নয়ন সমুখে

রুনার সন্তান হবে।  সন্তান জন্ম নেয়া  অতি স্বাভাবিক ব্যাপার।  প্রতিদিন ভাবি বোন পাড়া  প্রতিবেশি কত শত নারীর  সন্তান হচ্ছে  । হ্যাঁ প্রথম সন্তানের বেলায় একটু বাড়তি উচ্ছ্বাস থাকে, প্রথম বলে কথা! নতুনের কদর বরাবরই একটু বেশি।   কিন্তু যাদের দুই এর অধিক সন্তান তাদের পেটে কখন সন্তান আসে আর কখন ভূমিষ্ট হয় তার খবর  অনেকেই রাখেনা। রুনা বাস করে গ্রামে।  গ্রামের  ঘরে ঘরে চার পাঁচটা করে সন্তান।  গ্রামের মানুষ গোঁড়া, ধর্মভীরু। সন্তান জন্ম নেয়াকে তারা খোদার দান মনে করে। খোদার উপর খোদগারি করার সাহস ওদের নেই।  তারপরও সন্তান নেই রুনার ঘরে। রুনার স্বামী আসিফও পিতা মাতার একমাত্র সন্তান।

তাই রুনার সন্তান সম্ভবা হবাব খবরটা বিশেষ ঘটনার জন্ম দিল শান্ত স্নিগ্ধ নিস্তরঙ্গ গ্রামটাতে।  নদীতে গলা পানিতে দাঁড়িয়ে বউ ঝিরা গল্প করল

:জানিস মোল্লা বাড়ির বউ রুনার সন্তান হবে, আহারে কত ডাক্তার, কত বদ্যি, কত পানিপড়া।

: যাক শেষ পর্যন্ত তাহলে খোদা মুখ তুলে চাইলেন। একটা সন্তানের জন্য কি আকুলি বিকুলি মেয়েটার!

: হবেনা, সাত সাতটা বছর বিয়ে হয়েছে, স্বামীটা বড় ভাল। অন্য কোন স্বামী হলে কবে আর একখানা বিয়ে করে বসত। তাছাড়া কত ধন সম্পত্তি। ওই একটাই ছেলে  মোল্লা সাহেবের, তার যদি সন্তান না হয় বড়ই আফসোসের কথা।

: যাক এখন ভালয় ভালয় সন্তানটা প্রসব হলেই হয়। বউটা বড় ভাল।  

একই আলোচনা ঢেঁকিঘরে,  কলতলা, কুয়োতলা, দোকান আর মহল্লায় । ছোট এলাকায় আলোচনার তেমন কোন বিষয় থাকেনা। তাই কোন একটা বিষয় জন্ম নিলেই  সেটা আলোচনার খোরাক হয়ে দাঁড়ায়। তাও আবার যা-তা বিষয় নয়, গ্রামের সবচেয়ে ধনী গৃহস্থ মোল্লা সাহেবের একমাত্র ছেলের  ঘরে সন্তান আসছে বিয়ের সাত সাত বছর পর। এত আর ফেলানির মার একাদশ সন্তান জন্ম নেবার ঘটনা নয় যে মানুষ শুনেই ভুলে যাবে।  

মোল্লা বাড়িতে সাজ সাজ রব। মোল্লা  গিন্নির কাঁথা বানানোর ধুম পড়েছে । চিড়ে কোটা আর মুড়ি ভাজা হচ্ছে কোলা কোলা ।  আচার কাসুন্দি বোতলের পর বোতল ভরেও কোন তৃপ্তি নেই তার। রুনা দেখে আর ভয় পায় । একটাই তো মানুষ সে। পেটে তো তার বক রাক্ষস ঢোকেনি  যে ইচ্ছে  করলেই কাড়ি কাড়ি খাবার খাওয়া যায়। কিন্তু  না খেলে নিস্তার নেই। শাশুড়ি বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াচ্ছেন। শুরুর পাতে দু চামচ গাওয়া ঘি আর শেষ পাতে ঘরে পাতা একটু দই পড়তেই হবে।  নইলে গিন্নির স্বন্তি নেই।  দুবেলা জামবাটি ভরে সরসমেত  দুধ সাথে দুটো ডিম এ না হলে কি পুষ্টি হয়। মা ঠিকমত খেলেই সন্তান হবে নাদুস নুদুস,  স্বাস্ব্যবান।  মোল্লা  গিন্নির এসব কাজ দেখে আশপাশের বাড়ির বৌ ঝিরা আড়ালে হাসে, টিপ্পনিও কাটে ।

: মাগো মা কি আদিখ্যেতা, ছেলেপুলে যেন আর  কারো হয়না। বউকে খাইয়ে খাইয়ে ড্রাম বানিয়ে ফেলছে।  শুধু কি তাই,  বউটাকে নড়ে বসতে পর্যন্ত দেয়না।

কেউ কেউ সামনে বলতেও ছাড়েন না।

: বউকে অত খাইও নাতো বুবু। পেটের বাচ্চা বড় হয়ে যাবে। ডেলিভারিতে কষ্ট হবে। আর ওকে দিনরাত বসিয়ে না রেখে টুকটাক কাজ করতে দিও। নইলে কিন্তু শরীরের কলকব্জা জং ধরে যাবে। যত খাটবে তত সহজে ডেলিভারি হবে। সন্তান জন্ম নেবে  পানির মত তরতর করে।

টিপ্পনি, কথা শুনানো কোন কিছুতেই দমেন না শাশুড়ি। দমবেন কেন, এমন বউ অনেক পুণ্য করলে পাওয়া যায়। নিজে তিনি চিররোগা। সেবার যখন তিনমাস  একটানা বিছানায় পড়ে ছিলেন স্বজ্ঞানে একটা সেকেন্ডের তরে  দুচোখের পাতা এক করেনি ওই বউ। হঠাৎ করে নিজের অজান্তে  যদি ঘুমিয়ে পড়েছে, পরক্ষণে  ঝাড়া দিয়ে উঠে বসেছে ।  অসুস্থ রোগিকে সময় মত খাওয়ানো, গোসল করানো, বাথরুমে নিয়ে যাওয়া সেকি সহজ কাজ! সব করেছে ওই বউ এক হাতে।  বউএর একমাত্র ভাইটার তখন কি বাড়াবাড়ি অসুখ। বাপের বাড়ি থেকে বার বার তাগিদ এসেছে বউমাকে পাঠাবার জন্য। একবারটির জন্য মা মরা ভাইটাকে দেখতে যায়নি বউ। অথচ লুকিয়ে কেঁদেছে দিনের পর দিন। তাকে আড়াল করে কাঁদলেও শাশুড়ি  সেটা ঠিকই বুঝতে পেরেছেন। এমন বউ হাতে গড়ালেও হয়না। তা সেই সোনার টুকরো বউকে আদর আহ্লাদ করবে  নাতো করবে কাকে!

মোল্লা সাহেবের  মনেও বড় আনন্দ। আনন্দ বাড়লেই তার নস্যি টানা বাড়ে। সমানে নাকে নস্যি লাগাচ্ছেন আর একটু পর পর পিক ফেলছেন । পায়ের কাছে বসা বছরওয়ারি দুজন কামলা।  দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলে যাচ্ছেন নাতি নিয়ে তার নানান স্বপ্নের কথা।  কিভাবে তাকে নিয়ে সাধ আহ্লাদ করবেন, কি নাম রাখবেন এইসব।  রুনার স্বামী আসিফ আরো এককাঠি উপরে। আসিফ মফস্বল শহরে সরকারি চাকুরি করে।  বড় ইচ্ছে তার বৌকে সাথে  নিয়ে শহরে থাকার। কিন্তু আব্বা মায়ের বাধার কারণে সেটা পারেনি। তাছাড়া  মা অসুস্থ। তাই বাসে ঝুলে প্রতি সপ্তাহেই তাকে গ্রামে আসতে হয়। দূরত্বও নেহাত কম না।  দু‘একবার যাতায়াতে তেমন মনে হয়না । কিন্তু  নিয়মিত যখন আসতে হয় তখন দুরত্বটা বড়ই গায়ে লাগে। ওর হয়েছে উভয় সঙ্কট, না পারে আব্বা মাকে কষ্ট দিতে, না পারে বউকে রেখে একা থাকতে। এর মাঝে বউএর সন্তান সম্ভবা হবার খবরে সে  আনন্দে দিশেহারা। সাথে এ ভয়ও আছে,  সন্তান হলেও কি আব্বা মা রুনা আর সন্তানকে এখানে ধরে রাখবেন।  নাকি ও সাথে নিয়ে যেতে পারবে স্ত্রী সন্তানকে! তবে  এবার আর কিছুতেই শুনবেনা আসিফ। প্রয়োজনে সে শহরে বড় বাসা নেবে, আব্বা মাসহ সবাইকে নিয়ে থাকবে। মাকে ভাল ডাক্তার দেখাবে । আর এখানকার জমিজমা ঘরদোর দেখাশুনার একটা ভাল ব্যবস্থা করবে।  নিজে  এসে দেখে যাবে মাসে দু‘বার। নানান ধরনের প্রস্তুতি চলছে  তার মনের মধ্যে। কেমন দোলনা কিনবে, কি পোশাক আর কেমন খেলনা নেবে সে।

আসিফের দৃষ্টিতে মুনা এক অসাধারণ মেয়ে। কোন চাহিদা নেই, বড় অল্পে তুষ্ট। বিয়ের এই সাত সাত বছরে তার কাছে না চেয়েছে  কোন শাড়ি গয়না না টাকা পয়সা। বরং সুযোগ পেলেই আসিফের কাছে বায়না ধরে শশুর শাশুড়ির কাপড় চোপড়, স্যান্ডেল জুতো হরলিক্স ওভালটিনের ব্যবস্থা করেছে। আসিফের  ভাল মন্দের দিকেও তার তীব্র নজর । প্যার্ন্ট সার্ট পুরোনো হবার আগেই ওর জবরদস্তিতে নতুন কিনতে হয়।  বাড়িতে যাবার সময় ব্যাগ ভরে কাপড় নিয়ে যেতে হয় আসিফকে। রুনা নিজ হাতে কেঁচে পরিষ্কার করে গুছিয়ে দেয়,  জুতোয় কালি করে। আশ্চর্য এক মেয়ে,  নিজের জন্য কিছুই যেন ওর চাইবার নেই! একদিন আসিফ খানিকটা রাগ হয়েই ওকে বলেছিল,

:তুমি কেমন মেয়ে বল দেখি, কখনও কোন কিছু চাও না আমার কাছে। দিতে গেলেও  না না করো। আমারও তো ইচ্ছে  করে স্বামী  হিসেবে তোমাকে কিছু দিতে।

রুনা হেসেছিল। আসিফের অসন্তোষে ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে ওর চুলে হালকা একটু নাড়া দিয়ে বলেছিল,

:আমাকে কিছু দিতে চাও তাইত। বেশ ঢাকা থেকে আসার সময় আমার জন্য মাঝে মাঝে দু’একখানা করে বই আনবে। আর হ্যা সারা সপ্তাহের পুরোনো খবরের কাগজগুলো আমার জন্য নিয়ে এসো তাতেই আমার হবে।

:ব্যস মাত্র এতটুকুই । না কোন শাড়ি, না গয়না, না সাজের জিনিস ! অদ্ভুত মানুষ তুমি!

: আর একটা সাধ আছে আমার। বড় সাধ, অনেক দিনের সাধ । কিন্তু জানিনা সেটা পুরণ হবে কিনা।

: কি বলনা, দেখি আমি সাধটা পূরণ করতে পারি কিনা।

:দেখ সাধটা  এমন না যে তুমি বাজার থেকে কিনে পূরণ করে দেবে

:তবু বল, চেষ্টা করে দেখি

:জানো আমার বড় সাধ মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে কাছ থেকে দেখা । সেটা কি কখনও সম্ভব হবে!

আসিফ চুপ করে গেছিল। এ সাধ ওর পক্ষে পূরণ করা সত্যিই কঠিন। মহান নেতা  থাকেন ঢাকায়। তবে  সে থাকাটা নামেই ।  বছরের অধিকাংশ সময় জেলে কাটান। আর যখন  বাইরে থাকেন তার বেশির ভাগ  সময় চষে বেড়ান সারা দেশ।  আসিফ রাজনীতির সাথে যুক্ত না । তার এমন জানাশোনা কেউ নেই যে নেতার  বাসা বা অফিসে নিয়ে গিয়ে তার সাথে  রুনার দেখা করাবে। তাছাড়া আব্বা মা রুনাকে ছাড়বেনও না।

আসিফকে চুপ করে থাকতে দেখে রুনা বলেছিল,

: হবেনা না? থাক থাক মন খারাপ করোনা।

এরপর আর কখনও  সাধের কথাটা বলেনি রুনা। তবে কাগজে মহান নেতার  মিটিংএর কোন খবর ছাপা হলে ও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে।  আর সে বিষয়ে আসিফের সাথে আলাপ করে। তাতে আসিফ বুঝতে পারে বঙ্গবন্ধুকে দেখার ইচ্ছেটা ওর মনের মাঝে গুমরে গুমরে মরে। আসিফ মন খারাপ করবে বলে ওকে বলে না।  ভাবে আর মন খারাপ হয় আসিফের। একটাই তো চাওয়া রুনার, সেটাও পূরণ করতে পারল না সে। বিয়ের পর থেকেই আসিফ খেয়াল করেছে, পড়তে বড় বেশি ভালবাসে রুনা। দোকান থেকে ঠোঙ্গায় ডিম ডাল আনলে সে ঠোঙ্গা পর্যন্ত পড়ে।  খুব বেশি লেখাপড়া করেনি রুনা।  গরীব ঘরের মেয়ে, তাতে মা মারা গেছেন খুব ছোটবেলায। অল্প বয়সেই ওকে বাপের সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল। তবে যেটুকু  পড়েছে মন দিয়ে পড়েছে। হাতে বই পেলে শেষ না করে ওঠেনি।  রাস্তায় পড়ে থাকা কাগজ আর ঠোঙ্গা পড়া রুনার ছেলেবেলার  অভ্যাস। আব্বার বাজারে একটা  মুদি দোকান ছিল।  একদিন রাতে দোকান থেকে ফেরার পথে আব্বা একখানা খবরের কাগজ সাথে করে এনেছিলেন । কাগজটা  উল্টাতেই শেখ মুজিবুর রহমানের  ছবির উপর চোখ পড়েছিল  রুনার। রুনা আব্বাকে বলেছিল,

:ইনি কে আব্বা?

: পড়ে দেখ মা , পড়ে দেখ, ভাল করে চিনে রাখ।  ইনি আমাদের মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ।

সেই থেকে নেতার  সাথে রুনার  পরিচয়। আর তখন থেকেই কোথাও নেতার কোন খবর পেলে তা পড়ে আর ছবি পেলে কেটে রাখে ।  

মোল্লা সাহেব ছেলের জন্য গ্রামে গ্রামে সুন্দরী  পাত্রী  খুঁজছিলেন। চমৎকার রঙ আর আকর্ষণীয় চোখের জন্য এক দেখাতেই মেয়ে পছন্দ হয়ে  গিয়েছিল মোল্লা সাহেবের।  বিয়ে হয়ে গিয়েছিল দ্রুত। রুনার আব্বা মা মরা মেয়েটাকে ভাল পাত্রে বিয়ে দিতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। বিয়ের পর এ বাড়িতে এসে অসুস্থ  শাশুড়ির হাত থেকে সংসারের ভার  রুনার হাতে এসে পড়েছিল আরো দ্রুত। কিন্তু পড়ার অভ্যাসটা থামেনি । আর পড়তে পড়তেই সে জেনেছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নানান  কথা। জেনেছে এ দেশের পরাধীনতা, পাকিস্তানীদের শাসন শোষণ, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা  আর বাঙাালির একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের কথা। মনে মনে রুনা সে স্বপ্নের সাথে  একাত্ম হয়ে  গেছে । আর সেই স্বপ্নের নায়ক বঙ্গবন্ধুকে  কাছ থেকে দেখার বাসনা লালন করেছে দিনের পর দিন।

দেশের অবস্থা ক্রমাগত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।  ১৯৬৬ এর ছয় দফার  পর পরই শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হল। ৬৮ তে  ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে জড়িয়ে তাঁকে  প্রধান আসামী করা হল।  উনসত্তরের গণ আন্দোলনে ঢাকায় শহীদ হলেন আসাদুজ্জামান, মতিউর রহমান আর সার্জেন্ট জহুরুল হক  রাজশাহীতে শহীদ হলেন শামসুজ্জোহা।  সারা দেশের লোক কাঁদল তাদের জন্য।   ৬৯ এ এই মহান নেতাকে ছাত্র জনতার পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিলেন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমদ। ৭০ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে টানা তিনবছর জেলে কাটিয়ে ছাড়া পেলেন বঙ্গবন্ধু।  জেল থেকে মুক্তি পেয়েই    ঝাঁপিয়ে  পড়লেন দেশের কাজে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে তিনি মুক্তিপাগল জনতাকে সংগঠিত করতে লাগলেন। তাদের বোঝাতে লাগলেন  পরাধীনতার কুফল আর স্বাধীনতার সুফল ।  কখনও আবেগময় কখনও   জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিলেন তিনি।  তার সেই বক্তৃতায় জনমনে উন্মাদনা জাগল । তারা জেগে উঠল দেশের স্বাধীনতার পাবার আকাক্ষায়। আর সেই সময়েই দীর্ঘ সাত বছর পর অন্তঃসত্তা হল রুনা।

প্রতি সপ্তাহে গ্রামে এসে আসিফ যথাসাধ্য রুনার দেখাশুনা করে। ডাক্তারের সাথে কথা বলে, ওষুধ পথ্যি এনে দেয়।  গ্রামে ভাল ডাক্তার নেই, বাচ্চা হয় দাই এর হাতে। এসব নিয়েও আসিফের বড় চিন্তা। রুনাকে শহরে নিয়ে রাখতে পারলে হত।  কিন্তু মায়ের কাছে কথা পাড়তেই উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন,

:বাবা মেয়েলি ব্যাপার মেয়েদের বুঝতে দে, আর বাবা তুই এভাবেই জন্মেছিস, তোর আব্বাও।

মোল্লা সাহেব আরও এককাঠি উপরে উঠে বলেছেন,

: আসিফের মা তোমার ছেলেরে বলে দিও, আমি এ বাড়িতে দাই আর ডাক্তার বদ্যির হাট বসিয়ে দেব । আমার প্রথম নাতি বলে কথা।

রুনার যে কোন সময় ব্যথা উঠতে পারে । অচিরেই সন্তান আসার লক্ষণ এখন পরিস্ফুট ।  এই সময়ই  খবর এল বঙ্গবন্ধু আসছেন এ গাঁয়ে বক্তৃতা করতে। স্কুল মাঠে  সভা হবে।  রুনার মনে আশা , এবার এতদিনের সাধ পূর্ণ  হবে তার  । সে দেখতে পাবে বঙ্গবন্ধুুকে কাছ থেকে।  আসিফ বাড়িতে   এলে রুনা বলল,

:শুনলাম  বঙ্গবন্ধু আসছেন,  আমাদের গ্রামে  বক্তৃতা করবেন। কি আনন্দের কথা বল দেখি । আমি  ওনার সাথে দেখা করব  । ওনার পা ছুঁয়ে সালাম করব।

: তা করবে । কিন্তু

: এর মধ্যে কোন কিন্তু নেই।

দৃঢ় কন্ঠে বলল রুনা। এমন ভাবে সাধারণত কথা বলেনা ও। অফিস থেকে সাতদিনের ছুটি নিয়ে  এসেছে  আসিফ। এখন  রুনাকে সময় দেয়া দরকার।  সর্বক্ষণ  চোখে চোখে রাখছে ওকে।  কখন কি লাগে খেয়াল করছে, ওর সাথে গল্প করছে ।

সেদিন বিকালে স্কুল মাঠে সভা। মস্ত বড় প্যান্ডেল টানানো হয়েছে।  সকাল থেকেই ঘরে ঘরে তোড়জোড়। পুরুষরা কাজ কাম সকাল সকাল  সেরে ফেলছে বক্তৃতা শুনতে যাবার জন্য । রুনার মনে মনে প্রস্তুতি ও বক্তৃতা শুরু হবার আগেই গিয়ে মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে।  বঙ্গবন্ধু মঞ্চে  ওঠার সময় টুপ করে ওনার পায়ে একটা সালাম করবে। তারপর বসে বসে বক্তৃতা শুনবে। স্কুলটা বাড়ির  একেবারে কাছে। কাজেই কোন সমস্যা হবেনা। দুপুর নাগাদ প্রচুর লোক জমে গেল সভাস্থলে।  আর দুপাশের রাস্তায় যেন মানুষের ঢল নেমেছে ।

জানালায় দাঁড়িয়ে এই জনস্রোত দেখছিল রুনা। তখনই শুরু হল  প্রসব যন্ত্রণা।  যন্ত্রণা ক্রমাগত বাড়ল।  রুনা আপ্রাণ চেষ্টা করল সন্ধ্যে পর্যন্ত  সে যন্ত্রণা চেপে রাখার ।  তাকে যে বঙ্গবন্ধুকে দেখতে যেত হবে। কিন্তু পারল না,  শাশুড়ির চোখে ধরা পড়ে গেল রুনা।  দাইএরা এসে ভিড় করল বাড়িতে।  ওরা চেষ্টা করতে লাগল রুনার যন্ত্রণা কমাবার। রুনার মুখে শুধু একটাই কথা.

:তাড়াতাড়ি চাচি তাড়াতাড়ি, আমার যে একটা কাজ আছে।

: যত কাজই তোমার থাকুক  মা, এ কাজ তাড়াতাড়ি করার না। যখন সময় হবে তখন আপসে হয়ে যাবে।

রুনা প্রসব যন্ত্রণার মধ্যেই শুনতে পেল বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত গলা, মুর্হূ মুর্হূ স্লোগান। আর এক সময় শুনতে শুনতেই  ওর আধেক চেতন আধেক  অচেতনের মাঝে অনেক যন্ত্রণার উপশমে জন্ম নিল দেবশিশুর মত ফুটফুটে এক ছেলে। এর পর ঘুমিয়ে পড়ল রুনা।

অনেক রাতে ঘুম ভাঙার পর রুনা আসিফকে মাথার পাশে বসে থাকতে দেখে প্রশ্ন করল,

: বঙ্গবন্ধু চলে গেছেন তাই না?

:  না যেতে পারেননি । পাশের গ্রামের লোকেরা দাবি তুলেছে কাল ও গ্রামে  বক্তৃতা করতে হবে।  তাই উনি থেকে গেছেন।

: কোথায় আছেন?

:  মন্ডল বাড়িতে।

: তুমি পাশের ঘরে গিয়ে একটু ঘুমিয়ে নাও। আমি এখন ভাল আছি।

 

সকালে ঘুম ভেঙে মোল্লা গিন্নি অবাক হয়ে দেখল ঘরে রুনা  নেই। দাই পাশে শুয়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছে।  কোথায় গেল, কোথায় ? বার বার খুঁজলেন মোল্লা গিন্নি, ঘর উঠোন বারান্দা বাথরুম কলপাড় পুকুরঘাট, বারবাড়ি। তারপর চেঁচিয়ে উঠলেন। সদ্য ঘুম ভেঙে চোখ  কচলাতে কচলাতে আসিফ উঠে খবর শুনল। এক মুর্হূর্তও দেরি না করে দৌড় দিল সে।

মন্ডল বাড়িতে সে রাতে রাত নামেনি। মানুষ আসছে আর আসছে, বৌঠক ঘরে বসে আছেন বঙ্গবন্ধু, চারদিকে লোকে লোকারণ্য। সেই লোক ঠেলে একটা মেয়ে ঢোকার চেষ্টা করছে প্রাণপণ । বার বার পিছিয়ে  পড়ছে  সে।  হেলে পড়ছে তার দুর্বল শরীর। গলা দিয়ে স্বর বেরুচ্ছে না।  তবু বলছে,

: আপনারা একটু সরুন না,  সরুন।  আমাকে একটু বঙ্গবন্ধুর কাছে যেতে দিন।

কেউ সরছে না, জায়গা দিচ্ছে না। একসময় সর্বশক্তি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল মেয়েটা,

:বঙ্গবন্ধু ওরা আমাকে আপনার কাছে যেতে দিচ্ছে  না।

এরপর হেলে পড়ে গেল মেয়েটা, চেতনা হারাল।  

যখন জ্ঞান ফিরল রুনা অবাক হয়ে দেখল, ওর মুখের উপর ঝুঁকে তাকিয়ে আছেন বঙ্গবন্ধু। ¯স্নেহমাখা চোখে  ওর দিকে তাকিয়ে বললেন,

: তুমি কে মা?

ঠিক তখনই  লোক ঠেলে ঝড়ের বেগে প্রবেশ করল আসিফ।  রুনাকে দেখে  চেঁচিয়ে উঠল,

:কি হয়েছে ওর কি হয়েছে ?

রুনার মাথা কোলে তুলে নিয়ে  বঙ্গবন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল,

:ও আমার স্ত্রী রুনা। ছেলেবেলা থেকে ওর সাধ আপনাকে একবার কাছ থেকে দেখার। কাল সন্ধ্যেয়  ওর একটা সন্তান হয়েছে। অনেক কষ্ট  পেয়েছে দিনভোর।  তাই আপনার সভায় যেতে পারেনি। আমাদের  কাউকে না জানিয়ে  ও  এই সাতসকালে  উঠে এতটা রাস্তা হেঁটে আপনাকে দেখতে  এসেছে।  ওদিকে আমরা ওকে খুঁজতে খুঁজতে অস্থির ..ভয়ে উৎকণ্ঠায়

: বলছ কি তুমি বাবা, তাহলে তো তোমার সেই সন্তানকে না দেখে আমার যাওয়া হবেনা।

মোল্লা বাড়ির উঠোনে বঙ্গবন্ধু।  চারপাশে ভিড় করে দাঁড়ানো অসংখ্য লোক। বাচ্চাটাকে বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে নামিয়ে রেখে রুনা বলল,

:বঙ্গবন্ধু ওকে একটু আশীর্বাদ করে দেন

বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলেন বঙ্গবন্ধু। বললেন,

: আশীর্বাদ করি, প্রার্থনা করি অচিরেই  যেন দেশ স্বাধীন হয় । আর সেই স্বাধীন দেশের স্বাধীন মাটিতে তুই যেন মাথা উঁচু করে বীরের মত বাঁচতে পারিস।

: বঙ্গবন্ধু আপনি অনুমতি দিলে আমি ওর নাম রাখতে পারি মুজিব।

: কেন নয় মা, কাছে  আয়তো দেখি

বঙ্গবন্ধুর কোলে মুজিব, আর এক হাতে রুনাকে কাছে টেনে নেন তিনি। এ যেন পিতা কন্যা আর নাতির এক অপূর্ব সম্মিলন।

আফরোজা পারভীন

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment