ড. দীনেশচন্দ্র সেন ও তাঁর অপূর্ব কৃতিগাঁথা

ড. দীনেশচন্দ্র সেন ও তাঁর অপূর্ব কৃতিগাঁথা

ড. দীনেশচন্দ্র সেন ১৮৬৬ সালের ৩ নভেম্বর  মানিকগঞ্জ জেলার বকজুরী গ্রামে নানার বাড়ি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ঈশ্বরচন্দ্র সেন। মাতার নাম রূপলতা দেবী। তাঁর বাবা ঈশ্বরচন্দ্র সেন মানিকগঞ্জ বারের ইংরেজি জানা প্রথম আইনজীবী ছিলেন। পরবর্তীকালে দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর বাবা এবং মায়ের নামানুসারে কোলকাতার বেহালস্থ বাসভবনটির নামকরণ করেন রূপেশ্বর । ছোটবেলা থেকেই ড. দীনেশচন্দ্র সেন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং চিন্তা-চেতনায় ছিলেন ভিন্নধারার। পাঁচ বছর বয়সে তিনি সুয়াপুর গ্রামে বিশ্বম্ভর সাহার পাঠশালায় ভর্তি হন। ১৮৭৩ সালে তিনি মানিকগঞ্জ মাইনর স্কুলে পাঠ শুরু করেন। মাইনর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কুমিল্লা গভর্নমেন্ট স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন ১৮৭৯ সালে।  কিন্তু সেখানের পড়াশুনা তার মনোঃপুত না হওয়ায় পরের বছর তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। সুসময় সবসময় স্থায়ী নয়। নিয়তির অমোঘ নিয়মে দিন রাতের মতো সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সুসময়-দুঃসময় বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে। সেই ঘুরপাকে পড়তে হয় দীনেশচন্দ্র সেনকেও।  বাবার অসুস্থতার কারণে বিনা বেতনে পড়ার জন্য স্কুল খুঁজতে খুঁজতে এসে ভর্তি হন কিশোরীলাল রায়চৌধুরী নির্মিত জগন্নাথ স্কুলে। এই স্কুল থেকেই তিনি  ১৮৮২ সালে এন্ট্রাস পাস করেন। তারপর তিনি ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। ১৮৮৫ সালে সেখান থেকে এফ. এ. পাস করেন। বি. এ পড়ার সময় আচমকাই তাঁর বাবা মা মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবনে নেমে আসে ভয়ানক দুর্ভোগ। এক প্রকার বাধ্য হয়েই তিনি অন্নসংস্থানের জন্য কর্মজীবন শুরু করেন। ১৮৮৭ সালে হবিগঞ্জ স্কুলে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন।  কিন্তু জ্ঞান অর্জনের অদম্য তৃষ্ণা থেকেই তিনি প্রাইভেটে বি. এ পরীক্ষা দেন এবং ইংরেজি ভাষায় অনার্সসহ দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেন। তিনি কুমিল্লার শম্ভুনাথ ইনস্টিটিউশনে কিছুদিনের জন্য প্রধানশিক্ষক পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৮৯০ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া স্কুলের প্রধানশিক্ষক পদে নিয়োগ লাভ করেন। প্রধানশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি গ্রাম বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং চন্দ্রকুমারের সাহায্য সহযোগিতায় বাংলার আনাচে কানাচে পড়ে থাকা অমূল্য রতন কুড়িয়েছেন। ঠিক যেন ছাই উড়িয়ে উড়িয়ে মানিক রতন কুড়িয়ে ভান্ডার ভর্তি করার মতন। চন্দ্রকুমার দেও নিরলসভাবে কাজ করে সহায়তা করেছেন রতন ভান্ডার সমৃদ্ধ করার জন্য। বাংলার আনাচে কানাচে পড়ে থাকা পুঁথি সংগ্রহ করার মাধ্যমে সেইসব উপকরণের সাহায্যে ১৮৯৬ সালে ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” শিরোনামে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি পুঁথি সংগ্রহ, তা পাঠ ও বিশ্লেষণ, গ্রন্থ রচনা ইত্যাদি কাজে অস্বাভাবিক পরিশ্রমের দরুণ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। ১৮৯৭ সালে কুমিল্লা থেকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যান। কলকাতায় চিকিৎসা করান। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে বি. এ পরীক্ষার বাংলা পরীক্ষক নিয়োগ এবং ১৯০৯ সালে উক্ত বিষয়ের রিডার নিযুক্ত করেন। ১৯১০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য মনোনীত হন। তিনি ২০ বছর উক্ত পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি তাঁর গবেষণাকর্ম সম্পাদনা করে প্রকাশ করার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ ফেলোশিপ’ লাভ করেন। ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের “বাংলাভাষা ও সাহিত্য” নামে নতুন বিভাগ খোলা হয়। তিনি উক্ত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান নিযুক্ত হন। আদর্শ শিক্ষক  হিসেবে এবং একেই সাথে তাঁর  সাহিত্যকর্ম বিদগ্ধ সমাজে সাড়া জাগিয়েছিল। নবদ্বীপের বিদগ্ধ জননী সভার মহামহোপাধ্যায়গণ তাঁকে “প্রত্নতত্ত্বভূষণ” উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি.লিট্ ডিগ্রি প্রদান করেন এবং ভারত সরকার তাঁকে রায়বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯২২ সালে প্রিন্স অব ওয়েলস কর্তৃক প্রদত্ত কয়েকজনের মধ্যে তিনিও ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৩১ সালে “জগৎতারিণী” স্বর্ণপদক অর্জন করেন। ১৯২৬ সালে মৈয়মসিংহ গীতিকাটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়।

বাঙালির ইতিহাস চর্চার এক অনন্য গ্রন্থের নাম “বৃহৎবঙ্গ”।

বাংলা সাহিত্য গবেষণার অন্যতম পুরোধা ড. দীনেশচন্দ্র সেনের বিশাল সাহিত্য সাধনা ও বিবিধ গ্রন্থ প্রণয়ন সম্পর্কে আলোকপাত করতে গেলে আরো অনেক বাঙালি গবেষকদের নাম চলে আসে তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, যিনি নেপালের রাজদরবার থেকে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ আবিষ্কার করেছিলেন এবং পুঁথি সাহিত্যের সংগ্রাহক জনাব আবদুল করিম সাহত্যি বিশারদ।

সাহিত্য সাধনা, কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং ধৈর্যের দিক দিয়ে ড. দীনেশচন্দ্র সেন এর তুলনা অপরিসীম। তিনি হচ্ছেন সিদ্ধ পুরুষ। জ্ঞানের আলোয় বিশ্ব সাহিত্যকে যারা আলোকিত করেছেন সেই সব আলোকিতজনদের উল্লেখযোগ্য একজন তিনি। তিনি পরিপূর্ণভাবে বাংলাসাহিত্য ভান্ডারকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে সক্ষম হয়েছেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সাহিত্যচর্চার সাথে (বিনি সুতোর মালার মতন) আন্তরিকতার সাথে অত্যন্ত নিবিড় সুনিপুণ সম্পর্ক স্থাপন করে রেখে গেছেন। তাঁর সৃষ্টি অসংখ্য গ্রন্থ যার মাঝে তিনি বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে। সকালের সূর্য দেখলে যেমন বোঝা যায় দিনের আলো কেমন হতে পারে তেমনি তাঁর ছোটবেলা পর্যবেক্ষণ করলে আমরা বুঝতে পারি তিনি সকালের সূর্যের মতো তেজোদীপ্ত আলোর বন্যা, তাকানো যায় না।

বিশিষ্ট অধ্যাপক তরুণ মুখোপাধ্যায়ের সুচিন্তিত মূল্যায়ণে “বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস অসম্পূর্ণ হতে বাধ্য, যদি আমরা কোনদিন আচার্য দীনেশচন্দ্র সেনকে ভুলে যাই। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের তিনিই স্থপতি” আসলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এক যুগান্তকারী ব্যক্তিত্বের নাম ড. দীনেশচন্দ্র সেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি ইংরেজিও চর্চা করতেন। ঢাকা কলেজে পড়াকালীন সময়ে তিনি একটি ইংরেজি প্রবন্ধ লেখেন যা অধ্যাপক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে তার অসাধারণ দখল দেখে তৎকালীন ঢাকা কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের বিখ্যাত অধ্যাপক নীলকন্ঠ মজুমদার তাঁকে স্নেহ করতেন। ছাত্রাবস্থায় ড. দীনেশচন্দ্র সেন ইচ্ছা পোষণ করছিলেন তিনি ইংরেজি সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিহাস রচনা করবেন সেজন্য তিনি সে বিষয়ে বিস্তর পড়াশুনা শুরু করেন।  সাথে ফ্রেঞ্চ জার্মান ও রাশিয়ান সাহিত্যের উপরও পড়াশুনা করেন। কিন্তু তিনি পরবর্তীতে সে সিদ্ধান্ত ত্যাগ করেন এবং মাইকেল মধুসূদনের মতো মাতৃভান্ডারের রত্ন খোঁজা শুরু করেন এবং মাতৃভাষার ইতিহাস নির্মাণে ব্রতী হন। সে সময় বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক “পিস এসোসিয়েশন” নামক একটি সাহিত্য সংস্থা থেকে রৌপ্যপদকে সম্মানিত করা হতো। বলা বাহুল্য বিচারক সুসাহিত্যিক চন্দ্রনাথ বসু এবং রজনীকান্তের বিচারে তাঁর প্রবন্ধই শ্রেষ্ঠ বলে নির্বাচিত হয়। দীনেশচন্দ্র সেন যখন কলকাতায় ছিলেন তখন তিনি যেসব গুণীজনদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কবি হেমচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সাহিত্যকর্মকে আমরা কয়েকটি ভাগে ভাগ করতে পারি। যেমন

১. উপন্যাস ও কাহিনীমূলক গ্রন্থ

২. ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃত বিষয়ক গ্রন্থ

৩. সম্পাদিত গ্রন্থ

৪. ইংরেজি গ্রন্থ

৫. ইংরেজি পুস্তিকা

 

ড. দীনেশচন্দ্র সেনের প্রধান প্রধান গ্রন্থ এবং তার প্রকাশকাল :

১. বঙ্গভাষা ও সাহিত্য ১ম ও ২য় খ-, প্রকাশকাল ১৮৯৬

২. তিন বন্ধু ১৯০৪

৩. রামায়ণী কথা ১৯০৪

৪. বেহুলা ১৯০৭

৫. সতী ১৯০৭

৬. ফুল্লরা ১৯০৭

৭. জয় ভারত ১৯০৮

৮. সুকথা ১৯১২

৯. গৃহশ্রী ১৯১৬

১০. নীলমানিক ১৯১৮

১১. মুক্তাচুরি ১৯২০

১২. সরল বাংলা সাহিত্য ১৯২২

১৩. বৈদিক ভারত ১৯২২

১৪. ঘরের কথা ও যুগসাহিত্য ১৯২২

১৫. আলোকে আঁধারে ১৯২৫

১৬. চৌকির বিড়ম্বনা ১৯২৬

১৭. ওপারের আলো ১৯২৭

১৮. পৌরাণিক ১৯৩৪

১৯. বৃহৎবঙ্গ (১ম খ- ও ২য় খ-)১৯৩৫

২০. আত্মতোষ্টি স্মৃতিকথা ১৯৩৬

২১. শ্যামল ও কাজল ১৯৩৬

২২. পদাবলী মাধুর্য ১৯৩৭

২৩. পুরাতনী ১৯৩৯

২৪. বাংলা পুরনারী ১৯৩৯

২৫. প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান ১৯৪০

২৬. হিন্দু সমাজ ও বৈষ্ণব ধর্ম

২৭. মৈমনসিংহ গীতিকা

 

১৮৯১ সালে তাঁর তিনটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় :

১. জন্মভূমি

২. জন্মান্তরবাদ

৩. বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

 

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত)

 

Author: বেগম শামসুয জাহান নূর ও ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment