তাহান এবং তার যুদ্ধ সময়

অক্টোবরের সান্ধ্যকালীন আকাশটা তাহানের সবকিছু উলোট পালোট করে দেয় আজীবন। ছাতিমের গন্ধময় সময়টা ওকে দিশেহারা করে ফেলে। তার উপর মুজিব সড়কের এই স্থানটি, যেটি বেনাপোল সড়ক হয়ে সরাসরি বিখ্যাত যশোর রোড! যশোর টাউন হল ময়দানের সামনের অপ্রশস্ত মৃদু ঠান্ডা রাস্তাটি ওর আজীবন পছন্দের। তাকি মুন্সী মেহেরুল্লাহ মের জন্য অথবা ঐ রাস্তাটা একটুখানি পেরিয়ে সার্কিট হাউজের সারি সারি করোবী ফুলের থোকা থোকা লাল, নাকি ঝিম ধরা ছাতিমের জন্য তা তাহান জানে না। তবে সন্ধ্যা লাগলেই ওর একঘেয়েমি জীবনটায় কিছুটা ছন্দ আনবার জন্য ও এক কাপড়ে  বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এক কাপড়ে বলতে যেদিন ওর যে ড্রেস পরা থাকে সেটি পরেই বেরিয়ে পড়ে। সে যদি হয় সালোয়ার কামিজ কিংবা শাড়ি। অর্থাৎ অরডিনারী যা পরা থাকে তাই পরেই ও বের হয়ে যায়। মুখে শুধু একটু খানি রুজ পাইডারের পাভ বুলায়, ঠোঁটে গোলাপী লিপিস্টিকের আভা! ব্যস, ও বাইরে যাবার জন্য প্রস্তুত। সামনে দু’ পা হাঁটলেই ত্রি রাস্তার মোড়। ওখানে সারাদিনই রিকসার আনাগোনা। যে কোন একটাতে চেপে বসে দ্রুত। তারপর একটু  মোড় ঘুরতেই রিকশার হুড তুলে দেয়। চলতে থাকে মুজিব সড়কের চৌম্বক আকর্ষণে। তবে যেদিন মেহেরুল্লাহ মঞ্চে  রাজনৈতিক অনুষ্ঠান থাকে সেদিন ও রিকশাওয়ালাকে ওখানেই বিদায় দেয়। ছলিম চাচার দোকানের কোনার বেঞ্চটিতে বসে চিনি ছাড়া কড়া লিকারের দুধ চায়ের অর্ডার দেয়। একটি দুটি তিনটি চারটি এবং কখনও সখনোও অগুনতি চলতেই থাকে। যতক্ষণ না দূরে মেহেরুল্লাহ মঞ্চের  প্রধান অতিথির ভাষণ শেষ হয়। বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, কেন্দ্রীয় নেতা, এই মফস্বল শহরে মেহেরুল্লাহ মঞ্চের নায়ক জনাব তাজুল আহমেদ। কখনো রাজনৈতিক, কখনো  সামাজিক, কখনো বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসাবে তিনি মঞ্চের শোভা বৃদ্ধি করেন। আর সাংবাদিকরাও তাদের ক্যামেরার রেজুলেশান বাড়িয়ে মঞ্চের মূল নায়ককে করে তোলে সত্যিকারের নায়কোচিত ব্যক্তিত্ব। মঞ্চের ফেসভ্যালু বাড়িয়ে তোলে বহুগুণ। ঐ দূর থেকে ক্যামেরার ফ্লাস হয়তো সে দেখতে পায় না, কিন্তু হৃদয়ের স্পন্দন তোলা ঝংকারের  গান সে শুনতে পায়। ওর এক সময়ের সহপাঠী, সহযোদ্ধা, আরো একটু বাড়িয়ে কি আরো কিছু বলা যায়? তার প্রয়োজন আজ বিদুরিত। ওর একেকটি বাক্য যেন অনন্ত কালের কবিতা। কণ্ঠের সেই আবেগীয় আকর্ষণ সেই নায়ক সুলভ অভিনয় প্রতিদিন তার সামান্য বক্তৃতাকেও অসামান্য করে তোলে। ও মোহবিষ্টের মত বসে থাকে সেই দিনগুলির মত।

ও ছিল ক্লাসের অঘোষিত ক্যাপ্টেন। তাহানদের ব্যাচে ছিল ত্রিশজন। আনতারা  তাহান ব্যাচের একমাত্র মেয়ে। ইকোমিক্স  ফাস্ট ইয়ার। সবে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গণ্ডিতে পা দিয়ে চড়াই উৎরাই। তাহানও কম যায় না। দুধে আলতা রং। পুরো পাঁচফিট সাত  । খাড়া চিবুক, লম্বা নাক, পাতলা ঠোঁট। রাজহংসীর মত গ্রীবা, চিনের ডানার মত ভ্রু। ভ্রমর কালো চোখ। চুলের কাটিং ইন্দ্রিরা স্টাইল। আর দূরাগত কোন ঝরণাধারার মত ছলাৎ ছলাৎ কণ্ঠস্বর। সব মিলিয়ে একটি আকর্ষিত ব্যক্তিত্ব। এত যে সুন্দরী, কিন্তু তার মধ্যে অহংকারের লেশমাত্র নেই। পারিবারিক ঐতিহ্য রয়েছে। বাবা নামকরা শহর কাঁপানো পুলিশ অফিসার। এ শহর ও শহর পায়ের তলায়। দেশভাগের পর বেশ কিছুদিন বিদেশেও থেকে এসেছে। তাই তাহানের মধ্যেও ভ্রমণের নেশা রয়েছে। সব মিলিয়ে এক চমৎকার কারিশমা রয়েছে তার।  বিশেষ করে বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, উনসত্তরের এগার দফা ও গণ আন্দোলন এবং সত্তরের নির্বাচনে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা সক্রিয় আন্দোলনের সরাসরি সম্পৃক্ততা তার একটি ইমেজ তৈরি করে  দিয়েছে। মাঝে মাঝে আর বাকি আঠাশ জন সংশয়ে পড়ে যায়। কে তাদের ক্যাপ্টেন? তাহান নাকি তাজুল? তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে না। তারা তাজুলকে যেমন ভালোবাসে তেমনি তাহানকেও সমীহ করে। কিন্তু দুজন দুজনতে পাত্তা দেয় না- এই ব্যাপারটা ওদের ভাবায়, কষ্ট দেয়। কিন্তু কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না। ওদেরকে কেউ ঘাটায় না। যার যেমন প্রয়োজন তেমনভাবে তাদেরকে ইউজ করে। আর দুজন! তারাও যেন একপায়ে খাড়া! সবাইকে সাহায্য সহযোগিতা আর ভাল মনোযোগী শ্রোতা হওয়ার প্রতিযোগিতায় কে কাকে পেছনে ফেলে? ভাল লাগে ওদের এই ব্যাপারটা।

এরই মধ্যে শুরু হল  একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। সত্তরের নির্বাচন-পূর্ব টালবাহানা তাজুলরা খুব ভাল মতোই পর্যবেক্ষণ করছিল। তারা জানতো, জেনারেল ইয়াহিয়া খান ওয়াদা মোতাবেক জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর বা পদ ছেড়ে দেবার কোন ইচ্ছাই  পোষণ করেন না। তারা বুঝতে পারছিল উনসত্তর সালে তার প্রশ্ন ছিল জনমনে আঘাত না হেনে কীভাবে মতলব হাসিল করা যায়। আইউব খানের পতন থেকে এ শিক্ষা তিনি নিয়েছেন। এবার তিনি ভেবে নিয়েছেন যে, শুরুতে স্বৈরতন্ত্রের রূপ জাহির করা যাবে না। সাধারণ নির্বাচন যতই অপ্রিয় হোক, তবু তা প্রয়োজনীয় কারণে হজম করতে হবে। নির্বাচন থেকে সরে আসার আর কোন রাস্তা নেই। কারণ জনগণ নির্বাচন অস্বীকৃতি কোন অবস্থাতেই মেনে নেবে না। শুধু তাই নয়, বিগত নির্বাচনগুলোর মত নির্বাচনী প্রহসনের পুনরাবৃত্তি জনগণ আর গ্রহণ করবে না। এ ব্যাপারে এটা মুখ্য হয়ে দাড়াল যে, জনগণের প্রতি ন্যায় বিচার করা হচ্ছে তা বোঝাতে হবে। কিন্তু সত্তরের স্বর্তস্ফুত নির্বাচনের ফলাফলে তারা নিজে নিজে অন্তঃক্ষিপ্ত হচ্ছিল। পাকিস্তানের জটিল রাজনৈতিক ঐ সংকট ছিল জেনারেল ইয়াহিয়া খানের তৈরি। ৩০০ জাতীয় পরিষদ আসনের নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেল আওয়ামীলীগ পেয়েছে ১৬০ টি এবং মহিলা সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত ১৩টি আসনের মধ্যে আওয়ামীলীগ ৭টি আসন পায়। ৩১৩ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় পরিষদের জনসংখ্যার ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার জন্য বরাদ্দকৃত সর্বসাকুল্যে ১৬৯ টি আসনের মধ্যে আওয়ামীলীগ এককভাবে লাভ করে ১৬৭টি আসন। নির্বাচনের ফলাফল বিভিন্ন জনের কাছে ভিন্ন অর্থে প্রকাশ পেল। আওয়ামী লীগের পতাকাতলে বাঙালিরা বিজয় উল্লাসে উদ্ভাসিত। তাজুল তাহানসহ তাদের কলেজে বিরাট আনন্দ ও বিজয় র‌্যালী বের হলো। র‌্যালী শেষে কলেজের উত্তর গেটের আমতলায় তারা সংক্ষিপ্ত একটি আলোচনা সভার আয়োজন করলো। এই প্রথমবারের মত তারা প্রকৃত ক্ষমতা লাভের আশা করছে। এ নির্বাচন থেকে তারা অতীতের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান এবং দু‘দশকের শোষণের প্রতিকারের সামর্থ্য অর্জন করেছে।  বিজয়র‌্যালী শেষে এই প্রথম তাজুল তাহান এক সাথে এক রাস্তায় বের হয়। তাদের মধ্যের সেই অসম প্রতিযোগিতা এক কেন্দ্রে মিলিত হয়।  তারা বুঝতে পারে এখন সময় মিলনের। বিভেদের নয়। হাতে হাত রেখে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের দশটি নির্দেশনামা সম্বলিত ভাষণে আন্দোলনের ব্যাপকতার একটি চিত্র ফুটে ওঠে। যখন আট মার্চ থেকে এ নির্দেশ পালিত হলো, তখন পশ্চিম পাকিস্তানে দারুণ ভীতির সঞ্চারিত হলো। তারপর কত নদীর জল কতদিকে গড়াল। পঁচিশ মার্চের সেই ভয়াল মাঝরাতের মধ্যেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সব দলই তাদের ভয়াবহ কাজে লেগে গেল। ট্যাঙ্ক, বাজুকা ও স্বয়ংক্রিয় রাইফেলসহ পিলখানায় পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলবাহিনীকে আক্রমণ করলো। একই সময়ে রাজারবাগ পুলিশের প্রধান কার্যালয়ও আক্রান্ত হল। উভয় স্থানেই অপ্রস্তুত প্রায় পাঁচ হাজার বাঙালি শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বটে, কিন্তু আধুনিক অস্ত্রের কাছে তারা ছিল অসহায়। তবে আগে থেকে প্রস্তুত থাকলে তাদের  প্রতিরোধ আরো জোরদার হতো। যা হোক এর পরিণাম ছিল সুস্পষ্ট। তাদের এ আকস্মিক আক্রমণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের আবাসগুলোতে নিহত শত শত ছাত্র ও শিক্ষক, শাঁখারি বাজার, তাঁতিবাজারে বসবাসরত হাজার হাজার নিহত মানুষদের কেউ প্রস্তুত ছিল না। বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায়ের মূল অংশ হিসেবে পরিচিত শত শত অধ্যাপক, চিকিৎসক, লেখককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে নিয়ে রাতারাতি চিরতরে শেষ করে দেয়া হলো। মূলত পূর্ববাংলা রেজিমেন্ট ও পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বাহিনীর মুষ্টিমেয় অফিসার ও জোয়ানদের বিস্ময়কর সাহস ও সংকল্পের দৃঢ়তা পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর লোকদের অভিযানকে প্রতিরোধ করেছে। প্রতিটি দেশের সাহসী মানুষ তাদের সালাম জানাবে। ফলতঃ পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হলো নিউক্লিয়ার অর্থাৎ গোপনে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি। তাজুল, তাহানরাও এর সক্রিয় সদস্য। তারা গোপনে গোপনে প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এক সময় শুরু হলো প্রকাশ্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। সব ছেলেদের মাঝে একটি মাত্র মেয়ে তাহান। সবার মধ্যমনি। সবার ভালোবাসার, আদরের। ঐ সময় মেয়েরা স্কুল কলেজে শাড়ি পরত। তাহান ব্যতিক্রম। সে শাড়ি পরে না। সে পছন্দ করে সালোয়ার কামিজ। সালোয়ার কামিজে হাঁটা চলা সহজ। মিছিল মিটিং এ তো কথাই নেই। আর প্রশিক্ষণ? প্রশিক্ষণের জন্য সালোয়ার কামিজের বিকল্প সালোয়ার কামিজ। যখন বন্ধুদের সাথে পায়ে পা মিলিয়ে তাহান মার্চপাস্ট করতো তখন আর তার নিজেকে তাহান মনে হতো না। ও নিজের অজান্তেই তাজুল হয়ে উঠতো। ওর ভাব ভাষা কোন কিছুতেই মেয়েলি সংস্কৃতি পাওয়া যেত না। এ ব্যাপারে বন্ধুরা যদি কখনও ওকে মজা করে কিছু বলতে চাইতো ও সঙ্গে সঙ্গে কটাক্ষ করতো-

তোমাদের চেয়ে আমারা কিসে কম? কেন সব সময় মেয়ে মেয়ে বলে প্যানর প্যানর কর? তোমরা যা পার, আমিও তা পারি। মিছিল, মিটিং, রাইফেল, গ্রেনেড, মর্টার, প্রেম! সব- সবকিছু। তাহলে? প্লিজ তোমরা তোমাদের কনসেপ্টটা পাল্টাও। এখন সময় শুধু পাল্টে যাবার, এখন সময় শুধু উতরানোর!

ওরাও ওকে আর ঘাটাতে চাইতো না। শুধু শান্ত মুখে বলে উঠতো

– আমরা তো ওপারে যাচ্ছি। তুমি?

ওপারে, মানে ট্রেনিং?

হ্যা, যাবে?

এক পায়ে খাঁড়া।

ছাড়বে তোমাকে বাসা থেকে?

না ছাড়লে পালিয়ে যাব।

থাকবা কোথায়? তোমার বাবা গুলি করবে।

কেন, তোমাদের সাথে। ক্যাম্পে।

বাঃ হাাসালে…

হাসির কি দেখলে ? আমি কি তোমাদেরকে জোকস বলেছি?

না তা নয়। তবে…

রাখো তোমাদের তবে। দেখবা সব হবে।

তারপর এক রাতে সবাই মিলে যখন রাতের অন্ধকারে ভারতের পথ ধরলো তখন তাহানও । ও থাকলো তাজুলের মায়ের সাথে। তাজুল গেল তার ফ্যামিলিসহ। ওপাশে তাদের আত্মীয় আছে। নানাবাড়ি। তাজুলের বাবা নেই । মা একাই তাদেরকে বড় করে তুলছেন। তাজুল ছেলেদের মধ্যে বড়। তার বড় একটি বোন এবং ছোট দুটি ভাই ও একটি বোন রয়েছে। সবাইকে নিয়েই তাজুলের এ যাত্রা। তাহান বায়না ধরেছিল তাজুলের মাকে।

আমিও যেতে চাই আপনাদের সাথে।

এমনিতে তাজুলের মা ছেলের সহপাঠিনী হিসেবে তাহানকে আদর করতো। কিন্তু তাহানের এই আবদারে তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো যেন। মেয়ে বলে কি? তিনি যাচ্ছেন পরিবারের সবাইকে নিয়ে তার দূর সম্পর্কের ভাইয়ের বাড়িতে। নিজের কোন ভাই বোন নেই। সেখানে আরো একজন পরিবার বহির্ভূত সেয়ানা, সুন্দরী,  শিক্ষিত মেয়ে। কি বলবে তাকে আত্মীয়রা!

-তোমার পরিবার?

আমি ম্যানেজ করব। কাল কখন রওনা খালাম্মা? আমি ভোররাতেই চলে আসব।

হন হন করে বেরিয়ে যায় তাহান। দ্বিতীয় কোন কথা বলবার সুযোগ পায় না তাজুলের আম্মা। অপেক্ষা করে ছেলের জন্য। কিন্তু সে রাতে তাজুল আর বাড়ি ফেরে না।

এখনও চোখ বন্ধ করলে তাহান দিব্য চোখে দেখে সেই সব দিন- রাতের কাহিনী। দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে  যখন বাংলাদেশে আসে তখন তারা বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নেয়। তারা পাশাপাশি থাকে। কাছাকাছি থাকে। এক রাতে তারা আরো কাছে আসে। কিন্তু তার আগে তার তিন বন্ধুর সহযোগিতায় কাজির শরণাপন্ন হয়। বিষয়টা খুব গোপন রাখে। কিন্তু এ সমস্ত গোপন খবর বেশিদিন গোপন থাকে না। চাউর হয়ে যায়। আবারো ছুটে যায় তাহান তাজুলের মায়ের কাছে। এবার অধিকার নিয়ে যায়। অধিকারের প্রশ্ন তার তিনটি শব্দে। সে নিরাপদ একটি পরিচয় এবং আশ্রয় চায়। কিন্তু সেদিন তাজুলের আম্মাও ছিল বড় বেশি ক্ষুব্ধ। এই মেয়েটির জন্যই তার সংসারে শত অশান্তি। এখনই কি তাজুলের বিয়ের বয়স হলো? ছোট ছোট ভাই বোন। তাদের পড়াশুনা- বিয়ে- দায়িত্ব সব তো তারই! তাহলে? যুদ্ধাত্তোর এই দেশে ছাত্র ছেলেটি কি করে চলবে? খেপে যায় তাজুলের আম্মা মরিয়াম বেগম। এবং এক পর্যায়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়।

-ত্রিসীমানায় দেখি না যেন! যুদ্ধ করবে যুদ্ধ? যার নিজের ক্ষমতা নেই নিজ পায়ে দাড়ানোর, তার আবার যুদ্ধ করার শখ? যুদ্ধ করবি তো মাঠে ময়দানে বনে জঙ্গলে যা। আমার বাড়িতে কেন? আমার বাড়িতে এক যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছো  তার কান্ডকারখানা! কেন, আমার বাড়িটি কি বাংলাদেশ? এখানে যুদ্ধের কোন প্রয়োজন নেই। আমার যুদ্ধ আমি একলাই সামাল দিতে পারবো। যেভাবে দিচ্ছি ঠিক সেভাবেই। এখানে কারো সাহায্য সহযোগিতা চাই না আমি। আমি শান্তি চাই। আমার ছেলের ত্রিসীমানায় আসবে না কোনদিন। যদি কোনদিন দেখেছি, কি শুনেছি, খবর আছে।

না, তাহান আর কিছু ভাবতে চায় না। বড় বেশি যন্ত্রণাঘন দিন ছিল সে সব। ওর স্মৃতি থেকে কতকিছু যে বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু ঐ দিনটার স্মৃতিটা কেন ঝাঁপসা হয় না। কেন মুছে যায় না মস্তিষ্কের নিউরণ থেকে। না, তাহান আর কিছু ভাবতে চায় না। মাথাটা ঝিম ঝিম করে।

আর তাজুল? ঔ তো সেদিন ওর থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছে। কি সান্ত্বনা ছিল তার? সে কি কোন যৌক্তিক সান্ত্বনা দিতে পেরেছিল?  

ওর ভাল লাগে জেলখানার সেই জমাটবদ্ধ দিনগুলির কথা স্মরণ রাখতে।  সেদিন ছিল ৩১ অক্টোবর। ও ধরা পড়ল গোপন আস্তানা থেকে। প্রস্তুতি নিচ্ছিলো একটি অপারেশনের। এরই মধ্যে ধুপধাপ আওয়াজে তার আস্তানায় রেইড করা হল। বেশ পরে জেনেছে, তাকে জেলে পাঠানোয় হাত ছিল কারো।

সেও ভুলতে চেয়েছিল তাজুলকে। কারণ তাজুলের কথা মনে হলেই তাজুলের মায়ের সীমাহীন অভদ্রতা তার চোখে ভাসে। আর চোখ আর্দ্র হয়ে আসে। সে ঝাঁপসা আলোয় তাজুলকে আর দেখতে পায় না। তার চেয়ে জেলের অন্ধকার কুঠুরী  খারাপ নয়। সেই আলোহীন অন্ধকার দিনগুলোতে ক্ষীণ আলো হয়ে দেখা দেয় শহর কাঁপানো পুলিশ অফিসার ফজল। তারজন্য সে ছিল এক পায়ে খাঁড়া। খবরের কাগজ থেকে শুরু করে বাইরের খাবার, অন্য এক খানদানী জীবনের হাতছানি তাহানকে কিছুটা হলেও ভুলিয়ে রাখে। তার বর্ণাঢ্য শৈশবের কথা মনে পড়ে। সে নতুন স্বপ্নের জাল বুনতে থাকে। মাঝে মাঝে ভাবে, সে কি ভুল ভাবছে, ভুল করছে?

আবার ভাবে না, ঠিকই আছে। তাজুল কি পারবে ওর মাকে কোনদিন ম্যানেজ করতে? ও পারবে না। উনার যে ব্যক্তিত্ব! তাহান নিজেও পারবে না। তাছাড়া ওর অনেকগুলো ভাইবোন, বাবাহীন অসচ্ছ্বল সংসার। সংসারের ঘানি। তাজুল তাকে কোন কথা দেয় নি। কোথায় কখন যেন জড়িয়ে যায় ফজলের সাথে। নাকি সে তাজুলকে কিছুটা শিক্ষা দিতে চেয়েছিল? না কি, তা ছিল অভিনয়! তাজুলকে ফিরিয়ে আনবার অভিনয়! ভেবেছিল, তাজুল বুঝতে পারবে। ও ফিরে আসবে। তাই কিছুটা হালকা জালে জড়াতে চাইছিল তাহান। কিন্তু কে জানতো হালকা জালই ওকে শক্ত গেঁরোয় আটকে দেবে? ওদিকে তাজুলও ঐ সময়টা জেলে ছিল। তাহান জানত না সে সব। ও প্রতিদিন অপেক্ষা করত তাজুলের। ও দিকে তাহানের ব্যাপারে তাজুলকেও ভুল বোঝানো হচ্ছিল পরিবার থেকে। তারা চাইছিল, যে কোন মূল্যে পরিবারের সুনাম  অক্ষুন্ন থাক। এবং সেই মাত্র তিনটি শব্দে তাদেরকে ফিরিয়ে দিক আগের অবস্থানে।

যেহেতু তাজুলও তখন জেলে ছিল । তাই তাহান এবং পুলিশ অফিসার ফজলের  বিষয়টি ছিল তাজুলের গোচরে। প্রতিদিনই নিত্য নতুন রংয়ে তার কাছে উপস্থাপিত হতো সে বিষয়টি।  যেটি ছিল তার জন্য অপমানের,শ্লাঘার! তাজুল বিষয়টি কিভাবে নিয়েছিল তাহান তা জানে না। শুধু ভাবতো পুলিশ অফিসার ফজলের মত তাজুল নয়। নাকি সে নিজেই কিছুটা লোভী হয়ে গিয়েছিল তখন…।

হ্যান্ডসাম স্মার্ট আবুল ফজল মুখোশের আড়ালে লুকাতে পেরেছিল অনেক কিছুই। সে সব তাহান আর ভাবতে চায় না। কিন্তু সে ভাবতে না চাইলেও ভাবনা তাকে তো ছাড়ে না। বেশ পরে জেনেছিল, দু’দুটি জমজ ছেলে, ফিকে হয়ে যাওয়া সুন্দরী স্ত্রী, সবই ছিল তার! সে সম্পর্কও গড়ায়নি বেশিদিন। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তাহান আপোস করেনি কারো সাথে। যুদ্ধ তাকে যুদ্ধ শিখিয়েছে। কিন্তু তাকে সার্টিফিকেট নিতে শেখায় নি। তারপর রাতের ল’ ক্লাস এবং বর্তমানের নামকরা এ্যাডভোকেট তাহান এ শহরের এক নামে চেনা। কিন্তু এত বছর এত যুগ পর এসে এক নতুন ভাবনা এলোমেলো করে দেয়। এ্যাডভোকেসির প্রথম সময়টি তার জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। সেখানেও ছিল অনেক ঘাত, প্রতিঘাত, আঘাত এবং জঞ্জালমাখা সময়। সেখানেও কি ও নতুন করে পুরনো ভুল করে। নাকি সারা জীবনের ভুলগুলো শুধরে নিতে  চেয়েছিল ও। তারপর? তারপর আবারো সেই একই আয়নাবাজী। একের ভেতরে অন্যজনের জীবন। এক সময় সে সিদ্ধান্ত নেয়…এক- দুই- তিন! আর নয়।

এবার তুমি নিজের পথে চলো।

বন্ধু বেলা অনেক হলো।

 জীবনের প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে, নাকি বসে- তাহান ভাবে অবশেষে, আহা! একাত্তর তাকে কি দিতে পেরেছে? কি কেড়ে নিয়েছে? সে হিসাব মেলে না এখন! ন’ মাসের সশ্রস্ত্র যুদ্ধেকালীন সময় সে মাঠ ছাড়েনি। একের পর এক  গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। আর ভেতরে? ভেতরের যুদ্ধ ছিল ক্ষয়িষ্ণু। সে ক্ষয়ে যাচ্ছিল ভেতরে ভেতরে। সকলের যুদ্ধ এক সময় শেষ হলো কিন্তু তাহানের? তার যুদ্ধ কি থেমেছে আজ অবধি? এ শহর তাকে কি দিতে পেরেছে? তাকে কি তাজুলের মত সম্মান এবং প্রতিপত্তি দিয়েছে? দিয়েছে তার মত ন্যায্য অধিকার? তারও তো ওখানে বসে মাঠ  কাঁপানো বক্তব্য দেবার কথা ছিল! তারও ছিল বর্ণাঢ্য একটি পরিবার, ছিল ইতিহাস।  অথচ কেন  আজ এমন হলো? নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। একমাত্র ছেলের নিরাপত্তা নেই। অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনায় বেড়ে ওঠা ছেলেটির জীবন আজ হুমকির মুখে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য জন্য সরকার সব রকম সুবিধা দিচ্ছে। প্লট, ফ্লাট, মাসিক ভাতা, উৎসব ভাতাসহ আরো কত কিছু। সেও তো যুদ্ধাহত। হয়ত  তার ক্ষত বাইরে নয়, ভেতরে! সেই সার্টিফিকেট সে কিভাবে নেবে? সেও তো বিধ্বস্ত, সেও তো লাঞ্ছিত, সেও তো প্রতারিত। তবে তার ক্ষতগুলো ভিন্ন। এ গুলো অন্তর্গত, বহে অবিরত।  যায় না দেখা, দেখা যায় না তারে…। তাহানের চোখ যায় ঘড়িতে। রাত অনেক হলো!

-ছলিম চাচা!

-হ মা, অত কি ভাবনা তোমার। যাও, বাড়িত যাও। রাত যে ম্যালা, রাস্তা ফাঁকা।

হু, যাই। তাহান তড়িঘড়ি করে। সামনে তাকায়…শুধুই অন্ধকার। দূর থেকে কি এক আলো ভেসে আসে…

Author: ড. শাহনাজ পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment