তুলসী বিড়া

ছোট বেলায় এই তুলসী পাতা খেয়ে গাল লাল করতাম।

কাকীমার অলক্ষে পেয়ারা চুরি করতাম, কখনও বা বকুনি খেয়ে ছুটে পালাতাম। আজ কাকীমারা সপরিবারে ভারত চলে যাচ্ছে পেছনে রেখে যাচ্ছে শূন্য মাটির ঘর আর মৃত্প্রায় তুলসি গাছটি। সকালে কাকীর গভীর কান্নায় ঘুম ভাঙ্গলো, আর কাকার যে গানটি কদিন ধরে অশ্রু সজল চোখে ধ্বনিত হচ্ছিল তা এরকম,

‘ নিরুদ্দেশের যাত্রী আমি রে, ও মা নাও ভাসালাম অবেলায়, কি যেন কি ভাগ্যের লিখন রে, ওমা প্রাণ খুলে আশীষ দিও, দেশের মাটি শেষের প্রণাম নিও’

জানি না দেশের মাটি কাকার শেষের প্রণাম নিয়েছে কিনা । তবে কাকা আজ নিরুদ্দেশের যাত্রী হয়ে জন্মভুমির মায়া ত্যাগ করে চির বিরহী হয়ে ঘর ছাড়লেন।  খানিকটা ছাড়তে বাধ্য হলেন।

ছোট বেলাকার খেলার সাথী নিতাই, মাধব, গোবিন্দ, রিপন, উত্তম, মিঠু একে একে সবাই চলে গেল।  শুধু জন্মভুমির মায়াটান আর অনুকুল পরিবেশের কারণে আমি পড়ে আছি।  হয়ত একদিন আমাকেও ছাড়তে হবে।  অথবা ছাড়তে বাধ্য করা হবে জন্মভুমি মায়ের শাশ্বত কোল।

উৎসবে, পার্বনে, জন্ম, মৃত্যুতে পরস্পর পরস্পরের সমব্যথী হয়েছি,  সহযোগী হয়েছি একসাথে উদযাপন করেছি সব আচার অনুষ্ঠান মহাসমারোহে, আজ হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের সেই অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সেই সহাবস্থান।

কিন্তুু এর পিছনে কারণ কি?

গতকাল দেখলাম কাহার পাড়ার এক যুবতী মেয়েকে ভ্যানে করে তার মা তীব্র আর্তনাদ করছে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য। ঘটনা বুঝতে চেষ্টা করে যা জানলাম, প্রতিবেশী এক মুসলিম যুবক লাউ চুরির অভযোগ করে বেধড়ক পিটিয়েছে।  আরও গভীরে যান, বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ডে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত  ছেলে বুড়ো নির্বিশেষে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে।  যেখানে একবেলা জাল দড়ি নিয়ে কর্মে না গেলে বাড়ির লোকের উপবাস করতে হয়। কারণে অকারণে বাক স্বাধীনতা হরণ, অকথ্য গালিগালাজ শারীরিক নির্যাতন, ইভটিজিং ইত্যাদি কারণে তারা আজ জন্মভুমির মায়া ত্যাগে বাধ্য হচ্ছে।

এক্ষেত্রে ধর্মীয় নীতি নির্ধারকগণ একটি বড় ভুমিকা রাখছেন। যেমন তাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে বাধা প্রদান ( ঢাক, শঙ্খ, উলুধ্বনি)। পাড়ায় পাড়ায় মাহফিলে তাদের ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দেওয়া, ব্যঙ্গ্, বিদ্রুপ,তুচ্ছ, তাচ্ছিল্যের ভাষায় বয়ান করা ও নীরবে ধর্মান্তর করার চেষ্টা করা।

স্বাধীনতার পর অনেক হিন্দু জন্মভুমির মায়ায় ফিরে আসলেও এখনও তাদের উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগ, প্রতিমা ভাঙ্গচুর, বাড়ি ঘর ধুলিস্মাৎ করে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করা হচ্ছে। আজ দেশে ৭-৮% হিন্দু অবশিষ্ট আছে।  এই ধারা অব্যাহত থাকলে অচিরেই এদেশ হিন্দু শূন্য হবে  । তখন এদেশের শিশুদের হিন্দু শব্দটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে জাদুঘরের দ্বারস্থ হতে হবে।

কতিপয় উগ্রপন্থীর গোড়া মৌলবাদী আচারণের কারণে আজ হিন্দু বিতাড়নের সুর উঠেছে । নাস্তিকরা থাকতে পারবে না । এরপর হয়ত বলবে মুক্তিযোদ্ধারা থাকতে পারবে না, আউল বাউল থাকতে পারবে না।  একসময় হয়ত বলবে গোড়া, ওহাবী, নজদী এবং খাটি জংগীবাদ মন্ত্রে দিক্ষীত না হলে তারা এদেশে থাকতে পারবে না। তাহলে থাকবে কারা? আফগান বা পাকিস্তানের আদলে জন্ম নেওয়া কিছু বিকৃত মস্তিষ্কের হিংস্র কসাই!

সেদিন হয়তো শোনা যাবে না বারো মাসের তের পার্বনের উৎসবধ্বনি, মৃত্যু হবে অসাম্প্রদায়িক চেতনার। লালন, হাসনের দেশ হবে বাউল বিতাড়িত এক বধ্যভূমি।

পথের ধুলায় মিশে যাবে তুলসী বিড়াটি।

Author: শিপন সোহাগ​

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment