নজরুল রচিত মহামিলনের গান

নজরুল রচিত মহামিলনের গান

গাহি সাম্যের গান

যেখানে মিশেছে হিন্দুবৌদ্ধমুসলিমক্রীশ্চান

গাহি সাম্যের গান

কে তুমি? পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো ?

কনফুসিয়াস? চার্বাকচেলা? বলে যাও, বল আরো!

বন্ধু যা খুশি হও

পেটেপিঠে,কাঁধেমগজে যাখুশি পুঁথি কেতাব বও,

কোরানপুরাণবেদবেদান্তবাইবেলত্রিপিটিক

জেন্দাবেস্তাগ্রন্থসাহেব পড়ে যাও যত সখ,–

কিন্তু কেন পন্ডশ্রম, মগজে হানিছে শূল?

দোকানে কেন দরকষাকষি?— পথে ফোটে তাজা ফুল!

তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,

সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ!

তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,

তোমার হৃদয় বিশ্বদেউল সকলের দেবতার

(সাম্যবাদী / কাজী নজরুল ইসলাম)

 

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কৈশোরকাল থেকেই লক্ষ করেছিলেন ধর্মের নামে, জাতের নামে, বর্ণের নামে মানুষে মানুষে হানাহানি, মারামারি, হত্যাকান্ড ইত্যাদি জন্মগত মেধা আর সকল ধর্মের কেতাব পাঠ তাঁর মনে দ্রুত বিশ্বাস এনে দেয় যে, মানুষ আদতে একই জাতি ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, ভূগোলের পার্থক্য নিয়ে বৈষম্য ব্যবধান মানুষেরই সৃষ্টি এবং সৃষ্টি ভুল এবং অনেক অনর্থের মূল মানুষ যে সমাজে যে ভাষাতে এবং যে ধর্মাবলম্বী পরিবারে জন্মগ্রহণ করে সেটা দৈব তার ওপর মানুষের কোনো নিজস্ব পছন্দ কাজ করে না  যে হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করে, সে দৈবক্রমেই তা করে; যে মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করে, সেও দৈবক্রমেই তা করে জন্মের ওপর তার কোনো হাত থাকে না জন্মের পর  সকল ধর্মের মানুষের একই আলোবাতাসেজলে বেড়ে ওঠা একই ভাষায় হাসা কাঁদা পৃথিবীর সকল উপকরণ সকল মানুষের জন্যই সমানভাবে উপভোগের জিনিস সূর্য তার আলো দেয় সে আলো কোনো ধর্মের বা কোনো জাতের বা কোনো ভাষার মানুষের ভাগেই কম বা বেশি পড়ে না নজরুল অভূতপূর্ব সুন্দর বলিষ্ঠ বাণীতে, উপমাঅলংকারে ফুটিয়ে তুলেছেন বিষয়টি তাঁর গানে

 

মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দুমুসলমান

মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।।

এক সে আকাশ মায়ের কোলে

যেন রবি শশী দোলে

এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ির টান।।

এক সে দেশের খাই গো হাওয়া, এক সে দেশের জল,

এক সে মায়ের বক্ষে ফলাই একই ফুল ফল

এক সে দেশের মাটিতে পাই

কেউ গোরে কেউ শ্মশানে ঠাঁই

ভাষাতে মাকে ডাকি, এক সুরে গাই গান।।

 

হিন্দুমুসলমানের মধ্যে শত শত বছর ধরে শান্তিপূর্ণ সুসহাবস্থান ছিল বৃটিশদের শাসনামলে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ নামক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে এই দুই ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে যাকে বলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা হানাহানি, তা ছিল না কোথাও রাজ্য বিস্তারের চেষ্টায় যুদ্ধ হয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশে সেটা কিন্তু ধর্মকেন্দ্রিক ছিল না মুসলিম লোদী, সুলতান, শুর,  মোগল এদের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলিম ভারতের অন্য মুসলিম রাজবংশকে পরাজিত করেই এভাবে কখনো মোগল মারাঠাদের মধ্যেও যুদ্ধ হয়েছে কিন্তু সেসব যুদ্ধ ধর্মভিত্তিক যুদ্ধ নয় আকবরের সেনাপতি নিজেই ছিলেন রাজপুত হিন্দু হিন্দুমুসলমানের মধ্যে ধর্মভিত্তিক দ্বন্দ্বটা বৃটিশ ভারতের সময় তথাকথিত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কতিপয় রাজনৈতিক নেতার সৃষ্টি এবং এর পেছনে উদ্দেশ্যও ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল, ধর্ম নয় বৃটিশের ডিভাইড এ্যান্ড রুল পলিসির কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিলেনর সেসময়ের বড় বড় রাজনৈতিক নেতা এবং পন্ডিতেরাও সেই বিভাজনে সায় দিয়েছিলেন কিছু প্রভাবশালী সাহিত্য্যিকও এই কৃত্রিম বিভাজন ভারতকে দুশো বছর পরাধীন থাকতে বাধ্য করেছিল  কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর গভীর দৃষ্টি এবং মানবতাবাদী স্বাধীন মন নিয়ে সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছিলেন বিষয়টি ভারতীয়রা বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষ হলেও তারা বৃহত্তর ভারতীয় জাতি তাদের হাতে রচিত সিন্ধু সভ্যতা তাদের হাতে সৃষ্ট অজন্তাইলোরা, তাজমহল তাদের ভেতর থেকেই জন্ম হয়েছিল অশোক, আকবর, শাহজাহান এর মতো মহামতি সম্রাট তাদের হাতেই রচিত রামায়ণ মহাভারতের মতো মহাকাব্য তাদের দ্বারাই জ্ঞানবিজ্ঞানশিক্ষা ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন অংশে ভারতীয় প্রাচীন শাস্ত্রসমূহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বময় ভারতীয় মুনিঋষিজ্ঞানীদের খ্যাতি ছিল বিশ্বময় কিন্তু বৃটিশ শাসনামলে ভারতীয়রা সেসব বিস্মৃত হয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল বিভক্ত জাতি কোনো মহৎ কাজ করতে পারে না নজরুল তাঁর গানে এসব প্রসঙ্গ উত্থাপন করে ভারতীয় মানুষকে তাদের অতীত গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদের আবার একতাবদ্ধ হওয়ার প্রণোদনা উৎসাহ প্রদান করেছেন তিনি ধর্মীয় সম্প্রীতিকে উদার দেশপ্রেমে উন্নীত করতে চেয়েছেন

 

গঙ্গা সিন্ধু নর্মদা কাবেরী যমুনা

বহিয়া চলেছে আগের মতন, কই রে আগের মানুষ কই।।

মৌনী স্তব্ধ সে হিমালয়

তেমনি অটল মহিমাময়

নাই তার সাথে সেই ধ্যানী ঋষি, আমরাও আর সে জাতি নই।।

আছে সে আকাশ ইন্দ্র নাই

কৈলাসে যোগীন্দ্র নাই

অন্নদাসূত ভিক্ষা চায় কি কহিব এওে কপাল বই।।

সেই আগ্রা সে দিল্লী ভাই

আছে পড়ে সে বাদশা নাই

নাই কোহিনুর ময়ূরতখত নাই সে বাহিনী বিশ্বজয়ী

আমিরা জানি না, জানে না কেউ

কূলে বসে কত গুণিব ঢেউ

দেখিয়াছি কত, দেখিব এও নিঠুর বিধির লীলা কতই।।

 

নজরুলের গান বলে দেয় ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ একেবারে ভুল এবং কৃত্রিম এর পেছনে প্রকৃতির কোনো সায় নেই, অনুমোদন নেই প্রকৃতি সকল ধর্মের মানুষকে সমভাবেই সবকিছু দেয় এবং মানুষও প্রকৃতির বুকে একই রূপে ফুল ফসল ফলাতে পারে ভারতবর্ষ নানা ধর্মের এবং নানা ভাষার মানুষের মহামিলনকেন্দ্র যুগে যুগে কালে কালে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এসে এখানে স্থায়ীভাবে বসতবাড়ি গড়ে তুলে ভারতবাসী হয়ে গেছে ভারতবর্ষ আগে ছিল মূলত অনার্য মানুষের ভূগোল কালক্রমে এখানে এসেছে আর্যরা আগে মানুষ ছিল নিরীশ্বর এবং প্রকৃতিপূজারী পরে বাহির থেকে মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নিয়ে প্রবেশ করেছে এই জনপদে এই জনপদে প্রথম দিকে প্রায় সবাই ছিল প্রকৃতিপূজারী নিরীশ্বর মানুষ তারাই অনেকে পরে জৈন, বৌদ্ধ, হিন্দু এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে ধর্ম আলাদা হয়েছে কিন্তু মানুষ রয়ে গেছে একই ধর্ম যেন নানা রঙের পোশাক ভেতরের মানুষগুলো একই নজরুল এভাবেই ধর্মের আলাদা আলাদা খোলসের মধ্যে সকল মানুষের ঐকসূত্রটি আবিষ্কার এবং প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাঁর গানে যা অভূতপূর্ব এবং অনন্য আর ¯স্রষ্টা একই এবং একজনই ভাষার ভেদের কারণে তার নাম নামের ভেদ বাংলাভাষায় যে ভগবান, আরবিতে সে আল্লাহ, ফারসিতে খোদা, ইংরেজিতে গড এবং অন্যান্য ভাষায় অন্যান্য নাম সতরাং ধর্ম নিয়ে যে ভেদাভেদ সেটা মানুষের বুঝার ভুল, উপলব্ধির অসাফল্য

 

হিন্দুমুসলমান দুটি ভাই ভারতের দুই আঁখিতারা

এক বাগানে দুটি তরুদেবদারু আর কদমচারা।।

যেন গঙ্গা সিন্ধু নদী

যায় গো বয়ে নিরবধি

এক হিমালয় হতে আসে, এক সাগরে হয় গো হারা।।

বুুলবুল আর কোকিল পাখি

এক কাননে যায় গো ডাকি

ভাগীরথী যমুনা বয় মায়ের চোখের যুগলধারা।।

পেটেধরা ছেলের চেয়েও চোখে ধরার মায়া বেশি

অতীতে ছিল অতিথি, আজ সে সখা প্রতিবেশী

ফুল পাতিয়ে গোলাপ বেলি

এক সেমায়ের বুকে খেলি,

পাগল তারা,–ভিন্ন ভাবে আল্লা ভগবানে যারা।।

 

পৃথিবীতে নানা ধর্ম নানা ভাষা ভাষাভেদে একই ¯স্রষ্টার ভিন্ন ভিন্ন নাম আল্লাহ, খোদা, ভগবান, হরি, গড, ঈশ্বর, একই ¯স্রষ্টার নাম এক এক ধর্মের এক এক ধর্মপুস্তক বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধর্মের আবির্ভাব প্রচলন সকল ধর্মই মানুষ ভালো কাজ করতে এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে হিতোপদেশ দেয় উপাসনার পদ্ধতি বা আনুষ্ঠানিকতাসমূহ আলাদা হলেও সকল প্রকার উপাসনার লক্ষ্য একই ধর্ম একাধিক হলেও স্রষ্টা তো একাধিক নয় সুতরাং সকল ধর্মের উপাসনার আরাধ্য একই সৃষ্টিকর্তা কিন্তু মানুষ ধর্ম সম্পর্কিত গভীর জ্ঞানের অভাবে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিকঅর্থনৈতিক সংকীর্ণ স্বার্থে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে জাতিতে জাতিতে কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টি করে রেখেছে নিজেদের ধর্ম সঠিক এবং অন্য সকল ধর্ম ভুল এরই নাম গোড়ায় গলদ নজরুল এই গোড়ায় গলদটা যথার্থভাবেই চিহ্নিত করেছেন এবং তা তাঁর কবিতা গানে ফুটিয়ে তুলে সকল ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ঐক্যের বন্ধন রচনা মজবুত করতে চেয়েছেন এত প্রবলভাবে পৃথিবীর আর কোনো কবি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর মানবিক মহামিলনের গান রচনা করেননি

 

পুঁথির বিধান যাক পুড়ে তোর, বিধির বিধান সত্য হোক !

(এই) খোদার উপর খোদকারী তোর মানবে না আর সর্বলোক।।

জাতের চেয়ে মানুষ সত্য, অধিক সত্য প্রাণের টান

প্রাণঘরে সব এক সমান

বিশ্বপিতার সিংহআসন প্রাণবেদীতেই অধিষ্ঠান,

আত্মার আসন তাইতো প্রাণ  

জাত সমাজের নাই সেথা ঠাঁই জগন্নাথের সাম্য লোক

জগন্নাথের তীর্থলোক।।

চিনেছিলেন খ্রিস্ট, বুদ্ধ, কৃষ্ণ, মোহাম্মদ রাম

মানুষ কী আর কী তার দাম!

 

অথচ মানুষ ভুল করে তাই নিয়ে করে মারামরি হানাহানি ভারতবর্ষে প্রধানত দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাসহিন্দু এবং মুসলিম কিছু ধান্দাবাজ মানুষের হীন স্বার্থচিন্তা এবং  তৎকালীন বৃটিশ সরকারের ডিভাইড এ্যান্ড রুল পলিসি এই দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে মারাত্মক ভুল বুঝাবুঝি এবং তার পরিণতি হিসেবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি করে অথচ পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতার মতো ভারতীয় সভ্যতাও বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সম্মিলিত শ্রমে অবদানে সৃষ্ট এক ধর্মের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যখন সংখ্যালঘু ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষকে হত্যা করে, তাদের নিশ্চিহ্নকরণের হিংস্র কার্যক্রম চালায়, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধমের মানুষ এবং লেখকবুদ্ধিজীবীদের একটা বড় বড় অংশ কৌশলে নীরব নিস্ক্রিয় থাকে যা সাম্প্রদায়িক নিশ্চিহ্নকরণকে মৌন সম্মতিদানের সামিল  বৃটিশভারতে যখন গ্রেট ক্যালকাটা চলছিল, তখন অধিকাংশ কবিসাহিত্যিক মৌনতা অবলম্বন করেছিলেন কিন্তু নজরুল সেই সাম্প্রদায়িক উম্মত্ততা দেখে দারুণভাবে আহত হোন এবং প্রতিবাদে ফেটে পড়েন তিনি এই নির্বোধ দাঙ্গাহত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে অগ্নিঝরা বাণী হৃদয়ছোঁয়া সুর দিয়ে সৃষ্টি করেন যে গান শুনে অসাম্প্রদায়িক জেতনায় উদ্বুদ্ধ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু দারুণভাবে প্রভাবিত হোন  তিনি বলেন, হিন্দুমুসলমানের মহামলিনের গান ‘‘দুর্গম গিরি, কান্তারমরু, দুস্তর পারাবার হে / লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে , যাত্রীরা হুঁশিয়ার!’’ এই গানে তিনি রাজনৈতিকসাংস্কৃতিকধর্মীয় নেতাদের আবেদন জানিয়ে, তাদের বিববেকের দ্বারে প্রবল করাঘাত হেনে বলেছেন,

অসহায় জাতি মরিছে ডুরিয়া, জানে না সন্তরণ,

কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ

হিন্দু না ওরা মুসলিম ?’ ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন ?

কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা

 

এই গানে তিনি আরও বললেন, “ আজ পরীক্ষা জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ ?’’  ধর্ম, সম্প্রদায়. জাত, বর্ণ সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানুষ এবং মানবতা নজরুল তাঁর এই গানে যে প্রবল ভাষায় এবং আবেগউত্তোলনকারী সুরে মানবতার পক্ষে ধর্মীয় সম্প্রীতির পক্ষে সোচ্চারকণ্ঠ হয়েছেন, তাকে বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে মহামিলন রচনার উদাত্ত আহ্বান বললেও কম বলা হয় এই গান শুনে অসাম্প্রদায়িক জেতনায় উদ্বুদ্ধ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু দারুণভাবে প্রভাবিত হোন  তিনি বলেন,

 

‘‘নজরুলকে বিদ্রোহী কবি বলা হয় এটা সত্য কথা তাঁর অন্তরটা যে বিদ্রোহী তা স্পষ্টই বুঝা যায় আমরা যখন যুদ্ধে যাবো– – তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে আমরা যখন কারাগারে যাবো, তখনও তাঁর গান গাইবো আমি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে সর্বদাই ঘুরে বেড়াই প্রাদেশিক ভাষায় জাতীয় সঙ্গীত শুনবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে নজরুলের  ‘দুর্গম  গিরি কান্তারমরু’র মত প্রাণমাতানো গান কোথাও শুনেছি বলে বলে মনে হয় না।’’গানটি প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ শিল্পী দিলীপকুমার রায় বলেছিলেন, “ সুভাষ সবচেয়ে বেশী আকৃষ্ট হয়েছিল এমনি এক আসরে তার মুখে গান শুনে:দুর্গম গিরি কান্তারমরু দুস্তর পারাবার/ লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার! ’ ‘হুঁশিয়ার’– এর মতন গদ্যাত্মক বিশেষণকে যে বীর্যভঙ্গিতে এভাবে কাব্যে পাংক্তেয় করা যেতে পারে কে ভেবেছিল ? ’’(আলোর বাণীবাহক নজরুল / দিলীপকুমার রায়) স্বাধীনতা যুদ্ধসহসহ পরবর্তী প্রতিটি সংকটে সংগ্রামে নজরুলের এই গান আমাদের শক্তি জুগিয়েছে, সাহস জুগিয়েছে, পথের দিশা দিয়েছে এই গানের বাণীর যে বলিষ্ঠতা এবং সুরের যে রক্তনাড়ানিয়া ঝংকার, তাতে করে এর আবেদন প্রাসঙ্গিকতা কোনোদিনও শেষ হওয়ার নয়

 

বর্তমান সময়ের বাংলাদেশ ভারত এবং পাকিস্তান যুগ যুগ ধরে ছিল অখন্ড ভারতভূমি বা ভারতীয় উপমহাদেশ এটি পৃথিবীর একটি ছোট সংস্করণ বলা যেতে পারে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ নানা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, নানা ধর্ম, নানা সংস্কৃতির সমাবেশ সুসংমিশ্রণ ঘটেছে এই উপমহাদেশে এটা কোনো বিশেষ ধর্মের বা বিশেষ নৃগোষ্ঠীর বা বিশেষ কোনো ভাষাভাষী মানুষের দেশ নয় ভারতীয় উপমহাদেশ হচ্ছে মহাসাগরের মতো এখানে এসে মিশেছে মিলেছে নরগোষ্ঠী, ভাষা, ধর্ম সংস্কৃতির অজস্র ধারা এটি একটি মহামিলনকেন্দ্র নজরুল তাঁর সহজাত প্রতিভাবলে সেটি বুঝতে পেরেছিলেন এবং নির্ভেজাল মানবতাবাদী মন নিয়ে বিষয়টিকে উপস্থাপন করেছেন তাঁর কবিতায়, কথাশিল্পে গানে তেমনি একটি গানের প্রথম কয়েকটি চরণ:

 

উদার ভারত! সকল মানবে দিয়াছ তোমার কোলে স্থান

পার্সিজৈনবৌদ্ধহিন্দু খ্রিস্টানশিখমুসলমান।।

তুমি পারাবার, তোমাতে আসিয়া মিলেছে সকল ধর্ম জাতি;

আপনি সহিয়া ত্যাগের বেদনা সকল দেশের করেছ জ্ঞাতি;

নিজেরে নিঃস্ব করিয়া , হয়েছ বিশ্বমানবপীঠস্থান।।

 

কিন্তু নজরুল তাঁর জীবদ্দশায় দেখেছেন ধর্মের নামে হানাহানি , জাতপাতের ভেদাভেদ নিয়ে অমানবিক নিষ্ঠুরতা, এবং এক শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় মাদবর এবং লেখকবুদ্ধিজীবীঐতিহাসিকদের নানা ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিতে প্ররোচনাদানকারী বক্তব্য  লেখা ইতিহাসে, উপন্যাসে, বক্তৃতায় উদার ভারতের ধর্মীয়রাজনৈতিকসাংস্কৃতিক ইতিহাস ঐতিহ্যকে বিকৃত করা হয়েছে, সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেয়া হয়েছে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের সৌন্দর্যের এবং গৌরবের কেন্দ্রবিন্দু কিন্তু সেই মিলনকেন্দ্রে বিভেদের বীজ বপন করা হয়েছে নানাভাবে ফলে যুগ যুগ ধরে ভারতীয় মানুষের মাঝে সৃষ্ট প্রবাহমান মহামিলনের ধারা বিভেদমুখী সংঘর্ষে জড়িয়ে ঘুরপাক খেতে থেকেছে নজরুল সেই বিভেদ দূর করে হারানো ঐক্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা চেয়েছেন এবং সর্বজনীন আবেদনের ভাষায় রচেছেন মহামিলনের গান

 

এবার নবীনমন্ত্রে হবে জননী তোর উদ্বোধন

নিত্যা হয়ে রইবি ঘরে , হবে না তোর বিসর্জন।।

সকল জাতির পুরুষনারীর প্রাণ

সেই হবে তোর পূজাবেদী মা তোর পীঠস্থান;

সেথা শক্তি দিয়ে ভক্তি দিয়ে পাতবো মা তোর সিংহাসন।।

সেথায় রইবে নাকো ছোঁয়াছুঁয়ি উচ্চনীচের ভেদ,

সবাই মিলে উচ্চারিব মাতৃনামের বেদ

মোরা এক জননীর সন্তান সব জানি,

ভাঙব দেয়াল, ভুলব হানাহানি

দীনদরিদ্র রইবে না কেউ সমান হবে সর্বজন,

বিশ্ব হবে মহাভারত, নিত্যপ্রেমের বৃন্দাবন।।

 

এই মহামিলনের বৃন্দাবন রচনার জন্য প্রয়োজন যুবশক্তির সৃজনশীল উদার মনের বিকাশ তারা যদি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রীতিডোরে বাঁধে পরস্পরকে, তাহলেই জগতে প্রতিষ্ঠিত হবে ভালোবাসার রাজ্য কারণ তাদেও হাতেই জগতের ভাবী নেতৃত্ব তারাই সমাজের মূল শক্তি তারা একতাবদ্ধ হয়ে সংগ্রামে নামলে যে কোনো অপশক্তি, অপশাসন, মানুষে মানুষে সৃষ্ট কৃত্রিম ভেদাভেদ পরাজিত হতে বাধ্য তাই নজরুল যুবসমাজকে উদার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আদর্শে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন তাঁর গানেকবিতায়অভিভাষণে

 

জাগো রে তরুণ দল

(স্বতঃ) উৎসারিত ঝর্ণাধারায় প্রায় জাগো প্রাণচঞ্চল।।

ভেদ বিভেদের গ্লানির কারা প্রাচীর

ধূলিসাৎ করি জাগো উন্নতশির!

জবাকুসুমসঙ্কশ জাগো বীর

বিধি নিষেধের ভাঙো অর্গল।।

ধর্ম বর্ণ জাতির উর্ধ্বে জাগো ওে নবীন প্রাণ,

তোমার অভ্যুদয়ে হবে সব বিরোধের অবসান

সঙ্কীর্ণতা ক্ষুদ্রতা ভোলো ভোলো,

সকল মানুষে উর্ধ্বে ধরিয়া তোলো,

তোমাদের চাহে আজ নিখিল জনসমাজ

বিধাতার সম জাগো প্রেমপ্রোজ্জ্বল।।

 

তিনি শুধু নবীন সমাজকে আহ্বান জানিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি সব ধর্মের মানুষের সম্প্রীতির মাধ্যমে সৃষ্ট মানবিক মহামিলনের স্বপ্ন দেখেছেন এবং তা একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়ে কেমন মোহনীয় মহান রূপ ধারণ করবে তার অগ্রিম ছবিও এঁকেছেন গানে গানে ভারতে এবং বৃহত্তর অর্থে পৃথিবীতে শুধু হিন্দুমুসলমানের নয়, আরও রয়েছে খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, ইহুদী, পারসি এবং অন্যান্য ধর্মের মানুষের বসবাস ভারত উপমহাদেশে এবং সেই সঙ্গে সমগ্র পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং তার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হলে সকল ধর্মের মানুষের পারস্পারিক বোঝাপড়া, সমঝোতা, শ্রদ্ধাবোধ, সহিষ্ণুতা এবং সমন্বিত পথচলা প্রয়োজন  ধর্মে ধর্মে যে হানাহানি ঘটেছে এবং ঘটে, তার মূল কারণ ধর্মের মর্মবাণী এবং লক্ষ্যবস্তু সনাক্তকরণে ভ্রান্তি স্রষ্টা একজনই সকল ধর্মের লক্ষ্যই হচ্ছে মানবজীবনে সুশৃঙ্খলা  প্রতিষ্ঠা এবং পরজীবন থেকে থাকলে সেখানে শান্তির আশ্রয় প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ ইহজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ পারস্পারিক সমঝোতা , শ্রদ্ধাবোধ এবং ঐক্য বিভেদ আর অনৈক্য মানেই মারামারি, হানাহানি,যুদ্ধ, সংঘাত, সাম্প্রদায়িক রক্তপাত এবং চূড়ান্ত পরিণামে অশান্তি ধর্মের মর্মার্থ, উৎস, প্রয়োজনীয়তা, এবং লক্ষ্য সম্পর্কে গভীর উপলব্ধির অভাব এবং খন্ডিত জ্ঞানের কারণেই পৃথিবীতে ধর্মীয় সংঘাতের সূত্রপাত, বিস্তার বিরাজমানতা নজরুল মানুষকে সেখান থেকে ফিরিয়ে এনে ধর্মের মূল লক্ষ্য যে শান্তির পৃথিবীর রচনা, সেই শান্তির পৃথিবীর অগ্রিম ছবি এঁকেছেন এবং তার মাধ্যমে মানুষকে বাস্তবে সেই শান্তির পৃথিবী রচনার স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন, সেটা যে সম্ভব এবং সমীচীন, মানুষের মনের মধ্যে সেই গভীর প্রণোদনা আস্থা পুরে দিতে চেয়েছেন  

 

আজ ভারতের নব আগমনী জাগিয়া উঠিছে মহাশ্মশান

জাগরণী গায় প্রভাতের পাখি ফুলে ফুলে হাসে গোরস্থান।।

টলেছে অটল হিমালয় আজি

সাগরে শঙ্খ উঠিয়াছে বাজি

হলাহল শেষে উঠেছে অমৃত বাঁচাইতে মৃত মানবপ্রাণ।।

আঁধারে করেছে হানাহানি যারা

আলোকে চিনেছে আত্মীয় তারা

এক হয়ে গেছে খ্রিস্টান , শিখ, হিন্দু, পারসি, মুসলমান

এই তাপসীর চরণের তলে

লভিয়াছে জ্ঞান শিক্ষা সকলে

আবার আসিবে তারা দলে দলে করিতে পুণ্য তীর্থস্নান।।

 

আজ বিজ্ঞান প্রযুক্তির জয়জয়কারের যুগেও লক্ষ করা যাচ্ছে যে, মানুষ ধর্ম থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিতে পারেনি এবং পারবে এমন সম্ভাবনা মোটেই দৃশ্যমান নয় বরং আবারও নতুন করে ধর্মীয় জাগরণ ঘটছে এবং তা বিকৃত রূপে উন্মাদনায় পরিণত হতে চাচ্ছে নজরুল মানবজাতির অতীত সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতেন এবং তার ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছেন অব্যর্থ অন্তর্দৃষ্টি দূরদৃষ্টি সহযোগে তাই তিনি ধর্মকে অস্বীকার না করে বরং ধর্মীয় উন্মাদনা বা ধর্মীয় আফিম থেকে মুক্ত করে মানুষকে সর্বধর্মীয় উদার সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করেছেন কারণ সেটাই হচ্ছে পৃথিবীতে স্থায়ীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার বাস্তবসম্মত উপায় নজরুলের চোখে মানুষের পরিচয় সে শুধুই মানুষ ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তা, নৃতাত্বিকতা এসবই হচ্ছে দৈব যার ওপর মানুষের কোনো পছন্দ বা অপশন কাজ করে না এসব সে জন্মসূত্রে লাভ করে থাকে মানুষ যে মানুষ, সেটা তার মানবিক গুণাবলীর কারণে ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তা এসব মানুষের মৌলিক গুণাবলীর পরিচয় চিহ্ন নয় পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্প্রীতি, দয়া, সহমর্মিতা, একতা, শান্তিকামিতা, সুবিচারবোধ, সুজ্ঞানের প্রতি অনুরাগ, সৎকর্ম এসব হচ্ছে প্রকৃত মানুষের মনে মননে, কথায় কর্মে, ধারণায় ধর্মে ধারণ করার জিনিস মানুষ সেভাবে নিজেকে গড়ে তুললে পৃথিবী হবে সব ধর্মীয় মানুষের মহামিলনের পুণ্যভূমি নজরুল তাঁর সেই মহামমিলনের আবশ্যকতা তুলে ধরেছেন গানে গানে এবং এই মহামিলনের গান রচনায় তিনি শুধু নিজ মহাহৃদয়ের পরিচয়ই দেননি, মহাকাব্যশক্তি মহাসঙ্গীতপ্রতিভার পরিস্ফুটন ঘটিয়েছেন সকল মানুষের মহামিলনের গান রচনায় নজরুলের সঙ্গে তুলনীয় তাঁর আগে, সমসাময়িককালে কেউ ছিলেন না,  পরেও কেউ আসেননি এখানে নজরুল এক, অনন্য অতুলনীয়

আমিনুল ইসলাম
আমিনুল ইসলাম

 

 

 

Author: আমিনুল ইসলাম

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment