বন্ধু

বন্ধু

বন্ধু লাল গোলাপের শুভেচ্ছা নিও। একবার ঢাকা থেকে বাসে করে গোপালগঞ্জের বাড়িতে যাচ্ছি।  গাড়ির গানগুলো সাধারণত আমার পছন্দের তালিকার সাথে কখনই মেলে না। তাই মনোযোগ ও দেই না কোন গানে। তো সেইদিন  একটা গানটা বাজছিল।  আসিফ আকবর এর ”বন্ধু লাল গোলাপের শুভেচ্ছা নি/ ও আমি যে তোমার এই কথাটি মেনে নিও”।

গানটা খুব  ভাল লাগল আর আমি ফিরে গেলাম বন্ধুদের সাথে। সেই ১৯৯৩ সালে আমি মাত্র ক্লাস এইটে পড়ি স্যারদের ভাষায় থার্ডক্লাস। এই থার্ডক্লাস এর ব্যাখা নিশ্চয় আনেকেই জানেন আর যদি না জানেন তো তাদেরকে বলি থার্ডক্লাস হচ্ছে তৃতীয়। সেটা সিক্স থেতে গণনা করলেও হয় আবার দশম থেকে গণনা করলেও হয়।  তাই এটা থার্ডক্লাস। যাইহোক এই থার্ডক্লাসে আমার সাথে আমার এক ক্লাসমেটের দারুণ বন্ধুত্ব হয়। ভীষণ উদার মনের মানুষ ছিল সে, তার নাম কিবরিয়া। তার উদারতার উদাহরণ হচ্ছে, তার একটা বাইসাইকেল ছিল।  আর আমি চাইলেই সেই সাইকেল চালাতে পারতাম । এমনকি সে আমাকে সাইকেলটা দিতেও চেয়েছিল এক সামান্য শর্তে, আমি নেইনি। প্রায় এক বছর আমাদের  পরিচয় যেহেতু সে ক্লাস এইটে-ই ভর্তি হয়েছিল। হঠাৎ একদিন খবর পেলাম কিবরিয়া মারা গেছে। কিভাবে কি হয়ে গেল বুঝে উঠতে পারলাম না। আমাদের স্কুলে সাধারণ ছুটি ঘোষনা করা হল । সবাই বাড়ির পথ ধরলো আর আমরা কয়েক ক্লাসমেট ধরলাম কিবরিয়াদের বাড়ির পথ । আমরা কেউ তার বাড়ি চিনি না। প্রচন্ড দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তার  পরে অবশেষে  বাড়ি খুঁজে বের করলাম । ততক্ষণে এক বাঁশ বাগানের পাশে কিবরিয়াকে কবর দেয়া হয়েছে । মরা বাড়িতে যা হয়,  মা কান্নাকাটি করছে আর বাবা নির্বাক হয়ে বসে আছেন। আমাদেরকে বসতে দিয়ে আমাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিলেন । আমরা কখনওই  জানতাম না যে, কিবরিয়া কাউকে ভালবাসত আর ভালবাসার জন্য সে নিজের জীবন দিয়ে দেবে।  এত সুন্দর একটা পরিবার, কোন কিছুরই অভাব ছিল না কিবরিয়ার, তবুও সে চলে গেল। কি কঠিন তার প্রতিজ্ঞা।  তা না হলে সে এমন কাজ করতে যাবে কেন। আমি মনে মনে স্থির করলাম,  আর যাই হোক বাবা মাকে কাঁদিয়ে কোন মেয়ের জন্য নিজের জীবন দেব না।

সময় চলে যায় কিবরিয়া ও হারিয়ে গেল ব্যস্ততার বিড়ে। স্কুল পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হলাম। আমার কলেজ বন্ধু বলতে শিপন, নজরুল আর কামরুল । শিপন আর আমার গ্রাম একই আর নজরুল পাশের গ্রামের। স্কুল থেকে এস.এস.সি পাশ করে কোটালিপাড়া শেখ লুৎফর রহমান কলেজে ভর্তি হলাম । তাই নজরুল  আর শিপনকেই পেলাম পুরাতন বন্ধু হিসেবে । এরই মধ্যে নজরুল আর্মিতে যোগ দিয়ে গেল দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে । রয়ে গেলাম আমি শিপন আর কলেজ বন্ধু কামরুল। তাই ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়লো। বাকি প্রায় সবাই ভর্তি হলো সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ মাদারীপুরের খোয়াজপুরে।  কামরুল ছিল তখনকার ভিপি রুহুল আমিন ভাই এর ভাতিজা। কামরুলের সাথে আমার এবং শিপনের অনেক ভাল সম্পর্ক । ক্লাস আড্ডা, হইহুল্লোড় করে দিন কাটাতে লাগলাম আমরা। হঠাৎ একদিন শুনলাম কামরুল ক্যান্সারে আক্রান্ত। এত হাসিখুশি একটা বন্ধু, তার এমন দুঃসংবাদ ! আর ক্যান্সার আসলে কি তা তখন ভালভাবে জানতামও না। শুধু বুঝতাম কঠিন রোগ যা আর কখনই ভাল হবে না। ভালমানুষগুলো সত্যিই কি তবে ক্ষণজন্মা হয়? আর তাই হয়ত কামরুলও হারিয়ে গেল। ঘাঘর বাজারথেকে কোটালিপাড়া যেতে সড়কের পাশের কবরস্থানে কামরুলকে সমাহিত করা  হয়েছে। ওই রাস্তায় যতবার যাই ততবারই যেন মনে হয় কামরুল বলছে, ‘দোস্ত কেমন আছো?’ কলেজ শেষ করে ঢাকায় আসলাম আমি।  ভর্তি হলাম তিতুমির কলেজে । আর শিপন কর্মজীবনে প্রবেশ করলো তার খালাত ভাই এর আনারকলি মার্কেট এ। ২০০৯ সালের রোজার ঈদে বাড়িতে গেলাম । ঈদের ছুটি প্রায় শেষ । শিপন আর আমি ঢাকায় ফিরবো।  কিন্তু একসাথে ফেরা হল না।  আমাকে ও বললো, কয়েকদিন বাড়িতে থাকবে। আমি ঢাকায় চলে আসলাম । ৪/৫ দিন পরে খবর পেলাম শিপন হোন্ডা এক্সিডেন্ট করেছে,  এই পৃথিবীতে সে আর বেঁচে নেই।

মাত্র কয়েক বছরে এই তিন বন্ধু আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে । আর যাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব নষ্ট হয়েছে তা শুধু আমার দারিদ্রের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার সংগ্রামে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে। আমি প্রায়ই আনারকলি মার্কেটে যেতাম আর গেলেই শিপন এর সাথে দেখা হয়ে যেত। ছাত্রজীবনের অর্থসংকটে শিপন এর হাতছানি সব সময় হাসিমুখে মানা করে দিয়েছি। তবে যতবার ঢাকা থেকে তার  সাথে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছি  শিপন গাড়ি ভাড়া  দিয়েছে । ভাড়া দেয়ার  সুযোগ কখনই শিপন আমাকে দেয়নি।  মার্কেটে গেলে এমন কোন দিন নেই যে শিপন এর সাথে দেখা হয় নাই। আমার খুবই ইচ্ছা ছিল যে, একটা সময় আমি অবশ্যই চাকুরি করব। তখন শিপনকে আমি গাড়ি ভাড়া দিয়ে গ্রামে নিয়ে যাব। তখন আমি বলবো, ‘দেখ আমিও টাকা আয় করি ।’ যদিও শিপন বিশ্বাস করতে চাইত না যে, এমন বোকা একটা ছেলে কিভাবে টাকা রোজগার করবে?  অনেক বন্ধুর কাছে আমার অনেক দেনা।  এই দেনার দায়ভার একান্তই আমার যা থেকে আমি কখনও পরিত্রাণ পাই না।  আর হয়তো পাবো ও না। এখনও আমি আনারকলি মার্কেটে যাই কিন্তু  শিপনের  দেখা পাই না। আমার এখনও মনে হয়, মার্কেটে গেলেই শিপনের সাথে দেখা হয়ে যাবে। তাই মার্কেটের ভিতরে এ না যেয়ে পাশ দিয়ে চলে আসি। কারণ ভিতরে যাব আর শিপনের সাথে দেখা হবে না এটা কি করে সম্ভব! আর এমন তো কখনই হয় নাই।

ফিরোজ শ্রাবন​
ফিরোজ শ্রাবন​

Author: ফিরোজ শ্রাবন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment