বাংলাদেশে যাবনা

বাংলাদেশে যাবনা

অনেকদিন পরে পশ্চিমবঙ্গে আমার ছোটো ভাই-এর বাসায় বেড়াতে গিয়েছি।

বাসাটা রাস্তার ধারে।
রোজ রাতে খাওয়া দাওয়ার পরেে হাসি আড্ডায় গল্প করতে করতে বেশ রাত হয়ে যায়। এরপরে গভীর রাতে যখন শুয়ে পড়ি ঠিক তার কিছুক্ষণ পরে রোজই শুনি কে যেন বাসার পাশ দিয়ে হেঁড়ে গলায় একটাই গানের কলি তাও আবার উল্টো পাল্টা ভাঁজতে ভাঁজতে যায়। গানটির মাথামুন্ডূ কিছুই বোঝার উপায় নেই।

লোকটি গায় বজল নদীর জলে ভরা ঢেউ ছলছলে প্রদীপ ভাসাও কেন মরিয়া। ” 
আমি দুই তিন দিন শোনার পরে এক সকালে আমার ভাইকে ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে জিজ্ঞেস করলম,

: আচ্ছা রোজ রাতে ভুলভাল একটা গানের কলি গাইতে গাইতে বাসার পাশ দিয়ে কে যায় বলতো?

আমার ছোট ভাই আমার কথা শুনে হাসতে হাসতে আর নেই। বলল,

: গানটা শুনেছ তুমি? সতীনাথের গানের কি হাল করে ছেড়েছে। ওর নাম লালু। বাংলাদেশ থেকে এসেছে। রোজ রাতে মদ খেয়ে বেসামাল হয়ে ফুর্তির চোটে এই একটাই গানের কলি গাইতে গাইতে যায়। 
এই দেশ নাকি ওর খুব পছন্দ। বাংলা দেশে নাকি আর ফিরে যাবে না।

আমি বললাম,

: এই দেশ ওর খুব পছন্দ বেশ ভালো কথা, কিন্তু তাই বলে দেশে ফিরে না যাবার কাণন কি?
আমার ভাই আবার হাসতে হাসতে বলল,

: এদেশে এসে ওর নাকি সবচেয়ে ভালো লেগেছে মদ খাওয়া।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

: মদ খাওয়ার সঙ্গে দেশকে ভালো লাগার কি সম্পর্ক?

ভাই বলল,

: ও বলে খোদাতালার সৃষ্ট কি সুন্দর আর আশ্চর্য এই দেশ! এখানে যার যত ইচ্ছে মদ তুমি খেয়েই যাও খেয়েই যাও। কেউ তোমাকে বাধা  দেবে না কেউ কিছু বলবে না।এই বলে আবার গান গায় আহা এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি যত ইচ্ছে মদের বোতল নাওনা চুমি চুমি। আমি তো শুনে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ি। ভাই বলল এদিকে মদ খেতে খেতে ওর গাঁটের পয়সা কড়ি শেষ। লোকজনের কাছে শুরু করেছে ধার নেয়া । সবাই ওর যন্ত্রণায় অস্থির।

এর মধ্যে আমি থাকতে থাকতেই শুনি ও বাংলাদেশে সময়মত ফিরে যাচ্ছে না কেন তা জানার জন্যে ওর স্ত্রী এসে হাজির। স্ত্রীটি খুবই বুদ্ধিমতী। 
স্বামীকে প্রথমে অনেক অনুরোধ করল ফিরে যাবার জন্যে। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা । এমন আশ্চর্য দেশ ছেড়ে সে এক পাও নড়বে না।

স্ত্রী তখন পাড়ার ক্লাবের ছেলেদের কাছে গিয়ে তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করার অনুরোধ জানাল। ছেলেরা তো আগে থেকেই জানে লোকটা ধার করে করে মদ খাচ্ছে আর সবাইকে অতিষ্ঠ করে ছাড়ছে । ওরা বলল,

বউদি আপনি কোনও চিন্তা করবেন না । আপনি শুধু বলুন আপনি কোনদিন যাবেন আর কোন বাসে যাবেন? আমরা সব ব্যবস্থা করে দেব। ওঁকে কিছু বলার দরকার নেই। আপনি আপনার মত প্রস্তুতি নিতে থাকুন।

এর দুদিন পরেই স্ত্রী যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়ে স্বামীকে জিজ্ঞেস করল,,

: আমি আজই চলে যাচ্ছি। তুমি তাহলে যাবে না ঠিক করেছ?

লোকটি বলল,

: কক্ষণো না।

স্ত্রী ও আর কিছু না বলে বাস ধরবে বলে বেরিয়ে গেল।

স্ত্রী বেরিয়ে যেতেই ক্লাবের দুজন ছেলে লোকটাকে মদ খাওয়াবে বলে পটিয়ে পাটিয়ে ঘর থেকে বের করিয়ে বাস স্টেশনে নিয়ে জোর করে বাসে তুলে দুদিক থেকে দুজনে ওর হাত পা চেপে ধরে রাখল।লোকটির স্ত্রীও কিছু জানে না এমন ভাব করে বাসের ভিতরে নীরিহ যাত্রীর মত চুপচাপ বসে রইল। 
লোকটির অগ্নি দৃষ্টি স্ত্রীর দিকে। বাস যেই স্টার্ট নিতে শুরু করল লোকটি আচমকা তার অর্ধেক শরীর বাসের জানালা দিয়ে বের করে সমানে পথচারীদের ডেকে ডেকে চেঁচাতে লাগলো ,

:ভাই সব আমাকে এখান থেকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি এই দেশ ছেড়ে যা বনা ,যাব না, যা বনা। আমাকে বাস থেকে একটু নামান। প্লিজ নামান। কিন্তু কে শোনে কার কথা! বাস ততক্ষণে তার গন্তব্যে ছুটে চলেছে।

অনুপা দেওয়ানজী
অনুপা দেওয়ানজী 

 

Author: অনুপা দেওয়ানজী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts