প্রকৃতি কবিতায় দেখি নাথিংলেস কবিতারই ভিন্ন রূপ

সভ্যতার বৈশিষ্ট্য কী হবে তা আমরা জানি না।

মানুষের কেমন হওয়া উচিত তাও আমরা জানি না।

আধুনিকতা কাকে বলে, সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা যদিও স্পষ্ট করি, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে আধুনিকও হতে পারি না। কারণ আধুনিকতার মধ্যেই আদিমতার প্রাগৈতিহাসিক বৈশিষ্ট্যকে আমরা বিসর্জন দিতে পারি না। ‘পুনরাধুনিক’ কথাটির বহুল ব্যবহার আমাদের মধ্যে বাড়ছে, কিন্তু পুনরাধুনিক ব্যাপারটি আমরা শুধু শিল্পের কৌশলগত প্রকাশেই প্রয়োগ করে থাকি। শব্দ, আঙ্গিক, ক্রিয়ায় ও চিহ্ন ব্যবহারে পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রেই এই প্রয়োগ দেখতে পাই। কিন্তু অন্তরালে সভ্যতা, মানবিকতা এবং অস্তিত্বের জাগরণ ব্যাপারগুলি কিছুতেই এড়ানো যায় না। জীবন কিছুই নয়, অথবা, জীবনের কোনো অর্থ নেই, তবু জীবনের অর্থ খোঁজার ভেতরেই একটি প্রয়াস তা শিল্পিত রূপে উঠে আসে। এই কারণেই Jean-paul sartre existentialism, humanism এবং  Post-Modernism প্রসঙ্গে বলেছেন- ‘Life has no meaning a priori… It is up to you to give it a meaning, and value is nothing but the meaning that you choose.’

আমাদের জীবনে সভ্যতা কী শিখিয়েছে?

কাপড় পরা শিখিয়েছে। সমাজ-রাষ্ট্র-পুলিশ-আইন, যুক্তি ও বিজ্ঞানের আবিষ্কার শিখিয়েছে। কিন্তু আমাদের জীবন কি পরিবর্তন হয়েছে?

বাহ্যিক পরিবর্তন অনেক কিছুই দৃষ্টিগোচর হয়, কিন্তু অন্তর্নিহিত আদিমতায় আমরা তীব্রভাবে লালিতপালিত হই। প্রবৃত্তির অমোঘ অভিধান পাল্টানো যায় না। তার আদিম রসায়নে আমরা জারিত,স্পন্দিত ও নন্দিত হতে থাকি। কবিতা নামক শিল্পটির যতই পরিবর্তন ঘটাই, বক্তব্য -বিবৃতি ঘেরাটোপ হতে তাকে উন্মুক্ত করে সংকেত আর রূপকের অন্তরালে প্রবাহিত করি ঠিকই, কিন্তু তার উৎসমূল একই থাকে। সেখানে শূন্যতারই মহাগর্জন ধ্বনিত হয়। স্থূল আবেগের মানবিক পরামর্শ কবিতায় এক সময় উত্তাল হযে উঠেছিল। কবিতা তখন মানব-সান্ত্রীর তরবারির মতো উচ্চকিত। নীতি আর প্রেমের আদর্শে দর্পিত কোনো শক্তি। তখন নিভৃতি ছিল না, বক্তব্যবিলাসের ধারায় সর্বদা গতিসঞ্চার হত। বস্তুচেতনার নিরবধি পারস্পর্য মেনেই লেখা হত কবিতা। সেই চেতনারই রূপান্তরী উত্তরসাধক হিসেবে আমরা জীবনানন্দ দাশকেই প্রথম পেলাম। তিনিও এই প্রভাব এড়াতে পারলেন না। প্রথম কাব্য ‘ঝরাপালকে’ই লিখলেন

‘আলো আলো-আধেক আঁধারে

মোর সাথে মোর পিছে এলো তারা ছুটে,

মাটির বাঁটের চুমো শিহরি উঠিত মো ঠোঁটে, রোমপুটে;

ধুধু মাঠ-ধানক্ষেত-কাশফুর-বুনো হাঁস-বালুকার চর

বকের ছানার মতো যেন মোর বুকের উপর

এলোমেলো ডানা মেলে মোর সাথে চলিল নাচিয়া;

(সেদিন এ ধরণীর)

‘আলো আলো’ একদিকে কবির চেতনাকে সজাগ করেছে, কিন্তু অন্ধকার সম্পূর্ণ দূর হয়নি, তাই ‘আধেক আঁধার’। ‘আমার’ শব্দটা ‘মোর’ই থেকে গেছে। তবে ‘মাটির বাঁটের চুমো’ বাস্তবের নৈকট্য কবিকে শিহরিত করেছে। যদিও ‘শিহরি’ শব্দটা রবীন্দ্রনাথের । কিন্তু দূরাগত শূন্যতার ছায়ায় শুধু মাঠ, ধানক্ষেত, কাশফুল, বুনোহাঁস এবং বালুকার চরে কবির ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে। মুক্তির সূচনাটি কার্যত এখানেই। মনন চিন্তনকে মুক্তি না দিলে শিল্পও মুক্তি পায় না। সেই মুক্তির সোপানটিতে ‘নাচিয়া’ ক্রিয়াটি রবীন্দ্রনাথের নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হয়ে দেখা দিয়েছে।

কিন্তু ‘নাচিয়া’ও Nothing হয়ে গিয়েছে। ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ কাব্যে এসে জীবনানন্দ দাশ উপলব্ধি করলেন ‘নাগরির’ সিঁড়ি প্রায় নীলিমার গায়ে লেগে আছে;

অথচ নগরী মৃত।

সে-সিঁড়ির আশ্চর্য নির্জন

দিগন্তের এক মহীয়সী,

আপর তার শিশু;

তবু কেউ নেই।’

(মানুষের মৃত্যু হলে)

এই নগরীর সিঁড়ি, সুউচ্চ দালান, একান্ত নির্জন মানুষ, আর সভ্যতার সম্মানীয়া মহীয়সী ও তার সন্তান সব আছে। তবু তাদের গভীরে এক না থাকার ব্যঞ্জনা শাশ্বত শূন্যতার Philip k. Dick  কেই কবি পর্যবেক্ষণ করেছেন। এখান থেকেই আমাদের বারবার একটি কথা মনে পড়ে। ‘The pre-socratic Greek Philosopher Parmenides taught that the only things that are real are things which haves change…. and the pre socratic Greek Philosopher Heraclitus taught that everything changes. If you superimpose their two views, you get this result; Nothing is real.’

এই সত্য এবং বাস্তব দর্শনের ভিত্তিতেই জীবন যে কিছুই নয়, শূন্যতারই বাজনা, তা শিল্পী কবিরাও জানেন। তাই শিল্পজীবন এবং বাস্তব জীবনে একটা ফারাক থেকে যায়।

বাস্তব জীবনে মানবিকতার দরকার হয়। বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের প্রতিষ্ঠা সেখানেই। রাষ্ট্র ও পুলিশ, সমাজ ও পরিবারের রচনা তা থেকেই আসে। কিন্তু শিল্পীজীবনে ব্যক্তির নিভৃতি, একান্ত নির্জনতা-আত্মমুখী বিস্ময়ের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। Nothingness -এর মুক্তির সোপানে সত্য উপলব্ধির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় বিচ্ছিন্ন আত্মক্ষরণের বিষয়হীন শেকড়গুলি বিস্তৃত হয়। সেই জন্য এই কবিতাকে ‘Most conspicuonsly in the visual asts, but shown to varying degrees no havels and poetry’ বলা হয়। এর চারটি লক্ষণীয় অংশ (fetures) হল:

১. Iconoclasm – মূর্তিভঙ্গ বা পুরোনো রীতিনীতিকে উলঙ্গন করা।

২. Groundless – ভিত্তিহীন বা অমূলক।

৩. Formlessness- অরূপ বা আকারহীনতা।

৪. Populism-  জনবহুলতা বআ সার্বিকতা।

বহুমুখী, আদি মধ্য অন্তহীন, বিষয়বহির্ভূত, নতুন শব্দসৃষ্টির পারঙ্গমতা এবং চিরাচরিত ধারার বাইরে সমালোচনার সনাতন প্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে অবস্থান রত এই শিল্পীটির বৈর্ব্যক্তিক সমূহ সাংস্কৃতিক পর্যায়েই তার স্বয়ংক্রিয় অভিব্যক্তির ইতিহাস ও ঐতিহ্যে বিচরণ করে তথাপি কোনোকিছুতেই অবস্থিতি জানান দেয় না।  এ এক মুক্ত শিল্প। জীবনের মুক্তি ইচ্ছা এর মধ্যেই নিহিত। মানুষ যেমন আদিমতাকে অস্বীকার করতে পারে না, তেমনি সভ্যতার দাবি মেনে জীবনকেও সেভাবেই বাহ্যিক পরিবর্তনে সামিল করে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে পোশাক পরেও মানুষ বেশি নগ্ন হয়। আদিম প্রবৃত্তির ক্রিয়াগুলি দমন করেও বেশি ক্রিয়াশীল হয়। জীবন যদি এই সাময়িক প্রবৃত্তিরই বুদ্বুদ হয় তাহলে কীসেরই বা আলো দরকার? স্ববিরোধী চেতনালোকে তার দ্বান্দ্বিক বিপন্নতা সর্বদা সামূহিক প্রজ্ঞাকেই প্রভাবিত করে। সেই কারণটিই বুঝিয়ে দিলেন শিল্পে মানুষই শেষকথা। তার নৈতিকতা নয়, লিঙ্গ-সত্তা-বৈষম্য নয়। প্রতীকায়নের চিরাচরিত ধারা নয়। এসবের বিরোধিতাই তার মুক্তির সোপান।

পরাবাস্তবতার বহুমুখী ব্যত্যয়ে দ্বান্দ্বিকবোধের পর্যায়টি কবিদের কাছে অগ্রাধিকার পেল। যুক্তিহীন, এক লক্ষ্যহীন, সমাপ্তিহীন এক স্পেসের ভেতর দিয়ে শিল্পের অবস্থিতি যা এক শূন্যতা ও বিরামে সমর্পিত হল।

আঙ্গিক গঠনেও পরিবর্তন ঘটল। কর্মহীনতাকেই আশ্রয় করতে চাইলেন কবিরা। ফলত, পাল্টে গেল প্রচলিত সুর-ছন্দ-সৌন্দর্যায়নের চর্চা। সর্বজনীনভাবেই উপস্থাপিত হল বক্তব্য, কিন্তু বিষয়ভিত্তিক নয়। প্রচলিত অর্থবোধকও নয়।

সাধারণ মানুষের কথ্যভাষাকে আশ্রয় করলেন কবি। বাস্তবতার কঠোর কঠিন অনুষঙ্গগুলি কবিতায় উঠে এল। বুদ্ধিবৃত্তিকে ধাক্কা দেওয়া হল।

কিন্তু কবিতার এইসব বৈশিষ্ট্যও পাল্টে গেল। ব্যক্তিগত ধারনায় কবিরা পথ চলতে শুরু করলেন। জীবনই তার মূলধন। মৃত্যু শূন্যতা অন্ধকার তাকে এগিয়ে নিয়ে চলল। ‘ও চিরপ্রাম্য অগ্নি’ কাব্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ৫২তম জন্মদিনকে উপলক্ষ করে লিখলেন

‘জন্মদিনে কিছু ফুল পাওয়া গিয়েছিলো।

অসম্ভব খুশি হাসি গানের ভিতরে

একটি বিড়াল একা বাহান্নটি থাবা গুনে গুনে

উঠে গেল সিঁড়ির উপরে

লোহার ঘোরানো সিঁড়ি, সিঁড়ির উপরে

সবার অলক্ষ্যে কালো সিঁড়ির উপরে

শুধু আমি দেখেছি তার দ্বিধান্বিত ভঙ্গি

তার বিষণ্ণতা।’ (জন্মদিনে)

নিজেকে লেখার প্রয়াসের ভেতর বিড়ালের সিঁড়ি বেয়ে ওঠার পরিচিত গল্পের মধ্যেই একটা বিষয়হনি ক্রিয়ার সচলতায় আমরা ‘কালো সিঁড়ি’ অর্থাৎ রাত্রির ভেতর প্রবেশের অনুক্রমটি উপলব্ধি করতে পারি। কিন্তু জীবন যে দ্বিধান্বিত ভঙ্গির ও বিষন্নতার এক দান্দ্বিক ফলশ্রুতি সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর দ্বান্দ্বিকতাই Nothingness- এর আড়াল মাত্র। জীবনের অর্থ খুঁজতে যাওয়ার মধ্যেই আদি ও অনন্ত অন্ধকার বিরাজ করে। প্রকৃতিবাদ, বস্তুবাদ, আধুনিকতা এবং পুনরাধুনিকতাবাদ সভ্যতার বোধটি এভাবেই দেখান

Justin steckbauer-‘Why does a man walk into empty places? Why does a man walk into darkness? He’s looking for something. Maybe he’s looking for himself. There is a lot of noise in the world. In the night, all alone, its just you, God, and the stors.

Post modernity is a move toward nothingness. It’s the mood of emptiness, the response to the final bankruptcy of modernity materialism. The Philosophical heart of man must wander off onto the dark to find himself once again. Or maybe to find God.

 

এখানেই  Metaphysical এবং Monisim বা ব্রহ্মবাদ একসঙ্গে মিশে যায় তা বলাই বাহুল্য। আমি আছি, তাই আমার ছায়া আছে। আমি কথা বলছি, তাই প্রতিধ্বনি হচ্ছে। অন্ধকারে নিজেকে দেখছি, নিজের ঈশ্বরকে দেখছি, কিন্তু বাস্তবে কিছুই দেখছি না। Make toward nothingness – এই পথই সত্য হয়ে ওঠে প্রতিটি জীবনে। শিল্প একে ধরতে চায়। এই ধরার ব্যাপ্তি আছে, অনন্তে বিলীন হওয়া আছে। বিষয়াতীত হওয়া আছে।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কয়েকজন কবির কবিতা উদ্ধৃতি হিসেবে উল্লেখ করলে কবিতার এই পথটি কতটা গভীরভাবে সম্পৃক্ত তা স্পষ্ট হবে। কবি ফকির ইলিয়াস Post modern কবিতা না লিখেও এই কথারই প্রতিধ্বনিত তুলেছেন তার কবিতায়। ‘সংরক্ষণযোগ্য শীতবস্ত্র’ নামে একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন

‘আমাদের স্মৃতির চারপাশে বুনিয়াদি বিশ্বাস, কোনও কালেই স্থিতিশীল ছিল না। অথচ তারপরও আমাদের প্রেম অতিক্রম করছিল গ্রহদগ্ধ মাঠ,

মাঠের ফসল-বীজ

আর জন্ম দেবার প্রগাঢ় আলোরেখা।

 

সেই সংরক্ষিত আলোকবিশ্বে, আমরাও স্থায়ীভাবে অভিবাসী হতে চেয়েছিলাম। দেশান্তরি- হতে চেয়েছিলাম, সবকিছু ভুলে। যদিও আমরা জানতাম নদীতে ভাসার সামর্থ্য ছাড়া আমাদের আর কোনও সাধ্য নেই।’

পারম্পর্য ঐতিহ্যে যা কিছু আমাদের অর্জিত হলেও যা নিয়ে মানবসভ্যতা গড়ে উঠেছে, তা যে সর্বদা প্রবহমান, কোনো কিছুই স্থায়ী নয়, এই সত্য দর্শনই কবি নিরীক্ষণ করলেন। তাই মানবিকতার ধারণাও এক হতে পারে না। যুক্তিও অচল হতে বাধ্য। ‘বুনিয়াদি বিশ্বাস’ স্থিতিশীল নয়। যে প্রেম শুধু মুখোমুখি বসিবার আয়োজন করে, সেই প্রেমও গ্রহদগ্ধ মাঠ অতিক্রম করে চলে যায়। সংরক্ষিত আলোকবিশ্বে যে অমরতার দাবি প্রত্যেকেরই (মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাহি- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)- তা একদিন নিস্ফল অন্ধকারে ধাবিত হয়। ভাসার সামর্থ্য ছাড়া কিছুই থাকে না। এই ভাসমানতার বোধটুকুই দার্শনিক করে তুলেছে কবিকে।

কবিতা যতই লেখা হোক, চিরন্তন নৈর্ব্যক্তিক টংকার ছাড়া কবিতা প্রকৃত কবিতা হয়ে ওঠে না। সম্প্রতি একটি কাব্যে পড়ছিলাম, এক কবি লিখেছেন, মেঘেদের ছেলেমেয়ের কথা। মেঘেদের মেয়েরা খেলে বেড়াচ্ছে। গাছ যুবকেরা হাত বাড়িয়ে তাদের জড়িয়ে ধরছে। ধরাতলে বৃষ্টি নামবে। এরকমই চিত্রকল্প। এক্ষেত্রে মেটাফিজিক্যালের প্রয়োগ ঘটলেও জীবনবোধের শাশ্বত মন্ত্রটি খুঁজে পাই না। কাল্পনিক ধারণায় সমুদ্রকে জলবিশ্ব ভাবা যায়। জলজপ্রাণীদের সম্রাট-মহারাজা কল্পনা করা যায়। ঢেউগুলিকে আবেগ মুহূর্তের উত্থান, কিংবা আরও কিছু। কিন্তু কবিতার তাতে কী এসে গেল? জীবনের প্রতিনিয়ত যে ক্ষরণ, যে ক্ষয়, যে পীড়ন, যে শূন্যতা তার অমোঘ প্রলাপ থেকেই শব্দ ও বাণী উঠে আসে। বহুমুখী অনুভাবনার নিয়ত প্রক্রিয়ায় বোধের সমান্তরাল প্রকাশ- তাকেই কবিতা হিসেবে প্রথম সারিতে রাখা উচিত।  চেতনার ভাষাকে শিল্পরূপ দিতে কবি বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে পারেন। কিন্তু চেতনা যে শুধু জীবনবৃত্তান্ত এবং সেই সম্বন্ধীয় দর্শন তার অন্যথা হতে চলে না।

কবি শিজাব শাহরিয়ার ‘গঞ্জের মাঠ ও সনাতনির শূন্যতা’ নামে একটি কবিতায় লিখেছেন,

‘পিছনে রেখে এসেছি শিমুল গাছ

উল্টোদিক থেকে আমাকে অতিক্রম করলে

তুমি পাবে শূন্য গাছতলা…

 

এই গাছতলা ও শূন্যতা মানে

বিশ্বাস-অবিশ্বাস, একাকী নির্জন ও নিমগ্ন কবির উচ্ছল কবিতা

 

পাখিদের ডানাভরা গান পড়ে থাকে এই পথে

ধুলি সন্ধ্যার চোখ থেকে কেউ কেউ ফিরে যান যৌবনের প্রচ্ছদে’ স্মৃতির চৌকাঠ থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনের প্রবাহ ‘প্রেম’কে শূন্যতা যাপনেরই নিরিখ দান করেছেন ,‘তুমি পাবে শূন্য গাছতলা।’ আর এই শূন্যতা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বান্দ্বিক পর্যায়কে যা একাকিত্ব, নিঃস্তব্ধতা এবং নিমগ্নতায় তুলে ধরা হয়েছে। যা উচ্ছল কবিতার ভেতর জীবনেরই অনুষঙ্গ প্রবৃত্তি। যেখানে নষ্টালজিক প্রচ্ছায়ায় যৌবনের প্রচ্ছদের প্রসন্নতায় স্মৃতিমেদুর এক স্বপ্নভাষার দেখা পাওয়া যায়। কবি গঞ্জের মাঠ অতিক্রম করে শূন্যতার দিকে চলেছেন। এই মাত্রা তো থামে না কখনো। কবির স্বপ্নের ভূগোল আর বিনির্মিত পৃথিবী এভাবেই কবিতায় রচিত হতে থাকে।

সৈয়দ তারিকের কবিতায় এক আত্মদ্যুতির অভিযাপন দেখতে পাই। আমাদের অন্তর্গত কোনো নিবিড় বাতায়ন আত্মদর্শনের সীমাহীন প্রজ্ঞায়  ঝলকিত হয়ে ওঠে। অথচ নির্মোহ এক ব্যঙ্গ যা Nothingness এরই ভিন্ন দশনে উদঘাটিত। ‘ক্ষত্রগুলো ঢাকা ছিলো গান কটনের আবরণে’ সিরিজের ৯৮তম অংশে কবি লিখেছেন

‘সঞ্চারিত তাপ যথা, নল হতে ধাবমান ঘুরন্ত বুলেট,

ফিরবার দায় নাই ঘরে-

পৃথিবী প্রত্যহ ঘোরে, অবিরল পুষ্প ঝরে পড়ে।

ডাকহরকরা শুধু ঈষৎ অবাক চোখ তুলে

প্রাপকের ঠিকানাবিহীন

পোস্টকার্ড পৌঁছে দেয় প্রেরকের কাছে প্রতিদিন।’

প্রকৃতির নিয়মেই অবিরল বয়ে চলা ক্রিয়াকল্পের ভেতর এক বস্তুতান্ত্রিক চক্র দেখতে পাই। কবিও তা দেখতে পেয়েছেন। তাই তাপের সঞ্চারিত হওয়া থেকে বুলেটের নির্গমন এবং পুষ্পের ফুটে ওঠা থেকে ঝরে পড়া সবই বস্তুক্রিয়ার বাস্তবিক পরিণতি। কিন্তু আত্মদ্যুতির নিরীক্ষায় পর্যায়টি তখনই সংজ্ঞাবহ পুনর্নিমিতির অনুজ্ঞায় ওঠে আসে- তা হল আত্মদর্শনের এক নিবিড় প্রক্রিয়া। যে খানে প্রেরকের চিঠি প্রাপকের কাছে কখনো পৌঁছায় না, আবার তা প্রেরকের কাছেই ফিরে আসে। কেননা, প্রাপক কেউ নেই, অস্তিবাদী আত্মবাচক ঈশ্বর যিনি, তিনিই ‘আমি’। তাই চিঠি নিজের কাছেই আসতে বাধ্য। কবিতায় সুফিতত্ত্বের এই উপলব্ধিটি কবি প্রযুক্ত করে একটা নতুন ধারার জীবন দর্শনকে শিল্পরূপ দিয়েছেন।

বাংলা কবিতার বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য বহুমুখী পর্যায়েই ধাবমান দেখতে পাই। কোনো নির্দিষ্ট মতবাদে কবিতার প্রকৃত কর্ম নির্ণয় করা যায় না। শুধু ভাবকল্পের প্রসঙ্গ যা আদিচেতনার সংশ্লেষে বারবার জীবনকে ব্যথিত করে তোলে। তবে মডার্ন কিংবা পোস্ট মর্ডান হোক, মানবিকতা বা যুক্তিবাদ হোক, অথবা সেসব থেকে বেরিয়ে আসুক; কবিকে বস্তুগত সীমানা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের কাছেই দাঁড়াতে হয়। কবিতা এই নিজের কাছে দাঁড়ানোতেই তার নির্মাণ প্রক্রিয়া বজায় রাখে। সেই কারণে কবিতাগুলি এক একটি চিঠি, যা নিজেকে প্রাপকের কাছে না পৌঁছে নিজের কাছেই পৌঁছায়। নিজের ছায়া আর প্রতিধ্বনিরই বাতাবরণ। সহজ কথায় কখনো কখনো গভীর ভাবের কথা এসে পড়ে। কবি তাত্ত্বিক না হলেও তত্ত্বের তদারকি করেন। কবি মাহবুব হাসান ‘আরও একটি কবিতার জন্ম হোক’ নামে কবিতায় উল্লেখ করলেন

‘আরও একটি কবিতার জন্ম হতে যাচ্ছে বতিচেল্লির

ভেনাসের মতো

নগ্ন-সুন্দর আর স্বাধীন। জন্ম স্বাধীন কবিতার

মগডাল থেকে একরত্তি

ভোর আলো-হাওয়া নিয়ে এসে বসলো পিঁড়ি

পেতে আমাদের দিনানুদৈনিক

পান্তায় পাতায়।’

বতিচেল্লির ভেনাসের মতো নগ্ন-সুন্দর স্বাধীন বাংলা কবিতার জন্ম এভাবেই প্রতিমুহূর্তে হয়ে চলেছে। কিন্তু ‘আমাদের’ সর্বনামটি যে মনুষ্যের। মনুষ্যজীবনের, সর্বজনীন, অনন্তের তা ভুললে চলবে না। পান্তায় পাতায় কবিতা দিনানুদৈনিক এই জীবনের প্রচ্ছায়ামাখা উচ্চারণ তার।

 

Author: তৈমুর খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts