ছুঁয়ে যাওয়া গেরুয়া বিকেল

ছুঁয়ে যাওয়া গেরুয়া বিকেল

“মোরা ভোরের বেলা ফুল তুলেছি,দুলেছি দোলায়-বাজিয়ে বাঁশি গান গেয়েছি বকুলের তলায়,,,,,,”

শুনছি আর শুনছি।কি হয়েছে আজ আমার,কেন এমন লাগছে।ধূসর মেঘ বারবার ঢেকে দিচ্ছে লুকোচুরি খেলতে থাকা চাঁদটাকে।এরকম ঝাপসা আলো আঁধারী আকাশ দেখলে বুকের ভেতর কোথায় যেন শূন্যতার বিলাপ টের পাওয়া যায়।

“আয় আর একটিবার আয়রে সখা,প্রাণের মাঝে আয়।
মোরা সুখের দুখের কথা কব,প্রাণ জুড়াবে তায়।”,,,

ছাদের নিরিবিলি হাওয়া এলোমেলো করে দিচ্ছিলো আমাকে,আর করছিলো মনটাকে বেহিসেবী।
কামিনীর টবের পাশটায় বসে পড়লাম,শব্দহীন রুদ্ধশ্বাস আমায় জ্বালায়,অন্তরের ঘুনপোকা ঝাঁঝরা করে অহর্নিশি।
নিজেকে পোড়াতে পোড়াতে বেদনার প্ল্যাটফর্মে  খাঁ  খাঁ জারুলের দীর্ঘশ্বাসে নিমগ্ন।
মেনে নিয়েছিলাম তো তোমাকে,তোমার সাজানো আঙিনায় বুনন করে চলেছিলাম নিসর্গের সুর,হোক আমি তোমার মায়ের পছন্দ,তবু,তবুও এতটুকু প্রাপ্তি কি পেতে পারতামনা,
আমি কি ছিলাম শুধুই তোমার উদাসীন কামনার তৃষ্ণার্ত রাত্রী শুধু??এতটুকু প্রেম,ঘরে ফেরা ভালবাসায় আমি কেন পাইনি তোমায়,পাইনা খু্ঁজে।ছেড়ে চলে গেলে। কবিতা বুঝিনি বলে?কবি অনুভব করিনি,,,তাই বলে তোমার তিলোত্তমা রাজ্যে আমার ঠাঁই হয়নি।

:আম্মু
চমকে তাকিয়ে দেখি মম।ধপ করে কোলের উপর বসে পড়লো মেয়েটা।
:তুমি এখানে বসে কি করছো,মামাম, মিসের কাছে পড়া শেষ করে তোমাকে পাচ্ছিলামনা,জানো,আজ মা দিবস।স্কুলে তোমার জন্য কার্ড বানিয়েছি,কবিতা লিখেছি,, তোমাকে দেবো বলে,
:চল,দেখবো।
:মামাম,শোনো,তুমি আমার মা,তুমি আমার বাবা।আজই আমার দুটো দিবস।ওকে??

মম মুখটা আঁধার করে ফেললো,গলাটা মনে হলো,ভেজা ভেজা,,নাহ,আমাকে সামলে নিতে হবে,কিছুতেই ওকে মন খারাপ বোঝানো যাবেনা
মেয়েকে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম,
:আমরা বরং আজ বাইরে খাই,চল,রিক্সা করে ঘুরবো মা বেটি,ইচ্ছেমত,কেমন??
: চলো,চলো,অনেক মজা হবে।হেপি হেপি মাদার্স ডে,
মম’র গালে একটা চুমু খেয়ে নীচে নেমে এলাম।

আমি নিজেকে কত কত বোঝাই,কথা বলি,কেমন ইস্পাত কঠিন মনে হয়।না,এটা বিশাল বলেছিল,আমি নাকি পাথর মানবী।
বিশালের চোখে,মনে এখনো স্বপ্ন,জেগে আছে প্রেমার্দ্র সন্ধ্যার আকুতি।

মারুফ চলে যাওয়ার পর দিনের পর   দিন,নিদ্রাহীন রাত যখন আমাকে কুড়ে কুড়ে খেতো তখনই বিশালের সাথে পরিচয় ফেইসবুকে।আমার শূন্য হওয়া চোখে,বুকের ভেতর গভীর দীঘির ক্ষতে বিশাল তার আরক্ত মনের প্রাসাদ মেলে দিয়েছে।

না,এত এত দিনের হাহাকার,ব্যাকুলতা পেরিয়ে বিশাল ধ্রুব প্রেম জাগাতে পারেনি এখনো,তবুও হাল ছাড়েনি আশা আনন্দের বিজনঘরে।

মারুফের কৈশোর,যৌবনের ভালোবাসা ছিল তার খালাতো বোন টিয়া,মারফের মায়ের আপত্তিতে বিয়েটা হয়নি,চরম ঘৃনা নিয়ে সে আমাকে বিয়ে করে মায়ের একরোখা সিদ্ধান্তে আর সেটাই আমার জীবনে অভিশাপ হয়ে আসে।
স্বামীর ভালোবাসা তো একেবারেই পাইনি,গভীর রাতে বাড়ি ফিরতো মারুফ।শারিরীক কোনো প্রেম ছিলোনা,বিষাক্ত বেদনার মতো মারুফ আমায় ভোগ করতো।জড়াজড়ি কথার মধু,সুর, ছন্দ কিছুই না।মধ্যরাতের বুকফাঁটা কান্নার মত আমাকে সে সম্ভোগ করতো। এক মূহুর্তের জন্যও মারুফ আমায় ভালোবাসেনি।

নিরাবেগ কতগুলো নিস্পন্দ বছর কেটে গেলো,আমার শাশুড়ি চলে গেলেন পরপারে।
কোলজুড়ে মম এলো আমার সমস্ত কষ্টের ভুবনে আলোর বাগান নিয়ে।আমি মনোযোগ দিলাম, মগ্ন বিভোর জাদুর বাঁশি মমতে।

বুঝতেও পারিনি মারুফ কি করে আবার টিয়াকে কাছে টেনে নিয়েছিল,টিয়া তার সংসার, সন্তান ফেলে মারুফের প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে উঠলো।

টিয়া ছিল আগুনরঙা রুপসী,মারুফ ও দেখতে ছিল প্রানকাড়া রমনীয় সূদর্শন।ওরা ওদের অনুরাগের নীলঢেউয়ে ভাসতে লাগলো,কবিতায় একে অপরকে রাঙাতে লাগলো বিমোহিত উন্মাদনায়।
আমি রাতের পর রাত পা ভিজিয়ে বসে থাকতাম ভেজা জ্যোৎস্নার স্বপ্নিল আঙিনায়।কেউ আমার অভিমান ভাঙাতে আসতোনা,গোপন হৃদয়ের ধূসর দুঃখগুলোর থোকা গুড়ানোর ছিলোইনা কেউ।শুধু নির্বাক দৃষ্টি আর প্রতীক্ষার মোহন দুঃখ সঙ্গী ছিলো।

একদিন সেটাও শেষ হলো।
মারুফ মুক্তি চাইলো,আমিও দিলাম।একেবারেই  কান্না আসেনি,অস্ফূট গোঙানিও যেন হঠাৎ বহ্নিশিখার মত জ্বলে উঠলো।
মমকে বুকে চেপে নির্জন দিগন্তে আমার পথচলা শুরু হলো।

প্রেম ও মায়ার বন্ধন আমার অন্তরে মেঘের চাদর বিছিয়ে দিলো।দীর্ঘশ্বাসকে চিতায় পুড়িয়ে সামনে এগোনোর নিটোল পথ হাতড়ালাম।চাকরী নিলাম।

বিশাল আলুথালু হয়না,নির্মম, কঠিন আমার এই আমিকে সম্মোহনের হিরেজ্বলা রাত্তিরে ছুঁয়ে থাকে।

তরুন,ভাবুক এই ছেলেটি সরে যায়না শত অপমানেও।
মনোহর,শান্ত হ্রদের শিল্পিত স্পন্দন যেন বিশাল।

নাহ,আমাকে নিয়ে আমি এখন আর ভাবিনা।
কবিতা ভালবাসি এখন আমি,অন্ধকারের সুরভীতে শব্দ খুঁজি,নীলখামে তোলা আমার প্রজাপতি শিরোনাম।
চাঁদ দেখি,সাঁঝের কারুকাজে নিজেকে সাজাই।
ডায়েরীর পাতায় আঁচড় টেনে সোনালী মন্ত্রের কবিতা গড়ি।
দুঃখরা ধবল আকাশের হলদেটে মেঘ হয়ে উড়ে উড়ে দিয়ে যায় মগ্ন লহরীর ছন্দ।আমি সব ভুলে যাই।গ্রীবা উঁচু করে চিবুকভেজা জল মুছে, আকাশ দেখতে দেখতে প্রচন্ড ভাবে নিজেকে ভালোবাসতে থাকি।

সুমি সৈয়দা
সুমি সৈয়দা

 

Author: সু‌মি সৈয়দা

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment