প্রিয়ভাষিণী

প্রিয়ভাষিণী

কোথায় তুমি এখন? শঙ্খচিল নাকি শালিখের  নাকি কার্তিকের নবান্নের দেশে ?

নাকি অন্যত্র। যাকে সবাই বলে‘ না ফেরার দেশ!’

দক্ষিণাঞ্চলের লবণ জল গায়ে মেখে বড় হয়েছ তুমি। সুন্দরবনের উদাত্ততা আর এক ঝাঁক নদী তোমাকে শক্তি দিয়েছে।

রূপসা পসুর শিবসা  মধুমতি চিত্রা তোমাকে ছুঁয়েছে বার বার।  অফুরান প্রাণ জুগিয়েছে তোমার মন আর শরীরের জমিনে।। মৌয়ালী মাঝি- মাল্লা নোনাজলের খেটে খাওয়া মানুষেরা তোমাকে  প্রেরণা জুগিয়েছে । সে প্রেরণা আর শক্তি নিয়ে তুমি মহীরুহ হয়েছ।

তুমি এক অনন্যা। তোমার হাতের পরশে ফেলে দেয়া খড়কুটো , ঝরা পাতা , শুকনো ফুল শিল্প হয়ে উঠেছে। পরম যত্ন মমতা অার কুশলী হাতে তুমি গুড়ি কেটে মূর্তি গড়েছ। তুমি ভেবেছ স্বল্প আয়ের মানুষের কথা। তোমার হাতে বানানো উপকরণে সেজে  নারী আর তাদের ঘর হয়ে উঠেছে এক একটি অনন্যা।

তুমি যা হারিযেছিলে যুদ্ধে  তা হারিয়েছে অগুনতি মা বোন। কেউ   বলতে পারেনি সে কথা, লজ্জায় ভয়ে, সমাজের শাসনে, পরিবারের বিধি-নিষেধে। তুমি মানো নি কারো শাসন, কারো বাধা, কোন বিধি।

সোচ্চারে বলেছ,  পাকিস্তানিরা তোমার সাথে কি করেছে ।বলেছ,  এ তোমার অপমান নয়, পাকিস্তানিদের বর্বরতা। এক সেনা দিয়ে অপমান  করে সাধ মেটেনি তাদের, এসেছে পালা করে. পঙ্গপালের মতো।

তোমার দেশপ্রেম, সততা , আত্মার স্বচ্ছতা সাহস জুগিয়েছে‘ নিন্দিত নন্দ ‘ গ্রন্থে সেসব কথা স্বগর্বে বলতে।

তোমার অকপট আর বলিষ্ঠ উচ্চারণে কেঁপে উঠেছে ধর্ষিতা মা -বোনেরা । এটা কি ভালো হলো নাকি  খুব খারাপ!

সমাজ সংসারে আলোড়ন উঠল। রাষ্ট্র ভিতে নাড়া পড়ল।  যে নারীরা নিজেদের অপমান সম্বল করে লুকিয়ে ছিল লজ্জায়, মুখ খোলেনি এতদিন তারা একে একে মুখ খূলতে থাকল।

আর তুমি সেই অনন্যা, সারা শরীরে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্নকে  হীরকচিহ্ন বানালে। রাষ্ট্র সসম্মানে উচ্চরণ করল তোমার ত্যাগের কথা। তোমার মর্যাদা হলো সবার ওপরে।

এই দেশ এখনও  কুসংস্কার আর কূপমন্ডুকতায় আকীর্ণ। এখানে  এমনটি হতে পারে ভাবেনি কেউ। কাঠমোল্লারা তো ভাবেইনি, যারা তথাকথিত প্রগতির ধ্বজাধারী তারাও ভাবেনি। কিন্তু তুমি তোমার সাহস দিয়ে,  শক্তি দিয়ে তাদের ভাবাতে সক্ষম হয়েছ ধর্ষিতা নারীরা মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে তাদের ত্যাগ অস্ত্রযোদ্ধার মতোই।

তারপরও অনেকে মৃখ লুকিয়ে থাকে, স্বামী সন্তানের কাছে ছোট হয়ে থাকে। যেন সেদিনের ঘটনার দায় তার, লজ্জা তার। ওদের খুব দরকার ছিল তোমাকে।

তাই এত সকালে তোমার চলে যাওযাটা মন মানতে পারছে না। ওই নারীদের সামনে পতাকাটি ধরে রাখার জন্য আরো অনেক অনেক দিন সশরীরে বেঁচে থাকা প্রয়োজন ছিল তোমার।

মন কাঁদছে হুহু করে, চোখ ভিজছে জলে। প্রিয়ভাষিণী, প্রিয় আমার , গর্ব আমার, আনন্দ আমার, ভালো থাকো তুমি!

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment