ড. দীনেশচন্দ্র সেন ও তাঁর অপূর্ব কৃতিগাঁথা

ড. দীনেশচন্দ্র সেন ও তাঁর অপূর্ব কৃতিগাঁথা

(শেষাংশ)

মৈমনসিংহ গীতিকা : মৈমনসিংহ গীতিকা পূর্ববঙ্গ গীতিকা প্রথম খণ্ড শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন, রায়বাহাদুর, বি. এ, ডি-লিট্ কর্তৃক সংকলিত। এই গীতিকায় তিনি সহজেই বিশ্ব সাহিত্যের সুর বাজাতে সক্ষম হয়েছেন। ময়মনসিংহ থেকে বিভিন্ন প্রকার গাথা সংগ্রহের মাধ্যমে মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, উৎসাহ-আগ্রহ, প্রেরণা থেকেই গাঁথা এই গীতিকা যা বাস্তব জীবনমুখী।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ময়মনসিংহ গীতকা সম্পর্কে বলেছেন, “মৈমনসিংহ থেকে যে-সব গাথা সংগ্রহ করা হয়েছে তাতে সহজেই বেজে উঠছে বিশ্বসাহিত্যের সুর। কোনো শহুরে পাবলিকের দ্রুত ফরমাশের ছাঁচে ঢালা সাহিত্য তো সে নয়। মানুষের চিরকালের সুখ-দুঃখের প্রেরণায় লেখা সেই গাথা। যদি-বা ভিড়ের মধ্যে গাওয়া হয়েও থাকে, তবু এ ভিড় বিশেষ কালের বিশেষ ভিড় নয়। তাই, এ সাহিত্য সেই ফসলের মতো যা গ্রামের লোক আপন মাটির বাসনে ভোগ করে থাকে বটে তবুও তা বিশ্বের ফসল তা ধানের মঞ্জরী।”

“কাব্যপরিচয়ে যে বাউলের গানগুলো আছে সে আমার মাথায় কিংবা কলমে আসত না, লোক ঠকাতে গেলে নিশ্চয়ই ধরা পড়তুম। মৈমনসিংহ গীতিকাও অনেকটা তাই। প্রচলিত লোকসাহিত্যে গ্রন্থস্বত্ত্ব থাকে না, মুখে মুখে তার ব্যবহার চলে, নানা হাতের ছাপ পড়ে, তবু মোটের উপর তার ঐক্যধারা নষ্ট হয় না। ওর মধ্যে যে-একটা আশ্চর্য কবিত্ব আছে, ইতিপূর্বে তার এমন দুর্যোগ ঘটেনি যাতে একেবারে তার সুর কেটে যায়, তাল কেটে যায়। ওর ভিতরকার জিনিস রয়ে গেছে, সেটা নষ্ট করার সাধ্য কারো নেই। বাইরে দুটো-একটা জায়গায় একটু আধটু চুনকালির পলস্তারা লাগালেও ইমারতটা বাতিল হয়ে যায় না। মৈমনসিংহ গীতিকার কাল নির্ণয় চলে না, জাত নির্ণয় চলে, ওটা আবহমান কালের, কেবল ওটা কলেজিকালের বাইরে। এই কাল ওতে রিফু করতে যায় যদি সেটা তখনই ধরা পড়ে এবং সেটাতে সবটার দাম নষ্ট হবে না।” ময়মনসিংহ গীতিকার ভূমিকা লিখতে যেয়ে ড. আশরাফ সিদ্দিকী লিখেছেন “যা ছিল ধর্মানুষ্ঠানের অঙ্গ তা হল সাধারণের চিত্তবিনোদনের বিষয়বস্তু।”

ময়মনসিংহ থেকে এ পর্যন্ত যে সব গীতকিা সংগৃহীত হয়েছে তা মোটামুটি ৩ ভাগে ভাগ করা যায় বা তৃতীয় শ্রেণিতে ভাগ করা যায় ।

১ম শ্রেণি “ময়নামতির গান”  নাথ গীতিকা

২য় শ্রেণি মৈমনসিংহ গীতিকা এবং

৩য় শ্রেণি পূর্ববঙ্গ গীতিকা

ড. দীনেশচন্দ্র সেন পূর্ববঙ্গ গীতিকায় চমৎকারভাবে উঠিয়ে এনেছেন বিভিন্ন গাথা যা মানুষের হৃদয়ে এখনো দোলা দেয় শিহরণ জাগায়। শান্তি আনে পরম মমতায় ভালবাসা।  হৃদয় হতে হৃদয়ে প্রবাহমান ভালবাসার জন্য এই সকল গীতিকায় নারীরা  বিনয়ী প্রেমময়ী ত্যাগী এবং ক্ষমাশীল। পুরুষরাও তা থেকে কোন অংশে কম নয়। নারী ও পুরুষের মিলনে যেমন পাঠকরা খুশির স্রোতে ভাসতে পারে ঠিক তেমনি বিয়োগের সময় তারা কাঁদতে পারে এখানেই তো এই গীতিগাথার সার্থকতা। তিনি গ্রন্থগুলো বহু কষ্টে বিভিন্নভাবে সংগ্রহ করেছেন।

পূর্ববঙ্গ : মৈমনসিংহ গীতিকা প্রথম খন্ডে. দীনেশ চন্দ্র সেন কর্তৃক সংকলিত গাঁথাসমূহ :

১. মহুয়া

২. মলুয়া

৩. চন্দ্রাবতি

৪. কমলা

৫. দেওয়ান ভাবনা

৬. দস্যু কেনারামের পালা

৭. রূপবতী

৮. কঙ্ক ও লীলা

৯. কাজলরেখা

১০. দেওয়ানা মদিনা।

 

পূর্ববঙ্গ : মৈমনসিংহ গীতিকা দ্বিতীয় খণ্ডে. দীনেশচন্দ্র সেন কর্তৃক সংকলিত গাঁথাসমূহ :

১. দেওয়ান ঈশাখাঁ মসনদালি

২. ফিরোজ খা দেওয়ান

৩. সুরৎজামাল ও অধূয়া সুন্দরী

৪. চন্দ্রাবতীর রামায়ণ

৫. কা নমালা

৬. সন্ন (স্বর্ণ) মালা

৭. ধোপারপাট

৮. মহিশাল বন্ধু-১

৯. মহিশাল বন্ধু-২

১০. কঙ্ক ও লীলা

১১. বারতীর্থের গান।

 

পূর্ববঙ্গ : মৈমনসিংহ গীতিকা তৃতীয় খন্ডে. দীনেশচন্দ্র সেন সংকলিত গাঁথাসমূহ :

১. আয়না বিবি

২. সোনা বিবির পালা

৩. আঁকাবন্ধু

৪. রাজা তিলকবসন্ত

৫. বীর নারায়ণের মালা

৬. মলুয়ার বারমাসী

৭. কমলা রানী

৮. ভাইয়া রাজা কাহিনী

৯. পীর বাতাসী

১০. জীরালনী

১১. মুকুট রায়

১২. বস্তুলার বারমাসী

১৩. মাঞ্জুর মা

১৪. শ্যামরামের মালা

১৫. শিলাদেবী

১৬. রতন ঠাকুরের পালা

১৭. রাজা রঘুর পালা।

 

পূর্ববঙ্গ গীতিকা : চট্টগ্রাম-নোয়াখালী চতুর্থ খণ্ডে. দীনেশচন্দ্র সেন রায়বাহাদুর বি.এ. ডিলিটি কর্তৃক সংকলিত গাঁথাসমূহ :

১. ভেলুয়া

২. নিজাম ডাকাইতের পালা

৩. কাফন চোরা

৪. নুরুন্নেহা ও কবরের কথা

৫. কমল সওদাগরের মালা

৬. নছর মালুম

৭. চৌধুরীর লড়াই

৮. পরীবানুর হাঁইলা

৯. সুজা-তনয়ার বিলাপ।

 

ড. দীনেশচন্দ্র সেন এর উপন্যাস ও কাহিনীমূলক গ্রন্থসমূহ :

১. তিন বন্ধু (উপন্যাস), প্রকাশকাল, ১৯০৪ সাল

২. রামায়ণী কথা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা সংকলিত) প্রকাশকাল, ১৯০৪ সাল

৩. বেহুলা (পৌরাণিক কাহিনী) প্রকাশকাল, ১৯০৪ সাল

৪. বেহুলা (পৌরাণিক কাহিনী) প্রকাশকাল, ১৯০৭ সাল

৫. সতী (পৌরাণিক কাহিনী) প্রকাশকাল, ১৯০৭ সাল

৬. ফুল্লরা (পৌরাণিক কাহিনী) প্রকাশকাল, ১৯০৭ সাল

৭. জড়ভারত (পৌরাণিক কাহিনী) প্রকাশকাল, ১৯০৮ সাল

 

ড. দীনেশচন্দ্র সেন এর ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক গ্রন্থসমূহ :

১. বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (প্রথম ভাগ), প্রকাশকাল, ১৮৯৬ সাল

২. বৃহদ্বঙ্গ (প্রথম খ-), প্রকাশকাল, ১৯৩৬ সাল

৩. বৃহদ্বঙ্গ (২য় খ-), প্রকাশকাল, ১৯৩৬ সাল

৪. প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান, প্রকাশকাল, ১৯৪০ সাল

 

ড. দীনেশচন্দ্র সেনকর্তৃক সম্পাদিক গ্রন্থসমূহ :

১. ছুটি খানের মহাভারত (অশ্বমেধ পর্ব), প্রকাশকাল, ১৯০৫ সাল

২. শ্রী ধর্মমঙ্গল, মানিক গাংগুলি, সম্পাদক-হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও দীনেশচন্দ্র সেন, প্রকাশকাল, ১৯০৫ সাল

৩. কাশীদাসী মহাভারত, প্রকাশকাল, ১৯১২ সাল

৪. বঙ্গ সাহিত্য পরিচয়, প্রকাশকাল, ১৯১৪ সাল

৫. কৃতিবাসী রামায়ণ, প্রকাশকাল, ১৯১৬ সাল

৬. গোপীচন্দ্রের গান, প্রকাশকাল, ১৯২২-২৪ সাল

৭. ময়মনসিংহ গীতিকা-পূর্ববঙ্গ গীতিকা

৮. কবি কঙ্কনচণ্ডী (চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও হৃষিকেশ বসুসহ প্রথম ভাগ), প্রকাশকাল, ১৯২৪, ২য় ভাগ ১৯২৬ সাল

৯. গোবিন্দদাসে কড়চা (বেনুয়ারী লাল গোস্বামীসহ), প্রকাশকাল, ১৯২৬ সাল

১০. লালা জয়নারায়ণের হরিশীল (বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভসহ), প্রকাশকাল, ১৯২৮ সাল

১১. কৃষ্ণকানন গ্রন্থাবলি, প্রকাশকাল, ১৯২৭ সাল

১২. বৈষ্ণব পদাবলী, (খগেন্দ্র মিত্রসহ), প্রকাশকাল, ১৯৩০ সাল

 

এছাড়াও ড. দীনেশচন্দ্র সেনের অনেকগুলি   ইংরেজি গ্রন্থ রয়েছে।

 

ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হল দেশের চাষা, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার, ধোপা, নাপিত, মুচি । এদের জীবন কাহিনী অলিখিত সম্প্রদায়ের জীবন কাহিনী অসীম ভালবাসার দরদ মেখে রচনা করেছেন। তৎকালীন সময়ে এসব কাহিনী পড়ে শিক্ষিত সমাজ তাঁকে বিদ্রুপ করেছেন কিন্তু তিনি অসীম মনোবল এবং ধৈর্যের সাথে এসব মোকাবেলা করে তার প্রকৃত কাহিনী ইংরেজিতে অনুবাদ করে পাশ্চাত্যের ইংরেজি বিদগ্ধজনদের কাছে পাঠিয়েছেন । এসব কাহিনী পড়ে পাশ্চাত্যের বিদগ্ধ সমাজ তাঁকে প্রশংসা করেছেন এবং অভিনন্দিত করেছেন। একদিন যে সমাজ তাকে ধিক্কার করেছিলেন পরবর্তীতে তাদের কাছে তিনি আদৃত হয়েছেন। সেকালে দরিদ্র সুবিধাবঞ্চিত মুসলমান সমাজের যারা এ সকল কাহিনীর রচয়িতা ছিলেন তাঁদের কাহিনী অত্যন্ত সংবেদনশীলতায় অভিষিক্ত করে পাঠক সমাজের কাছে উপস্থাপন করেছেন।  যা আজো মানুষের হৃদয়কে আন্দোলিত করে। যা পাঠ এর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়েছে।

বিশিষ্ট কবি খান মোহাম্মদ মইনুদ্দীন প্রথম দিকে তাঁকে উপহাস করেছিলেন কিন্তু তিনি যখন উপলব্ধি করতে পারলেন তাঁর অমরগাঁথা সমূহ তখন তিনি তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।

ময়মনসিংহ এলাকার মাতৃতান্ত্রিক সমাজের যে বৈশিষ্ট্য ময়মনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকায় প্রতিফলিত হয়েছে তা সমাজে নারীর স্বাধীন প্রেম। প্রেমের স্বীকৃতি নারীর মানবিক, মানবিকতা, মায়াময়ী মহিয়সী দ্রোহের রূপ এবং প্রেমের কারণে ভালবাসার আবেদন পিতার বিরুদ্ধে পুত্র দাঁড়াতে যেমন দ্বিধা করেনি তদ্রুপ নারীও তার সুনিপুণ নিদর্শন রেখেছেন পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং সরাসরি ছদ্মবেশে যুদ্ধের মাধ্যমে। এই যে নারীর বিভিন্ন রূপ ময়মনসিংহের আঞ্চলিক সহজ সরল মানুষের ভেতর থেকে বের করে এনে বিশ্বের বুকে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার যে ব্রত ড. দীনেশচন্দ্র সেন নিয়েছিলেন তার মাধ্যমেই আজকের সমাজ, আজকের সাহত্য গর্ব করতে পারে। পারে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে সমৃদ্ধশালী সাহিত্য হিসাবে পরিচিত করতে । নারী, নারীর ত্যাগ, নারীর প্রেম, নারীর বিদ্রোহ ও বৈচিত্র্যময় রূপ বিশ্ব দরবারে নারীকে গরিয়ান করেছে। বিদেশী সাহিত্যের নারী চরিত্রগুলোকেও ছাপিয়ে গিয়েছে বাংলার সহজ সরল নারী চরিত্রগুলো। এই চরিত্রের চিত্রায়নে মানুষের চোখে যেমন দরদর করে পানি প্লাবিত হয় তেমনি হাসির ঝলকে গড়িয়ে পড়ে, আবার দ্রোহের সময় গর্জে ওঠে পাঠক ।এখানেনেই  ড. দীনেশচন্দ্র সেন পল্লির আনাচে-কানাচে পড়ে থাকা রত্নভাণ্ডার কুড়ানোর সার্থকতা খুঁজে পেয়েছেন। ড. দীনেশচন্দ্র সেনকে এই সকল গাঁথা সংগ্রহে যারা সহায়তা করেছিলেন তাদের কথা না বললে অবিচার করা হয়ে যাবে।  তাই নিজের প্রশান্তির জন্যে হলেও তাদেরকে আপনাদের সামনে আনতে চাই, পরিচয় করিয়ে দিতে চাই পাঠকমহলে সেই সব সম্মানিত মুখ যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে ড. দীনেশচন্দ্র সেনকে সাহায্য সহযোগিতা করে দুরূহ কাজ সম্পাদনা করেবাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধি করেছেন।  এবং বিশ্ব দরবারে সমাদৃত করতে বিশেষ অবদান রেখে গেছেন। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কিছু নাম : চন্দ্র কুমার দে, আশুতোষ চৌধুরী, বিহারী লাল সরকার, নগেন্দ্র চন্দ্র দে, মনোরঞ্জন চৌধুরী, পল্লিকবি জসীমউদ্দীন প্রমুখ । ড, দীনেশ চন্দ্র সেন তাঁর অসাধারণ সম্পাদনার মাধ্যমে প্রত্যেকটি গাঁথাকে গেঁথে দিয়েছেন মানুষের হৃদয়ের গভীরে, সুনিপুণ কারুকাব্যে।

 

 

Author: বেগম শামসুয জাহান নূর ও ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment