বার্মা থেকে মিয়ানমার

হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা, কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গাকে দেশত্যাগে বাধ্য করার পরে ইদানিং মিয়ানমার সরকার বলছে, ‘আমরা শান্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সব মানুষের দুর্ভোগ গভীরভাবে অনুভব করি। রাখাইনে শান্তি, স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে  কাজ করছি। রাখাইন থেকে রোহিঙ্গারা কেন পালিয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছে, তা খুঁজে বের করতে চাই—–’। আমরা বলবো, এই বক্তব্য মিয়ানমার সরকারের একটা নতুন নাটক, একটা ফন্দিবাজী, নতুন ধাপ্পাবাজি। হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা, লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করার বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে বিশ্ববাসীকে এখন বোকা বানাতে চাইছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদেরকে ফেরত না নেয়ার আরেক কৌশলের ফন্দী এটেছে এবার অং সান সূ চি। এতই দরদ, এতই ভালোবাসা রোহিঙ্গাদের প্রতি তাহলে অং সান সূ চি কেন তার দলবলকে এখনও পাঠাচ্ছেন না বাংলাদেশে তাদের রোহিঙ্গাদেরকে ফেরত নেয়ার জন্য। সূ চি এও বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সব ধরণের কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রাখতে চান। আমরাতো মনে করি, আলোচনাতো একটাই -‘অবিলম্বে, অবিলম্বে মিয়ানমার থেকে আসা সর্বমোট ১০ লক্ষ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত নিয়ে যেতে হবে’। সূ চি এতোটা বোঝেন-এটা কেন এখনও বুঝতে চাইছেন না।

মিয়ানমার এখনও জ্বলছে- জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর। মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনী ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে অমানবিক নির্যাতন করেছে, যুবতীদের ধর্ষণ করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। শিশু বৃদ্ধ যুবকদেরকে এলোপাথাড়ি গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে। মিয়ানমারে আজ মানবতা ধুলায় লুন্ঠিত। প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছে, এক মুঠো ভাতের জন্য আজ হাত পাতছে, খাদ্য পাওয়ার জন্য রীতিমতো তারা করছে লড়াই। আশ্রয় ও চিকিৎসা সংকট তো রয়েছেই। একটুকু ঠাঁই পাওয়ার জন্য সে কি প্রতিযোগিতা। বিশ্ববাসী দু’চোখ মেলে এসব দৃশ্য দেখেছে আর মিয়ানমারের সামরিক শাসক ও রাজনৈতিক নেত্রী সূ চি’কে জানাচ্ছে ধিক্কার। তবুও মিয়ানমারে এই ২০১৭ সালে ফিরছে না মানবতা। ওখানে নেই রোহিঙ্গাদের জীবনের নিরাপত্তা। নিরাপত্তা দিয়ে ওরা ফিরিয়ে নিচ্ছে না রোহিঙ্গাদেরকে তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে। কি ওদের অমানবিকতা, আবার বলে কিনা – রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের বাসিন্দা নয়। বলতে হয়, মিয়ানমার সরকার হিংসা ও বিদ্বেষের মনোভাব নিয়ে নির্বিচারে চালাচ্ছে অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা, খুন, ধর্ষণ। ইরাবতী নদী আজ রক্তে লাল হয়ে রয়েছে।

মিয়ানমার বা বার্মা ভ্রমণে এখন আর যেতে চান না টুরিষ্টরা। কারণ ওখানে রীতিমতো চলছে হত্যাযজ্ঞ, নির্মমতা, অগ্নিকান্ড, ধর্ষণ। ভয়ভীতি  আতঙ্ক প্রতিনিয়ত কাজ করছে মানুষের মনে। কেউ বা বলেন মিয়ানমারে বছরের পর বছর চলছে সামরিক শাসন, জাতিগোষ্ঠি নিধন, তাহলে এদেশটি স্বাধীন হওয়ার কী প্রয়োজন ছিল। ইংরেজদের অধীনে ছিল বার্মা সেই দিনগুলোইতো ছিল ভালো।

এককালে মিয়ানমারের নাম ছিল বার্মা। বাঙালিরা প্রায়ই বার্মার রাজধানী রেঙ্গুনে যেতেন। রেঙ্গুনের এখন নাম তো ইয়াঙ্গুন। কাজের সন্ধানে বার্মা যাওয়া বাঙালির বোধহয় পানিভাতের মতোই সহজ ছিল। অনেকে বার্মার স্থায়ী বাসিন্দাও হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর এই যাতায়াত নানা কারণে কমে যায়। রেঙ্গুনের রাস্তাঘাট অনেকটাই আমাদের দেশের মতো, কিন্তু রাস্তার ধারে গাছপালা অনেক বেশি। ট্রাফিকের লাল আলোয় গাড়ি থামতেই অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা বেলফুল, জুঁইফুল, দোলনচাঁপার মালা বিক্রি করার জন্য গাড়ির কাছে চলে আসে। ওদের গালে চন্দনের মতো কী যেন মাখানো থাকে। একে বলা হয় ‘তানাখা’। তানাখার আসল কাজ রোদ থেকে ত্বককে বাঁচানো। তানাখা বেটে একটু খেলেও তাতে নাকি শরীর ঠান্ডা থাকে।

১৯৪০ সালের আগে বহু বাঙালি পরিবার বার্মায় বিভিন্ন শহরে চাকরির সুবাদে ওখানে বসবাস করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেই ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে জাপানি বিমানের আক্রমণ শুরু হয় বার্মায়। তখনই বাঙালি পরিবারগুলো দিগ্বিদিক জ্ঞানহীন হয়ে বার্মা ছেড়ে স্বদেশ বাংলায় ফিরে আসতে থাকেন। তখন অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়ে সঙ্গে স্ত্রী, পুত্র, কন্যাকে নিয়ে দিনের পর দিন পায়ে হেঁটে আসতে গিয়ে নানান সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন। কেউ শিশুসন্তানকে বয়ে নিয়ে যেতে না পেরে ফেলে যায় বার্মার গভীর বনে। কীই না-নিদারুণ দিনগুলো কেটেছিল বার্মাবাসী বাঙালিদের !

একদা বার্মার রাজধানী ছিলো মান্দালে। কেউবা একে বলে মান্দালয়। বড় শহর। ইংরেজরা রেঙ্গুণে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যায় ঊনিশ শতাব্দীর শেষভাগে। উত্তর মিয়ানমারের প্রধান শহর মান্দালে। এখানে শহরের কেন্দ্রে মান্দালে পাহাড়, এটি নাতিদীর্ঘ পাহাড়। বোধহয় হাজারখানেক সিঁড়ি ভাঙতে হয়। এতে লিফট আছে। পাহাড়ের মাথায় একটা অতি সুদৃশ্য প্যাগোডা। সুন্দর স্থাপত্য,  এর ভেতরে রংয়ের বাহার। উপর থেকে সারা মান্দালে শহর দেখা মেলে। ১৮৮৫ সালে থিবোকে পরাজিত করে ইংরেজ মান্দালে এবং উত্তর বার্মা অধিকার করে নেয়। দক্ষিণ বার্মা অবশ্য আগেই ইংরেজরা দখল করে নিয়েছিলো। থিবোকে ইংরেজ শাসক ভারতবর্ষে নির্বাসিত করেছিলো সেই সময়। স্টিমারে ইয়াবতী নদী পাড়ি দিয়ে যেতে হয় বাগানে। হাজার বছর আগে বার্মার রাজধানী ছিল বাগান । সম্ভবত তখন ছিল ভক্তির যুগ। বাগান থেকে রাজধানী কবেই  চলে গেছে, কিন্তু এখানে থেকে গেছে সাড়ে সাত হাজারের অধিক প্যাগোডা, মন্দির ও মঠের ধ্বংসাবশেষ। আজ জনহীন প্রান্তরের মাঝখানে পুরনো দিনের স্মৃতি নিয়ে সেকালের মানুষদের কীর্তির চিহ্ন দাঁড়িয়ে আছে বাগান। এই শহরের একটি অংশ এখন আধুনিক। ইট-কাঠ দিয়ে তৈরি এখানের বসতবাড়ি ও দোকানপাট, দেখতে বড়ই চমৎকার লাগে।

১৯৩৮ সালে বার্মা এবং ভারতবর্ষ ইংরেজের শাসনে সুবিধা করার জন্য আলাদা হয়ে গেল। নাটক-নভেল পড়ার সেই উঠতি বয়সে শরৎচন্দ্র ছিলেন আমাদের প্রিয় উপন্যাসিক। শরৎচন্দ্র বার্মাকে আমাদের কাছে এনে দিয়েছিলেন। আর পাঁচজন বাঙালি ভাগ্যান্বেষীর মতো শ্রীকান্তও বার্মা গিয়েছিল। তার বাসস্থান রেঙ্গুণের বাঙালিপাড়ায়। রবীন্দ্রনাথের জাপান যাত্রীতেও রেঙ্গুনের উল্লেখ আছে, কিন্তু তিনি সেখানে মাত্র একদিন ছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষভাগে বার্মা খবরের চূড়ায় উঠে এল। সেই সময় দক্ষিণভারতের চেট্টিসাররা বার্মায় ব্যবসা-বাণিজ্যে জমিয়ে ছিল। জাপানিরা যত এগোতে লাগল, বাঙালিরা আর চেট্টিসারেরা তত দ্রুত বার্মা ছাড়তে লাগলেন। সেই যুগে চট্টগ্রাম থেকে জাহাজে বার্মায় যাওয়া যেত। আবার অনেকেই পায়ে হেঁটে বার্মায় যেতেন। এজন্য তাদেরকে ভয়াল নির্জন পাহাড়-জঙ্গল পেরিয়ে বার্মায় যেতে হত।

লিয়াকত হোসেন খোকন
লিয়াকত হোসেন খোকন

 

Author: লিয়াকত হোসেন খোকন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment