দুর্ভাগ্য রজনী  ও বীরের মৃত্যু

পনের আগস্ট রাতের ভয়াবহতা, বিভীষিকা ও রহস্যময়তা নিয়ে  নতুন করে আষাঢ়ে গল্প ফেঁদে একটি স্বার্থান্বেষী মহল আবারো  পানি ঘোলা করার প্রয়াস পাচ্ছে।কাদা পানিতে  মাছ ধরার সেই অসাধু খেলাই  হবে হয়ত। এমনটি ভাবার সঙ্গত কিছু কারণ ঘটেছে সম্প্রতি।

কিন্তু কুশিলব  কারা ?সেকথা জনা হয়নি  এখনও ।

তারা বলছে সে রাতে ক্ষমতা দখলের জন্যে দুটো সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছিল।প্রথম অভ্যুত্থান হয়েছিল ভারত-সোভিয়েত  সমর্থিত একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর  নেতৃত্বে।তারা বামপন্থী ।তারা শহর ঘিরে ফেলেছিল।বড় সেনাবাহিনী ছিল তাদের হাতে।“সেই অভ্যুত্থানেই বঙ্গবন্ধু শহীদ হন।”

তারা আঙুল তুলছে শেখ ফজলুল হক  মনি  ও আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের দিকে।নেপথ্যে ছিলেন নাকি তাজউদ্দীন, আবদুস সামাদ আজাদ, কোরবান আলী , সোহরাব হোসেন, শামসুল হক প্রমুখ। “রা্ত সাড়ে তিনটের সময় রব সেরনিয়াবত ও ফজলুলহক মনি প্রতিপক্ষে র  হাতে নিয়ত হন”। সেই বামপন্থী অভ্যুত্থান ঠেকাতেই ফারুক রশিদ গং  পথে নেমে এসেছিল  

মধ্যরাতে। মিশরের আনোয়ার সাদাতের  অনুদানে পাওয়া ২য় মহাযুদ্ধ আমলের ৩০ খানা ট্যাঙ্ক নিয়ে ।“দু পক্ষে লড়াই হয়েছিল”। প্রমাণ হিসেবে তারা “বিক্ষিপ্ত গোলায় মেহাম্মদপুর এলাকায় ৪৫ বেসামরিক নাগরিকের ” মৃত্যুর কখা বলছে।

এ আর নতুন কথা কী ? বামপন্থীদের ঠেঙ্গাতেই তো কঙ্গো, ইন্দোনেশিয়া এবং চিলিতে সেনা অভ্যুত্থান ঘটানো “জরুরি হযে পড়েছিল্”।তবে কোথাও পরিবার নির্মূল করা হয়নি ।

১৫ আগস্ট এখন ইতিহাসের সম্পদ। তা নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ নেই তা বলবো না।

তবে  মিথ্যা দিয়ে সত্যকে ঢাকার কোন সুযোগ নেই। সারাজীবনের  শত্রুরা  রাতারাতি বন্ধু হয়ে গেলো। আর আত্মার  আত্মীয় যারা, সারা জীবনের বন্ধু যারা, তারা সব শত্রু হয়ে গেলো,  এমন গাঁজাখুরি গল্প পাগল ছাড়া কেউ বিশ্বাস করবে না।তাছাড়া, বঙ্গবন্ধুর  জীবনাবসান হয়েছিল  ভোরের  আলো ফোটার পর। বেগম মুজিব জেগে গিয়েছিলেন।দুজন কাজের লোক উঠে পড়েছিল। এসব সত্য ঢাকার কোন সুযোগ নেই।

একথাও সুনির্দিষ্ট ভাবে জানা গেছে যে, আব্দুর রব সেরনিয়াবত ও শেখ ফজলুল হক মনির নিহত হওয়ার কথা জানতে পেরেই বঙ্গবন্ধু জেনারেল শফিউল্লাহকে ফোন করেছিলেন, ফোর্স পাঠাতে বলেছিলেন। কর্ণেল জামিল ছুটে এসে মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।   

ঘাতকদের বিরুদ্ধে  কেউ প্রতিরোধ গড়ে থাকলে  সেটাওতো আনন্দের কথা। আর সেই প্রতিরোধে যদি সাধারণ মানুষ অংশ নিয়ে প্রাণ দিয়ে থাকে তাহলে সেটাও গর্বের কথা।

আমরা সাধারণ মানুষ।আমাদের জানার অধিকার  আছে, জাতির জনক কেন জীবনের নিরাপত্তা পেলেন না? কেন সাভার থেকে  নবম ডিভিশন ছুটে এলোনা? কেন রক্ষীবাহিনী  ঝাঁপিয়ে  পড়লো না? কেন সেনা প্রধান,বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনী প্রধান প্রেসিডেন্ট মুজিবকে রক্ষার জন্য কর্ণেল জামিলের মত ছুটে না এসে সকাল সাতটা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকলেন? কেন ডেপুটি চীফ অব স্টাফ জেনারেল জিয়াউর রহমান গুরুতর দুঃসংবাদ বহনকারী দূত শাফায়েত জামিলকে  বললেন, “প্রেসিডেন্ট ইজ ডেড, সো হোয়াট? ভাইস প্রেডিন্ট ইজ দেয়ার! যেমন,“কিং ইজ ডেড।লংলিভ দ্য কিং”!

এমন উক্তি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের জন্য শ্লাঘ্য।কিন্তু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রাণপুরুষের জন্য অবমাননাকর। শ্লেষাত্মক। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারির জন্য খুবই ঔদ্ধত্বপূর্ণ! এসব নিয়ে বার বার প্রশ্ন করার অধিকার আছে সাধারণ  মানুষের। জানার অধিকার আছে সত্য কী ? কারা ছিনিয়ে নিলো বাঙালি জাতির প্রাণভোমরাকে?

কেন? কেন?

বলাবাহুল্য, একাত্তর কি তারও আগে থেকে বাম ডানের টানাপোড়েন ছিল

দলের ভিতর।বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সেটা প্রবল হয়েছিল।২৫ মার্চ রাতে

গণহত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের পর্ব শুরু। গোড়াতেই ট্রোজান যুদ্ধের সেই কাঠের ঘোড়ার আবির্ভাব।সোয়াত নাটক অসমাপ্ত রেখে ৪হাজার বাঙালি সৈন্যকে নিয়ে হ্যামিলনের বংশীবাদকের নদী পার হওয়া, মাত্র ৬০০ পাকি দানবের হাতে বিডিআর পুলিশের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেয়ার ভার ছেড়ে দেয়া এবং সেই প্রেক্ষায়  শীর্ষনেতা হওয়ার জন্য খন্দকার মোশতাকের উঠে পড়ে লাগার ঘটনা খুবই সাযুয্যময় ও পরম্পরা পূর্ণ।

আমি  ত্রিপুরার বকশনগর সীমান্ত হয়ে সপরিবার আগরতলা পৌঁছালাম সম্ভবতঃ ১৮-২০ এপ্রিলের মধ্যে, শ্রদ্ধাভাজন এমএনএ শামসুজ্জোহা ও মোস্তফা সারোয়ারের পরিবার পরিজন এবং ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলামের  পত্নীর সাথে একই যাত্রায়।

একদিন বিশ্রামের পর  আমি স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে আসামের করিমগঞ্জের উদ্দেশে ধর্মনগরের পথে যাত্রা করলাম।

আমাদের বাসে তুলে দিতে এসে নারায়নগঞ্জের এমপিএ খাজা সাহেব বললেন, “আমরা ১০ জুলাই ঢাকায় ফিরে যাচ্ছি“।সে সময়টাতেই তুরুপের তাস নিয়ে আগরতলায় এম-এন-এ ,এমপিএ জড়ো করেছিলেন খন্দকার সাহেব নিজের উচ্চাভিলাষ পূরণের জন্যে। তার পাশে ছিলেন চোদ্দগ্রামের জহীরুল কাইয়ুম, তাহের ঠাকুর, ওবায়দুর রহমানসহ সমদর্শী আরও অনেকে।পক্ষান্তরে আওয়ামি লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ দিল্লী গেলেন সমমনাদের নিয়ে। তাঁদের  উপস্থিত বুদ্ধি এবং প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে প্রবাসী সরকার স্বৗকৃতি পেলো।মধ্য একাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে জেলে রেখে পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন করার জন্যে খন্দকার মোশতাক কতটা পাগল ও বেপরোয়া হয়েছিলেন সেকথা প্রেসিডেন্ট নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তা

উপদেষ্টা  হেনরি  কিসিঞ্জার   তার “হোয়াইট হাউজ ডেইজ” বইতে বিস্তারিত লিখেছেন।সে সময় ফজলুল হক মনি সমস্ত শক্তি দিয়ে সেই ষড়যন্ত্র ঠেকিয়েছিলেন । সেকথা কে না জানে?

সৈয়দ নজরুল, তািউদ্দীন , আব্দুস সামাদ আজাদ একজোট হয়ে  মোশতা্ককে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে না দিলে কী কী হতে পারতো?

১.যুদ্ধ বিরতি হলে বাংলাদেশ খন্ডিত হয়ে ২য় কাশ্মীরে পরিণত হ’ত।

২.একাংশে “আজাদ  কাশ্মীরের মত পাকিস্তিানের ক্ষুদ্র অস্তিত্ব যুগ যুগ ধরে বাঙালির স্বাধীনতাকে বিদ্রুপ করতো।অস্তিত্ব বজায় খাকতো।

৩.চরম দুর্দশায় মুক্তিযোদ্ধারা ডান বামে খন্ডিত হয়ে সন্ত্রাসীতে পরিণত হ’ত।

৪.জাতির জনকের বন্দীদশা প্রলম্বিত হ’ত।    

পাকিস্তানের  পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী  ভূট্টো আর বাঙালি নামের কলঙ্ক কুষ্টিয়ার কুলাঙ্গার শাহ আজিজুর রহমান হাত ধুয়ে বসেছিল মোশতাকের পথ চেয়ে। নিরাপত্তা পরিষদে খন্দকার  মোশতাকের স্থলে বাংলাদেশের  পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে সামাদ আজাদকে দেখে তারা ভিমরি খেয়েছিল।যুদ্ধ বিরতির স্বপ্ন ব্যর্থ হ’ল দেখে বুক চাপড়ানো ছাড়া কীইবা আর করার ছিল? এরই মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সরদার শরণ শিং মঞ্চে প্রবেশ করলেন।পৃথিবীকে জানালেন,  পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছে ।সেদিন ১৬ ডিসেম্বর ৭১।জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রথমে তার টাক মাথার চুল ছিঁড়লো। তারপর পাগলের মত হাতের নথিপত্র টুকরো টুকরো করে ছুঁড়ে ফেললো। দেশদ্রোহী শাহ আজিজুর রহমান লেজ নাড়তে  নাড়তে ভুট্টোর  পিছু পিছু বেরিয়ে গেলো  নিরাপত্তা পরিষদের সভাকক্ষের বাইরে।

সেই শাহ আজিজুর রহমানকেই  বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার পর  জবরদস্তি ক্ষমতায় জুড়ে বসা সেনাপতি জিয়াউর রহমান।

১৬ ডিসেম্বর ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই আমি সিলেট শহরে প্রবেশ করেছিলাম একটা সামরিক জীপে দাড়িয়ে।আমার হাতে ছিল মেগাফোন।পাশে  দাঁড়িয়ে ছিলেন মিত্র বাহিনীর একজন কর্ণেল।সিলেট শহরে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল আত্ম সমর্পণকারী পাকিস্তানী সৈন্যরা।তাদের নিরাপত্তা দিয়ে কেন্দ্রীয় যুদ্ধবন্দী শিবিরে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছিল যৌথ বাহিনীর সদস্যদের।সার্বিক জন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেলা ১টা পর্যন্ত কারফ্যু ঘোষণাও ছিল আমাদের কাজের তালিকায়।শহরে ঢোকার পথে মেজর জিয়াকে দেখতে পেলাম সার্কিট হাউজে।সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ, ২৭ নভেম্বর দেখা হয়েছিল আটগ্রাম মুক্তাঞ্চলে।

মজার ব্যাপার হ’ল যে, বিজয় দিবসে জেড ফোর্সের অধিনায়ক জিয়া

একাকী সিলেট সার্কিট হাউজের দেয়ালে হেলান দিয়ে রোদ পোহাচ্ছিলেন।পরণে ছিল খাকি হাফ প্যান্ট, গায়ে সাদা গেঞ্জি, মাথায় ফেল্ট, পায়ে কেটস।বড়ই নির্লিপ্ত  ও নির্বিকার চেহারা।আমি সালাম দিতে ভুলিনি।পরবর্তী দৃশ্যপটে জেনারেল ওসমানি , জিয়াউর রহমান ও দেওয়ান ফরিদ গাজী ১-৩ জানুয়ারি ‘৭২  সিলেটে বার বার বৈঠক করেন।গাজী সাহেবের পারিবারিক এ্যালবামে সেই সব গোপন বৈঠকের  কিছু ছবি ছিল। সেগুলি আমি দেখেছি।

আমি ৩১ ডিসেম্বর সকালে ভাঙাচুরা দুর্গম পথে একটা জীপে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হই।সেক্টর কমান্ডার মেজর সি আর দত্তের সাথে পথে দেখা হয়।

পরবর্তীকালে জিয়া আবির্ভুত হন প্রধান সামরিক প্রশাসক রূপে ও জেনারেল ওসমানী তার সামরিক উপদেষ্টা। ফরিদ গাজী মোশতাকের  উপ- মন্ত্রী।১৯৭২ সালের প্রথম দিকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ চৌধুরী এবং খন্দকার মুশতাক রংপুরের হারাগাছে গোপন বৈঠক করেন।সেদিন খুব সকালে খন্দকার মোশতাক রংপুর রেস্টহাউজে আমার কক্ষে দরজায় নক করলেন। আমি দরজা  খুলে চমকে উঠলাম। হাতকাটা গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরণে  পানি সম্পদ মন্ত্রী! সালামদিলাম। মন্ত্রী মহোদয় বললেন, একটা ব্লেড হবে? আমি বললাম, জী দিচ্ছি, স্যার, ভিতরে আসুন।

রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরি চুপি চুপি এলেন বেলা ১২টায়।এমএনএ

রহিম ভরসা তাঁকে নিয়ে গেলেন নিজ এলাকা হারাগাছে।সাথে গেলেন আমার  বস পূর্ত মন্ত্রী মতিউর রহমান ও স্থানীয এমএনএ আজিজুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুহত্যার পর বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী জবরদস্তি ক্ষমতায় জুড়ে

বসা প্রেসিডেন্ট  খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রীসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন।এসব

সংযোগই  ইতিহাসের উপাত্ত উপকরণ।জোড়া দিলে একটা আস্ত ভাঙা আয়না।

এখন এতদিন পর উদোর পিন্ডি বুদোর ঘড়ে চাপাবার প্রচেষ্টা কেন? তার

উত্তরটাও খুব সহজ ।

১. ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করেনা।২. খুনের মামলা তামাদি হয়না।৩.খুনি

রেহাই পায়না।৪. অপরাধীকে কবর থেকে তুলে  ফাঁসিতে ঝুলাবার দৃষ্টান্ত

রয়েছে ইতিহাসে।বৃটিশ স্বৈরাচার ক্রমওয়েল মরেও নিষ্কৃতি পায়নি।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ঘটোছল ছিল স্নায়ুযুদ্ধের উত্যুঙ্গ সময়ে।

কোল্ড ওয়ার চলাকালে সংঘটিত শীর্ষ রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের তালিকায়

চোখ বুলালে আমি যা বলতে চাই সেটা আরও প্রাঞ্জল হবে।

১.শ্রীলঙ্কার জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী সমাজবাদী নেতা জয়বর্ধন,২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৫৯,সাপ্তাহিক সাক্ষাৎকারের দিনে দর্শনার্থী একজন বৌদ্ধভিক্ষুর পিস্তলের গুলিতে নিহত হলেন।২.কালো  আফ্রিকার  উদয়ের কবি কঙ্গোর  মুক্তিদাতা, প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বা সেনা প্রধান জোসেফ মবুতুর হাতে নৃশংসভাবে খুন হলেন।স্মরণযোগ্য যে.বেলজিয়ামের ঔপনিবেশিক শাসনামলে কঙ্গোর ইউরোনিয়াম লুঠ করেই  হিরোশিমা নাগাসাকি ধ্বংসের হাতিয়ার এটম বোমা তৈরী করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

হিটলারের নাৎসী জার্মানী থেকে বিতাড়িত আইনস্টাইনসহ ২০০বৈজ্ঞানিককে একটি গবেষণাগারে আটকে রেখে মানববিধ্বংসী বোমা উদ্ভাবন করা হয়েছিল।

এডলফ হিটলার বলেছিলেন,“ কিছু  সংখ্যক ইহুদিকে আমি ছেড়ে দিলাম।

পৃথিবী বুঝুক, কেন আমি বাদবাকিদের বাঁচতে দিলাম না”।৪. যুক্তরাষ্ট্রের

আস্থাভাজন জেনারেল সুহার্তো এক রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ,

১২ মার্চ ১৯৬৭, ইন্দোনেশিয়ার  মুক্তিদাতা সর্বমান্য নেতা প্রেসিডেন্ট

সুয়োকার্ণোকে ক্ষমতাচ্যূত করে অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করায় অচিরেই তাঁর জীবনাবসান হয়।৫. এর পরের ঘটনাস্থল দক্ষিণ আমেরিকার চিলি।সেনাপ্রধান জেনারেল পিনোশে ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ চিলির নির্বাচিত মার্কসবাদী প্রেসিডেন্ট ডা. সালভাদার  আলেন্দেকে  তাঁর সরকারি বাসভবনে বিমান হামলা চালিয়ে খুন করে ক্ষমতা দখল করে।লক্ষণীয় বিষয ১. ঘাতক সেনাপ্রধানরা দীর্ঘদিন দেশ শাসন করেছে এবং সকলকেই বিশাল রকমের লুটপাট ও দূর্নীতির  কলঙ্ক মাথায় নিয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়েছে জনরোষে।২.আলোচিত প্রেক্ষাপটে খুন হওয়া কোন রাষ্ট্রনায়কের পরিবার পরিজনকে হত্যা করা হয়নি।

১৯৭৩ সালে আলজিরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত ৪র্থ ন্যাম সম্মেলনে কিউবার সংগ্রামী নেতা প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাথে বঙ্গবন্ধু মুজিবের দেখা হয়।ক্যাস্ট্রো তাঁর ব্যক্তিত্ব ও সাহসের ভূয়সী প্রশংসা করে যে উক্তি করেন তা বঙ্গবন্ধুর শিরোপায় নতুন রত্ন গেঁথে দেয়।তিনি বলেন,“আমি হিমালয় পর্বতমালা দেখিনি। কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি।“আই হ্যাভ নট সীন হিমালয়াজ।বাট  আই হ্যাভ সীন শেখ মুজিব।ইন পাসোনালিটি এন্ড ইন কারেজ দিস ম্যান ইজ দ্য

হিমালয়াজ”।

সে সময়ে বঙ্গবন্ধুর একটি অসম সাহসী উক্তি বিশ্বকে চমকে দেয়। “পৃথিবীটা আজ দুভাগে বিভক্ত হয়ে আছে। এক ভাগ শোষকের।আর এক

ভাগ শোষিত মানুষের।তোমরা যদি আমাকে জিজ্ঞাসা কর , আমি কোন

পক্ষে আছি? আমি বলবো আমি শোষিত মানুষের দলে ছিলাম। আমি

শোষিত মানুষের পক্ষে আছি। জীবন গেলেও আমি শোষিত মানুষের সপক্ষেই থাকবো”।

তাঁর দুঃসাহসী কথার রেশ ধরে কিনা জানিনা ফিদেল ক্যাস্ট্রো

বঙ্গবন্ধুকে একান্তে বলেছিলেন,“ শেখ মুজিব, তুমি সাবধান থেকো।একটা

বুলেট তোমাকে ধাওয়া করছে।যে কোন সময় তোমাকে ঘায়েল করে

ফেলতে পারে”।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সতর্ক হতে দেখলাম না।গ্রামের কৃষক নিজের জমির লাল শাক, দুটো লাউ একটা মিষ্টি কুমড়ো নিয়ে প্রিয় মুজিবের বাড়ির দোতালায় উঠতে কখনও বাধা পেলোনা।প্রেসিডেন্ট মুজিব উঠে গেলেননা নতুন গণভবনে।সেখানে সব রকম নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল্।রক্ষীবাহিনী ছিল।পিছনের খিড়কিও ছিল। কিন্তু জনগণের মুজিব জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ভয়ে অরক্ষিত বাড়ি আঁকড়ে পড়ে ছিলেন।তিনি বিশ্বাস করতেন না কোন বাঙালি তাঁকে মারতে পারে।কিন্তু ক্যাস্ট্রোর সাবধান বাণীই তো অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেলো।

বিশ্বাসঘাতক বজলুল হুদা ও নূর ঘাতক হয়ে ঢুকলো ভোরের আলোয় পথ দেখে।স্টেনের ১৮টা বুলেট তাঁকে ক্ষতবিক্ষত করলো। তিনি গ্রামের একজন সাধারণ বাঙালির মত চেক লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে ৩২ নম্বর ধানমন্ডির দোতালা থেকে নামার সময় সিঁড়ির ওপর লুটিয়ে পড়লেন।রক্তে ভাসলো বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার সেই ঐতিহাসিক সোপান।

খুন হওয়ার আগে তিনি জেনেছিলেন রব সারনিয়াবাত ও শেখ মনির

নির্মম হত্যাকান্ডের কথা।

বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন কোটি হৃদয়ে শুকতারা হয়ে, নীহারিকার স্বাতী হয়ে।মুজিব মৃত্যুকে বরণ করেছিলেন অভিমন্যুর মত।

সত্যান্বেষী গ্যালিলিওর মত ভয়ে মুখ লুকাননি। কোপারনিকাসের মত

সত্যপ্রতিষ্ঠায় প্রাণপাত করেছিলেন।একান্ত সাক্ষাতকারে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে নতি স্বীকার করলে যীশুর মত ক্রুশবিদ্ধ হতেন না।চিয়াংকাইশেকের  মত বেঁচে থাকতেন । মার্কোসের মত ক্রীতদাসের জীবন চাননি।একিনোর মত বুক পেতে দিয়েছিলেন ঘাতকের বুলেটের সামনে।

মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন সক্রেটিসের মত।।“মরণরে তুঁহুঁ মম শ্যাম

সমান”।‘হে মৃত্যু আমি প্রস্তুত তুমি আসো।তোমার জন্যে আমার দরজা খোলা রয়েছে’। এটা কোন পরাজিত মানুষের উক্তি নয়।অপরাজেয় বীর অভিমন্যুর কথা।

বঙ্গবন্ধু নিজেই দরজা খুলে নিচের সিঁড়িতে পা রেখেছিলেন।রাজনীতির

কবি ৭ মার্চ লিখেছিলেন জীবনের মহাকাব্য। ১৫ আগস্ট লিখলেন মৃত্যুর

অমরকাব্য।হে মৃত্যু তুমি মোরে করেছ মহান, দানিয়াছ খৃষ্টের সম্মান।

শামসুল আরেফিন খান

Author: শামসুল আরেফিন খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment