বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদপ্রাপ্তি এবং দু’টি প্রাসঙ্গিক কথা

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল

বর্তমান দুনিয়ায় আইন পেশা নানাবিধ কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পেশা গ্রহণের জন্য সকল দেশেই একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রার্থীকে তার যোগ্যতা যাচাইয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। আইনজীবি হওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতা নির্ধারণ ও যাচাই, ফি নির্ধারণ ইত্যাদি বিষয়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরণের বিধি-বিধান করা হয়েছে এবং হচ্ছে। প্রাচীন গ্রীকে পক্ষগণের স্ব স্ব মামলা উপস্থাপনের বিধান ছিল। প্রাচীন রোমে খ্রীস্টপূর্ব ২০৪ শতকে আইনজীবিদের ফি গ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়। আইন পেশায় অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বিধি-বিধান প্রণীত হলেও এই পেশা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাচীন যুগ থেকে অদ্যাবধি পৃথিবীর কোন দেশে বয়সের উর্দ্ধসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা যায়না। যেমন-ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশে ২১ বৎসর পূর্ণ হলে একজন আইন পেশা গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু কত বয়স পর্যন্ত আইন পেশা গ্রহণ করা যাবে তার কোন উর্দ্ধসীমা নির্ধারণ করা হয়নি। তামাম দুনিয়ার কোন দেশে আইন পেশা গ্রহণের ক্ষেত্রে বয়সের উর্দ্ধসীমা নির্ধারিত নেই। দেশের উন্নতি ও গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে মানুষ এখন ৮০/৮৫ বৎসর পর্যন্ত কর্মক্ষম থাকে। বাংলাদেশে আইন পেশা গ্রহণের ক্ষেত্রে বয়সের উর্দ্ধসীমা নির্ধারিত হলে তা পৃথিবীতে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে। আমাদের দেশে সরকারী চাকুরি শেষে যারা আইন পেশা গ্রহণ করেছেন তাদের অনেকেই এই পেশায় যথেষ্ট অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

 

সরকারী চাকুরীতে বিশেষতঃ আয়কর, শুল্ক ভ্যাট ও আবগারী, প্রশাসন ইত্যাদি বিভাগে যারা চাকুরি করেন তাদের অনেকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন। চাকুরি শেষে পরিণত বয়সে তারা আইন পেশায় আসলে আদালত অঙ্গন অবশ্যই সমৃদ্ধ হবে। সনদ প্রাপ্তির জন্য বয়স-সীমা ৪০ বছর নির্ধারণ করা হলে তারা এই পেশা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন এবং জাতিও তাদের লব্ধজ্ঞান সমৃদ্ধ সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।

 

সনদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ৪০ বৎসর নির্ধারিত হলে বার কাউন্সিল আইনে সনদ গ্রহণের ক্ষেত্রে বয়সের উর্দ্ধসীমা নির্ধারিত না থাকায় বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত যে সব বয়স্ক লোক দেশী/বিদেশী আইন ডিগ্রী অর্জন করেছেন ও করছেন তাদের মধ্যে যে Ôlegitimate expectation’ সৃষ্টি হয়েছে তার পরিসমাপ্তি ঘটবে। ভারতের Poonam Verma VS Delhi Development Authority (2007) মামলায় ‘legitimate expectation’ নিম্নরূপে সংজ্ঞায়িত করা হয় :

“legitimate expectation is an expectation of a benefit, a relief or remedy, that may ordinarily flow from a promise or established practice.”

 

যুক্তরাজ্যের R VS Board of Inland Revenue, exp MRK underwirting Agents (1990) মামলায় Bingham Lj বলেন, “If a public authority so conducts itself as to create a legitimate expectation that a certain course of action will be followed, it would often be unfair if the authority were permitted to follow a different course to the detriment of one who has entertained the expectation, particularly if he acted on it.”

 

সমাজের বিভিন্ন স্তরে শত শত হাজার হাজার বয়স্ক মানুষ আর্থ-সামাজিক কারণে পঞ্চাশ/ষাটের কোঠায় আইন পেশা গ্রহণের জন্য অর্থ, মেধা ও শ্রম দিয়ে কষ্ট করে আইন ডিগ্রী লাভ করেছেন এবং করছেন, তাদের বৈধ প্রত্যাশা ও তদানুযায়ী গৃহীত কর্ম প্রক্রিয়া মোতাবেক তারা আইন পেশা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলে natural justice থেকেও তারা বঞ্চিত হতে পারেন। শুধুমাত্র বয়সের কারণে এই পেশা গ্রহণ থেকে কাউকে বারিত করা যায় না। বয়স কখনও কর্মস্পৃহার পথে অন্তরায় নয়। এই প্রসঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলা যায় “বার্ধক্যকে সব সময় বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না। বহু যুবককে দেখিয়াছি যাহাদের যৌবনের উর্দির নীচে বার্ধক্যের কঙ্কাল-মূর্তি। আবার বহু বৃদ্ধকে দেখিয়াছি যাহাদের বার্ধক্যের জীর্ণাবরণের তলে মেঘ-লুপ্ত সূর্যের মত প্রদীপ্ত যৌবন। তরুণ নামের জয়মুকুট শুধু তাহারই বিপুল যাহার আশা, ক্লান্তিহীন যাহার উৎসাহ, বিরাট যাহার ঔদার্য, অফুরন্ত যাহার প্রাণ, অটল যাহার সাধনা।”

 

শেখ রফিকুল

Author: শেখ রফিকুল

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment