তাসমিমা হোসেন, একজন​ অনন্যা

তাসমিমা হোসেন। নিজ পরিচয়ে উদ্ভাসিত এক নারী। পাক্ষিক অনন্যা পত্রিকার সম্পাদক। অনন্যা  সাহিত্য পুরস্কার আর অনন্যা শীর্ষদশ নামে দুটি পুরস্কার দিয়ে গুণী আর শীর্ষ নারীদের সম্মানিত করছেন দীর্ঘদিন ধরে।  বর্তমানে দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। একাধারে নিপুণ হাতে চালিয়ে যাচ্ছেন দুটি পত্রিকা। সংসদ সদস্য ছিলেন। নারীদের নিয়ে ভাবেন, কাজ কতে চান।

হাসিখুশি, আমুদে, মিশুক, দিলখোলা এই নারীর সাথে ইত্তেফাক অফিসে আলাপ করেছেন কথাশিল্পী আফরোজা পারভীন। বিশালাকার সুস্বাদু চমচম আর মোয়ায় আপ্যায়ন করেছেন।সাথে খোলামেলা কথা বলেছেন । সেই কথামালার  বিস্তারিত:

আ.পা:  কেমন আছেন আপা?

তা. হো: ভাল । এ বয়সে যতটুকু ভালো থাকা যায়, ইনশাআল্লাহ ততটুকুই আছি।

আ.পা: আপনার এখন ব্যস্ততা কেমন? আপনি তো একসাথে দুই পত্রিকার দায়িত্বে?

তা. হো: দুটো না, ছয়টা। আধাডজনও বলতে পারো।

আ.পা: কীভাবে একটু বলবেন?

তা. হো : প্রথমে ঘরটাতো দেখতে হয়, বাজার তুলতে হয়, ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখতে হয়। আর আমি যেহেতু ইনডিপেনডেন্ট বাড়িতে থাকি বাড়ির সদস্যর চেয়ে কাজের লোক বেশি। তাদের চালাতে  হয় । আমি নানিও, মেয়েরা যখনই দরকার হয় বলে, মা বাচ্চার অসুখ হয়েছে তুমি আসো অথবা বাচ্চাকে পাঠিয়ে দেয়। বেবি সিটিংও আমাকে করতে হয়। ওই যে বলেনা, মেয়েদের দ্বৈত সত্তা। ঘর বাহির দুটোই দেখতে হয়। আর দেখ, অনন্যা বের করেছিলাম আজ থেকে ২৮ বছর আগে । এখন ওটা আমার একটা পরিচয়ের মতো দাঁড়িয়ে গেছে। তুমিতো পোর্টাল বের করছ, জানো কোন কাজই অল্পতে সারা যায় না। আর ইত্তেফাকের এডমিনিস্ট্রেশনের দিকটা আমি আগেও দেখতাম। পলিসি ম্যাটার কি হবে,  নিউজ কি যাবে ওগুলো আমার স্বামী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু দেখেন। কিন্তু রোজকার যা যাবে তা আমাকেই দেখতে হয়। তাছাড়া আমাদের কিছু পারিবারিক ব্যবসা আছে। সেগুলির কর্ণধার হিসেবে ব্যবসাপাতিও দেখতে হয়। তাহলে বোঝ কতগুলো কাজ!

আ.পা: হ্যা, আপনি এক হাতে অনেক কিছু সামলান। আপানাকে অনুসরণীয়ই বলতে হবে। আচ্ছা আপা, অনন্যা বের করার চিন্তা আপনার মধ্যে কি করে এল? সত্যি বলতে কি, নুরজাহান আপার পর মেয়েদের জন্য একটা পত্রিকা বের করার কথা আর কেউ তেমন ভাবে ভাবেনি। আপনি ভাবলেন কিভাবে?

তা. হো: দেখ নুরজাহান আপার সময়টা তুমি ভাবো। বেগম পত্রিকা কিন্তু বের করেছিলেন নাসিরউদ্দিন সাহেব কলকাতা থেকে। উনি  সেই যুগের অত্যন্ত মহান, একজন  প্রতিভাবান মানুষ ছিলেন। বেগম পত্রিকার সাথে  বেগম সুফিয়া কামালও ছিলেন। আমার ফুফাতো বোন লায়লা সামাদও ছিলেন। অনেকে জানে না নাসিরউদ্দিন সাহেবের পরিবারের সাথে আমার ফুফাতো বোনদের মানে বাবার দিকের আত্মীয়দের গভীর সম্পর্ক ছিলো কলকাতাতে। আমাদের পরিবারের মেয়েরা খুব ফরোয়ার্ড ছিলো, খুব মডার্ন। আমার মা সাখাওয়াত মেমোরিয়ালে পড়েছিলেন ক্লাস এইট পর্যন্ত। কবিতা লিখতেন। কিন্তু সেসব প্রকাশ হতো না। আমরা ৮ বোন। দুই মায়ের ঘরের । যাক সে কথা। তারপর দেশ ভাগ হলো। নাসিরউদ্দিন সাহেবরা  এদেশে চলে এলেন। নিজের মেয়েকেও তিনি তৈরি করলেন ।

আমার ব্যাপারটা কিন্তু তেমন নয়। আমার বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট।  পত্রিকার মালিকের  ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছিল, মানিক মিয়ার মতো পরিবারে। তবে আমার বরাবরই এমবিশন ছিল। গান সেতার ছবি আঁকা, ব্রিজ খেলা, কিটি পার্টি, ইয়োগা, নামাজ সবই আমি করেছি। সব ব্যাপারেই আমার আগ্রহ। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর বিয়ে হয়ে গেছিল।  লেখাপড়া সংসার কাজ সবই চালিয়ে গেছি একসাথে। তারপর যখন অনন্যা করতে চাইলাম ১৯৮৮ সালে আমার স্বামী বললেন, ইত্তেফাকের মধ্যে থেকে করা সম্ভব না। আমি মোহাম্মদপুরে আমাদের যে পৈতৃক বাড়ি ছিলো তার একটা রুম ভাড়া নিয়ে শুরু করলাম। শুরুতে আমাকে খুব সাহায্য করেছিলেন  মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। উনিই দিল মনোয়ারা মনুকে নিয়ে এসেছিলেন। ওরা করত আমি পেছনে থাকতাম। তারপর যা হয়, কাজ করতে করতে কাজের মধ্যে থাকতে থাকতে আমার ইনজব ট্রেনিং হয়ে গেল। আমি আগেই বলেছি বাবা  সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি  খুবই আধুনিক ছিলেন। আর ছিলেন খুবই  সৎ শাসক। জাস্টিস কথাটা আমি  ছেলেবেলাতেই শিখেছিলাম। তাই যেখানে যাই করি, জাস্টিস করার চেষ্টা করি। আমারও চারটে মেয়ে । মেয়ে হবার ট্যাবুটা আমি বুঝি। তাই মেয়েদের জন্য কিছু করার চিন্তা থেকেই অনন্যার জন্ম।

তারপর ধরো ৬০ দশক এল। আমরা দ্রুত উন্নয়নের ধারায় চলে গেলাম। নারীরা এখন অনেক অগ্রগামী। তারপরও  পুরো সচেতন নই। আমরা যাকে পুরুষতন্ত্র বলি তা কিন্তু অনেক নারীর মধ্যে তীব্রভাবে বিদ্যমান। নারীরাই নারীদের দমিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট। তাই আমাদের সচেতন হতে হবে। কিসে আমাদের আসলেই সফলতা সেটা বুঝতে হবে। এই যে ধরো আফরোজা  তুমি এতবড় একটা চাকরি করেছ, সন্তান মানুষ করেছ, গল্প লিখেছ। লেখ নাই?

আ.পা: লিখেছি আপা।

তা.হো:  সে লেখা কি তোমার মনে প্রশান্তি  এনে দেয় না? দেয় তো!  তুমিতো অন্তত একটা কাজ করেছ, নিজের ভাবনাগুলো কাগজে লিখে গেছ । এটা অনেক বড় কাজ । নিজেকে নিয়ে ভেবেছ, নিজেকে চিন্তা করেছ। আমি বিশ্বাস করি, মানুষের অবসর বলে কিছু নেই। কিন্তু আমাদের সমাজ তা ভাবে না। এই যে ধরো, তুমি অবসরে গেছ, এখন তোমাকে সবাই বলবে, তুমি সরো, জায়গাটা ছেড়ে দাও। বাড়িটাই বা দখল করে রেখেছ কেন? তোমার আর প্রয়োজন নেই। কিন্তু আসলে তো তা না।  একজন মানুষ একজন নারী সর্বোচ্চ কতটা দিতে পারে  সেটা নিয়ে সরকারেরও ভাবা উচিৎ । আর প্রত্যেকের উচিৎ নিজের স্যাটিসফেকশনের জন্য কাজ করা। আমি অনন্যাকে নিয়ে খুশি।  যেটুকুই হোক অনন্যা  নারীদের জন্য কিছু কন্ট্রিবিউশন রেখেছে। আর বিন্দু বিন্দু করেই তো সিন্ধু হয়!

আ.পা: আপা আপনি নির্মম সত্য কথাটা অকপটে বলেছেন। যা আমরা সবাই জানি, কিন্তু বিশ্বাস করি না। শুনতেও খারাপ লাগে আমাদের। আমাদের সমাজে সত্যিই মনে করা হয় একজন মানুষ অবসরে গেলতো    সে শেষ হয়ে গেল। একজন মানুষ অবসরে যাওযা মানে তো তার প্রাণশক্তি, জীবনীশক্তি প্রতিভা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং জীবনের সঞ্চিত অভিঞ্জতায় তখন  সে সমৃদ্ধ পরিপূর্ণ পরিপক্ক। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য সমাজ তা মনে করেনা! আর সরকারেরও অবসরপ্রাপ্তদের নিয়ে কোন প্লানিং নেই। যাক আপা, আমার এর পরের প্রশ্ন অন্যন্যা বের করতে গিয়ে আপনি কি কি বাধার মুখোমুখি হয়েছিলেন? কিভাবেই বা সেগুলো অতিক্রম করেছেন?

তা.হো: যেটা সবচেযে বড় বাধা ছিল সেটা হচ্ছে,  সবাই ভাবত ওতো পয়সাওয়ালা ঘর থেকে এসেছে, ওকে লুটে নাও। ওর মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাও। তারপর নারী হবার যন্ত্রণা। যেখানেই কাজ করতে গেছি সেখানেই একই ধারনা, ও মেয়েমানুষ কি বোঝে, কি জানে? ওকে ঠকানো খুব সহজ। একজন প্রফেসর তো আমাকে বলেও গেছে, ‘আপনি কি বোঝেন। কি আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা? অত বড়াই করেন কিসের  জোরে, স্বামীর জোরেই তো?’ আমি বলি, হ্যা করি।  কারো না কারো জোরে তো করতে হবে, কেউ করে লেখাপড়ার জোরে, কেউ অভিজ্ঞতার জোরে, কেউ স্বামীর জোরে, কেউ পয়সার জোরে। আমি স্বামীর জোরে করছি।  তুমি যে তোমার বদমায়েশি আর ধোকাবাজির জোরে সব লুটে পুটে নিচ্ছ। আমি তো তা করছি না। আমি সব কিছু টোটালি বুঝতে চাই। এটা আবার অনেকের অপছন্দ।  আমাকে যা বোঝাবে সেটুকুই কেন আমি বুঝছি না, কেন সবটুকু বুঝতে চাচ্ছি। তা এসব ফেস করে আমি এগিয়ে গেলাম। সে সময় বেলাল ভাই আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। এই একটা মানুষ যার কাছে আমি চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকব। তিনি অনেক ভালো লোকও আমাকে দিয়েছেন। তাদের কাউকে কাউকে আমি বন্ধু হিসেবে ধরে রেখেছি, নিজে শিখেছি। আমি পড়তে শিখেছি। কোন লেখা ভাল, কোনটা বোরিং কোনটা মন্দ বুঝতে শিখেছি। মানুষ জার্নালিজম পড়ে, ট্রেনিং নিয়ে যা করে, শেখে আমি কাজ করতে করতে তা শিখেছি। আর একটা জিনিস হচ্ছে, আমি সরকারি অফিসারের মেয়ে বলে আমার এডমিনিস্ট্রেশন খুব ভাল। আমি বাবার কাছ থেকে তিনটা জিনিস শিখেছি।  এক লিখে রাখতে, দুই মনে রাখতে, তিন স্টেপে স্টেপে ভাগ করে কাজ করতে। যেটাকে তোমরা বলো প্লানিং। এবং  বাস্তবসম্মত ট্রেনিং । এভাবেই আমি এগিয়েছি।  তোমাকে ভয় দেখালে তুমি ভয়  পেওনা। শক্ত হয়ে দাঁড়াও।  তারপর ধরো তখন কমিপউটার ছিলো না। মোবাইলের তো প্রশ্নই আসে না। আস্তে আস্তে সব এল। কালার এরা, অফসেট এল। আর একটা বড় বাধা ছিল স্বামী। ‘তোমার বাড়ি ফিরতে এতে দেরি হলো কেন?’ এ প্রশ্ন আমাকে মাঝে মাঝেই শুনতে হতো।  আমি কাজ করতাম পার্টটাইমার নিয়ে। পাঁচটায় অফিস ছুটির পর তারা আসত। পাঁচটা থেকে আটটা এই সময়টা বাইরে থাকতাম। ওই মোহম্মদপুরের একঘরের অফিসে। তাই নিয়ে স্বামীর অসন্তোষ। তারপর নারীরাও কত কথা বলেছে, আপনি অন্যন্যাকে নিয়ে এটা কি করছেন? শুধু নারীদের লেখা দিয়ে সাজান। কিন্তু আমাকে তো কেউ পযসা ঢেলে দিচ্ছে না। বাজারে কি চলে সেটা আমাকে দেখতে হত। আমাকে ফ্লো বুঝতে হবে। বাজারে ফ্যাশন চলে, রান্নাটা চলে, তার মাঝে মেয়েদের কিছু দিলে সেটাও চলে। আমি সেইভাবেই চেষ্টা করেছি। আমার  তো কোন ইনভেস্টর ছিলো না। তাই নিজে প্রেসে গেছি। কাগজের দাম ফর্মা কস্টিং প্লেটের দাম কোন কাজে কতটা প্লেট লাগে সবই শিখতে হয়েছে আমাকে হাতে কলমে। আমার সাথে যারা ছিল তারা আমাকে বোকা বানিয়ে রাখতে চেয়েছে। আমি কখনও তাদের ফাঁদে পড়েছি, কখনও ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসেছি। ঠকতে ঠকতে শিখেছি। এমন কথাও কটাক্ষ করে আমাকে বলেছে, উনি নাকি নারীবাদী। এমনও বলেছে, মঞ্জুভাই বউ কন্ট্রোল করতে পারছেন না। হাত থেকে বেরিয়ে গেছে। আমি তোয়াক্কা করিনি, ওভারকাম করেছি।   অনন্যা শীর্ষ দশ  সাহিত্য পুরস্কার দিচ্ছি বহু  বছর ধরে। সেখানেও পলিটিক্স। তুমি শুনলে অবাক হবে, একজন পুরুষ  লেখক বই পাঠিয়ে আমার কাছে পুরস্কারের তদবির করেছে। আমি অবাক হয়ে বলেছি, আপনি জানেন না, আমি শুধু নারীদের দিই।  এইত আমাদের সমাজ!

তবে হ্যা, একটি দিনের জন্যও অনন্যা পত্রিকা আমি বন্ধ হতে দিইনি। একাধিকবার রাজনৈতিক কারণে আমাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। কিন্তু অনন্যা বন্ধ হয়নি। এটা একটা বড় ব্যাপার বলে আমি মনে করি।

আ.পা: নিশ্চয়ই এটা অনেক বড় ব্যাপার। আপনি অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার আর শীর্ষদশের কথা বললেন। আপনি কি বলবেন কিভাবে সিলেকশন করেন?

তা.হো:  তুমি স্টেপের কথা বলছ তো? আমি আসলে শুনি প্রতিষ্ঠিত লেখকদের কাছ থেকে। আবার অনেকে আছে লেখেনা, পড়ে। তাদের কাছ থেকেও শুনি। বাংলাদেশ তো ছোট জায়গা, সবাই সবাইকে চেনে। আর আমি যাকে দেব বলে ঠিক  করি তার বইগুলো পড়ি। পুরোটা তো পড়া সম্ভব হয় না, স্ক্যানিং করি। অনেকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করে। আমি ওটা বুঝি। এভাবেই হয়। মানুষই আমাকে সহযোগিতা করে।

আ.পা: এটাতো  সাহিত্য পুরস্কারের কথা বলরলন। শর্ষদশ?

তা.হো:ওই একইভাবে। আমি পড়ি, শুনি । মানুষের সহযোগিতা নেই। আর এখন তো সব কিছু খুব সহজ হয়ে গেছে। বাইরের সংবাদদাতাদের বলি, আমার  এই এই ক্যাটাগরি হয়ে গেছে, এই ক্যাটগরি বাদ আছে ।  একটা দাও। ছবি তুলে পাঠাও।ইনফরমেশন দাও।  দেখো জেনুইনটা দিও। খালাতো বোন মামাতো বোন দিওনা। এভাবেই হয়।  

আ.পা:  আপা অনন্যাকে নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

তা.হো : সত্যি কথা বলতে কি, আমি অনন্যার পুরস্কারগুলো   আর বেশিদিন চালাবো না।

আ.পা: কেন আপা?

তা.হো: আমি ২৫ বছর হয়ে গেলে অনন্যা শীর্ষদশ বন্ধ করে দেব। সাহিত্য পুরস্কারও বন্ধ করব। ওসবের আর দরকার নেই্ । এবার নারী দিবসে দেখলাম সবাই সবাইকে পুরস্কার দিচ্ছে । একই মানুষকে বার বার দিচ্ছে। কোন রিসার্চ ওয়ার্ক নেই। যে কোনদিন সুফিয়া কামালের নামও শোনেনি সে ‘সুফিয়া  কামা ‘ পুরস্কার পাচ্ছে । যে বেগম রোকেয়ার একটা বই ধরে দেখেনি সে পাচ্ছে ‘রোকেয়া’ পুরস্কার। ব্যাপারটা এমন। একই মানুষ। তারা কি করে সবাই জানে। আমি চারটেতে গেছি। র‌্যাডিসনের মতো হোটেলে লাঞ্চ  ডিনার খাইয়ে পুরস্কার দিয়ে দিলো। আর মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো দুহাতে তাদের টাকা দিচ্ছে। আমি তো টাকা দেবো না, সম্মান দেবো। তাহওল যার তার হাতে কেন দেব? কাজেই পুরস্কার আমি বন্ধ করে দেব। তবে সিনিয়র সিটিজেনদের একটা জায়গা করার কথা আমি ভাবছি । আমিও তো এখন সিনিয়র সিটিজেন। যেখানে তারা ডিগনিটির সাথে থাকতে পারবে। যেখানে সংস্কৃতি থাকবে, তাদের লেখাজোখা থাকবে। অনন্যা এজ এ মেগাজিন সেখানে চলবে। আমি অনন্যার জন্য একটা ফাউন্ডেশন করেছি। ফাউন্ডেশনের ব্যানারে অনন্যা চলবে যতদিন চলার। পরবর্তী প্রজন্ম আমার ইচ্ছের মূল্য দিয়ে এটা চালাবে আমি বিশ্বাস করি না। তাই কেউ যদি চালায় চালাবে, না চালাওল বন্ধ হয়ে যাবে।

আ.পা: আমি বুঝতে পেরেছি আপনি পুরস্কার বন্ধ করে দেবেন। কিন্তু অনন্যা চলবে । তাইতো?

তা.হো :হ্যা  

আ.পা: আপা আপনি দীর্ঘদিন ধওর অনন্যা চালাচ্ছেন, বলা চলে অনন্যা আপনার নিজে তৈরি পত্রিকা আর এখন আপনি ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক

তা.হো: তুমি কি বলতে চাচ্ছ আমি বুঝেছি। শোন মনে রাখবে, আমার পদবির সামনে ভারপ্রাপ্ত কথটা আছে। নারীরা তো ভার নিয়েই জন্মায়। অনন্যা আমার স্বামী আমাকে দিয়েছে। আমাকে যোগ্য মনে করেছে তাই দিয়েছে। বুঝেছে আমি পারব। আমি তো পার্লামেন্ট মেম্বারও হয়েছিলাম।হইনি? আমি কি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হয়েছিলাম? আমার স্বামীর ছেড়ে দেয়া আসনে আমি হয়েছিলাম। তবে ওটা আমি এনজয় করেছি। মানুষের সাথে মানুষের জন্য কাজ করা একটা আনন্দের ব্যাপার। তবে আমি বরল, কেউ মানুষের জন্য কাজ করে না। করে নিজের জন্য, ভাল লাগে বলেই করে।  নিজে আনন্দ না পেলে করত না। আমিও এনজয় করি। যে স্বামীর সাথে আমি এক ছাদের নিচে ৪৬ বছর কাটিয়ে দিয়েছি সে আমাকে এটা দিয়েছে, তার সম্মান রাখার জন্য করি। তাছাড়া এটা পারিবারিক পত্রিকা, পারিবারিক ঐতিহ্য। সে ব্যাপারটাও আমি মাথায় রাখি। আর আমি যখন যা করি সিনসিয়ারলি করি। না করেই বা কি করতাম। আমি তো দেখেছি আমার শাশুড়ি কি অবিশ্রাম খেটেছেন। তাকে কি কেউ কোন ট্রিবিউট দিয়েছে? বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব অনেক সৌভাগ্যবান। তাঁর কন্যারা নারীর কষ্টটা বুঝেছেন্, মাকেও তাই তুলে এনেছেন। ছেলে হওল কি করত আমি জানি না।

আ.পা: একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি?

তা.হো: আবশ্যই ।

আ.পা: স্যারের সাথে কি কখনও আপনার ইগো কনফ্লিক্ট হয়?

তা.হো : খুব, হয় খুব। আমি খুব একরোখা। যা করব বলে স্থির করি তা করবোই। ও ও তাই। তাহলে তো আমাদের ফাটাফাটি হয়ে যাবার কথা। কিন্তু তাতো হয় না। হয় না কারণ এডজাস্টমেন্ট বলে একটা কথা অাছে। আমরা কখনই আমাদের লিমিটি ক্রস করি না। জীবনের সর্বত্রই একটা লিমিট আছে। পার্লামেন্টেও তুমি বেফাঁস কথা বলতে পারবে না। আমরা সেই লিমিট বুঝে চলি। দুজন দুজনকে বলি, সমালোচনা করি, শুনি কিন্তু লিমিট কখনও অতিক্রম করি না। তাছাড়া আরেকটা কথা তো ঠিক আমাদের এই সমাজে পুরুষই সব। আজ যদি তোমার স্বামী  না থাকে তোমার বাড়ির চাকরও তোমাকে মানবে না। তাকে তো অশ্রদ্ধা করা যায় না। তাছাড়া স্বামী সবসময় বয়সে বড়ই হয়। আদব তমিজ লেহাজ বলেও কথা আছে। তাকে তার প্রাপ্যে সম্মানটুকু তো আমাকে দিতে হবে। আমি সেটা দিই।ছেচল্লিশ বছর একসাথে আছি। নিশ্চয়ই ভালবাসাও তৈরি হয়েছে। না হলে একসাথে থাকলাম কেন। আমি তো তার, সেও আমার হয়ে গেছে। এর জন্য আই লাভ ইউ  বলার প্রয়োজন পড়ে না। ইগো কনফ্লিক্ট হয় কিন্তু সেটা কখনই মাত্রার বাইরে যায় না?

আ.পা: আপনার কাছে আমার শেষ প্রশ্ন, নিজেকে আপনি কতটা সফর মনে করেন? আর দেশের পিছিয়ে পড়া নারীদের আপনি কি বলবেন?

তা.হো: খুব কঠিন প্রশ্ন। দেখ সফলতার কোন শেষ নেই। তবে হ্যা আমি যেটুকু করছি তাতে আমি স্যাটিসফায়েড। হতাশা একটা মারাত্মক জিনিস। ডিপ্রেশন এক ভয়ানক অসুখ। আমি তাতে ভুগতে চাই না। আমি যতটুকু যা করি আন্তরিকতার সাথে করি। আমি যদি কাউকে দাওয়াত করে মাছভাতও খাওয়াই আন্তরিকতা নিয়ে করি। আমার নিয়ত ভালো থাকে। তাই বলব আমি স্যাটিসফায়েড।

আর নারীদের লড়াই তো চিরন্তন । বিশেষ করে প্রন্তিক নারীদের। আজ একজন মহিলার সাথে কথা হচ্ছিল। আমি তাকে বললাম, আপনি আমার নমস্য। যেভাবে তিনি কাজ করছেন।

আ.পা: তিনি কি করছেন আপা?

তা.হো: বাল্যবিবাহ বন্ধ করার জন্য কাজ করছেন। এক গাম থেকে পাশের গ্রামে বিয়ে হয়ে সেখাকার উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন। মেয়েদের পড়াচ্ছেন । সচেতন করছেন। নিজে আইন পড়ছেন। আইনি সহায়তা নিচ্ছেন। ভাবতে পারো। এই ধরো আমার মা দাদিদের সময়ের কথা। এক একজন তিরিশ চল্লিশ বছর বিধবাই ছিলেন। বসে কিন্তু থাকেননি। দুপুরে খাওয়ার পর নামাজটা পড়ে এক পেচে শাড়ি পরে মহিলা সমিতি করতে বেরিয়েছেন। নিজের যতটুকু করার ক্ষমতা  আছে করেছেন। তাই নারীদের নিজেদেরই এগিয়ে আসতে হবে, কাজ করতে হবে, নিজেই নিজেকে তুলে ধরতে হবে। কেউ তাকে করে দেবে না।

আ.পা: আপনি আমাকে অনেক সময় দিলেন। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

তা:হো: তোমাকেও ধন্যবাদ।  

 

Author: রক্তবীজ ডেস্ক

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment