নজরুলের প্রেমের গান

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যেসংগীতে এক যুগস্রষ্টা কবি  স্রষ্টা তাঁর রোমান্টিক হাতেই আধুনিকতার শুরু সাহিত্যে এবং সঙ্গীতে তাঁর আগে যারা সাহিত্য সঙ্গীত নিয়ে কাজ করেছেন তারা মূলতঃ আদর্শবাদী রোমান্টিকতার বৃত্তে থেকে  রচেছেন তাদের সৃষ্টিকর্ম নজরুল ছিলেন একাধারে আবেগী, মানবতাবাদী এবং বাস্তববাদী মানুষ মানুষের শারীরিক মানসিক আবশ্যকীয় চাহিদাগুলোর প্রতি তার সমান শ্রদ্ধা সমর্থন ছিল ভালোবাসা শুধু হৃদয়ের ব্যাপার নয়, মনের বিষয় এবং নিষ্কাম প্রেমই প্রকৃত প্রেম এই ধারণাকৃত ভেঙ্গে তিনি বাস্তবতার ভুবনে প্রবেশ প্রবল পদক্ষেপে বিচরণ করেছেন আধুনিক মানুষ মানুষের দৈহিক চাহিদা বিশেষত যৌনচাহিদা বা সেক্সকে সমান শ্রদ্ধার চোখে দেখেন এবং এটাই অস্বীকার করাকে অবাস্তব রোমান্টিকতা বলে গণ্য করেন নজরুল ছিলেন তেমন আধুনিক মানুষ তিনি প্রেমের ক্ষেত্রে দেহ মন দুটোর সমান পরিপূরক ভূমিকাকে সমান গুরুত্ব সহকারে তাঁর সাহিত্যে সঙ্গীতে উপস্থাপন করেছেনআমি তোমারে পেয়েছি হৃদয় মাঝে আর কিছু নাহি চাই গো’– এই রাবীন্দ্রিক রোমান্টিকতা অতিক্রম করে নজরুল তাঁর প্রেমধারণায় হৃদয়ের পাশাপাশি শারীরিক অনুষঙ্গকে প্রতিষ্ঠা করেছেন তাই ঘুমঘোরে দেখা স্বপ্নের নজরুলের গানের নায়িকার স্বপ্নের নাচের শারীরিক ছোঁয়ায় সন্ন্যাসীও বিকশিত, পুলকিত, শিহরিত, সংকুচিত আলোড়িত হয়ে উঠেছে যে পুরুষ পাহাড়ের মতো, পর্বতের  মতো বাহ্যত উদাসীন নির্মোহ, তারও বৈরাগ্যের ঘুম ভেঙ্গে গেছে নারীর শরীরের সোনার ছোঁয়ায়পাষাণের ভাঙালে ঘুম কে তুমি সোনার ছোঁয়ায়’– বলে সন্ন্যাসী পুরুষ আত্মোপলব্ধিজাত উচ্চারণে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন, বলেছেন– ‘উদাসী বিবাগী মন, যাঁচে আজ বাহুর বাঁধন/শত জনমের কাঁদন পায়ে লুটাতে চায়’  যারা শুধু নিষ্কাম প্রেমের কথা বলেন, তারা খারিজ হয়েছেন নজরুলের হাতে রোমান্টিক বিশ্বামিত্ররা কৃক্রিম ধ্যান ভেঙ্গে আপন শরীরমনের চাহিদায় জেগে উঠেছেন নারীর স্পর্শের বাস্তব যাদুতে এরই নাম আধুনিকতা নজরুলের হাতে বাংলা গান প্রথমবারের মতো এবং সবচেয়ে প্রবলভাবে আধুনিক হয়ে উঠেছে

নজরুল ছিলেন বিপ্লবী পুরুষ, বিদ্রোহীহৃদয় সৃজনশীল পুরুষ ধরনের মানুষের জীবন হয় সংগ্রামে কাজে, কষ্টে বেদনায় ভরা জীবন ক্ষয় হয় নিত্য নিয়মিত জীবনের রিফুয়েলিং এর জন্য দরকার হয় ভালোবাসার পৃথিবীর প্রায় সকল মহামানব মহামানবীর জীবনে ভালোবাসা শক্তিদায়িনী উপশমকারী প্রেরণাময়ী ভূমিকা পালন করেছে নজরুল প্রেমকে কর্মে প্রেরণাদায়ী, ব্যথার উপশমকারী এবং শোকে সান্ত্বনাদায়ী হিসেবে দেখেছেন নজরুলের কাছে প্রেম তাই বহুবিধ ইতিবাচক শক্তির উৎস যার চূড়ান্ত কাজ সৃজনশীল শক্তির রিফুয়েলিং নজরুলের প্রেমের গানে প্রেম তাই ভেতরের সৃজনশীল প্রেরণা এবং কখনো কখনো সৃজনশীল শক্তিযার শিখি পাখা লেখনী হয়ে গোপনে মোরে কবিতা লেখায়অথবাতুমি হাতখানি যবে রাখো মোর হাতের পরে/মোর কণ্ঠ হতে সুরের গঙ্গা ঝরে’ —এভাবেই চিত্রিত হয়েছে প্রেম নজরুলের হাতে

 

নজরুল আবেগে রোমান্টিক এবং চিন্তনে আধুনিক মানুষ ছিলেন যে কারণে তাঁর হাতে প্রেম লাভ করেছে রোমান্টিকতার মাধুর্যমোড়ানো আধুনিক অবয়ব তিনি মনে করেছেন প্রেমই সৃষ্টির উৎস, বিশ্ব সৃষ্টির উৎস এবং জীবনের উৎস তিনি বারবার জন্মলাভ করতে চেয়েছেন প্রেমিক রূপে এবং তাঁর মনে হয়েছে বিশ্ব প্রেমময় স্থান মিলন বিরহ, সাক্ষাৎ বিচ্ছেদ, মানঅভিমান, হাসি অশ্রুএসব নিয়েই পার্থিব প্রেম কিন্তু ধর্মবিশ্বাসমতে যে স্বর্গ, সেখানে সুখ আছে কিন্তু প্রেম নেই কারণ প্রেমের যে অনুষঙ্গ মিলনের সাথে বিরহ, হাসির সাথে চোখের জল, মানের সাথে অভিমান পাওয়ার সাথে হারানো এসব কোনেটাই স্বর্গের জীবনে নেই নজরুল আধুনিক মানুষ তিনি স্বর্গীয় জীবন বা স্বর্গের প্রেমকে বাতিল করে তদস্থলে পার্থিব প্রেমকেই বেছে নিয়েছেন ফুলের সাথে কাঁটার ভরা সুখ দুঃখের মিশ্রণে গড়ে ওঠা পৃথিবীর প্রেমই অগ্রাধিকার পেয়েছে নজরুলের প্রেমভাবনায় নজরুলের পার্থিব প্রেমভাবনা চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে, ‘যত ফুল তত ভুল কন্টক জাগে/মাটির পৃথিবী তাই এত ভালো লাগে’ গানটিতে যা নিম্নরূপ:

যত ফুল ভুল কন্টক জাগে

মাটির পৃথিবী তাই এত ভালো লাগে।।

হেথা চাঁদে এছ কলঙ্ক, সাধে অবসাদ

হেথা প্রেমে আছে গুরুগঞ্জনা অপবাদ

আছে মান অভিমান পিরিতি সোহাগে।।

হেথায় হারাই হারাই ভয় প্রিয়তমে তাই

বক্ষে জড়ায়েল কাঁদি ছড়িতে না চায়

স্বর্গের প্রেমে নাই বিরহঅনল

সুন্দর আঁখি আছে, নাই আঁখি জল

রাধার অশ্রু নাই কুমকম ফাগে।।

 

পার্থিব প্রেমের প্রতি নজরুলের এই অনুরাগ পক্ষপাতিত্ব কখনোই এতটুকু নড়চড় হয়নি তিনি প্রেমকে যখন রোমান্টিকতার রঙে রাঙিয়ে উপস্থাপন করেছেন তখনও সে প্রেম ধুলিধূসরিত এই পৃথিবীর পার্থিব প্রেম রয়ে গেছেমোরা আর জনমে হংসমিথুন ছিলাম’, ‘তোমারেই আমি বাসিয়াছি ভালো শতরূপে শতবার’– এসব গানে রোমান্টিক মানসিকতার ছোঁয়া প্রবল নিবিড়, কিন্তু তারপরও এই প্রেম শুধু পার্থিব প্রেম, ধুলিধূসরিত জীবনের প্রেম

নজরুল সর্বশ্রেণীর মানুষের কবি; তিনি কৃষকমজুরশ্রমিকহরিজনমাঝিকুলিকামারকুমোরঅবহেলিত নারীএদের সবার কবি নজরুলের প্রেম ভাবনাও তাঁর কাব্যভাবনার মতো সর্বত্রগামী সর্বজনস্পর্শী তিনি জনচিত্তজয়ী প্রেমের কবি তাঁর গানে শিক্ষিত উচ্চবর্গের মানুষের প্রেমভাবনা প্রকাশিত হয়েছে উচ্চমার্গীয় ভাষায়, তেমনি নিম্নবর্গের নরনারীর প্রেম রূপায়িত হয়েছে সহজবোধ্য ভাষায়আকাশে আজ ছড়িয়ে দিলাম প্রিয় আমার কথার ফুল গো’, ‘আমি যার নূপুরের ছন্দ বেণুকার সুর’,  ‘আমার নয়নে নয়ন রাখি পান করিতে চাও কোন অমিয়’  প্রভৃতি গানে বিদগ্ধ শিক্ষিত  নরনারীর  প্রেমভাবনা বিধৃত; আবারতেপান্তরের মাঠে বঁধু হে একা বসে থাকি’, ‘আমি ময়নামতির শাড়ি দিবো চলো আমার বাড়ি’, ‘হলুদ গাঁদোর ফুল রাঙা পলাশ ফুল’, ‘যবে তুলনী তলায় প্রিয় সন্ধ্যাবেলায় তুমি করিবে প্রণাম’, ‘নদীর নাম সই অঞ্জনা’,  ‘তোর রূপে সই গাহন করে জুড়িয়ে গেল গা’,  ‘সাঁঝের পাখিরা ফিরিলা কুলায় তুমি ফিরিলে না ঘরে’, —এমনতর অজস্র গানে চাষীমজুরশ্রমিকমাঝিসাঁওতালবেদে অর্থাৎ গণমানুষের জীবনের প্রেমবিরহের ছবি তুলে ধরা হয়েছে নজরুল পল্লীর মানুষের জীবন নিয়ে এমন অনেক গান রচনা করেছেন, যেসব পল্লীগীতি নয়, উন্নতমানের আধুিনক গান একজন  গেরস্তপ্রকৃতির অথবা গ্রামীণ মানুষের স্ত্রীপ্রেম নিয়ে কত উন্নতমানের প্রেমের আধুনিক গান করা যায় অসাধারণ প্রতিভা বলে তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ নজরুলের ‘‘সাঁঝের পাখিরা ফিরিল কুলায় তুমি ফিরিলে না ঘরে’’  গানটি

নজরুলের প্রেমসঙ্গীতের সিংহভাগ জুড়ে আছে নারীর প্রেমসংক্রান্ত দুঃখ, ব্যথা, অভিমান, অনুরাগ, মিলন বিরহের বহুমুখি বিচিত্র আলেখ্য সে সময়ে স্বামীপুত্ররা গৃহের বাইরে কাজ করতেন; আর নারীরা গৃহবন্দী জীবন যাপন করতেন সামাজিক অনুশাসন  ধর্মীয় বিধি নিষেধের কঠোরতার কারণে নারীরা তাদের প্রেমভূতি ব্যক্ত করার সুযোগ্য পেতেন না বললেই চলে নারীদের প্রেমসংশ্লিষ্ট সেসব অব্যক্ত বেদনা ভাষা পেয়েছে নজরুলের শতশত প্রেমের গানে নারীজাতির অন্তরের  বেদনা, হাহাকার, সংকোচ, দ্বিধা অনুরাগ, রিরংসা প্রভৃতি নিজ অনুভূতিতে ধারণ করে তাদের যথাযোগ্য সঙ্গীতরূপ দান করেছেন নজরুল কিশোরী থেকে সন্তানের জননী সকল বয়সের সকল নারীর প্রেমাকাঙ্ক্ষা ভাষা লাভ করেছে তাঁর গানেতুমি আরেকটি দিন থাকো’, ‘বঁধু আমি ছিনু বুঝি বৃন্দাবনের রাধিকার আঁখি জলে’, ‘সই ভালো করে বিনোদবেণী বাঁধিয়া দে’, ‘তুমি যখন এসেছিলে, তখন আমার ঘুম ভাঙেনি’, ‘মোর প্রথম মনের মুকল’, ‘আমার ভুবন কান পেতে রয় প্রিয়তম তব লাগিাঁ’, ‘এখনো ওঠেনি চাঁদে এখনো ফোটেনি তারা’, ‘গাঙে জোয়ার এলো ফিরে তুমি এলে কই’—এমন শত শত গানে নজরুল নারীর প্রেমবাসনাবেদনাসুখদুঃখকে মূর্ত করে তুলেছেন নারী হৃদয়ের এমন অকৃত্রিম শিল্পিত প্রকাশ আর কোন কবি গীতিকারের এত সংখ্যক গানে এত জীবন্তরূপে বিচিত্র ব্যঞ্জনায় ফুটে ওঠেনি

নজরুল প্রেমভাবনার আরেকটি বড় দিক হচ্ছে প্রেমকে মহিমান্বিত করে উপস্থাপন নজরুলের কাছে প্রেম সৃজনের প্রেরণা এবং অমরত্বলাভের প্রধানতম মাধ্যম তিনি বিশ্বাস করতেন বীরত্ব, অর্থসম্পদ, রাজ্যপাটসবকিছু ধুলোয় মিশে যায় একদিন; কিন্তু প্রেম চিরঅবিনশ্বর চিরঅম্লান আর তাই তিনি বলেছেন, তিনি কবি বা  নেতা হতে আসেননি, এসেছিলেন প্রেম দিতে এবং প্রেম পেতে তাঁর কাছে সম্রাটদের চেয়ে বড় প্রেমিকপ্রেমিকা তিনি নিজেও বিদ্রোহী বীর কিন্তু প্রেমেই তার শর্তহীন আনুগত্য: ‘ওগো রানী, তোমার কাছে হার মানি আজি শেষে/আমার বিজয় কেতন লুটায় তোমার চরণতলে এসে’ এমনকি তিনি তাঁর কবিসত্তার চেয়েও প্রেমসত্তাকে বেশী প্রাধান্য দান করেছেন তিনি এক গানে বলেছেন, ‘তুমি আমায় ভালোবাসো তাই তো আমি কবি/ আমার রূপ সে তো তোমার ভালোবাসার ছবি।’ প্রেমের মহিমান্বিত রূপ প্রতিষ্ঠাকরণের উদ্দেশ্যে তিনি ভালোবাসার সুপারস্টার লাইলী, মজনু , শিরি,  ফরহাদ, শাহজাহান, মমতাজ, সেলিম, নুরজাহান প্রভৃতি প্রেমকাহিনীর নায়কনায়িকা নিয়ে অনুপমসুন্দর একাধিক গান রচনা করেছেনলাইলী তোমার এসেছে ফিরিয়া মজনু গো আঁখি খোলো’, ‘লাইলী লাইলী ভাঙিও না ঘুম’, ‘নুরজাহান নুরজাহান সিন্দুনদীতে ভেসে, এলে মেঘলামতীর দেশে’, ‘মমতাজ মমতাজ তোমার তাজমহল’, ‘মম তনুর ময়ূরসিংহাসনে এসো রূপকুমার ফরহাদ’ প্রভৃতি গানে প্রেমের আকাশচুম্বী মহিমান্বিত রূপ অংকিত হয়েছে তিনি কিংবদন্তীর মধুমালাকে নিয়ে প্রেমের গীতনাট্য রচনা করেছেনমমতাজ মমতাজ তোমার তাজমহল’ গানটিতে পার্থিব প্রেম পার্থিব অন্যান্য সকল সৃষ্টির উর্ধ্বে স্বর্গতুল্য মহিমা লাভ করেছে এই গানেরকত সম্রাট হলো ধূলি স্মৃতির গোরস্তানে/ পৃথিবী ভুলিতে নারে প্রেমিক শাহজাহানেচরণদুটিতে নরনারীর পার্থিব প্রেম সবকিছুকে ছাড়িয়ে উঠেছে সর্বোচ্চ মহিমায়

নজরুলের তাঁর প্রেমের গানে প্রেমকে এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন যে অন্য কোনো কারণে নয়, শুধু ভালোবাসার জন্য বারবার তিনি এই ধুলিধূসরিত পৃথিবীতে জন্মলাভ করার বাসনা পোষণ করেছেন হিন্দধর্ম মতে এই পৃথিবীতে পুনর্জন্ম লাভ পাপের প্রায়শ্চিত্ত অন্য ধর্মে পৃথিবীতে পুনর্জলাভের বিধান নেই অথচ নজরুল প্রায়শ্চিত্ত নয়, সন্তোষ্টচিত্তে পুনর্জন্ম লাভ করতে চেয়েছেন শুধু ভালোবাসার সাধ মেটিয়ে নেয়ার বাসনায় তাঁর বহু গানে এমন বাসনার কথা ব্যক্ত হয়েছেবঁধু মিটিল না সাধ ভালোবাসিয়া তোমায়/তাই আবার বাসিতে ভালো আসিবো ধরায়’, ‘তোমার আমার এই যে বিরহ এক জনমের নহে’, ‘তোমারেই আমি বাসিয়াছি ভালো শতরূপে শতবার’, ‘পর জনমে যদি আসি ধরায়/ ক্ষণিক বসন্ত যেন না ফুরায়’, ‘মোরা আর জনমে হংস-মিথুন ছিলাম’– ইত্যাদি গান নজরুলের অনন্য প্রেমবাসানার পরিচয় বহন করে

 

প্রেমের অনেকগুলো পর্ব আছে দর্শন, রাগ, অনুরাগ, মিলন, বিরহ , স্মৃতিতর্পণ ইত্যাদি নজরুলের গানে প্রেমের প্রতিটি পর্যায় চমৎকারভাবে জীবন্ত ব্যঞ্জনায় ফুটে ওঠেছে নজরুলের অনুরাগ নির্ভর প্রেমের গানগুলো অনবদ্যকেন মনোবনে মালতী বল্লরী দোলে’, ‘তুমি কি দক্ষিণা পবন’তোর রূপে সই গাহন করে জুড়িয়ে গেল গা’, ‘যাক্ না নিশি গানে গানে’, ‘আমি সুন্দর নহি জানি হে বন্ধু জানি’, ‘আধখানা চাঁদ হাসিছে আকাশে আধখানা চাঁদ নীচে’, ‘মনের রং লেগেছে বনের পলাশ  জবা আশোকে’, ‘এসো প্রিয় মন রাঙায়ে’ প্রভৃতি গানে এবং এমন আরও অসংখ্য গানে প্রেমের অনুরাগরাঙা ছবি ধরা পড়েছে আবারমোর প্রিয়া হবে এসো রানী দেবো খোঁপায় তারার ফুল’, ‘আমি ময়নামতির শাড়ি দিব চলো আমার বাড়ি’, ‘গাছের তলে ছায়া আছে ¯স্রোত নদীর জলে’, ‘বাহির দুয়ার মোর বন্ধু হে প্রিয় মনের দুয়ার আজি খোলা’এসো চিরজনমের সাথী’সুন্দর অতিথি এসো এসো কুসুম ঝরা বনপথে’, ‘তোমার মনে ফুটবে যখন প্রথম মুকুল’ফোটালে না কেন ফোটালে না ভীরু মনের কলি’,  ‘তুমি শুনিতে চেও না আমার মনের কথা’, ‘আমার নয়নে নয়ন রাখি পান করিতে চাও কোন আমিয়’ প্রভৃতি গানে প্রেমের প্রস্তাব বা প্রেমবাসনার প্রত্যক্ষ বিনিময় চমৎকার বাণীমূর্তি লাভ করেছে

 

প্রেমের আরেকটি পর্যায় হচ্ছে মিলনকাঙ্ক্ষা বা কামনা যার মধ্যে যৌনবাসনা বা রিরংসার প্রকাশ পায় নজরুল প্লেটোনিক লাভ বা নিষ্কাম প্রেমে বিশ্বাসী ছিলেন না তাই তাঁর গানে নরনারীর শারীরিক মিলনবাসনার ছবি প্রায়শঃ দৃশ্যমান হয় সত্যি কথা বলতে কি প্রাণীর জীবনের সবচেয়ে সুখকর অভিজ্ঞতা হচ্ছে শারীরিক মিলন বা সহবাস ধর্ম এবং নীতিশাস্ত্র কখনো যুক্তিতে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অযৌক্তিকভাবে মানুষের মিলনবাসনা প্রকাশের ওপর নানাবিধ নিষেজ্ঞা আরোপ  করে এসেছে ভাবনার অতিপরিশীলন বা একধরনের শুচিবায়ুগ্রস্ততাও  কাজ করেছে এমন নিষেধাজ্ঞার পেছনে নজরুল সকল প্রকার অযৌক্তিক বিধিনিষেধ শুচিবায়ুগ্রস্ততাকে অস্বীকার করে তাঁর কবিতাগানে নরনারীর মিলনবাসনাকে অভূতসুন্দর মহিমায় ফুটিয়ে তুলেছেনএসো প্রিয় মন রাঙায়ে’, ‘অঞ্জলি লহো মোর সংগীতে’, ‘মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর’, ‘আমার মালায় লাগুক তোমার মধুর হাতের ছোঁওয়া’, ‘প্রিয় এমন রাত যেন যায় না বৃথায়’, ‘মম তনুর ময়ূর সিংহাসনে এসো রূপকুমার ফরহাদ’,‘বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিতে আমার তনুর তীরে’, ‘ফোটালে না কেন ফোটালে না ভীরু মনের কলি’  প্রভৃতি গানে মিলনবাসনার ছবি কখনো পরোক্ষভাবে, কখনোবা প্রত্যক্ষরূপে জীবন্ত হয়ে উঠেছে

ভালোবাসাজনিত মিলনবাসনা বাস্তবায়িত করার জন্য প্রয়োজন হয় অভিসারের অভিসার হচ্ছে মধুরতম প্রেমভ্রমণ সমাজের অনুশাসন, ধর্মের কঠোর নিষেধাজ্ঞা, রাষ্ট্রের দন্ডবিধি ইত্যাদি উপেক্ষা করে তাই প্রেমিকপ্রেমিকা অভিসারে বাহির হয় দুর্গম পথে, অন্ধকার রাতে, কখনোবা অন্যকোনো কঠিন ভিন্ন পরিবেশে নজরুলের গানে প্রেমাভিসারের ছবিও দেখতে পাওয়া যায় প্রসঙ্গে  ‘আজ নিশীথে অভিসার তোমারি পথে প্রিয়তম’ ‘এখনো ওঠেনি চাঁদ ফোটেনি তারা’,  ‘তোমার কুসুম বনে আমি আসিয়াহি ভুলে’, ‘ব্রজগোপি খেলে হোরি’, ‘ভরিয়া পরাণ শুনিতেছি গান আসিবে আজি বন্ধু মোর’, ‘আসিলে ভাঙাঘরে কে মোর রাঙা অতিথি’ , ‘আজি মিলন বাসর প্রিয়া হের মধুমাধবী নিশা ’, ‘মাধবীলতার আজি মিলন সখি’ ‘মম বেদনার শেষ হলো কি এতদিনে’,  ‘বনে বনে জাগে কি আকুল হরষণগানগুলো উল্লেখযোগ্য ভালোবাসার অনিবার্য অনুষঙ্গ প্রিয়তমের জন্য অপেক্ষা যার অপর নাম প্রেমের প্রতীক্ষা ভালোবাসার মানুষটি আসবেতার চোখে নিজেকে সুন্দর করে উপস্থাপন করতে হবে; তার কাছে কত কথা আছে বলার; কত মান অভিমান আছে জানানোর; কত প্রশ্ন আছে করার; কত দেখার আছে বাকি; কত কি বাকি আছে নেয়ার; পথে পথে কত বেদনা ছড়ানো ! আবার প্রিয়জন আসবে বলে আকাশ কত রাঙানো, বাতাস কত রোমান্টিক! প্রেমের মানুষের জন্য অপেক্ষা হচ্ছে সুন্দরতম সময়ের উঠোনে বসে থাকা আবার তার আসতে দেরী হলে অথবা তার আসার কথা থাকা সত্ত্বেও সে না এলে তখন অপেক্ষার সময়টা বেদনায় ভরে ওঠে, সময়গুলো দীর্ঘ হয়ে ওঠে, কিছুতেই কাটিয়ে চায় না দিন, রাত মাস প্রেমের রঙে রাঙানো, প্রেমের আনন্দবেদনার রসে সিক্ত এই প্রতীক্ষার  সময়টা নজরুলের গানে ধরা পড়েছে অনন্যসন্দুর শব্দে সুরে, ভাবে ব্যঞ্জনায়আসিবে তুমি জানি প্রিয়’, ‘ভরিয়া পরাণ শুনিতেছি গান আসিবে আজি বন্ধু মোর’, ‘(প্রিয় মোর) উচাটন মন ঘরে রয় না’, ‘সই ভালো করে বিনোদবেনী  বাঁধিয়া দে’, ‘প্রিয় এমনও রাত যেন যায় না বৃথাই’, ‘নিশি নিঝুম ঘুম নাহি আসে’, ‘আমার গানের মালা আমি করবো কারে দান’,‘তুমি কি আসিবে না’, ‘আর কত দিন বাকী তোমার পাওয়ার আগে বুঝি হায় নিভে যায় মোর আঁখি’, ‘এসো চির জনমের সাথি’, ‘চাঁদের মতো  এসো নীরবে’, ‘এসো বঁধু ফিরে এসো’, ‘কত নিদ্রা যাও রে কন্যা জাগো একটুখানিপ্রভৃতি গানে প্রেমপ্রতীক্ষার মধুরবিধুর ছবি জীবন্ত ব্যঞ্জনায় মূর্তিমূর্ত হয়ে উঠেছে

প্রেম প্রথমে আসে মনেপ্রাণেহৃদয়ে; অতঃপর তা শারীরিক অভিব্যক্তিতেও ধরা পড়তে শুরু করে প্রথম প্রেমের অনুভূতি হয় কামনা আর শিহরণে ভরপুর যে অভিজ্ঞতা নেই, অথচ যা চায় মন এবং যা স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি, সেই অনুভূতি বেশিটাই অনির্বচনীয় নিবিড় বনে চাঁদের  আলো সম্পাতের মতো অনুদ্ধত আধাস্ফুট সে অনুভূতি তবে ভালো লাগার শিহরণটুকু অন্যন্যসুন্দর অুনপম নজরুলের গানে প্রথম প্রেমানুভূতি হৃদয়েমনেশরীরে সঞ্চারিত হওয়ার মধুর ছবি ফুটে উঠেছে ততোধিক মধুরতায়কথার কুসুমে গাথা গানের মালিকা কার’, ‘কেন মনোবনে মালতী বল্লরী দোলে’, ‘ আমি যার নূপুরের ছন্দ বেণুকার  সুর’, ‘মোর প্রথম মনের মুকুল’, ‘আধো আধো বোল লাজে বাঁধো বাধো বোল’, ‘আমারে চোখ ইশারায় ডাক ছিলে হায় কে গো দরদী’, ‘আজো ফোটেনি মম কুঞ্জে কুসুম ভোমরাকে সখি যেতে বল’, ‘মোর স্বপ্নে যেন বাজিয়ে ছিল করুণ রাগিনী’, ‘মম মায়াময় স্বপনে কার বাঁশি রাজে গোপনেপ্রভৃতি গানে নান্দনিক সাফল্যে শিল্পরসে ফুটে উঠেছে প্রথম প্রেমানুভূতির মধুর শিহরণসমৃদ্ধ ছবি

নজরুলের প্রেমভাবনায় বিরহের হাহাকার প্রাধান্য লাভ করেছে ভালোবাসার চূড়ান্ত লক্ষ্য মিলন বা মহামিলন কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচ্ছেদ বা অকালবিচ্ছেদ হয় প্রেমের পরিণতি পৃথিবীর বিখ্যাত প্রেমকাহনীগুলো এবং কিংবদন্তীগুলো তাই ট্রাজেডি লাইলীমজনু, শিরিফরহাদ, চন্ডিদাসরজকিনী, রোমিওজুলিয়েট, কচদেবযানী এরাই তো বিশ্বপ্রেমের মহানায়কমহানায়িকা; এদের সবার ক্ষেত্রেই বিচ্ছেদ ছিল চূড়ান্ত পরিণাম নিকটঅতীতে মুম্বাইয়ের মধুবালাদিলীপ কুমার, রেখাঅমিতাভ বচ্চনদের প্রেমও বিচ্ছেদে পরিণতি লাভ করেছে সুফীসাধকরা অর্থাৎ জালালউদ্দিন রুমি, হাফিজ, লালন এবং রবীন্দ্রনাথ যে অপার্থিব প্রেমের কথা বলেছেন, সেখানেও বিরহের হাহাকার বেশি রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি স্রষ্টার মাঝে প্রেম নিয়ে যখন বলেন, ‘‘তোমার আমার এই বিরহের মাঝে কত আর বাঁধি সেতু সুরে সুরে গানে গানে’’, কিংবা জালালউদ্দিন রুমি বলেন, বাঁশ হতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনাই ফুটে ওঠে বাঁশির সুরে অথবা লালন বলেন,  ‘মিলন হবে কত দিনে আমার মনের মানুষের সনে’,  তখন চরাচরব্যাপী বিস্তৃত বিচ্ছেদবিরহের ছবি প্রতিভাসিত হয়ে ওঠে নজরুলের ব্যক্তিজীবনে অচরিতার্থ প্রেম বা মিলনবঞ্চিত প্রেমতো ছিলোই এবং তার একটা প্রভাব অবশ্যই পড়েছে তাঁর গানে,  কিন্তু প্রেমে বিরহের দাপটিই যে বেশি, সেটি সত্য হয়ে উঠেছে নজরুলের প্রেমের গানে কবি বা সাধকের গানে বিরহের ছবি প্রধান, কবি নজরুলের গানেও তাই ক্ষেত্রে একটা বিরাট পার্থক্য এই যে অন্যেরা বিরহকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছেন; নজরুল মেনে নেননি তিনি চেয়েছেন মিলন রবীন্দ্রনাথ বিরহের ছবি এঁকেছেন বলা যায় মনের সুখে, ‘আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয়মাঝে আর কিছু নাহি চাই গো’, অথবামিলনে আছিলে বাঁধা শুধু একঠাঁই/ বিরহে টুটিয়ে বাঁধা আজি বিশ্বময়/ব্যপ্ত হয়ে গেছো প্রিয়ে/তোমারে দেখিতে পায় সর্বত্র চাহিয়েপ্রভৃতি উচ্চারণে শরীরিকমানসিক নিবিড় বেদনা নেই কিন্তু নজরুল বিরহের ছবি এঁকেছেন হৃদয়ক্ষরিত রক্তের বর্ণমালায় বিরহ নয়, মিলনই নজরুলের প্রেমের লক্ষ্য কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে লক্ষ্য দূরে সরে গেছে সামনে এসে ছড়িয়েছে বিচ্ছেদের বিস্তুৃত পারাবার নজরুলের বিরহকে প্রেমের একটা অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে মেনে নিয়েছেন কিন্তু তাকে গন্তব্য হিসেবে মেনে নেননি সে কারণে নজরুলের গানের বিরহের আর্তনাদের পাশাপাশি বিরহের পারাবার পেরুনোর  দুর্বার আকাঙ্খার  প্রকাশ প্রবলতর এবং পুনরাবৃত্তিময় ব্যঞ্জনায় পরিপূর্ণবঁধু মিটিল না সাধ ভালোবাসিয়া তোমায়’– বলেই ক্ষান্ত হননি নজরুল, পরপরই প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, ‘তাই আবার বাসিতে ভালো আসিবো  ধরায়।’

প্রেমিকপ্রেমিকার জীবনে একাবার বা বহুবার অথবা বারবার বিরহ বিচ্ছেদ আসতে পারে বিরহ বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা বেদনায় ভরা, হৃদয়ের রক্তে রঞ্জিত এর পুনরাবৃত্তি   চায় না প্রেমিকাপ্রেমিকা তাই তাদের মিলনেও সংশয়ের সতর্কতা জাগে কখনো কখনো বিচ্ছেদের আশংকা অথবা বিচ্ছেদের স্মৃতি মিলনকে আরও বেশি নিবিড়, ঘনীভূত গভীরতর করে তোলে নজরুলের প্রেমের ভাবনায় সেই ছবি হরমামেশাই লক্ষ করা যায়মোরা আর জনমে হংস মিথুন ছিলামগানটিতে যখন বলা হয়,বাহুর ডোরে বেঁধে আজো, ঘুমের ঘোরে যেন/ ঝড়ের বনলতার মত লুটিয়ে কাঁদো কেন?’ তখন অতীতের বিচ্ছেদবেদনাক্লিষ্ট দুটি মানবমানবীর বর্তমান মিলনের নিবিড় গভীরতার সাথে এক ধরনের ব্যাকুলতাও ফুটে ওঠে এই ব্যাকুলতা হচ্ছে ভবিষ্যৎ বিচ্ছেদকে ঠেকানোর প্রধান অস্ত্র এভাবেই নজরুলের হাতে বিরহ ভাবনা একটি বাড়তি ব্যঞ্জনা মাত্র লাভ করেছে প্রেমের গানে

প্রেমের অন্যতম অপরিহার্য অংশ হচ্ছে বিচ্ছেদের পর সুখদুঃখের স্মৃতিচারণ নানা কারণে বিচ্ছেদ ঘটে থাকে ভুল বুঝাবুঝি, নতুন করে অন্য কারও প্রেমে পড়া, মৃত্যু ইত্যাদি বিচ্ছেদের মূল কারণ বিচ্ছেদ হলে প্রেম অতীত হয় বাহ্যিক অর্থে; কিন্তু অন্তরে চিরজাগরুক থেকে যায় হারানো প্রেমের সুখদুঃখের আনন্দেরবেদনারশিহরণেরবিহ্বলতারমিলনেরক্ষণিক বিচ্ছেদের  বহুবিধ স্মৃতি বিচ্ছেদপ্রাপ্ত প্রেমিক প্রেমিকার দিনরাত ভরে থাকে অতীত প্রেমের সৌরভে স্মৃতিতে কখনও একা একা, কখনো অন্য কারও সাথে ভাগাভাগি করে প্রেমের স্মৃতিচারণ অনিবার্য হয়ে ওঠে নজরুলের গানে প্রেমের স্মৃতিচারণ একটা বিরাট স্থান দখল করে আছেভেসে আসে সূদুর স্মৃতির সুরভি হায় সন্ধ্যায়’, ‘মোরা আর জনমে হংসমিথুন ছিলাম’, ‘মনে পড়ে আজ সে কোন জনমে বিদায় সন্ধ্যাবেলা’, ‘তোমার আঁখির  মত আকাশের দুটি তারা’, ‘রহি রইি কেন সেই মুখ মনে পড়ে’, ‘মোর ভুলিবার সাধনায় কেন সাধো বাদ’, ‘সে চলে গেছে বলে কি গো স্মৃতিও হায় যায় ভোলা’, ‘হায় আঙিনায় সখি আজো কি সেই চাঁপা ফোটে’, ‘দিনের সকল কাজের মাঝে তোমায় মনে পড়ে’, ‘সাঁঝের পাখিরা ফিরিল কুলায় তুমি ফিরিলে না ঘরেপ্রভৃতি গানে প্রেমের স্মৃতিতর্পণ বিচিত্র মাত্রায় বিভিন্ন ব্যঞ্জনায় বিবৃত হয়েছে

নজরুলের প্রেমের গান দেশিবিদেশিলোকায়তপ্রমিত শব্দের যুৎসই ব্যবহারে এবং  উপমাচিত্রকল্পকল্পচিত্রউৎপ্রেক্ষার অভিনবত্বে অভূতপূর্বসুন্দর অতুলনীয়ভাবে অনন্য নজরুলের প্রেমের গান বহু প্রকারেরলোক আঙ্গিকের গান, গজল গান, কাব্যগীতি, উচ্চাঙ্গ প্রধান এবং কীর্তন আঙ্গিকের গান নজরুল বিষয় অনুসারে শব্দ নির্বাচন করেছেন গজল গানে আরব ফারসি উর্দু শব্দ এসেছে অত্যন্ত যুৎসইভাবে; আবার কীর্তন আঙ্গিকের গানে তৎসম, সংস্কৃত শব্দের প্রাধান্য ঘটেছে বেশি নজরুল প্রেম বলতে নরনারীর মানসিক শারীরিক চাহিদাকে সমানভাবে বুঝতেন বিধায় তাঁর প্রেমের গানে শরীর  সংশ্লিষ্ট শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে জীবন্ত ব্যঞ্জনায় যা পঞ্চকবির অন্য চারজনের গানে অনুপস্থিতপ্রায় শব্দ ব্যবহারে তাঁর মনে কোনো দ্বিধা বা শুচিবায়ুগ্রস্ততা ছিল না যে স্থানে যে শব্দ বেশি ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে, তিনি সেই স্থানে সেই শব্দ ব্যবহার করেছেন অন্যান্য শ্রেণীর গানের মতো প্রেমের গানেও নজরুলে বহু অভিনব উপমা এবং চিত্রকল্প সৃজন ব্যবহার করেছেন ফলে তাঁর গান গভীর সসংহত কবিতা হয়ে উঠেছে বাংলা ভাষায় আধুনিক গানের প্রবক্তা প্রচলক কাজী নজরুল ইসলাম এই আধুনিক গান মূলত প্রেমের গান তাঁকে অনুকরণ অনুসরণ করেই বাংলা আধুনিক গানের আজকের সমৃদ্ধি এসেছে আধুনিক গানের ভাবনায়  ভাষায় নজরুল অনুসৃত হয়েছেন ব্যাপকমাত্রায় এবং প্রচলভাবে কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ নজরুলকে অতিক্রম করে যেতে পারেননি তিনি একদিকে সব ধরনের শব্দের যুৎসই ব্যবহার করে গানের ভাষাকে বি¯তৃত করেছেন, গানের শ্রোতার সর্বজননীকরণ ঘটিয়েছেন, অন্যদিকে প্রেমের গানের রোমান্টিক শুচিবায়ুগ্রস্ততা অতিক্রম করে তাকে রক্তমাংসের নরনারীর শরীরমনের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করে তুলেছেন নজরুলের একটি প্রেমের গান নিয়ে আলোচনা করা যায় গানটি হচ্ছে– ‘আমার নয়নে নয়ন রাখ পান করিতে চাও কোন অমিয় এই গানটি আধুনিক গানের উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই গানে নরনারীর মানসিক চাহিদার সঙ্গে শারীরিক পিপাসা সমান গুরুত্বসহকারে স্বীকৃতি লাভ করেছে গানের নায়ক একজন সৃজনশীল মানুষ তার প্রাণপ্রিয় অন্যজন, সে থাকে অন্য কোথাও অধরা ভূবনে গানের নায়িকাকে দিয়ে তিনি সে অভাব পুরণ করে নিতে চান যতটা পারা যায় নায়িকা তা টের পেয়েছেন কিন্তু নায়ককে ফিরিয়ে দেননি বা তার সাথে বিরূপ আচরণ করেননি বরং নিজের শরীর ভান্ডে যে মদ আছে তা দিয়ে নায়কের প্রাণের পিপাসা মিটিয়ে দিতে চেয়েছেন উদারভাবে এই দৃষ্টিভঙ্গির নামই আধুনিকতা এই গানটির ভাব অনুকরণ পূর্বক এবং অনেকখানি অনুরকণ পূর্বক প্রণব রায় লিখেছেন, ‘জানি বাহিরে আমার তুমি অন্তরে নও’- গানটি কিন্তু সে গানের নায়িকা নজরুলের গানের নায়িকার মতো এতটা আধুনিক বা প্রাগ্রসর নয় প্রণব রায়ের নায়িকা হৃদয় শব্দটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছে নিজ ভালোবাসা কিন্তু এটা বাস্তবতা যে শারীরিক পিপাসাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে যে প্রেম, তা কথিত নিষ্কাম প্রেম হিসেবে যতই প্রশংসিত হোক শুচিবায়ুগ্রস্ত  সনাতনপন্থীদের মাঝে, সেটা জীবনের বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি নয় শুধু শরীরের ক্ষুধা যেমন প্রেম নয়, তেমনি শারীরিক চাহিদাকে সম্পূর্ণ অঙ্গীকার করাও প্রেমের প্রকৃত ধর্ম নয় তো নজরুল আধুনিকদের চেয়েও আধুনিক

প্রেমের গানে নজরুলের একটি বিরাট অবদান গজল গজলের জন্ম পারস্যে গজল মুলতঃ ঐতিহাসিক প্রেমের কবিতা গজলের গায়ে জড়িয়ে থাকে সুফিবাদী খোশবু তবে অনেক সময় গজল গান এমনভাবে রচিত হয় যে তা নরনারীর প্রেমের অভিব্যক্তি হিসেবেও প্রতিনিধিত্ব করতে পারে নজরুল বাংলা ভাষায় গজল প্রব্যতন করেন এবং তাকে বঙ্গীয় ইহলৌকিক রূপদান করেন নজরুলের গান নরনারীর ভালোবাসার গান এসব গানে আরবি ফারসি উর্দু শব্দও ব্যবহৃত হয়েছে; নজরুল সেসব শব্দ এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে তারা বিদেশী শব্দ হয়ে থাকেনি, বাংলাভাষার শব্দ ভান্ডারে যুক্ত হয়ে বাংলাভাষাকে সমৃদ্ধতর বিস্তৃততর করে তুলেছে  অধিকন্তু নজরুল গজলকে  সর্বসাধারণের প্রেমের গানে উন্নীত করেছেন ফারসিউর্দু গজল মূলতঃ উচ্চশিক্ষিত বিদগ্ধজনের গান কিন্তু নজরুলের গজল সকল শ্রেণীর মানুষের উপভোগউপযোগী গান নজরুলের গজলগুলো কাব্যগীতি বিধায় সেসব কাব্যগুণেও অত্যন্ত সমৃদ্ধ গজলকে কাব্যগুণে সমৃদ্ধ রেখে সর্বসাধারণের উপভোগ্যতার উপযোগী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নজরুলের কৃতিত্ব অনন্য একক

বাংলা গানের আধুনিকায়ন, বাংলাভাষার শব্দ ভান্ডার সমৃদ্ধকরণ, গজলের প্রচলন, পরিশীলিত প্রেমের গানে তথাকথিত নিম্নশ্রেণীর মানুষের মানুষের উপভোগ অধিকার প্রতিষ্ঠা, প্রভৃতি কারণে নজরুলের প্রেমের গানের গুরুত্ব অতুলনীয়।

 

Author: আমিনুল ইসলাম

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts