বাবার হাসি

baba afroza parveen

বাবা মোটেও হাসেন না এটা মিতুর একটা দুঃখের কারণ । হয়ত কোন মজার গল্প হচ্ছে, সে আর মা হেসে গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু বাবার মুখে হাসির লেশমাত্র নেই। বরং আচমকা ওদের হাসির মাঝেই বলে ওঠেন, ‘এত হাসির কি আছে শুনি ?’ ওরা থতমত খেয়ে থেমে যায়। এমন ঘটে প্রায়ই। হয়ত কোন বাড়িতে  অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করেছে । ওরা গেছে সেখানে, সবাই হাসছে, গল্পে  মেতে আছে, নানান রকম কথা বলছে, খুনসুটি করছে। বাবা কিন্তু নিশ্চুপ। শুধু নিশ্চিুপ থাকলেও এক কথা ছিল, রীতিমত গম্ভীর। আর তার গাম্ভীর্য এতটাই যে সবারই সেটা চোখে পড়ে। যে আত্মীয়ের বাড়িতে গেছে সে হয়ত ফট করে বলে বসে, ‘ব্যাপার কি বলুন তো ভাই,  আপনার বোধহয়  এখানে আসার ইচ্ছে  ছিল না। তা ইচ্ছে যখন ছিল না না এলেই পারতেন।’ এমন ব্যাপার হামেশাই ঘটে। আর মাকে রীতিমত বিব্রত হতে হয়।  বাবা  কারো সাথে মেশেন না, পাড়ার মসজিদে নামাজ পড়তে যান না। পাড়ায় একটা ক্লাব আছে সেখানে যান না, লাইব্রেরিতে না। অফিসে যান আসেন আর সারাদিন ঘরে বসে থাকেন। আত্মীয় স্বজন আসলে তেমন কথাও বলেন না। আত্মীয় বলতে মিতুর মায়ের দিকের আত্মীয়। বাবার দিকের কাউকে কখনও এ বাড়িতে আসতে দেখেনি সে। না তার দাদা দাদি না চাচা ফুফু । এমনকি তার দাদাবাড়ির কোন লোকজনও । বন্ধুরা প্রায়ই গল্প করে,

: জানিস আমার দাদি এসেছেন । যা ভাল  আমার দাদি। আমাকে অনেক রূপকথার গল্প শুনিয়েছেন।

: আমার চাচু না এমেরিকায় থাকেন । চাচু এসেছেন। তিনমাস থাকবেন।  অনেক গিফট নিয়ে এসেছেন।

: দাদাবাড়ি থেকে মুড়ি আর মোয়া এসেছে।  মুড়িগুলো যা মুচমুচে আর মোয়ায় গুড় বোঝাই। দারুণ খেতে ।

মিতুর নানি দু একবার এ বাড়িতে এসেছেন। কীযে আদর করেন তিনি মিতুকে!  মুখে তুলে খাওয়ান। নানান ধরনের গল্প করেন।  রূপকথার গল্প,  ভূতের গল্প, তাদের গ্রামের গল্প আরো কত কি। মিতুর নানিকে দারুণ ভাল লাগে । নানির রান্নাও খুব ভাল। মিতুর খুব ইচ্ছে  করে নানি তাদের সাথে এ বাড়িতেই থাক। কিন্তু এখন অনেকদিন নানি আসেন না। শেষবার  ফিসফিস করে মাকে বলছিলেন,

: শাপলু জামাই বোধহয় আমাদের আসাটা পছন্দ করে না। আমার সাথে কথা বলে না। ভাবছি আর আসবো না। কিন্তু কি করব তোর জন্য, মিতুর  জন্য মনটা কেমন করে তাই ছুটে ছুটে আসি।

মা নানিকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।  তার চোখে পানি।  কাঁদতে কাঁদতে  বলেছিলেন,

: তুমিতো সবই জানো মা, তোমার জামাই কেন কথা বলে না, কেন এমন পাথর হয়ে গেছে তা তুমি জানো। তারপরও তুমি এ কথা বলতে পারলে!

নানি মায়ের চোখের পানি মুছিয়েছিলেন

: আরে পাগল তুই কাঁদতে শুরু করলি কেন বোকার মত!  আমি কি না এসে, তোদের না দেখে থাকতে পারব? কখনই না।

বলেছিলেন বটে কিন্তু আর অসেননি। গেছেন সেও তো তিন চার বছর হল।  আর বাবার বাড়ির কেউ তো কখনই আসেন না।

একদিন সকালে খাবার টেবিলে বাবাকে অচমকা জিজ্ঞাসা করেছিল মিতু

: আচ্ছা  বাবা তোমার বাড়ির কেউ তো কখনও আসে না এ বাড়িতে,  তোমার বাবা মা ভাইবোন কেউ না। কেন বাবা?

খেতে খেতে হাত থেমে গেছিল বাবার। আগুন চোখে একবার মিতুর দিকে তাকিয়েছিলেন ।  তারপর হনহন করে হেঁটে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।  সারা দিন সে দরজা খোলেননি ।  সেদিন বাবা অফিসেও যাননি। সন্ধ্যার পর অনেক ডাকাডাকি আর কান্নাকাটিতে দরজা খুলেছিলেন বাবা। বাবাকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল  মিতু।  বাবার চোখ মুখ ভীষণ ফোলা। কেউ কাঁদলে সাধারণত এমন ফোলা হয়। কিন্তু বাবা কাঁদতে যাবেন কেন।  সেদিন মা মিতুকে অনেক বকেছিলেন। কঠোর কন্ঠে  বলেছিলেন, আর যেন কোনদিন বাবাকে তার বাবা-মা,  ভাইবোনের কথা জিজ্ঞাসা করা না হয় ।

: কিন্তু কেন মা ?

: অত প্রশ্ন করো না। ওসব জিজ্ঞাসা করলে তোমার বাবার অনেক কষ্ট হয়। দেখলে না তোমার বাবা কত কেঁদেছেন। খবরদার বলছি আর কখনই ওকে এসব জিজ্ঞাসা করবে না।

কিন্তু  মিতু বোঝেনি কী এমন অপরাধ সে করল যাতে তার বাবা এত কষ্ট  পেলেন আর কান্নাকাটি করলেন। আর তখনই মিতুর মনে হয়েছিল, ঠিকই তো বাবা যখন লাল চোখে তার দিকে তাকিয়েছিলেন সে চোখে শুধু আগুনই ছিল না, তার পেছনে কান্নাও ছিল ।

বাবার এই ঘরকুনো স্বভাবের কারণে পাড়ার কেউ বাবার সাথে মেশে না। অফিসেও বাবার কোন সুনাম নেই। বাবার অফিসের এক পিয়ন এ পাড়াতেই থাকে। একদিন সে মিতুকে দেখে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছিল, ‘ কি অহংকারি মানুষ এই আসিফ স্যার ।  কারো সাথে মেশেন না, একটার বেশি দুটো কথা বলেন না। এজন্য অফিসের সবাই মনে করে স্যারের খুব দেমাগ। স্যারকে কেউ তেমন পছন্দ করে না। আর যা কৃপণ, একদিন পাঁচশ টাকা ধার চেয়েছিলাম। দিলো তো নাই উল্টে আরও দশ কথা  শুনিয়ে দিল।’

এসব কথা প্রায়ই শুনতে হয় মিতুকে। বাবার অফিসের লোকেরা বলে, পাড়া প্রতিবেশি আত্মীয় স্বজনরা বলে । বাবা কোন প্যারেন্টস ডেতে মিতুর স্কুলে যান না। ছেলেবেলা থেকে এটা একটা বড় কষ্ট মিতুর। দু চারবার বাবাকে বলেছেও সে কথা, কেঁদেছেও। কোন লাভ হয়নি। তাই মা একাই যান প্যারেন্টসডেতে । আর প্রায়ই অন্যান্য গার্জিয়ানদের প্রশ্নের জবাবে মাকে মিথ্যে কথা বলতে হয়। বাবা কোনদিন তাকে পার্কে নিয়ে যান না , বেড়াতে নিয়ে যান না। নিজে থেকে তো নাই-ই। বায়না করলেও না । বরং বায়না করলে ধমক খেতে হয়। এসব কারণে বাবার  ওপর মিতুর ভীষণ অভিযোগ আর অভিমান।

স্কুলে বন্ধুরা গল্প করে,

: দেখ দেখ আমার আব্বা এই টিফিনবক্সটা আমার জন্য নিজে পছন্দ করে কিনে এনেছেন । খুব ভাল না?

: আর দেখ আমার আব্বা এই  দামি কলমটা

: জানিস আমরা না এবারের হলিডেতে সাফারি পার্কে ঘুরতে যাব । বাবা বলেছেন, ছেলে মেয়েদের যেমন পড়াশুনা করা দরকার তেমন ঘোরাও দরকার। নতুন নতুন জায়গা দেখবে । নতুন নতুন জিনিস শিখবে

: বাবা আমাকে কাল বিকেলে বসুন্ধরা শপিং মলে নিয়ে গিয়েছিলেন। দুটো ভাল ফ্রক  কিনে দিয়েছেন। যা সুন্দর রং ফ্রক দুটোর।

মিতু শোনে আর মূহ্যমান হয়। তার বাবা তাকে কোনদিন টিফিনবক্স কিনে দেননি, কলম কিনে দেননি, সাফারি পার্কে বেড়াতে নিয়ে যাননি, নতুন ফ্রক কিনে দেননি।  হ্যাঁ এ কথা ঠিক মিতুর কখনই কোন কিছুর অভাব হয়নি। বাবা যেটা দেননি তার চারগুণ দিয়ে মা পুষিয়ে দিয়েছেন। মা সবসময় মিতুর অভিমানটা বুঝেছেন আর সেভাবেই তাকে নানাভাবে খুশি রাখতে চেষ্টা করেছেন।  কিন্তু মিতুর মন তাতে ভরেনি।

মায়ের সাথে যে বাবা খুব একটা কথা বলেন তাও না।  দিন শেষে বাড়িতে ফিরে প্রয়োজনীয় কথাগুলোই দুজনকে বলতে দেখে মিতু। সংসারে কি লাগবে, মিতুর কি প্রয়োজন এসব। অন্য মানুষের বাবা-মায়েরা কত গল্প করে, হাসে, বেড়াতে যায়, তার বাবা মা তাও করেন না। কেন করেন না? একদিন মাকে সে প্রশ্নও করেছিল মিতু

: আচ্ছা মা, বাবা তোমার সাথে গল্প করেন না কেন? তোমরা সিনেমা দেখতে যাওনা কেন ? আমার বন্ধুদের বাবা মায়েরা কত বেড়াতে যায়, সেনিমা নাটক দেখে ।

মা অবাক হয়ে তাকান । তারপর বলেন,

: তোমাকে অত ভাবতে হবে না মিতু। শুধু মনে রেখ ও খুব ভাল মানুষ আর ওর মনে অনেক কষ্ট।

: কি কষ্ট, কিসের কষ্ট সেটাই তো জানতে চাই । বলো না মা।

: না দরকার নেই। তোমার বাবা যদি শোনেন আমরা এসব আলাপ করছি তাহলে মনে ভীষণ কষ্ট পাবেন। দরজা বন্ধ করে দেবেন, অনেক কান্নাকাটি করবেন। একবার শুনে ফেলেছিলেন । ওরে বাপরে সে যে কি অবস্থা । থাক থাক

: কিন্তু মা বাবার মনে কষ্ট। আমি তার মেয়ে, আমি জানতে পারব না?

: জানবে, এক সময় জানবে। এখন এ কথা থাক।

মা কথায় কথায় বলেন বাবা খুব ভাল মানুষ, বাবার মনে অনেক কষ্ট। কিন্তু বাবার সেই কষ্টের খবর মিতু পায় না। তাই মিতুর কষ্ট আর অভিমানও বাড়ে। বাবার কষ্ট মা বোঝেন, তারটা বোঝেন না এটাই বা কেমন কথা। মায়ের প্রতিও মিতুর অভিমান জমা হয়। বাবার সাথে আগে থেকেই কথা হতো না। মিতু স্কুল বাদে সারাটা সময় মায়ের পাশে  ঘুরঘুর করত, মায়ের সাথে গল্প করত, এবার সেটাও সে ছেড়ে দেয়। স্কুল থেকে বাসায় এসে ঝিম মেরে ঘরে বসে থাকে । মার কাছে যায় না, আগের মত তার চারপাশে ঘুরঘুর করে না। কথাও বলে না। মিতুর ধারণা ছিল দু চারদিন এমন করলে মা তার অভিমানটা বুঝবেন। কিন্তু সাতদিন পার হয়ে যায়। মা আপন মনে কাজ করেন, রান্না করেন, ঘর গুছান। একবারও মিতুর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করেন না, ‘ কিরে মিতু তুই আমার কাছে আসিস  না কেন। অভিমান হয়েছে নাকি রাগ করেছিস ’

কাজেই মিতুর অভিমান এবার রাগে গড়ায়। সে দরজা বন্ধ  করে ফুঁফিয়ে কাঁদে। তাকে কেউ ভালবাসে না । না মা না বাবা। কেউ না। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, বাবা- মা না ডাকলে আর কখনই নিজে থেকে তাদের কাছে যাবে না।  

সেদিন বিকেলে  মা ডাকতে থাকলেন । মিতু ডাকের জবাব না দিয়ে মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কোন কথা বলল না । মা বললেন,

: এত ডাকছি, ডাক শুনছিস না কেন ? মিতু জবাব দিল না। মা আবার বললেন,

: এই দেখ তোর পছন্দের পাকোড়া বানিয়েছি। তুই খেতে ভালবাসিস তাই বানালাম। অনেকদিন বানানো হয়নি  তাই না । নে খা । কি হল নে।

মিতু দাঁড়িয়ে রইল।

এমন সময় বাবা এলেন । মা চেয়ার টেনে দিলেন। বাবা বসে প্লেটে পাকোড়া নিতে নিতে মিতুর দিকে তাকালেন। সে চোখে কি যেন ছিল । মিতু বসল । মা ওর প্লেটে কয়েকটা পাকোড়া তুলে দিল। মিতু একটা পাকোড়া মুখে দিয়েই  উঠে পড়ল। মা বার বার ডাকলেন,

: কিরে তোর জন্য বানালাম তুই খেলি না। হয়েছে কি বল ? নাকি তোর ঘরে পাঠিয়ে দেব ?

বাবা বললেন,

: তোমার মেয়ের অভিমান হয়েছে । অভিমানের কারণটা বোঝার চেষ্টা কর।

যেতে যেতে থমকে গেল মিতু। তার অভিমান হয়েছে মা বুঝলেন না। বাবা বুঝলেন। আশ্চর্যতো !

বিষয়টা নিয়ে মিতু অনেক ভাবে। তার মানে সে যে ভাবে বাবা তাকে খেয়াল করেন না, সেটা ঠিক না। বাবা তাকে গভীরভাবে খেয়াল করেন। না হলে অত অল্প সময়ে মিতুর গভীর অভিমানটা তিনি ধরে ফেললেন কি করে!

সেদিন ছিল শুক্রবার।  ব্রেকফাস্ট করতে বসেছে ওরা। টেবিলে বাবার সামনে খোলা পত্রিকা। বাবা খাবার মুখে তুলতে তুলতে পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছেন।  বাবা হঠাৎ বলে উঠলেন,

: সাধে কি তোমায় বলি শাপলা এ দেশটা হল খুনি আর ডাকাতের দেশ । দেখ না জলজ্যান্ত ছেলেটাকে কিভাবে সবার চোখের সামনে কুপিয়ে মেরে ফেলল।  কেউ বাধা দিল না , টুশব্দও করল না। আমি বলি কি, যারা খুন করেছে তারা তো খুনিই আর যারা তাকিয়ে দেখেছে তারাও খুনের সমান অংশিদার। ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।’ বলতে বলতে বাবা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তার চোখ ঠিকরে আগুন বের হয়। কিন্তু মিতু সে আগুনের পেছনে পানি দেখে। বাবার খাওয়া থেমে যায়।

মা দ্রুত বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। তার কাঁধে হাত রাখেন

: দেখ তুমি ওসব  নিয়ে ভেব না। যারা এগিয়ে যায়নি তারা নিজেদের প্রাণের ভয়ে যায়নি

: তোমার একথা মানকে পারলাম না শাপলা । সব কটা মানুষ যদি এগিয়ে যেত প্রাণভয়ে পালিয়ে যেত খুনিরা। কিন্তু জনগণ তা করেনি, নিজের নিজের প্রাণ বাঁচিয়েছে । যাকগে আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। বলতে বলতে খাওয়া ফেলে উঠে যান বাবা। তিনি তখন কাঁপছেন।

মা ছুটে যান।

: খেয়ে যাও প্লিজ, খেয়ে যাও। আমি জানতাম এমন হবে।

বাবা  না খেয়ে বেরিয়ে যান। মা কাঁদতে বসেন।

বিষয়টা মিয়ে মিতু অনেক ভাবে। বাবা কিন্তু দারুণ সত্যি কথা বলেছেন । সত্যিই তো সবাই যদি একজোট হত কেথায় পালিয়ে যেত খুনিরা।  বাবার জন্য তার মনের কোণে একটা ভাললাগা রিনরিনিয়ে ওঠে।

বর্ষাকাল । দিনরাত বৃষ্টি ঝরছে তো ঝরছেই । ঢাকার অধিকাংশ এলাকা তলিয়ে গেছে । বেশ কিছু স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। বড় বড় রাস্তার উপর দিয়ে নৌকা চলছে। জনজীবন প্রচন্ডভাবে বিপর্যস্ত। মিতুরা যে এলাকায় থাকে সেখানে মিতুদের বাসাসহ আর কয়েকটা বাসা  উঁচু জায়গায় । এর চারধারের বাড়িগুলো নিচু নিচু। আর  চারপাশের অধিকাংশই গরিব মানুষ। তারা থাকে নিচু নিচু বস্তিতে।  

দিন কয়েক ধরে প্রচন্ড বর্ষণের পর সেদিন ঝড় শুরু  হল।  প্রচন্ড  ঝড় উঠল আর সাথে অঝোরে  বৃষ্টি। আশপাশের বাড়িগুলো আগেই পানির অনেকটা নিচে চলে গিয়েছিল । মাচা বেধে ছেলে মেয়ে ছাগল মুরগি নিয়ে একসাথেই বাস করছিল বস্তির মানুষেরা।  তীব্র খাওয়া আর পানির কষ্ট ওদের। খাওয়ার পানির অভাবে অনেকেরই ডায়রিয়া হয়ে গেছে । মাচার নিচে পানিতে খলবল করে সাপ। এই অবস্থায় বাস করছিল ওরা অনাহারে আর   রোগ যন্ত্রণায়। কিন্তু  এবার সিগনাল হল । সিগনালের পর এভাবে আর বসবাসের উপায় থাকল না। তাছাড়া যেকোন সময় ঝড়ে ভেঙে পড়তে পারে বস্তিগুলো,  ভেঙেছেও কয়েকটা। রেডিও টেলিভিশনে বার বার ঘোষণা করা হল, নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেবার জন্য। মূল্যবান জিনিস যতটুকু সাথে নেয়া যায় নিয়ে মানুষ ছুটল আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর দিকে। বেশ কিছু লোক সেখানে আশ্রয় পেল বটে, কিন্তু কিছু লোকের আশ্রয় জুটল না। তারা ছুটে এল উঁচু এলাকার এই বাড়িগুলোর দিকে। অন্য বাড়িগুলোর বরান্দায় উঠে তারা চীৎকার করতে লাগল, কাঁদতে লাগল, কেউ দরজা খুলল না। মিতুদের বাড়িতে কেউ এলো না। মিতুর বাবার কথা ওরা জানে। জানে এ বাড়ির দরজা খুলবে না। শেষ পর্যন্ত উপায় না দেখে বাড়িগুলোর সামনের খোলা জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে শিশু যুবক বৃদ্ধ অসুস্থ রোগি সবাই ভিজতে লাগল একসাথে ।  ওরা ভিজছে আর কাঁদছে। যদিও সে কান্নার আওয়াজ বৃষ্টির শব্দে শোনা গেল না। মিতু কাঁচের জানালায় দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছে।  তার চোখে জল।  আহা মানুষের  এত কষ্ট! আর এই কষ্ট দেখেও দরজা বন্ধ করে যারা ঘরে বসে খাচ্ছে দাচ্ছে টিভি দেখছে তারা কি মানুষ !  ওদের মানুষ নামটার আগে একটা ‘অ’ বসিয়ে দিতে ইচ্ছে  হল মিতুর। ওর ইচ্ছে  হল নিজে ছুটে গিয়ে  দরজা খুলে সবাইকে বাড়িতে নিয়ে আসতে। কিন্তু সেটার উপায়  নেই। যে বাবা মানুষের সাথে কথা পর্যন্ত বলেন না তিনি তাদের এ বাড়িতে ঢুকতে দেবেন না  কিছুতেই ।  মাও তো সারাক্ষণ বাবার পক্ষে। বাবার অমতে একটা কাজও করেন না মা। মিতুর কান্না বেড়ে গেল। তার মরে যেতে ইচ্ছে হল । বাবা মায়ের উপর প্রচন্ড রাগ হল । মনে মনে ঠিক করল এই ঝড় কমলে সে লুকিয়ে নানির কাছে চলে যাবে, ওখানেই থাকবে। এখানে আর কখনই ফিরে আসবে না। এসব যখন ভাবছে মিতু তখনই দরজা খোলার শব্দ শোনা গেল। মনে হল প্রবল বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে বাবার কন্ঠ  শোনা গেল।  কি বলছেন বাবা অত জোরে। ওদের বকছেন নাতো?  মিতু দৌড়ে গেল সামনের ঘরে। বাবা  ঝড়ের মাঝে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ঝড় তাকে উড়িয়ে নিতে চাচ্ছে , বৃষ্টিতে অবিরাম ভিজছেন তিনি। বাবা উচ্চস্বরে বলছেন,  

: আপনারা আসেন  আমার বাড়িতে,  আসেন প্লিজ । আমার ছোট বাড়ি । হয়ত খুব বেশি মানুষকে জায়গা দিতে পারব না। কিন্তু যতজনকে পারব দেব। এক চিলতে খালি জায়গাও আমি রাখব না। নিজের বিছানাও ছেড়ে দেব। কি হল আসেন।আগে বৃদ্ধ শিশু আর মহিলারা আসেন।

ওরা হুড়মুড় করে ঢুকল বাড়িতে । কেউ কেউ বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল, কেউ বাবার পায়ে পড়ল। মিতু দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল বাবাকে।

:বাবা আমার বাবা !

রাতে সিলিং থেকে সবচেয়ে বড় হাড়িটা নামানো হল। সে হাড়িতে খিচুড়ি রান্না হল। বাবা ঘুরে ঘুরে সবার খাওয়া দেখলেন। খাওয়ার পর যে যেখানে জায়গা পেল শুয়ে পড়ল।  তবে কেউই সোজা হয়ে শুতে পারল না। কুুঁকড়ে মুকড়ে একজন আর একজনকে জড়িয়ে শুলো ওরা ।  

বাবা সেদিকে তাকিয়ে মাকে বললেন,

: মানুষ যদি এমনভাবে পরস্পরকে সবসময় জড়িয়ে থাকত পারত শাপলা। কিন্তু সেটা হবার নয়।

অনেক রাতে  রান্নাঘরে কাজ করছিলেন মা। মিতু সেখানে গেল । বলল,

: আজ বাবা  যা করলেন আমি ভাবতেও পারিনি মা

: কেন ভাবতে পারোনি। আমি তো তোমাকে বার বার বলেছি তোমার বাবা খুব ভাল। কিন্তু ওর মনে খুব কষ্ট

: কষ্টটা কিসের মা? আজ  আমাকে বলতেই হবে

মা এদিক ওদিক তাকালেন । তারপর বললেন,

: তোমার বাবা তখন ছোট ।  তোমার বাবার চোখের সামনে সম্পত্তির লোভে তার বাবা মা আর বোনকে কুপিয়ে মেরেছে  দুর্বৃত্তরা ।  অল্পের জন্য বেঁচে যান তোমার বাবা। তারপর অনেক কষ্টে মানুষ হয়েছেন।  চারপাশে অনেক মানুষ ছিল সেদিন। কেউ এগিয়ে আসেনি।  সেই থেকে তোমার বাবা মানুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন।  কিন্তু তোমার বাবার অন্তরের গভীরে বাস করে এক বিশ্বাসী মানুষ। আর সেই বিশ্বাসের জোরে তিনি না চাইলেও মানুষকে ভালবেসে ফেলেন, কাছে ডাকেন, বিপদে পাশে দাঁড়ান । আজ যেমন দাঁড়িয়েছেন।

মিতুর চোখ  দিয়ে অনর্গল পানি ঝরতে শুরু করেছে সবে তখনই দেখে বাবা সামনে দাঁড়িয়ে। তার কোলে ছোট্ট একটা শিশু। মা বাবাকে দেখে  ভয় পেয়ে কি যেন বলতে চান।  বাবা বলেন,

: দেখেছ শাপলু, দেখ দেখ মিতু বাচ্চাটা কি দুষ্টু, কিছুতেই গলা ছাড়ছে না। যেই ছাড়াতে যাচ্ছি আবারও জড়িয়ে ধরছে।  আর দেখ দুষ্টুটা কেমন হাসছে

বাবা অবিরাম হাসছেন। মা গলা মেলান সে হাসির সাথে। আর মিতু হাসতে গিয়ে ফিসফিস করে বলে, আমার বাবা ওয়ার্ল্ডের বেস্ট বাবা।

আফরোজা পারভীন​
আফরোজা পারভীন

 

 

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts