বাংলাদেশের নারী

আই অ্যাম ডায়িং

নারী আন্দোলনের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া নারী জাগরণের আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন,‘ তোমাদের কন্যাগুলিকে শিক্ষা দিয়া ছাড়িয়া দাও , নিজেরাই নিজেদের অন্নের সংস্থান করুক।’ তার এই আহ্বানে নারীর অধিকার অর্জনের পন্থা সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে । উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এ দেশে নারী জাগরণে সাড়া পড়েছিল শিক্ষা গ্রহণকে কেন্দ্র করে। তাছাড়া বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে নারী তার অধিকার আদায়ে সচেতন হয়ে ওঠে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও স্বাধিকার আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে  নারীর অসামান্য অবদান তাদেরকে আত্মপ্রত্যয়ী করে তোলে। নারীরা সোচ্চার হয়ে ওঠে অধিকার আদায়ে । আশার কথা, নারী অধিকার সুরক্ষায় বর্তমান সরকার সচেষ্ট রয়েছে। রাষ্ট্র, অর্থনীতি, পরিবার ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করা এবং উন্নয়নের মূলধারায় নারীকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে সরকার নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে । নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ডিসেম্বর ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক সিডো সনদ প্রণীত হয়। ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর এই সনদ গৃহীত হয়। বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালে চারটি ধারায় কতিপয় সংরক্ষণসহ এই সনদে অনুস্বাক্ষর করে। ১৯৯৬ সালে দুটি ধারা থেকে সংরক্ষণ তুলে নেয়া হয়। এটাকে বলা হয় নারীর জন্য ‘আন্তর্জাতিক বিল অফ রাইটস।’ এই দলিল নারীর অধিকার সংরক্ষণের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মানদন্ড বলে বিবেচিত। বাংলাদেশ এই সনদে অনুস্বাক্ষরকারী প্রথম দশটি দেশের অন্যতম। এর আগে ১৯৭৫ সালে প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে । এরপর থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারী অধিকার সংক্রান্ত সব ক’টি প্লাটফর্মে বাংলাদেশ অংশ নেয়। এভাবে বাংলাদেশ দেশের বাইরে নারী উন্নয়নের যে আন্দোলন চলছিল তার মূলধারায় যুক্ত হয়ে পড়ে।

শুধু আন্তর্জাতিক ফোরামে দলিল দস্তাবেজে স্বাক্ষর করে ক্ষান্ত হয়নি বাংলাদেশ । ১৯৯৭ সালে তৎকালীন সরকার প্রথমবারের মত দেশের ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ১৯৯৭’ প্রণয়ন করে। যার প্রধান লক্ষ্য ছিল যুগ যুগ ধরে নির্য়াতিত ও অবহেলিত  বৃহত্তর নারী সমাজের ভাগ্যোন্নয়ন করা। নারী উন্নয়ন নীতিতে এদেশের নারী সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ আন্দোলনের প্রতিফলন ঘটে। নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার জন্য সরকার ২০১১ সালে প্রণয়ন করে ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি।’  

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ‘ সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ তাছাড়া সংবিধানের ২৮(১), ২৮(২) , ২৮(৩) ২৮( ৪) , ২৯( ১) , ২৯((২) ৬৫( ৩) এবং ৯ অনুচ্ছেদে সুনির্দিষ্টভাবে নারীর  সমান অধিকার , প্রতিনিধিত্ব, অংশগ্রহণ ও মর্যাদার বিষয়টি নির্দিষ্ট করা আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ২০২১ সালের রূপকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে । এই রূপকল্প বাস্তবায়নের জন্য নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীকে সার্বিক উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্তকরণ অত্যন্ত জরুরি। তাছাড়া বিশ্বায়নের এই যুগে নারীকে সমষ্টিক অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করার  লক্ষ্যে ‘দারিদ্র বিমোচন কৌশলপত্রে’ বিভিন্ন কার্যক্রম সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এই কৌশলপত্রে রয়েছে সামাাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বলয়ের প্রসারের মধ্য দিয়ে হতদরিদ্র নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় নারী দারিদ্র বিমোচন, নারী নির্যাতন বন্ধকরণ, নারী পাচার রোধ, কর্মক্ষেত্রসহ সকল ক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা বিধানের এবং আর্থসামাজিক কর্মকান্ডে নারীর পূর্ণ ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। দরিদ্র নারীদের জন্য চালু করা হয়েছেঃ

বিধবা ও দুঃস্থ নারীদের জন্য ভাতা ঃ সরকার কর্তৃক ১৯৯৮ সালে এই কার্যক্রম চালু করা হয়। বর্তমানে দেশের ৯,২০,০০০ জন নারী এই কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত।

মাতৃত্বকালীন ভাতা ঃ মোট ৮৮০০ দরিদ্র মা এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিমাসে ৩৫০ টাকা হারে ভাতা প্রাপ্ত হন।

শহরা লে কর্মজীবী নারীদের ল্যাকটেটিং মাদার ভাতা : ৩৫০ টাকা করে প্রতিমাসে ভাতা দেয়া হয়। ঢাকা শহরের গার্মেন্টস কর্মীরা এই ভাতা পেয়ে থাকেন।

বিত্তহীন নারীর দারিদ্র বিমোচন কর্মসূচি : এই কর্মসূচির আওতায় খাদ্য নিরাপত্তারূপে ৭,৫০,০০০ জন দরিদ্র নারীকে প্রতিমাসে ৩০ কেজি চাল বা ২৫ কেজি পুষ্টি আটা দেয়া হয়।

দারিদ্র বিমোচন ঋণ প্রদান কর্মসূচি : নারীদের কৃষি, সেলাই, ব্লক, বাটিক, হস্তশিল্প, বিউটিফিকেশন, কম্পিউটার ও বিভিন্ন আয়বর্ধক বিষয়ে ব্যাপক প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ও বিনা জামানতে ঋণ সহায়তা প্রদান ও পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

নারী ও আইন

নারী ও কন্যা শিশুর প্রতি নির্য়াতন রোধকল্পে কতিপয় প্রচলিত আইনের সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে । যেমন:

১ যৌতুক নিরোধ আইন

২. বাল্যবিবাহ রোধ আইন

৩. নারী নির্যাতন ও শিশু নির্যাতন দমন আইন

৪. নাগরিকত্ব আইন ( সংশোধিত )  ২০০৯

৫ ভ্রাম্যমান আদালত আইন ২০০৯। এই আইনে বিচারের ক্ষেত্রে দন্ডবিধি ৫০৯ ধারা সংযুক্ত করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে । নারীর প্রতি যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ ও দমনের জন্য এটি একটি  কার্যকর আইন।

তাছাড়া বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি পাশ করেছে,

পারিবারিক সহিংসতা ( প্রতিরোধও সুরক্ষা আইন ) ২০১০

সরকার কর্তৃক নারী নীতি ঘোষণার মাধ্যমে নারীদের জীবনে এসেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। তাছাড়া মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে মাল্টি সেকটরাল প্রোগ্রামের আওতায় খোলা হয়েছে ২৪ ঘন্টার হেল্প লাইন ।  দেশের যে কোন স্থান থেকে যে কোন সময় এই লাইনে নারী সংক্রান্ত যে কোনো অভিযোগ, যে কোনো সমস্যার সমাধান চেয়ে কল করা যায় ।

তারপরেও অস্ব^ীকার করার উপায় নেই, নারী নির্যাতন চলছে । ঘরে বাইরে নারীরা হচ্ছে প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার।  ব্যাপকভাবে ঘটছে ইভটিজিং । ধর্ষণের মাত্রা বেড়ে গেছে অবিশ্বাস্যরকম। শিশু ধর্ষণের মত ঘৃণ্য অপরাধ চলছে লাগাতার। বাসে নারী ধর্ষণ এবং তার পরিণতিতে আত্মঘাতী হবার মত ঘটনাও ঘটেছে পর পর কয়েকটি। অভিভাবকেরা আজকাল তাদের নারী শিশু নিয়ে রীতিমত চিন্তিত । রাতের ঘুম হারাম হয়েছে তাদের।

এত ব্যবস্থা এবং সতর্কতার পরও কেন এই ধরনের ঘটনা ঘটছে সেটা ভেবে দেখা দরকার। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থা নেয়া দরকার  বলে মনে করি।

১.মোবাইল কোর্ট আরও সক্রিয় করা দরকার।

২. ইভটিজিং এবং ধর্ষণের মূল উৎস হচ্ছে নগ্ন ছবি ও মোবাইল। মোবাইলে  অশ্লীল গান ও অশ্লীল ছবি লোড করে এক ধরনের বিকৃত রুচির মানুষ। তারা সেগুলো শুনে আর  ছবি দেখে উত্তেজিত হয়। এ বিষয়ে কঠোর আইন করা দরকার। কেউ মোবাইলে অশ্লীল ছবি লোড করলে তাঁর উঁচু পর্যায়ের জরিমানা এমনকি জেলেরও বিধান রাখা প্রয়োজন।  

৩. নারী নির্যাতন রোধ করার বিষয়টা শুধুমাত্র আইন শৃঙ্খলা বাহিনির লোকদের হাতে ছেড়ে না দিয়ে পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায় এর বিরুদ্ধে টিম গড়ে তোলা দরকার। সেই টিমে প্রগতিশীর ছেলে মেয়েদের সাথে থাকবে সমাজকর্মী আর আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর লোক । এদের  ডিউটি এবং এলাকা ভাগ করে দিতে হবে। নিয়মিত টিম মিটিং করে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নিতে হবে। অনেক সময় এসব বিষয়ে সালিশ হয়। সালিশ সাধারণত ফলপ্রসু হয় না। বেশিরভাগ সময় সালিশ প্রভাবশালীদের পক্ষে যায়। কাজেই সালিশ না করে আইনত ব্যবস্থা নেয়াই ভাল।  

৪. থানা পুলিশ ফাঁড়ি থেকে শুরু করে সমস্ত জরুরি নাম্বার পাড়া, মহল্লার রাস্তার মোড়ে মোড়ে ডিসপ্লে করতে হবে।

৫. নিয়মিতভাবে সচেতনাতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত করতে হবে। ধর্ষণবিরোধী র‌্যালি করতে হবে। ইভটিজিং বা ধর্ষণ করে যারা ধরা পড়বে তাদের বায়োডাটা থানায় ডিসপ্লে করতে হবে। যাদের নামে অভিযোগ আছে তাদেরও তালিকা করতে হবে। ধর্ষণের আসামী জামিনে ছাড়া পেয়ে  ধর্ষিতাকে গলা টিপে মেরেছে এমন উদাহরণ আছে । অপরাধীদের নাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দিতে হবে। সেই নামগুলির ভিত্তিতে একটা তালিকা সংরক্ষণ করতে হবে। তালিকা প্রণয়নের জন্য একটা কমিটি করতে হবে। কমিটি যারা কাজ করবে তাদের মধ্যে সমন্বয় করবে। ইউএনও অফিস থেকে একটা মনিটরিং টিম করতে হবে। তারা উর্দ্ধৃতন কর্তপক্ষের কাছে রিপোর্ট করবে। অভিভাবকেরা সন্তানদের ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কভাবে নজর রাখবেন। ছেলেমেয়েরা যাতে অশ্লীল ছবি না দেখে সেদিকে কঠোর নজরারি রাখতে হবে। সাইবার ক্যাফেগুলি  মাঝে মাঝে চেক করে অশ্লীল কিছু দেখলে ব্যবস্থা নিতে হবে।

৬. থানাগুলোতে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণবিরোধী অপরাধ সেল গড়ে তুলতে হবে।  

আশার কথা যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সদ্য সমাপ্ত সংসদ অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে  সারা দেশে সন্ত্রাস বিরোধী প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ওয়ার্ড থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে এ কমিটি গঠনের জন্য নেতা কর্মী এবং সাংসদদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

আমরা আশাবাদী সরকারের এই সব কাজ বাস্তবায়নের  মধ্য দিয়েই অর্জিত হবে রূপকল্প ২০২১ । বিশ্ব নারী দিবসের প্রাক্কালে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আফরোজা পারভীন​
আফরোজা পারভীন​

 

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts