেছিলেন সিরাজউদ্দিন যা আগেই বলেছি। একাত্তরের পর আরও অনেকের মতো “হারিয়ে গেছেন” বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অবশেষে আবার ফিরে এসেছেন সেই নায়ক। সিরাজউদ্দিনকে । ফিরিয়ে আনার কাজটা করেছেন এই প্রজন্মের তরুণেরা।

 ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআর) সুবেদার পদে চাকরী করতেন তিনি। একাত্তরের সেই উত্তাল সময়ে সিরাজউদ্দিন ছিলেন চারটি বিওপি (বর্ডার অপারেশন পোষ্ট)-এর দায়িত্বে। মার্চের মাঝামাঝি এসেই বুঝতে পেরেছিলেন, একটা ঝড় আসছে। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।  ২৭ মার্চ তিনি গ্রেফতার করে ফেললেন বিওপিগুলোর অবাঙালি সৈনিকদের। তাদের অস্ত্র রেখে দিয়ে চারঘাট থানা হাজতে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর সঙ্গী বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে মুক্তিবাহিনীর সাথে একাত্ম হয়ে শুরু করলেন মুক্তির লড়াই।

যুদ্ধের প্রথম বিজয়টা সিরাজ উদ্দিনদেরই হয়েছিল। ১৯৭১ সালে চার এপ্রিল রাতে রাজশাহীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে ক্যান্টনমেন্টে আটকে ফেলে। এই ঘটনার ফলে কার্যত রাজশাহী শহর পাকিস্তানের দখলমুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তখনও হার মানেনি। খবর এসে যায়, অবরুদ্ধ বাহিনীকে উদ্ধার করতে ঢাকা থেকে পাকিস্তানী বিশাল সেনাবহর আসছে। রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে তাঁরা নগরবাড়ী ঘাট অতিক্রম করেছে। খরবটি বিচলিত করে তোলে রাজশাহীর মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধাদের। পাকিস্তানী বাহিনীকে রাজশাহীতে ঢোকার আগেই ঠেকানোর পরিকল্পনা করা হয়। সেই উদ্দেশ্যে লস্কর সিরাজউদ্দিন, সুবেদার মোবাশ্বেরসহ ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে পাবনার নগরবাড়ীতে পাঠানো হয়।  পাবনায় গিয়ে সিরাজউদ্দিন-মোবাশ্বেররা বুঝতে পারেন, পাকিস্তানী বিশাল এই সেনাবাহিনীকে ঠেকানো সহজ কাজ নয়। আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানী বাহিনীর প্রবল আক্রমণের মুখে পিছিয়ে আসেন সিরাজউদ্দিন ও তাঁর দল। কিন্তু পেছানোর জন্য তো যুদ্ধে যাননি তাঁরা। বিকল্প উপায় বেছে নিলেন সিরাজউদ্দিন-মোবাশ্বেররা। ৭ এপ্রিল থেকে তাঁরা শুরু করলেন ‘হিট এন্ড রান’। চোরাগুপ্তা আক্রমণ করেন আর পেছান। এই করতে করতে ১২ এপ্রিল পুটিয়ার বিড়ালদহে এক লোহার সাঁকোর কাছে পৌঁছে গেলেন মুক্তিযোদ্ধারা। সিদ্ধান্ত হল, এখানেই চূড়ান্ত প্রতিরোধ করতে হবে পাকিস্তানী বাহিনীকে। এই সাঁকো পার হয়ে আর এগোতে দেওয়া হবে না তাদের।

শুরু হল প্রতিরোধ পর্ব। রাস্তা কেটে ফেলা হল।  তৈরি করা হল পরিখা। মহাসড়কের মাঝে রেখে উত্তর ও দক্ষিণ পাশে দেড় কি. মি. এলাকা জুড়ে প্রতিরোধ-বলয় তৈরি করা হল। সকাল ১০টা-১১ টা নাগাদ শুরু হয়ে গেল প্রবল যুদ্ধ । সেই যুদ্ধে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা  ছিল বড়ই দুর্বল পক্ষ। কিন্তু অস্ত্রের জোরে নয়, মনের জোরে তাঁরা রুখে দাঁড়ালেন। বিকাল ৫টা পর্যন্ত অসম দুই শক্তির এই লড়াই চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী বাহিনীর উল্লেযোগ্য ক্ষতি করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুমান, সেই দিন শতাধিক পাকিস্তানী সৈন্য মারা পড়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে আরো দুর্বল হয়ে পড়ে প্রতিরোধ । ফুরিয়ে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাবারুদ। সারাদিনের এই প্রতিরোধ যুদ্ধে ৪২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন। নিরুপায় হয়ে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পাশের গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেন। গ্রামবাসীরা প্রাণপণে রক্ষা করার চেষ্টা করেন মুক্তিযোদ্ধাদের। যার কাছে যা কিছু ছিল তা নিয়েই ইপিআর সদস্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা হয় পাকিস্তানীদের। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে এলে গ্রামে ঢুকে পড়ে পাকিস্তানী সেনারা। শুরু হয় নৃশংস প্রতিশোধপর্ব। এতে শহিদ হন ৭১ জন নিরীহ গ্রামবাসী। দুই শতাধিক ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

শেষ পর্যন্ত  থেমে যায় ১২ এপ্রিল এর অসামান্য প্রতিরোধপর্ব। কিন্তু মানুষের মন থেকে মুছে যায় না সিরাজ-মোবাশ্বেরের নাম।  চিরকালের নায়ক হয়ে ওঠেন এই দুই মুক্তিযোদ্ধা। এপ্রিল থেকে সময় গড়িয়ে ডিসেম্বর আসে। সারা দেশের মত রাজশাহীতেও আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানী সৈন্যরা। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের নতুন কোন ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে চলে যান সিরাজউদ্দিন-মোবাশ্বের। সেই চলে যাওয়ার ৩৬ বছর পর রাজশাহীর নবীন প্রজন্ম  নতুন করে আবিষ্কার করে চিরকালের এই নায়ককে।


লেঃ কর্ণেল সৈয়দ হাসান ইকবাল (অব.)

 

Author: সৈয়দ হাসান ইকবাল

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts