ট্রিব্যুউট টু আ ভ্যাকুয়াম ক্লিনার

ট্রিব্যুউট টু আ ভ্যাকুয়াম ক্লিনার

দিব্যি তো ছিল সকালটা। রাতের ঘুমটা গাঢ় হয়েছিল বলে ঘুম ভাঙ্গতেই মনে হ’ল, আজ বেশ ফুরফুরে লাগছে। কানে এসেছিল বৃষ্টির শব্দ। বুঝতে পেরেছিলাম, দিন কয়েক হাড় জ্বালানো গরমের পর রাতে বৃষ্টি এসেছিল, তাই তো ঘুমটা ভাল হয়েছে। বিছানা ছাড়তে ছাড়তেই ভাবছিলাম, ছেলেটাকে বলি আজ অফিস কামাই করুক। সারা জীবন চাকরি করে রিটায়ারমেন্টে গিয়েও শান্তি নেই, আবার চাকরি শুরু করেছে। বুঝি, বউটার চাপাচাপিতে দম নিতে পারিস না। তাই বলে সব দিন অফিস যেতে হবে, ঝুম বৃষ্টির দিনেও কি রেহাই পাবি না বাছা? ভাবছিলাম, ওকে সোজা বলে দেব, আজ কোথাও যেতে হবে না। ভাবছিলাম, ভুনা খিচুড়ি আর গরুর মাংস যদি আজ হয়, ছেলেটাকে পাশে বসিয়ে দুপুরের খাবারটা খেতে পারি। সেই মত ডাকও দিলাম, হ্যাঁ, বিছানা থেকে নামতে নামতেই ডাক দিলাম, আতিক! বাবা!

আছিয়া যখন ঘরে এল, তখনো আমার পুরোপুরি নামা হয়ে ওঠেনি। বিছানার নিচে স্যান্ডেলটা খুঁজছিল পায়ের আঙ্গুলগুলো। আছিয়া স্যান্ডেল খুঁজে দিতে দিতে যা বলল, তা শুনে তো পিত্তি জ্বলে গেল। আতিক নাকি অফিস চলে গেছে! এর মানে কি? হাড় হাভাতে ছেলেটা ঘর থেকে বেরুনোর আগে বুড়ো মা’টার সাথে কথাটথা বলার কথা কি ভুলে গেল? বউটা দুই দিন হ’ল রিটায়ার করেছে, আজকাল দেখি সকালের নাস্তা নিয়ে টেবিলে বসে থাকে, খাওয়া শেষ হলে পানির গ্লাসটাও এগিয়ে দেয়, আর আতিক কবে কোন্ শার্ট পরে যাবে তা-ও ঠিক করে দেয়। আগে বাপু অতটা ছিল না। সকাল হলেই সে-ও তো অফিসে ছুটত, এই সব ঢং করার সময় পেত না। তাই বলে কি তখন আমার ছেলে খেয়ে যায়নি, খাওয়ার পর পানি খায়নি! প্রতিদিন ছেলেটা আমার কাছ থেকে বিদায় না নিয়ে ঘর থেকে বের হয় না, আজ তবে কি হ’ল? বুঝেছি। হারামি বউটা এখন সব সময় বাসায় থাকবে আর আমার ছেলেকে এভাবেই আমার কাছ থেকে সরিয়ে রাখবে। অফিস যাওয়ার সময় দুনিয়ার আল্লাদ করবে, যাতে ছেলেটা মা’র কথা মনে করার সময়ও পাবে না। বেশ্যা মাগির মনে মনে এত পাপ!

আছিয়াকেও কেমন হাত করেছে, দ্যাখ না? যেন কিছুই হয়নি, এমন ভান করে বলে কি, আমি নাকি নাক ডাকছিলাম আর তাই দেখে ওর ভাইজান নাকি বলেছে, মায়রে ডাকন যাইব না, মায় ঘুমায়তেছে, ঘুমাক। এ্যাত্তো ডেঁপো হয়েছিস্ তুই! কী সুন্দর মিথ্যে বলে যাচ্ছিস্ ঐ হারামজাদির হয়ে!

আছিয়াকেই মূলত ধরতে চাইলাম, না না, ধরতে চাইলাম আছিয়ার চুলের গোছা। পা কেন সরে গেল, নাকি সরে গেল পায়ের নিচের মাটিটা, বুঝতে পারলাম না। একেবারে ধাম্ করে পড়ে গেলাম মাটিতে। এভাবে পড়লে হাড়গোড় কি আর আস্ত থাকে? আমিও বুঝলাম, আমারও হাড়গোড় আস্ত নেই। তবে ব্যাপারটা আমি একা বুঝলে কি চলবে? সবাইকে বুঝিয়ে দিতে আমাকে যে চিৎকার শুরু করতে হ’ল! ততক্ষণে আছিয়াও দৌড়ে গেছে ভেতরে, কোথায় আমাকে তুলে দাঁড় করাবে, তা না করে শয়তানটা গেছে বউকে খবর দিতে। আমি হাড়গোড় ভেঙ্গে দলা হয়ে থাকলে ঐ বউ জানলেই কি আর না জানলেই কি? ওতে কি আমার জ্বালা কমবে? নাকি বউয়ের মুখ দেখে আমার জান ঠাণ্ডা হবে? ওরে, তা কি হয়েছে কখনো?

ঐ দ্যাখ, বলতে না বলতেই বউ এসে হাজির। ষাট তো পার হয়েছে, বয়সী শরীর নিয়ে আমার ভারী শরীরটাকে টেনে তুলতে চায়, এ্যাতো তার সাহস! একা তো নয়, আছিয়া আর সখিনাকে সাথে নিয়েও আমার শরীরের ভার যখন ক্লান্তি এনে দেয়, তখন বেয়াদবের মত বলে, কিভাবে পড়লেন আম্মা?

কিভাবে পড়লাম কি পড়লাম না, তা কেন জানতে হবে? আমার হাড়গোড় ভেঙ্গেছে, কথা হচ্ছে সেটাই। তা হারামজাদিকে যতই বলি, কম করে হলেও তিন খান হাড় ভেঙ্গেছে, আবাগির বেটি সব সময়ের মত আস্তে আস্তে বলে কি, হাড় ভাঙ্গলে নাকি ফুলে যেত জায়গাটা, লাল হয়ে যেত হ্যানো ত্যানো। ও আমাকে হাড় ভাঙ্গা শেখাতে এসেছে! বলি, লেগেছে তো পাছায়, পাছার তাল তাল মাংসের দাপটে ফুলে ওঠা-উঠি চোখে না পড়লে আমি কি করব? মাঝে মাঝেই হারামি বউটা আমাকে জ্ঞান দিতে আসে। বলে, আতিক নাকি আমি যা চাই তাই এনে দেয়। নাতনির সাথে পাল্লা দিয়ে আমি বলে দুধ-ঘি-পনির-ফনির খেয়ে দুনিয়ার রোগ বাঁধিয়েছি, ওজন বেড়েছে বিপদজনক হারে। বয়স চুরাশি হয়েছে তো এমনি এমনি না। খেয়েদেয়েই তো বেঁচে আছি, থাকবও। হাতি হব, আরও হব। তোর মুখে ঝাঁমা ঘঁষার জন্য আমি এরকম খেয়েদেয়েই বেঁচে থাকব, দেখিস্! তবে আজ যখন হাড় ভেঙ্গে যাওয়ার জ্যান্ত ঘটনা দেখেও না দেখার ভান করছে, তখন পাছার মাংস নিয়ে যাতে কথা বলতে না পারে, সেজন্য চেঁচিয়ে বলি, আতিককে আসতে বল। ট্রমা সেন্টারে যেতে হবে। হাড় ভাঙ্গার ব্যথা তো আর সইতে পারছি না।

কোন মতে বিছানায় উঠে বসেছি আবার। বউ আবারও কি যেন বলতে চায়, পাছার মাংসের কথা কি না কে জানে ভেবে গালি দিয়ে বসি। শুয়রের বাচ্চি, যা বলছি তা করতে পারছিস্ না? তোর বাকবাকুম কে শুনতে চেয়েছে? যা, দূর হ’ সামনে থেকে।

বউটার শ্যামলা মুখে ছায়া ঘনাতে দেখে, চোখে কূল ভাসানো তালপুকুরের টলটলানি দেখে আমার ভেতরটা খুশিতে একেবারে ফেটে পড়ছিল। বউটা আতিককে যখন ফোনে বলছে আমার হাড় ভাঙ্গার কথা, তখন আমি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মত চিল্লানি দিতে থাকলাম, বাবা গো, মা গো!

বকুল মাথায় তোয়ালে পেঁচিয়ে ছুটে আসে আমার কাছে। বুঝতে পারছি, অফিসে যাওয়ার আগে গোসল সারছিল বলে আমার এতক্ষণের চিল্লানি ওর কানে যায়নি। এখন আমি আবার বর্ণনা দিতে শুরু করি। কিভাবে পড়লাম, কিভাবে আমার হাড়গোড় ভেঙ্গে গেল আর কিভাবে বাকি জীবনটা আমাকে পঙ্গু হয়ে শুয়ে বসে কাটাতে হবে। বকুল মেয়েটা ওর মার মত আস্তে কথা বলতে শেখেনি, কাঠখোট্টা দজ্জাল মার্কা…আমার নাতনি আমার মতই হয়েছে ভেবে মনে মনে যতই আনন্দ পাই না কেন, এখন কিন্তু চাইছিলাম, নাতনিটা আমার গলা জড়িয়ে আদর দিক্। আমি একটু কাঁদি। বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু বৃষ্টির মতই ঝিরঝিরিয়ে কান্নার সুর বিলাপের সাথে আমিও তো ধরতে জানি।

বকুল আমার কিছুই দেখল না, খানিক টিপেটুপে মা-র মত একই কথা বলে। আমার নাকি হাড় ভাঙ্গেনি। দু’টো নাপা খেয়ে টান টান হয়ে ঘুমাতে হবে। ঘুম ভাঙ্গলেই আমি নাকি দেখব, আমার সব ঠিকঠাক। বসতে গিয়ে মাটিতে চাপ খেয়ে মাংসপেশিতে ব্যথা হয়েছে, ও নাকি তেমন কিছু না। তেমন কিছুটা যদি না-ই হবে, আমার ব্যথা কেন লাগে? বকুল বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলে গেল, রাজু এসে দেখে যাবে। তেমন কিছু হলে ও তো বুঝবে।

ঘোড়া বুঝবে। হাতি বুঝবে। রাজু তো হার্টের ডাক্তার, ও হাড় ভাঙ্গার কি বুঝবে? বউ সুযোগ পেলেই রাজুকে ডাকবে, বোনের ছেলে বলে রাজুকে নিয়ে এত মাতামাতি, সে কি আমি বুঝি না? কেন বাপু, দেশে কি আর ডাক্তার নেই? আমি রাজুকে দেখাব না তো দেখাব না। ডাক্ আমার ছেলেকে। সে আমাকে পাঁজাকোলা করে হাসপাতালে নিয়ে যাবে, দেখে নিস্ তোরা।

বকুল হাসে, ওর বেহায়া মা-টাও হাসে। মেয়েটার সামনে ওর মা-কে বেশি কিছু বলা যায় না। বকুল বেরিয়ে যেতেই গলা ছাড়লাম। আমার ছেলে আমাকে পাঁজাকোলা করে হাসপাতালে নেবে না তো কি তোকে নেবে? বেশ্যা মাগি, পেটে তো ছেলে ধরিস্ নি, তুই বুঝবি কি?

বউটা সরে যায়। ওদিকে শুনতে পাই, বউয়ের লাই পেয়ে পেয়ে মাথায় উঠে যাওয়া আছিয়াটা বকুলকে ফোনে ফিসফিসিয়ে বলছে, আমি ওর মা-কে বেশ্যা মাগি বলেছি। বলেছি, বেশ করেছি। তুই সেদিনকার সেই এক ফোঁটা মেয়ে, চাকরি করিস্ বলে কি তোকে আমি ভয় পাই? তোর মা-কে আমি আগেও বেশ্যা বলতাম, এখনো বলি, ভবিষ্যতেও বলব। আমার ছেলেটাকে ছিনিয়ে নিল আমার কাছ থেকে, সে বেশ্যা না তো কি! যত যা-ই বলিস্, এই বউ আমার বড়ই খেদমত করে, আতিক দীর্ঘদিন বিদেশে চাকরি করলেও আমাকে একা রেখে যাবে না বলে বউ বেড়াতেও যায়নি ওর কাছে, আমার পেটে ধরা দুই মেয়ের চেয়ে এক ছেলের এই এক বউই আমাকে সেবা করেছে বেশি, তবুও আমি বলব। ওর জন্যই তো সাতাশ বছর আগে আতিক আমাকে বলেছিল, তুমি পছন্দ কর আর না-ই কর, রানুকে আমি ভালবাসি, রানুকে বিয়ে আমি করবই। ওর জন্যই তো ছেলে আমার গলা তুলেছিল, যে ছেলে কোন দিন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেনি! আমার হাতের রান্না ছাড়া যে ছেলে মুখে ভাত দেয়নি, সেই ছেলে দিব্যি কেমন করে ছিনালিটার জাদুতে বস মেনে গেল। শোয়ার ঘর থেকে ভেসে আসত খিলখিল হাসি। রান্না ঘরে শুনি আতিকের গলা—রানু, রুই মাছের দোপেঁয়াজি তোমার মত আর কেউ করতে পারে না। ক্যান রে আতিক, তোর মা কি তোকে রুই মাছের দোপেঁয়াজি খাওয়ায়নি কোন দিন? কোনদিন কি তুই বলিস্ নি, মা খুব মজা হয়েছে! বলেছিস্ তো, কত্ত বলেছিস! অথচ, সব কেমন ভুলে গেলি। আমাকে সাথে রেখেছিস্, খাওয়া-পরার কোন কষ্ট রাখিস্ নি মানলাম। মায়ের মনে যে দিনের পর দিন কাঁটা গাছ বুনে দিলি, তার কি হবে রে বাছা?

আতিক কিংবা বকুল নয়, মমতাকে দেখে থমকে যাই আমি। ততক্ষণে আধশোয়া হয়ে খাওয়া-দাওয়া শেষ করেছি, যে সিরিয়ালগুলো আমি দেখি প্রতিদিন, তা-ও দেখে ফেলেছি। হাব হাব কি বাজনাভির সিরিয়ালে আমার মত এক শাশুড়ি আছে, তার বউটাও আমার বউয়ের মত শয়তানের পা ঝাড়া, সেই শাশুড়িটারও আমার মত দুঃখে দিন যায়। আজ দেখলাম, শাশুড়ির জন্য শাড়ি কিনে এনেছে বউটা, শাশুড়ির মোটেও পছন্দ হয়নি শাড়ি। শাশুড়ির পছন্দ হবে এমন শাড়ি কি কিনেছে পাজি বউটা? শাশুড়িকে আবার আল্লাদ করে বলছে, ইতনা জবরদস্ত, নেহি মাতাজি? মাতাজি তো শাড়ি ছুঁড়ে ফেলেছে (আমি হলেও তা-ই করতাম), আঙ্গুল উঁচিয়ে বলছে, কি যেন বলছিল… ছাই আমি হিন্দি অত মনে রাখতে পারি না…তবে যা বলছিল, তার অর্থ হচ্ছে, এই পচা শাড়ি দিয়ে আমি আমার শরীর ঢাকব না, ঢাকতে পারি না, না না না। বউটা চোখ বড় বড় করে তাকাল, আর তখনি সিরিয়ালটা শেষ। কাল সকালে দেখি বউটা কি বলে। ততক্ষণ আমার হাড়গোড়ের খবর নিই। মমতাকে বলি, নানু ভাই, আমার হাড় ভেঙ্গে গেছে।

আমার পেটে ধরা মেয়ের মেয়ে মমতা আমাকে কি না চোখ রাগিয়ে প্রশ্ন করে, আমি কোন্ সাহসে তার আল্লাদের রানু মামীকে গালাগাল করেছি?

বাহুবালী টু! বাহুবালী টু! আমিও লাফিয়ে হাতির শুঁড়ের উপর ভর দিয়ে হাতির পিঠে চড়ে বসতে পারতাম, তবে কিনা পাছার হাড় সত্যি সত্যি ভেঙ্গেছে বলে বোঝানোটা জরুরি বলে সেটা করলাম না। অস্থিরতা দেখাই, ফুঁপিয়ে কেঁদেকেটে একসাঁ করি, যাতে আমার কোন কথাই মমতা ঠিকঠাক বুঝতে না পারে। না বুঝেই মমতা বলে কি, আমাকে নাকি সাপের পাঁচ পা দেখিয়ে ছাড়বে। ওদের বাড়ি নিয়ে যাবে। ওখানেই আমার সেবাযত্ন করবে ওর মা। আমার পেটের মেয়েও আমার যন্ত্রণা সইতে পারবে না, এটা এবার প্রমাণ করেই ছাড়বে মমতা।

মমতা আমাকে নিতে পারলে তো! ঠাস্ করে মাথা ঘুরিয়ে চোখ উল্টিয়ে কিভাবে বিছানায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকতে হয়, তা আমি শিখে ফেলেছি। ভাগ্যিস, ভাল মতো হ’ল পড়াটা। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই টের পাই, আতিকের কাছে ফোন গেছে। আতিক আসছে। আতিক এল। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ‘মা’ বলে কাঁদল। আমি আমার ছেলেটার বুকে মাথা রেখে শুনলাম ধুক্ পুক্ শব্দ। ঠিক সেই শব্দ, যা আমি শুনেছিলাম আতিককে পেটে নিয়ে ডাক্তার হাসনা বানুর চেম্বারে। পেটের উপর কি জানি কি বসিয়ে কি জানি কি শুনছিল। আমিও শুনতে পাই। ধুক্ পুক্ ধুক্ পুক্। জানতে চাই, ও কীসের শব্দ গো আপা? হাসনা বানু বললেন, আপনার সন্তানের হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ। আমি বুঝলাম, আল্লা এইমাত্র আমার সাথে কথা বলে ফেললেন। আতিককে কোলে নিতে পারলাম বলে বহুবার ওকে কোলে নিয়ে বুকে কান পাততাম। আল্লা আমার সাথে কথা বলেন, সেই কথার লোভ কী এক জনমে যায়? যায় না।

হাসপাতালের ডাক্তারগুলো কোন্ লেখাপড়া শিখে ডাক্তার হয়েছে, তা আমি বলতে পারব না। খালি আমাকে দেখে আর বলে, আমার নাকি কিছুই হয়নি। আমার কি হয়েছে, তা বোঝার মতো লেখাপড়া এরা করেনি, এ আমি বুঝতে পারলাম। কেউ আমার এ কথায় কান দেয় না, নিজেরাই বলে, এরা বড় ডাক্তার বলেই আমার মুখে নাকি রোগশোকের কোন চিহ্নই নেই। বয়স কমে গেছে বিশ বছর, কে যেন আরও কমালো, মনে পড়ছে না।

বেশ্যা মাগি নিজের হাতে আমার জন্য খাবার রান্না করে আনে। মুখে যদিও বলিনি কোনদিন, কিন্তু ওর হাতের মসুর ডাল আর কচুর লতির চচ্চড়িটা  বেশ লাগে, একদিন দেখি সেটাও এনেছে। বুঝতে কেন দেব যে এটা আমি ভাল খাই? ওকেই কেন বোঝাব যে ওর রান্না আমার মুখে রোচে? আমার আতিকের বুকের উপর মাথা রেখে কম আল্লাদ করেছে হারামিটা? জীবনভর জ্বালালো, কবে এ জ্বালা মিটবে, কে জানে!

কবে এ জ্বালা মিটবে…এ ভাবনায় পড়ি আমি। কবে এ জ্বালা মিটবে? আতিক আমার আতিক-ই আছে, এ বোধ জ্বালাটাকে কমিয়ে দেয় হাসপাতালে থাকলেই। অফিস থেকে ছুটে আসে পাগলের মতো। ছোট্ট কেবিনের ভেতর আমার আতিককে ছাড়া আর সব্বাইকে বেরিয়ে যাওয়ার হুকুম দিয়ে বলি, খুব জরুরি একটা কথা আছে বাপ্।

আতিক হাসে হা হা। বলে, এই জরুরি কথা বলবে বলে সেই ছোটকাল থেকে টেনে ধরো আমাকে। তোমার জরুরি কথা তো বলা হ’ল না মা।

আতিক, আমার বাপ্ আমাকে জড়িয়ে ধরে ওর বুকের উপর মাথাটা রাখতে দেয়। আমি প্রাণপণে ওর বুকের ভেতরে নিজেকে মিশিয়ে দিতে থাকি, শুঁষে নিতে থাকি আমি ছাড়া আর সব সত্তাময় অণু-পরমাণু, বেশ্যাটাকে শুঁষে নিতে হবে এই বেলা, এই প্রত্যয়ে আমার কান্নার হাহাকার কেন যেন ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের পোঁ-ধ্বনি হয়ে যায়, আমি তার কিছুই বুঝতে পারি না। কিছুই না।

নাসরীন মুস্তাফা
নাসরীন মুস্তাফা

 

Author: নাসরীন মুস্তাফা

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment