পদ্মাপারের চালচিত্র

পদ্মাপারের চালচিত্র আনোয়ার কামাল

ভোরের কুয়াশা ভেদ করে যতদূর চোখ যায় আলফাজ মোল্লা ততদূর চেয়ে চেয়ে দেখে, আর মনে মনে তৃপ্তির একটা ঢেকুর তোলে। আহারে! কি আনন্দ! পদ্মার পানি তরতর করি সরি যাচ্ছে, আর পলি পড়ছেরে। ইডা পলি না সোনা, কাঁচা সোনা। আমার বুক জুড়ানো ধানে গোলা ভরার আগাম বার্তা। আলফাজ মোল্লার বেতফলের মতো ঘোলাটে চোখ রাতে বেরুনো চিতাবাঘের চোখের মতো জ্বল জ্বল করে ওঠে। হাতের লাঠিটা বার কয়েক পায়ের কাছে জমে থাকা পলিতে গুতো দিয়ে পরখ করে নেয়, এবার কি পরিমাণ পলি পড়েছে। আলফাজ মোল্লা একাই হেঁটে চলে প্রায় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত। ঠিক যেখানে মিন মিন করে পদ্মার পানি ভাটিতে নেমে যাচ্ছে সেখানে।

এবার সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে যে করিই হোক জাগি উঠা এ জমিটুকু তাক দখল করতিই হবি। গেল বছর যে ভুলডা সে করিছিলি এবার আর তার পুনরাবৃত্তি করতে চায় না। দারুণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে, হাক ছাড়ে:

শালার রহমত কাজী। এবার তোর একদিন কি আমার একদিন। কত ধানে কত চাল এবার বুঝবা বেটা, মোল্লার সাথে টক্কর দিবার সাধ এবার তোক মিটি দেবো। তোর বাপ যা পারিনি তা তুই গেল বছর করি দেখাইছিস। মোল্লার জমির ধান তোর গোলায় গেছে। এবার আর তা হবি না বাপু। এবার এসব জমি আমার দখলে থাকপি। দেখি তুই কি করি এবার দখল লিস। নিজে নিজে বিড় বিড় করে আলফাজ মোল্লা বকতে থাকে।

পূব আকাশে সূর্য উঠতেই ধীরে ধীরে কুয়াশা কেটে যেতে থাকে, আর পদ্মার চরের জমি চিকচিক করে ওঠে। আলফাজ মোল্লার চোখ আরো ঝলসে ওঠে। হাতে তুলে নেয় একমুঠো কাঁদা মাটি। নেড়ে নেড়ে ভালো করে পলির স্তর পরীক্ষা করে। না এবার বালির ভাগ কম দেখা যাচ্ছে। মাটির পরত বেশি, বাহ! সোনা ফলবি, এবার এই চরে সোনা ফলবি। মোল্লা তার বাপ দাদার আমল থেকে দেখে আসছে। চরে পলিমাটি কতখানি পড়লে ধান কেমন জন্মে। আবার ধান কবে রোপন করতি হবি, বান আসার আগেই আবার কাটতি হবি। এসব তার মুখস্ত। কারণ, সেতো মার পেট থেকে পড়েই চর দখলের লড়াই সংগ্রামে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে।

দাদার বিশাল জমির দাগ ছিলো। এই সর্বনাশা পদ্মা তার বেশিরভাগ কেড়ে নেয় দাদার আমলেই। বাপের আমলে যা ছিলো, তা আবার বেহাত হতে হতে আর নদীতে ডুবে যেতে যেতে অবশিষ্ট খুব সামান্যই আছে। যা দিয়ে তার ছেলে-মেয়ে নিয়ে পনর জনের সংসার চলা কঠিন। তার উপর কামলা-রাখাল এদের খরচ। পাঁচ মেয়ে এক ছেলে স্কুলে পড়ে। মেজো মেয়েটা এবার ম্যাট্রিক পাশ দেবে। তার খরচ কত! নিজে বেশি দূর লেখাপড়ায় আগাতে পারেনি। বাপের সাথে চর দখল করতে করতে আর মামলা মোকদ্দমায় জানটা ফাতা ফাতা হয়ে গেছে। স্কুলে যাবে কখন। আর বাপেরতো কোন ভাতের অভাব ছিলো না যে তাকে স্কুলে যেয়ে লেখাপড়া করতেই হবে। মাস্টারের বেতের বাড়ি খাবে। চাকরি করতেই হবে, এমন তো না। তবে আলফাজ মোল্লা এখন বোঝে, সে ভুল করেছে। মাস্টারের হাতে একদিন নিম গাছের ডালের জোড়া বেতের বাড়ি খেয়ে সেই যে এক দৌড়ে বাড়ি চলে আসে তারপর আর কোনদিন সে ঐ স্কুলমুখো হয়নি। লেখা-পড়া সিঁকেয় তুলে রেখে এ চরের রাজনীতিতে জড়িয়ে জীবন-যৌবন সবই গেছে। মামলা মোকদ্দমা-খুন খারাবি সেতো তার কাছে নস্যিতুল্য। আরে বাপ চরের জীবন, খুন-খারাবি একটু আধটু হবিই। এটা কোন ব্যাপার হোলি।

বড় মেয়েকে মাত্র বিয়ে দিয়েছে। মেয়েকে এসএসসি পাশ করানোর পর পরই বিয়ে দিয়ে দেয়। ছেলেটা ভালো, শিক্ষিত ছেলে। তবে বাড়ির অবস্থা তেমন ভালো না। জমি-জমা তেমন নেই বললেই চলে। ছেলেটার ব্রেন ভালো, তাই বিএ পাশ করেই চাকরিটা পেয়ে যায়। আর ঐ ছেলেকে জামাই করার কারণও একটাই। কোর্টে চাকরি করে। মোল্লাও চতুর লোক। মুরগি ধরার মতো ছেলের বাপকে খপ করে চেপে ধরে। গ্রাম থেকে জেলা সদরে কোর্টে যাবে তারতো মটরসাইকেল লাগবে। আর কাঁচা বাড়ি পাকা করে দেবে। মেয়ের ঘর বলে কথা। ছেলের বাপ না করতে পারে না। কারণ, এ কামালপুরের চরে মোল্লা পরিবাবের মুখের ওপর একটা কথা না করা কিন্তু অত সহজ না। তার উপর চাল-চুলোহীন সদরউদ্দিনের মতো খেটে খাওয়া মানুষের। তাই বিয়েটা হয়ে গেল। অলফাজ মোল্লার মাথা থেকে একটা বোঝা যেন হালকা হলো। আরো পাঁচ মেয়ে আছে। হবে, হবে সবারই এভাবে একে একে শিক্ষিত ছেলে ধরে ধরে সে মেয়েদের পার করবে। আর তার জন্যইতো মেয়েদের স্কুলে পড়ায়। একটা ছেলের জন্য, বংশরক্ষার জন্য সে ছয় মেয়ের পর এক ছেলে পেয়েছে। বংশের প্রদীপ। আল্লাহ্ তার দোয়া কবুল করে এই ছেলেকে দিয়ে তার ঘর আলো করে বংশরক্ষা করেছে। ছেলেকেও সে স্কুলে পড়ায়। ছেলে এখন ক্লাস ফাইভে পড়ে। আলফাজ মোল্লা স্বপ্ন দেখে ছেলেকে সে ব্যারিস্টারি পড়াবে। যাতে জীবনে মামলা মোকদ্দমায় হেরে যেতে না হয়। যত টাকা লাগে খরচ করবে, তবু তার ছেলে, বাপধন যেন ব্যারিস্টারি পাশ দেয়। এই চরের সে হবে সবচে বেশি শিক্ষিত, জ্ঞানী। দশ গাঁয়ের লোক তাকে দেখতে আসবে। মানুষজন তার গলায় ফুলের মালা দেবে। বাবা হিসেবে তার গর্বের সীমা থাকবে না। এসব স্বপ্নেই বিভোর থাকে আলফাজ মোল্লা।

বাড়ি ফিরেই আলফাজ তাড়াহুড়ো করে নাওয়া খাওয়া শেষ করেই জেলা শহরের দিকে রওনা হয়। আজ তার মামলার তারিখ আছে। হাজিরা দিতে হবে। শালার মামলায় তাকে খাইলো। মাসের মধ্যে ৪/৫ দিন তার মামলা মোকদ্দমায় কোর্টে হাজিরা দিতে হয়। একটাও শেষ হয় না। খালি খালি তারিখে তারিখে হাজিরা দিয়ে উকিলের হাতে কয়টা ট্যাকা গুঁজি দিতে হয়। ফের তারিখ পড়ে। জমি জাতির মামলা সহজেই শেষ হতে চায় না।

কোর্টের বারান্দায় আলফাজ মোল্লার সাথে দেখা হয়ে যায় কামালপুর চরের দুর্ধর্ষ লাঠিয়াল রুস্তমের সাথে।

ক্যারে রুস্তম জেল থেন ছাড়া পালু কবে রে?

চাচা তুমি কি চাও আমি সারা জীবন জেলেই পচি মরি। রুস্তমের কথার ঝাঁজে আলফাজ মোল্লা খানিক এগিয়ে যেয়ে রুস্তমের কাঁধে হাত দিয়ে বলে

:আমি কি তাই বলিছি নাকি? আমি যে তোক কত ভালোবাসি তা কী তুই জানিস নি।

:জানি চাচা, জানি। তুমি আমাক সেল্টার না দিলি কামালপুরে আমার টিকা দূরের কথা, এই পাবনা জেলা ছাড়া লাগতি। আজই জামিন পাইছি চাচা। তা তোমরা কেমন আছো? গিরামের খবরা খবর কী? চর জাগি উঠতেছে নাকি? আমি জেলের মধ্যে থাকিও অনেক খবরই পাইছি। জেলের মধ্যি সব খবরই পাওয়া যায়।

:খবর সবই ভালো। চরে এবার পলি পড়েছে বেজায় রকমের।

উত্তরে মোল্লা গদগদ ভঙ্গিতে বলে ওঠে। আর তোর এবার আগের মতো আমার সাথে কাম করা লাগবি। কী ঠিক আছে?

:করবো লে ক্যা। সেই কবে থেনে তো তোমার সাথেই আছি। তুমি যা করতে কও, আমি তাই করি। আমার কাম হুকুম তামিল করা। কী করতে হবি খালি ইশারা মারবি, তারপর যা করার তা দেখতিই পারবি।

রুস্তমের কথায় মোল্লা আশ্বস্ত হয়। ধড়ে পানি আসে। তার চোখ জ্বল জ্বল করতে থাকে আর মনের মধ্যে জমানো সব আহ্লাদ মনে হয় লাফ দিয়ে ক্যাঙ্গারুর বাচ্চার মতো থলে থেকে বেরিয়ে আসবে।

:হ-হ-হ। তাইতো। তুই যে আমার ছাবালের মতোরে। সেই ছোটবেলা থেনে তোক কোলে-পিঠে করি মানুষ করে আনছি। রুস্তম বাপ আমার আজ বাড়িত যা। বাপ মার সাথে দেখা কর। কত দিন পর হাজত থেনে বারালু। যা যা বাড়িত যা। দুই তিন দিন পর আমার সাথে দেখা করিস। কাম দেবোনে। আর লে এই কয়ডা ট্যাকা লে। বলে পাঁচশো টাকা রুস্তমের হাতে গুুঁজে দেয়। রুস্তম তা নিয়ে সালাম দিয়ে চলে যায়।

জোহরের অজান হতেই আলফাজ মোল্লা কোর্টের বারান্দা থেকে নেমে মসজিদের দিকে হাঁটা দেয়। তার মামলা টুমোরো হয়ে গেছে, বলেই উকিল সাহেব একটা হাসি দেয়। উকিল সাহেব যথারীতি তার ফিস পাঁচশো টাকা ছ্যাপ দিয়ে গুনে নেয়ার পর আলফাজ মোল্লাকে জানায়, আজ জজ সাহেবের জরুরি মিটিং আছে। কোর্ট আজ বসবে না। শুধু হাজিরা দিয়ে চলে যান। কাল আবার আসবেন। অগত্যা বাড়ি মুখো হওয়া ছাড়া তার আর কোন কাজ নেই। তাই নামাজ পড়েই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

চরে রাষ্ট্র হয়ে যায় এবার অনেক চর জেগেছে। গতবারের চেয়ে চারগুণ বেশি। আর এবার চরে বালির চাইতে পলি বেশি। আবাদি জমিতে দখল দায়িত্ব নেয়ার জন্য যে যার মতো দলবল গোছাতে থাকে। আর লাঠিয়ারদেরও কদর বেড়ে যায়। তারাও মোচে তা দেয়। চরজীবন এক বিচিত্র জীবন। মানুষের জীবনযাত্রা নানা মাত্রিকতায় চালিত হয়। দলাদলি আর কোন্দল যেন তাদের নিত্য সঙ্গী। খুন-খারাবি হরহামেশা লেগেই থকে। কে কার উপর খবরদারি চালাবে তার একটা কসরৎ সব সময় চলতে থাকে। সেই সাথে উপজেলা শহর থেকে যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ দূরে ও দুর্গম হওয়ায় এখানে অপরাধীদের লুকিয়ে থাকার একটা মোক্ষম জায়গা বলে আশাপাশের এলাকার অপরাধীদের একটা অভয়ারন্য হিসেবে বিবেচিত হয়। মাঝের পদ্মা নদীকে রেখে দুপারে দুই জেলা ওপারে কুষ্টিয়া আর এপারে পাবনা। কাজেই পুলিশ এপারে ধাওয়া করলে তারা নৌকাযোগে ওপারে দ্রুত সটকে পড়ে। আবার ওপারে পুলিশি হানা দিলে অপরাধীরা এপারে গা ঢাকা দেয়। ফলে দু’পারের অপরাধীদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। রয়েছে আত্মীয়তার দৃঢ় বন্ধনও। তাছাড়া তাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নিজেরাই গড়ে তুলেছে এক নিরাপত্তা বেষ্টনী।

ঘন কুয়াশা চারদিক জালের মতো ঘিরে ধরছে। একহাত দূরের কোন বস্তুও দেখা যায় না। গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগলেই কেবল বোঝা যায়। এবার কুয়াশা একটু বেশিই পড়ছে। কুয়াশা বেশি পড়ার কারণে চরের মানুষের বাড়িঘরের লোকজন সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই লেপ-কাঁথা মুড়ি দিয়ে শীতের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে তৎপর থাকে। কেউ কেউ বাড়ির কোণায় জমানো খড়-কুটো দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে শীতের হাত থেকে রক্ষার জন্য একত্র হয়। আখের পাতা, কলার পাতাও জ্বালিয়ে আগুন দিয়ে শীত তাড়ানো হয়। গরু-ছাগলের গায়ে পুরাতন চটের বস্তা জড়ানো হয়, যাতে শীতে তারা রক্ষা পায়।  

হালকা ফিস ফিসে কথার আওয়াজ শুনে মফিজুল থেমে যায়। ঠিক করে পরখ করে কণ্ঠ কার। ঘন কুয়াশায় ভেতরেও স্পষ্ট শোনা যায় এ গলাতো তারই গেরস্থ আলফাজ মোল্লার। কার সাথে কথা বলছে? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে মফিজুল। গত দুই বছর থেকে সে এ বাড়িতে কামলার কাজ করে আসছে। অভাবের তাড়নায় বিয়ে থা পর্যন্ত করেনি। বৃদ্ধা মা পাশের চরকাতরা গ্রামে এক বাড়িতে কাজ করে আর থাকে। নিজের ঘর-বাড়ি নেই। যা ছিলো, তা সবই পদ্মার পেটে গেছে। এখন নিঃস্ব, সর্বশান্ত। এখানে খাওয়া-থাকা আর বছর শেষে ধান পায়। মাঝে মধ্যে হাত খরচের জন্য মোল্লার কাছে চাইলে মোল্লা না করে না। মা তাকে বিয়ে থা করতে বললে মফিজুল তাতে রাজী হয় না। নিজেরই থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয় না তারপর বিয়ে করে অযথা ঝামেলা বাড়বে। তাই ভয় করেই তার বিয়েতে রাজী হওয়া হয় না।

মফিজুল পথের পাশে ঝোপের আড়ালে চলে যায়। এবার সে বেশ স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে, তারই গেরস্থ মোল্লা রুস্তমের সাথে ফিসফিসিয়ে কথা বলছে

: রুস্তম, এবার চরের জমি হাত ছাড়া করা যাবে না। যে করেই হোক, তোক সেই ব্যবস্থাই করা লাগবি বাপু।

:চাচা কও কি করা লাগবি? তুমি যা কোবি, আমি তাই করে দেবো। তুমি তো জানো আমার জবানের দাম আছে। মানুষ আমি খারাপ হতি পারি, তবে যাক বুক দেখাই তাক পিঠ দেখাই নি, তা তো তুমি ভালো করিই জানো। আর যাক আমি কথা দেই তার কাম জীবন দি হলেও করার চেষ্টা করি। এবার কও কী কাম করতি হবি?

:একটা লাশ দরকাররে রুস্তম। শালার রহমত কাজীর একটা ব্যবস্থা করা দরকার। তা না হলি গেল বারের মতো আবার চর হারাবো। সব যাবি রে। সব চলি যাবি। একটা ব্যবস্থা কর। বলেই আলফাজ মোল্লা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে।

:নামটা কও চাচা। ওক বালিশ ছাড়া শুয়া দি। কত জনাকইতো শুয়া দিলিম এ জীবনে। এ রুস্তমের কোন বালও ছিড়তি পারিনি কেউ। আর তুমি আমাক অভয় দিলি দিনকে রাত আর রাতকে দিন করি দিতে পারি :তা বলি দিচ্ছি।

আলফাজ মোল্লা স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেয় রুস্তমের কাঁধে।

:কামডা আমার বাড়িতই সারতে হবি রে রুস্তম। আলফাজ মোল্লা গলাটা নরম করে বলে।

:কওকি চাচা। তোমার বাড়িত মানে?

:হ। আমার বাড়িত। আমার বাড়িত কামড়া হলি তাহলিই না কাজীর বেটা কাজীক ফাঁসাতে পারবো। তা না হলিতো ওক ফাঁসানো যাচ্ছে না। মামলা দিয়েও উড়ি তাড়া করা যাচ্ছে না। আর যদি আমার বাড়িত একটা লাশ পড়ে তা হলি মামলা ওর ঘাড়ে পড়বি। তারপর চরের জমি তুমি আমার। হা-হা-হা।

:তা লোকটা কিডা। যাক বালিশ ছাড়া শুয়া দেবো।

:কচ্ছি রে কচ্ছি। তার নামডাই কচ্ছি,

বলেই আবার একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। মোল্লা পকেট থেকে সিগরেটের প্যাকেটটা বের করে একটা রুস্তমের দিকে বাড়িয়ে দেয়।

:লে ধরা জাড়ের মধ্যি আগুনে টান দে শরীলডা গরম কর।

মোল্লা নিজেও একটা সিগারেট বের করে পকেট থেকে লাইটারে চাপ দেয়। ওমনি কুয়াশা ভেদ করে এক চিলতে ফ্যাকাসে আলোয় দুজনের মুখ খানিকটা ঝলক দিয়ে ওঠে। ঝোপের আড়ালে থেকে মফিজুল এবার দুজনের মুখ দেখতে পায়।

:বুঝলু রুস্তম, জাড়ের মধ্যি বিড়ি সিগারেট না টানলি গা গরম হয় না। না কি কস রুস্তম?

: ঠিকই কইচাও চাচা।

:এবার শোন আমার বাড়ির ঐ যে মফিজুল থাকে না। তাক চিনিসতো?

:চেনবো লে ক্যা। ওর কী হয়ছে!

:ওর উপর দি এবার কামডা চালা দিতি হবি রেÑ।

: কউ কি চাচা!

রুস্তম চমকে ওঠে। রুস্তমের চোখের সামনে মফিজুলের চেহারা ভেসে ওঠে। পাঁচ বছরের ছোট মফিজুল রুস্তমের সাথে খেলতে খেলতে বেড়ে উঠেছে। অত্যন্ত সাদাসিধা। বাপ হারা ছেলেটাকে মেরে ফেলতে হবে। তার খেলার সাথি। ছোটবেলায় এ পাড়া ওপাড়া বদন খেলা, হা-ডু-ডু খেলা হতো। কতদিন তারা একসাথে খেলেছে। কতদিন ভরা নদীতে সাঁতার কেটেছে। পদ্মার স্রোতের বিপরীতে তাদের বেড়ে ওঠা। মনের মধ্যে মোচড় দিয়ে গা গুলিয়ে যায়। লোক আমি খারাপ হতি পারি কিন্তু এ কাজটা কী করা উচিৎ। রুস্তমের মনটা শীতের কুয়াশায় আরো ঠান্ডা হয়ে কেমন যেন চুপসে যায়। হাতের সিগারেটটাও স্যাত করে নিভে যায়।

সিগারেটে একটা সুখ টান দিয়ে মোল্লা বলে, কীরে রুস্তম তোর জবান বুজি গেল কে রে? কতা কচ্ছিস নি যে!

গায়ে ধাক্কা দিতেই রুস্তম সম্বিত ফিরে পায়।

:হ চাচা। তুমি যে কামডা দেও আমিতো সেডাই করি। না করিছি ককুনো। তুমি কি তা বুলতি পারবি।

:না রে, তা কচ্চি নি। তুই যে আবার ঝিম ধরি ছিলু তাই বুলছি।

:এবার কও কামডা কবে করতে হবি, আর কিরাম করি করবো।

:শোন, আমার বাইরের ঘরডায় মফিজুল থাকে। কাল রাতে আসি কামডা সাবাড় করি দে। কিরে পারবু না? রাতির কামে তুইতো আবার পাকা।

বলেই মোল্লা হাসতে হাসতে রোস্তমের গায়ে ঢলে পড়ে। হাতের সিগারেটে শেষ সুখটানটা মেরে যেন একটা তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। দাঁতে দাঁত কিটমিট করে প্রলাপের মতো বকতে থাকে।

:হারামজাদা রহমত কাজী এবার তোক দেখ কি করি মামলার ফাঁদে ফেলি।

মোল্লা গায়ের চাদর সরিয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে টাকার তোড়া বের করে রোস্তমের হাতে গুঁজে দেয়। রোস্তম গদগদ ভঙ্গিতে টাকাগুলো খপ করে হাতে নিয়ে লুঙ্গির ভেতর কোমরে গুঁজে রাখে।

:শোন কাল রাতে কাজটা সাবাড় করতি হবি কিন্তু। এদিক আবার চর ধাই ধাই করি জাগি উঠতেছে। আবার কাজীর বাচ্চা কাজী ককুন ঝাঁপা পড়ে তার কি ঠিক আছে! দেরি করা যাচ্ছে নারে। তার আগেই কামডা সারি ফেলা।

দুজনের পথ দুদিকে চলে যায় । মাঝে মফিজুল ঝোপের আড়ালে কুশায়ার শরীরে ছাওয়া পাখির ছানার মতো জবু থবু হয়ে মাটির সাথে লেপ্টে থাকে। তার ভেতরের কলজেটা বেরিয়ে আসতে চায়। একরাশ ভীতি নিয়ে দ্রুত উল্টো পথে মোল্লা বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।

রাত গভীর হতে থাকে। চারদিক শুনশান নীরবতা। মাঝে মাঝে থেমে থেমে হুক্কা-হুয়া, হুক্কা-হুয়া, করে খেঁকশিয়ালের ডাক আর কুকুরের ঘেউ ঘেউ ছাড়া আর কিছুই সে শুনতে পায় না। মফিজুলের চোখে আর ঘুম আসে না। কেবলই মৃত্যুর কালো থাবা তাকে ঘিরে ধরছে। দুচোখ দিয়ে কান্নার পানি অঝোরে ঝরতে থাকে। মাঘ মাসের শীতেও তার পুরো শরীর দিয়ে দর দর করে ঘাম ঝরছে। একটু পাতা নড়া বা খসখস শব্দেও লাফ দিয়ে ওঠে।

রুস্তমের গগনবিদারী চিৎকারে পুরো বাড়ির সবার ঘুম ভেঙ্গে যায়। এমন কি কামালপুর চরের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত চিৎকারের আওয়াজ পৌঁছে যায়। অনেকে ঘুমিয়ে থাকায়, চিৎকারের উৎস স্থান পরখ করতে থাকে। এতক্ষণে বাড়ির সবাই ঘর থেকে হাতে হারিকেন আর লাঠি নিয়ে বের হয়। মোল্লার বউ এর হাতেও একটি লাঠি। চোর চোর ডাকাত ডাকাত বলে সবাই চিৎকার জুড়ে দিলেও কেবল মোল্লার হাতে কোন লাঠি থাকে না, শুধু একটা তিন ব্যাটারির টর্চ লাইট। আর সে কোন চিৎকারও করে না। মোল্লা উঠোনে টর্চ লাইট জ্বালাতেই মফিজুলকে দেখে হতভম্ব হয়ে যায়।

:চাচা

বলেই চিৎকার করে মফিজুর মোল্লার পা জড়িয়ে ধরে। আর ঘরের দিকে হাতের ইশারায় কি যেন দেখায়। মোল্লা বিষয়ের কিছুই বোঝে না। সে আবার জিজ্ঞেস করে

:কি হয়েছে রে। তুই চেচাচ্ছিস কে? আমার ঘরে কি?

:তুমি ঘরে যায়ে দেখ।

আতঙ্কে মফিজুলের গলা থেকে কোন কথা বের হচ্ছে না।

ধীর পায়ে মোল্লা ঘরের দিকে এগিয়ে যায় আর টর্চের আলো দিয়ে দেখতেই আঁতকে ওঠে।

:ওরে বাবারে এডা কি করি হোলি রে? নিজের একমাত্র সন্তানকে চকিতে দ্বিখন্ডিত পড়ে থাকতে দেখে একটা চিৎকার দিয়ে নির্বাক হয়ে যায়।

কামালপুর চরের জামে মসজিদ থেকে সুরেলা কণ্ঠে ফজরের নামাজের আযান ভেসে আসে। এতক্ষণে মোল্লা বাড়ি লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে। মোল্লার মুখে কোন কথা নেই। লোকজন মফিজুলকে গরুবাধা দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে। কয়েকজন তাকে চড় থাপ্পড়, লাথি মারে। তাকে সন্দেহ করে মারধোর করতে থাকে। মফিজুল ঘটনার বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করে। তবে কেউ তার কথাই শুনতে চায় না। মোল্লার বউ একমাত্র ছেলের এ অবস্থা দেখে বুক ফাটা চিৎকার করে আকাশ-বাতাস একাকার করে দেয়। সেই সাথে বার বার মূর্ছা যেতে থাকে।

চারদিকে ফর্সা হলেও কুয়াশার কারণে অন্ধকার ঘিরে থাকে। এর মধ্যে কুয়াশা ভেদ করে একটি জিপ গাড়ি আর দুটি মটর সাইকেল মোল্লা বাড়িতে চলে আসে। গাড়ি থেকে পুলিশ নেমেই মফিজুলের হাতে হ্যান্ডকাফ লাগায়। মফিজুল হাউ-মাউ করে কেঁদে ওঠে।

:চাচা আমি তুমার ছেলেক খুন করিনি। ও রাতে আমার কাছে থাকতি আইছিলি। রাতে ডাকাত আসি কোপ মারেছে। আমি এর কিছু জানিনি। আমি চিনতি পারিনি।  

:এই থানায় চল সেখানে যেয়ে কথা হবে। লাশ থানায় নিয়ে চলো।

বলেই পুলিশ মফিজুলকে টানতে টানতে পুলিশের গাড়িতে তোলে। লাশও ভ্যান গাড়িতে ওঠানো হয়। মোল্লা নির্বাক। তার মুখ থেকে কোন কথা বের হয় না। সে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে এদিক ওদিক তাকাতে থাকে। আর মনে মনে কাউকে খুঁজতে থাকে। পায়ে পায়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। ততক্ষণে পুলিশ আসামি ও লাশ নিয়ে রওনা দেয়। মোল্লা দূরে পদ্মায় চরে বয়ে যাওয়া ক্ষীণ স্রোতের রেখার উপর প্রভাতের লাল আভা দেখতে পায়। আর এক পশলা ঠান্ডা বাতাস এসে হীম শীতল করে বুকের রক্ত জমাট করে দেয়।

আনোয়ার কামাল
আনোয়ার কামাল

 

 

 

 

Author: আনোয়ার কামাল

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment