ঠিক আছে!

আলবার্তো মোরাভিয়া

মূল : আলবার্তো মোরাভিয়া

রূপান্তর : মাহবুবুর রহমান শিশির

লিফটের ভেতরে ঢুকল ওরা। নোরা এক পাশে সরে দাঁড়াল, খানিক আগে স্যান্ড্রোর দেয়া মিমোসার গুচ্ছটা দুই হাতে ধরে রেখেছে সে। লিফটের বোতাম টিপল, ওটা উপরে ওঠা শুরু করতেই বলে উঠল মেয়েটা, ‘মনে আছে তো? আমি তোমাকে কেবল ওই একটা শর্তেই আমার সঙ্গে আসার অনুমতি দিয়েছি। ও ফোন করা মাত্রই তুমি কেটে পড়বে এখান থেকে।’

‘ঠিক আছে।’

ক্ষণিকের জন্য নোরার ভরাট, লালচে মুখে রাতের চিহ্ন ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল, কুঁচকে উঠল নীল চোখের কোনা। এগুলো স্যান্ড্রোর চোখ এড়াল না। ‘না’, নোরা বলল। ‘আমি জানি আসলে কোনো কিছুই ঠিক নেই। কখনো ঠিক হবেও না। উপরে গিয়ে ঠিকই বক বক শুরু করবে তুমি। কানের পাশে ঘ্যান ঘ্যান করে শোনাবে কতই না ভালোবাস তুমি আমাকে! আমি বললেও তুমি যেতে চাইবে না। তোমাকে বিদায় দিতে রীতিমত যুদ্ধ করতে হবে আমাকে। আমি আর যুদ্ধ চাই না।’

‘কিন্তু এত রেগে যাচ্ছ কেন তুমি?’

‘আমি রাগছি কারণ কিছুই বোঝ না তুমি, বুঝতে পারোও না।’

‘কী বুঝি না?’

‘যে আমি তোমাকে ভালোবাসি না। পারবও না কখনো।’

‘ঠিক আছে।’

‘জান কেবল এ দুটো শব্দই ঠিক আছে আর ঠিক আছে। কী ঠিক আছে তোমার? কিসসু না! তাহলে কেন বল ঠিক আছে?’ ক্রোধের ঝড়ে উড়ে যাচ্ছে মেয়েটা। ‘কখনো বলবে ঠিক নেই, কিছুই ঠিক নেই?’

স্যান্ড্রো মাথা নত করল।

‘দুঃখিত। আসলে যখন আমি কথাটা বলি, সবকিছু মেনে নিয়েই বলি।’

‘কিন্তু আমরা কখনো কোনো কিছু মেনে নিইনি। ভবিষ্যতেও পারব না।’

লিফট দাঁড়াতেই নোরা চঞ্চল ভঙ্গিতে বের হতে উদ্যত হলো, স্যান্ড্রোকে পাশ কাটানোর সময় মিমোসার গোছা থেকে অসংখ্য পরাগ ছিটকে এসে ভরিয়ে দিল স্যান্ড্রোর মুখমন্ডল। নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়াল নোরা, ঘুরে চিৎকার করে উঠল, ‘সঙের মতো এখনো দাঁড়িয়ে কেন, ভেতরে এসো… আসতেই তো চেয়েছিলে, নাকি?’

নোরার পেছনে এসে দাঁড়াল স্যান্ড্রো, দরজা খুলে হলরুমে প্রবেশ করল ওরা। ভেতরে ঘন অন্ধকার, নোরা আলো জ্বালাল না। এভাবেই চুপচাপ পেরিয়ে গেল কটা মুহূর্ত। নোরা দরজা বন্ধ করল, অকস্মাৎ পাশের ঘর থেকে বিকট শব্দে ভেসে এলো টেলিফোনের আওয়াজ। স্যান্ড্রো শুনতে পেল নোরার পড়িমড়ি পায়ের শব্দ। ছুটে যাচ্ছে আঁধারকে পাত্তা না দিয়েই। ধাক্কা খেল কোনো আসবাবের সঙ্গে, কেয়ার করল না। অবশেষে তার রুদ্ধশ্বাস কণ্ঠ শোনা গেল, ‘হ্যালো… কে? হ্যালো…’ এবং এর পর পরই স্বস্তিতে ভরে উঠল তার স্বর, ‘ওহ্ তুমি, আমার লক্ষ্মীসোনা!’

আলাপচারিতা বেশি লম্বা হলো না। কেবল ‘হ্যাঁ’, ‘না’ করে গেল নোরা। বোধহয় ভয় পাচ্ছিল ও প্রান্তের কণ্ঠস্বর আর বক্তব্য বুঝি স্যান্ড্রোর কানে যায়! শেষটা করল সে গাঢ় স্বরে, ‘এক সেকেন্ড, দাঁড়াও… হ্যাঁ বলো…’ এরপর যথাস্থানে রিসিভারটা রাখার শব্দ শোনা গেল।

আবারও নীরবতা।

ঘড়ির কাঁটা ধীরগতিতে ঘুরছে। মূর্তির মতো দাঁড়িয়েই আছে স্যান্ড্রো। কল থেকে টিপ টিপ করে ঝরছে পানি। বাথরুম কিংবা কিচেনের হবে হয়তো। বিল্ডিংয়ের কোনো এক ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসছে জ্যাজ মিউজিক, অন্য আরেক ফ্ল্যাটে ঝগড়া করছে কারা যেন… কিন্তু নোরা যে সত্যি সত্যি ঘরে আছে বোঝার কোনো উপায় নেই। না, ভুল হলো, খস খস শব্দ উঠল হঠাৎ। পোশাক পাল্টাচ্ছে? মনস্থির করে ডাক দিল স্যান্ড্রো, ‘নোরা!’

মেয়েটা আধা শ্বাসরুদ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘শুনছি… ভালো লাগছে আমার সঙ্গে থাকতে?’

‘তুমি জানো লাগে।’

‘তাহলে যা বলছি কান খুলে শোন। ঘরের বাতি জ্বালাবে না, এমনকি একটা ম্যাচের কাঠি পর্যন্ত না। বেডরুমে ঢুকে বিছানার পায়ের কাছে রাখা আর্ম চেয়ারটায় বস। চুপচাপ বসেই থাকবে।’

‘কিন্তু কেন?’

‘আমি শুয়ে পড়েছি। গায়ে কাপড় নেই। মনের যা অবস্থা তাতে একা থাকতে পারলেই বেশ লাগত… কিন্তু আমার সঙ্গ যখন এত ভালো লাগে তোমার, এটুকু অনুমতি আমি দিতেই পারি তোমাকে। তবে শর্ত ওটাই। আলো জ্বালাবে না। টুশব্দ করাও চলবে না।’

‘তোমার হাতটাও একটু ছুঁতে পারব না?’

‘না, ঈশ্বরের দোহাই! সে চেষ্টা করলেই চিৎকার করব আমি।’

‘তাহলে আমি করবটা কী?’

‘কিছুই না। কোনো অস্তিত্বই নেই তোমার এখন। অন্ধকার ঘরে চেয়ার, চেস্ট অব ড্রয়ার কিংবা অন্যান্য আসবাবপত্রের অস্তিত্ব কি বোঝা যায়?’

‘কিছুই করার নেই?’

‘আমার সঙ্গ তোমার ভালো লাগছে না? এটুকুতেই কৃতার্থ হও।’

স্যান্ড্রো চুপ মেরে গেল, অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজতে লাগল আর্ম চেয়ারটা। ওটার নাগাল পেতেই সঙ্গে সঙ্গে বসল না, কুশনের ওপর হাত বুলাতে লাগল সে। নরম কী যেন আঙুলে ঠেকল। সম্ভবত স্টকিং। হাত ঘুরতেই থাকল। এক জোড়া উঁচু কিন্তু ছোট স্তম্ভের আদল ঠেকল তালুতে। ব্রা! মেয়েটা তাহলে মিথ্যা বলেনি। ফোনে আলাপ শেষ করেই নগ্ন করে ফেলেছে নিজেকে। আর্ম চেয়ার থেকে ওগুলো ঠেলে ফেলে দিল সে, বসে পড়ল নিঃশব্দে।

নীরব মুহূর্তগুলো পার হতেই চায় না… স্যান্ড্রো পকেট হাতালো। অনুভব করল সিগারেটের প্যাকেট আর ম্যাচের অস্তিত্ব। নোরার সতর্কবাণী মনে পড়ল তার, সামলে নিল নিজেকে। বিছানায় কোনো সাড়া-শব্দও নেই। কখন যেন থেমে গেছে জ্যাজ মিউজিক আর ঝগড়া। চরমে ঠেকছে নীরবতা। অসহনীয়!

খস খস শব্দ শোনা গেল আবার, সম্ভবত গা থেকে চাদর সরালো নোরা। তার আকস্মিক শান্ত আর নরম কণ্ঠ স্যান্ড্রোর গোটা শরীরে পুলক আর স্বস্তির ঢেউ তুলল।

‘কিছু শোনাও আমাকে’, একেবারে স্যান্ড্রোর পায়ের কাছ থেকে বলে উঠল সে।

‘তুমি কোথায়?’

‘কোথায় আবার, বিছানায়।’

‘চাদরের নিচে?’

‘ধ্যাৎ, ওটা কখন সরিয়ে ফেলেছি। যে গরম!… আসলে উল্টো হয়ে শুয়ে আছি আমি। পা বালিশের ওপর, মাথা ঝুলছে বিছানার কিনারে। চুলগুলো ছুঁই ছুঁই করছে মাটিতে। তোমার হাঁটুর খুব কাছে আমি। চাইলে চুমুও খেতে পারি।’

‘তুমি চাইলে আলোটা জ্বালাতে পারি আমি…’

‘না, বলিনি আমি ন্যাংটো! একবার চেষ্টা করেই দেখ না, একেবারে ঘাড় ধরে বের করে দেব!’

স্যান্ড্রো নিজের একটা হাঁটুতে হাত রাখল, একটা আঙুল তুলল সাবধানে। নরম চুলের আলতো ছোঁয়া ঠেকল আঙুলের মাথায়।

‘কী শোনাব আমি?’ জিজ্ঞেস করল সে।

‘এমন কিছু যা আমাকে অন্য কিছু ভাবায়।’

স্যান্ড্রো ধীরে ধীরে বলল, ‘কিছুই মাথায় আসছে না আমার।’

‘কেন, এত না ভালোবাস আমাকে আর এখন বলার কিছু পাচ্ছ না?’

‘তোমাকে ভালোবাসি এটুকুই বলতে পারি।’

‘না, প্লিজ ভালোবাসার কথা বলো না।’

‘তাহলে কী বলব?’

‘তোমার পছন্দের কিছু বল।’

স্যান্ড্রো একমুহূর্ত ভেবে বলল, ‘সমুদ্র ভালো  লাগে। এ নিয়ে বলব?’

‘বল।’

খানিকক্ষণ ভেবে বক্তব্য গুছিয়ে নিল সে, শুরু করল সাবধানে। যতটা সম্ভব যত্নের সঙ্গে নির্বাচন করল প্রতিটি শব্দ। বলল, কতটা ভালোবাসে সে বসন্তের সকালে উচ্ছল ঢেউয়ের মাথায় নৌকা বাইতে। নীল জলরাশি, কাচের মতো স্বচ্ছ; দৃষ্টি যায় অনেক গভীরে। দেখতে পায় ছোট ছোট মাছেদের এদিক-ওদিক ছোটাছুটি, সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় হঠাৎ ঝিক করে ওঠে ওদের গা। লেজ নেড়ে দ্রুত এঁকেবেঁকে ঘুরছে, পরিষ্কার দেখা যায় মাথার ওপর চোখগুলো যেন এক জোড়া খুদে কালো বল… অদূরে কোরাল দ্বীপ… ক্রমে কাছে চলে আসছে। এগিয়ে যায় নৌকা, কোরালের ফাঁকফোকর গলে এগোয় সাবধানে… হঠাৎ থেমে গেল স্যান্ড্রো।

নোরা চেঁচিয়ে ওঠে। ‘ওহ্ অসহ্য, থাম বলছি! যথেষ্ট হয়েছে… যথেষ্ট! আর না!’

‘যথেষ্ট কেন? তুমি চাও না সমুদ্রের কথা বলি আমি?’

‘তুমি বোকা। রামবোকা! কিছু বোঝ না! এমন একটা বিষয়ে কথা বলছ যা নিয়ে তোমার বলাই উচিত হয়নি!’

‘উচিত হয়নি কেন?’

‘কারণ সমুদ্র আমারও পছন্দ, বিশেষ করে ওর সঙ্গে যখন যাই ওখানে। আর এখন তোমার মুখে সমুদ্রের গালগল্প শুনতে শুনতে আমার আবার ওর সঙ্গে সমুদ্রে যেতে ইচ্ছে করছে। তুমি অন্য কিছু বল।’

‘অন্য কী? তুমি-ই বরং ধারণা দাও একটা।’

‘জানি না… স্ট্যাম্প, ফুটবল, শুটিং, যা হোক একটা কিছু।’

‘আমি স্ট্যাম্প জমাই না। ফুটবল আমার পছন্দ না। জীবনে কখনো শুটিংয়েও যাইনি।’

‘ওহ্ চুপ কর, চুপ কর… প্লিজ!’

মেয়েটা নামছে বিছানা থেকে, টের পেল স্যান্ড্রো; নড়ছে। কিন্তু কোন দিকে গেল অন্ধকারে ঠিক বোঝা গেল না। হঠাৎ হলরুম থেকে তার চিৎকার শোনা গেল। স্যান্ড্রোর ঘাড়ের কাছে চুলগুলো সড়সড় করে দাঁড়িয়ে গেল আতঙ্কে।

‘বাথরুমে ঢুকছি… লক্ করে দেব দরজা! এরপর ঝাঁপ দেব জানালা খুলে…!

‘কসম ঈশ্বরের… না!’ হলরুমের দিকে ছুটল স্যান্ড্রো, ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে বাথরুমের দরজা। ভেতর থেকে লক করারও শব্দ হলো। বন্ধ দরজায় ঘুষি মারল  স্যান্ড্রো, পাগলের মতো ডাকল নোরাকে; এরপর দ্রুত ফিরে গেল বেডরুমে। অন্ধকারে কোনোমতে সব কটি জানালা খুলে ফেলল সে। আকাশভরা মেঘের ফাঁক দিয়ে যেন ছুটে চলছে চাঁদটা। হাল্কা, ম্লান আলো প্রবেশ করল ঘরে। বাইরে মাথা গলালো স্যান্ড্রো, কিন্তু বাথরুমের জানালাটা ঠিক কোথায় তা ঠাওর করতে পারল না। ওটা ঢাকা পড়ে গেছে বিল্ডিংয়ের সামনে রাস্তার দিকে মুখ করে বসান কুলুঙ্গির আড়ালে।

তার পেছনে হঠাৎ সশব্দে বেজে উঠল টেলিফোন।

স্যান্ড্রো ঘুরছে, এরই মধ্যে বাথরুম থেকে ছুটে এলো নোরা। ক্ষিপ্র হাতে রিসিভারটা তুলে নিল সে। গায়ে বাথরোব পেঁচানো। বিস্মিত স্যান্ড্রো ভেবে পেল না ওটা গায়ে চড়াবার সময় কখন পেল নোরা!

কথা বলতে গিয়ে যেন দম আটকে যাচ্ছে, কোনোমতে একবার বলল, ‘ঠিক আছে।’ সামান্য বিরতির পরে আবার বলল, ‘ঠিক আছে।’ এবার কণ্ঠে খুশির আমেজ। অবশেষে তৃতীয়বারের মতো, আগের চেয়ে লম্বা বিরতি দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে!’ উল্লাসে ফেটে পড়ল কণ্ঠ। রিসিভার রেখে স্যান্ড্রোর মুখোমুখি হলো সে। ‘আমি দুঃখিত যে চুক্তির কথা মনে করিয়ে দিতে হচ্ছে… তোমাকে বিদায় নিতে হবে এখন। ও আসছে!’

‘ঠিক আছে, যাচ্ছি।’

‘মন চাইলে পরে ফোন করতে পার।’

‘কবে? কখন?’

‘কখন? উম্ম্… এই ধর তো সকাল ৮টার দিকে।’

‘ঠিক আছে।’

‘দরজাটা টেনে যেও।’

‘ঠিক আছে।’

 

 

Author: মাহবুবুর রহমান শিশির

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment