দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা… শুধিতে হইবে ঋণ

ফরাসী বিপ্লব নাটকীয়ভাবেই খুব দ্রুততার সাথে ফ্রান্সের রাজনৈতিক কাঠামো বদলে দিল।নেপোলিয়ানের দিগ্বিজয় একই

রকম গতিময়তায় বিস্ময়করভাবে বিস্তৃতি ঘটালো বিপ্লবী চিন্তা চেতনার।সারা ইউরোপ আপ্লুত হ’ল্।অষ্টাদশ  শতাব্দির

শেষ এবং উনবিংশ শথাব্দির শুরুতে  ঝড়ের বেগে  শিল্পবিপ্লব  এসে নাটকীযভাবে গোটা ইউরোপের অর্থনৈতিক ও

সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন ঘটালো।শিল্পবিপ্লবের সেই জোয়ারে কলকারখানার উৎপাদনে ব্যাপক গতি  সঞ্চারিত হ’ল।

নতুন জ্বালানি এবং ইন্ধন এলো।কয়লা এবং বাষ্পচালিত যন্ত্র উৎপাদনব্যবস্থাকে প্রযুক্তিমুখী করে তুললো।শ্রমজীবী মানুষকে

তখন প্রতিযোগিতায় নামতে হ’ল  ক্লান্তিহীন যন্ত্রের সাথে।শ্রমের মজুরি বাড়লো না ।কিন্তু কাজের সময় প্রলম্বিত হ’ল।

পুঁজি বাড়লো, মুনাফ বাড়লো, শ্রমিকের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হ’ল না।বিশ্রাম ও ছুটি ছিল নিষিদ্ধ শব্দ। যা উচ্চারণ

করাও ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ।প্রসবের আগের মুহূর্তেও  প্রসূতি নারী শ্রমিককে গতর খাটাতে হয়েছে।

ইংলান্ড,আমেরিকা জার্মানী সর্বত্র একই অবস্থা।সমাজ সংস্কারকরা প্রতিবাদী হলেন । শ্রমিকরা সচেতন হ’ল।বাঁচার মতো মজুরি,

কলকারখানায় স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নারী শ্রমিকের প্রসবকালীন সবেতন ছুটি এবং সবার জন্যে  সাপ্তাহিক ছুটিসহ দিনে

আট ঘন্টা কাজের সময় বেধে দেয়ার দাবিতে শ্রমিকরা  সংগঠিত হতে শুরু করলো। সংগ্রাম শুরু হ’ল। শ্রমিকরা রক্ত ঝরালো। প্রাণ দিলো ।বিজয় ছিনিয়ে আনলো। সে সংগ্রাম, ত্যাগ ও বিজয়ের অম্লান স্মৃতিকে ধারণ করে আছে আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস যা সচরাচর মে দিবস নামে অভিহিত, প্রতিবছর ১ মে তারিখে বিশ্বব্যাপী  পালিত হয়। এটি

আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের উদযাপন দিবস।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষ  এবং শ্রমিক সংগঠনসমূহ রাজপথে  সংগঠিতভাবে মিছিল  ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে।বিশ্বের প্রায় ৮০ টি দেশে ১মে জাতীয় ছুটির দিন।আরও

অনেক দেশে দিবসটি বেসরকারীভাবে পালিত হয়। বিশ্বময়  দেশে দেশে  আকাশ বাতাস  ভূতল  প্রকম্পিত করে কোটি কন্ঠে উচ্চারিত হয় মর্মভেদী সেই মোহনীয় আওয়াজ,“দুনিয়ার মজদুর এক হও”। এই স্লোগানে যাদু আছে।এ যেন সেই হেমিলনের বাঁশি যা শুনে সর্বহারা মেহনতি মানুষ  মন্ত্রমুগ্ধের মত ছুটে যেয়ে হে মার্কেটের শহীদ মজদুরের রক্তে রঞ্জিত লাল পতাকার তলে জমায়েত হয়।এই সেই মুক্তিবাণী যা মজলুম  মানুষের  বুকে লড়াই করে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়। খেটে খাওয়া মানুষকে

যুদ্ধ করে বাঁচতে শেখায়।সংগ্রামের শপথে প্রদীপ্ত করে।মেহনতি মানুষকে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে শিখিয়েছেন কার্লমার্কস, লেনিন, হোচি মিন, ফিদেল ক্যাস্ট্রো।নিরস্ত্র শ্রমজীবী কর্মজীবী মানুষের লড়াই সংগ্রামের হাতিয়ার তাদের বিশ্বজনিন ঐক্য ও সংহতি। মে দিবস সেই  ঐক্যের বাণী বহন করছে শতবর্ষব্যাপী।বিদ্রোহী কবি  কাজী নজরুল ইসলাম শোষিত বঞ্চিত মেহনতি মানুষের মর্মবেদনাকে বাঙময় করেছেন অতি সরল বাক্যে।মার্ক্সের কঠিন পুঁজি শোষণ তত্ত্বকে প্রাঞ্জল,  বোধগম্য

করেছেন খুবই সহজ ভাষায়,-“কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল?”। কবি বলেছেন , “আসিতেছে শুভদিন,

দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে রীণ ।” সারা দুনিয়ার  দু:খি মানুষ ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছে সেই শুভদিনের  প্রত্যাশায়।

শামসুল আরেফিন খান

 

Author: শামসুল আরেফিন খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts