নারী কিংবা পুরুষ নয়, মানুষ নির্যাতন বন্ধ করি। শান্তির পৃথিবী গড়ি

ইভটিজিং শব্দটার সাথে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বাভাবিকভাবে আমরা মেয়েদের ক্ষেত্রেই ব্যাপারটাকে বেশি গুরুত্ব সহকারে দেখে থাকি। সরকার ইভটিজিং এর উপর বেশ কিছু আইন কানুন করেছেন। তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল কোর্টের মাধ্যেমেও ইভটিজারদের শাস্তি দেওয়া হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইভটিজাররা আসলেই ইভটিজিং করেছেন নাকি কোন ভুল বোঝাবুঝির রেশ থেকে সে শাস্তি পাচ্ছে তা যথাযথ প্রমাণ না করেই বা প্রমানণিত না হওয়া সত্ত্বেও শাস্তি তাকে পেতে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত ধারণা থেকে বলছি, অনেক সময় উগ্র অস্বাভাবিক উচ্চাভিলাসী কিছু মেয়ের স্বেচ্ছাচারিতা বা ভুল বোঝার কারণে অনেককেই অপরাধ না করেও শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে। এমন অনেক ঘটনাই ঘটে আমাদের চোখের সামনে।  নারী হিসাবে বলছি না, মানুষ হিসাবে বলছি। আমাদের সমাজে এখনো অনেক মেয়ে বা নারী যেমন নির্যাতিত হচ্ছে তেমনি অনেক ছেলেও অযাচিতভাবে নির্যাতিত হচ্ছে তা সমাজের চোখে ধরা পড়ছে  অথবা পড়ছে না । আর পড়লেও তা নীরবে হজম করা হচ্ছে কেননা যদি পুরুষ নির্যাতন কথাটা তুলে ধরা হয় তবে হয়তো পুরুষ শাসিত সমাজে পুরুষের আত্মসম্মানের হানি ঘটতে পারে। তাই পুরুষ নির্যাতিত হলেও সমাজে তা প্রকাশ হচ্ছে না বা হলেও তার সংখ্যা নিতান্তই কম ফলে অনেক ছেলে বা পুরুষ বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সময় প্রয়োজনে -অপ্রয়োজনে, কারণে-অকারণে নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছে কিন্তু সুবিচারতো দূরের কথা, তারা মুখ পর্যন্ত খুলছে না নিজেদের পৌরুষকে বহাল রাখার জন্য। রাঘব বোয়ালরা নির্যাতন করেই যায় সে পুরুষ হোক বা নারীই হোক। ইদানিং লক্ষ করছি, কিছু সচেতন ছেলে বা পুরুষ একটু সাহস দেখাচ্ছে, প্রতিবাদ করছে এবং তারা প্রমাণ করতেও সক্ষম হচ্ছে যে, তারা নিরপরাধ। এখানেই মানুষ হিসাবে গর্ববোধ করি যে আমাদের সমাজে নারী পুরুষ ভেদাভেদ নয়, মানুষ হিসেবে আমরা আমাদের অধিকারকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে শিখছি।  আমরা যদি প্রত্যেকে প্রত্যেকের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হই এবং অামরা যদি বিশ্বাস করি, প্রতিটি মানুষের এক ধরণের অধিকার থাকে যা জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য। যা মানুষ  স্বাধিকার বলে ভোগ করবে, চর্চা করবে, হৃদয়ে লালন করবে, নির্ভয়ে, স্বগৌরবে, স্বদর্পে ,কিন্তু তা কোন অবস্থাতেই অন্যের কোন প্রকার ক্ষতি কিংবা প্রশান্তি নষ্ট করে নয়। তাহলেই আমরা সবাই সবার প্রতি সম্মানসূচক আচরণ করবো সম্মানসূচক আচরণের মাধ্যমে স্ব-স্ব অধিকার উপভোগ করতে পারবো। এটাই যদি হয় আমাদের স্বাধিকার এবং আমরা যদি বুঝি আমাদের দায়িত্ব কর্তব্য অধিকার সম্পর্কে তবে কিসের হানা হানি, কিসের মারামারি, কিসের ভুল বুঝাবুঝি কোন প্রকার অসঙ্গতি থাকার কথা নয়, অশান্তি তো দূরের কথা। আমরা সমাজে বাস করি তাই সামাজিক জীব হিসেবে আমরাই যদি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জাগ্রত মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে পারি, ঘর থেকেই যদি শুরু করি নিজের-অধিকার মানবাধিকার, দায় দায়িত্ব, করণীয় কর্তব্য, মানুষের প্রতি মানুষের আত্মিক সম্পর্ক সম্মান অসম্মান এর সুফল, কুফল তাহলে সামাজিক বন্ধন হবে আরো দৃঢ, আরো শক্তিশালী, থাকবে না অনাচার অত্যাচার। সভ্য সমাজে থাকবে না কোন ইভটিজিং, লাগবে না কোন দিন দরবার। সবাই সবার মতো থাকবে সোচ্চার রক্ষা করতে মানবাধিকার। তাহলে আমাদের সমাজে একটি মেয়েকেও নির্যাতিত হতে হবে না । সেই সাথে ছেলেরাও নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবে।

আমরা শুধু জানি নারীই নির্যাতিত হয় । আসলে তা নয়, পুরুষরাও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং দিন দিন তা বেড়েই চলছে। ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, পথে ঘাটে হাটে মাঠে অফিস আদালতে ঘরে বাইরে প্রায় সব জায়গায় সব সময় কোন না কোন ভাবে পুরুষ নির্যাতিত হচ্ছে। একাধিক নারী চক্রের হাতে পুরুষ নির্যাতিত হচ্ছে যেমন ধরুন, নারী ছিনতাইকারী তারা যে কোন উপায়ে পুরুষের পকেট ফাঁকা করে নিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ভয় ভীতি দেখিয়ে বা কোন না কোন ফাঁদে ফেলে। যেমন পুরুষরা নারী নির্যাতন করে কোন না কোন লোভ দেখিয়ে, ভয় ভীতি দেখিয়ে জোর করে কিংবা কোন না কোন প্রলোভন দেখিয়ে তদ্রুপ নারীরাও এখন কোন অংশে কম নয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে পুরুষ নির্যাতিত হচ্ছে এই সভ্য সমাজে আজও। অথচ আগেই বলেছি তারা মুখ খুলছে না, নীরবে সয়ে যাচ্ছে সকল নির্যাতন।  আবার তারাই এরই রেশ বা ক্ষোভ স্বরূপ ঝোঁপ বুঝে কোপ মারছে কোন নিরীহ নারীর উপর। যে পুরুষ বাহিরে নারীর দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে, ঘৃণিত হচ্ছে, অপমানিত হচ্ছে সে পুরুষরাই তাদের ক্ষোভ ঝাড়তে অত্যাচার করছে তাদেরই আপনজন স্ত্রী কন্যা কিংবা গর্ভধারীণি মায়ের প্রতি। তাহলে এই অসঙ্গতি, দুর্বলের প্রতি সবলের অত্যাচার বা নির্যাতন এটা চলতেই থাকবে । যেমন উপর থেকে পানি নিচের দিকে  গড়িয়ে পড়ে ঠিক তেমনি। এভাবে যদি চলতেই থাকে আর আমরা যদি সচেতন না হই স্ব-স্ব জায়গা থেকে তবে, এই অসঙ্গতি কিংবা নির্যাতন চলতেই থাকবে। আমরা সুশীল সমাজে বাস করি সুনাগরিক হিসেবে অথচ আমরা সুসম বন্টনের প্রতি এখনো ভীষণ ভাবে উদাসীন। সুসম বন্টন সুশীল সমাজের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। অসঙ্গতি অসম বন্টন নৈতিকতার অবক্ষয় সুশীল সমাজকে করছে কলংকময়। সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষার জন্য মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে সোচ্চার হওয়া খুবই জরুরী। তাহলে সামাজিক অসঙ্গতি দূর করা সম্ভব। রোধ করা যাবে দুর্বলের প্রতি  সবলের নির্যাতন, বন্ধ হবে নারী নির্যাতন, পুরুষ নির্যাতন তথা মানুষ নির্যাতন।সমাজ হয়ে উঠবে শান্তির আবাসন। পৃথিবী হয়ে উঠবে প্রশান্তিময়, মানুষ হয়ে উঠবে গতিসম্পস্স। জীবন হবে স্বস্তিময়। সার্বিক দিক দিয়ে শান্তিতে ভরপুর। তাই আসুন আমরা সকলে মিলে নারী ও পুরুষ নির্যাতন নয়, মানুষ নির্যাতন বন্ধ করি। শান্তিময় অভয় আবাসন গড়ি।

ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী
ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী

 

 

Author: ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts