বিশু চোর- ৬ষ্ঠ পর্ব

বিশু চোর

১৯৭১সালের বসন্ত কাল। এটি যেন বিন্নাপুর গ্রামের বিভীষিকাময় বসন্ত। সাতই মার্চের ভাষণে  বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিয়েছেন। পঁচিশে মার্চ পাকিস্তান বাহিনী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরীহ বাঙালির ওপর হামলা চালায়। দেশের মানুষ একতাবদ্ধ, স্বাধীনতার নেশায় উদগ্রীব।বিন্নাপুর গ্রামের বেশিরভাগ তরুণ যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য শপথ নিয়েছে। গ্রামের ইরফান পণ্ডিত সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। ইরফান পণ্ডিত একদিন  হন্তদন্ত হয়ে পাকিস্তানের হাট থেকে ফিরে এসে উঠানেই বসে পড়ে একটি টুলের ওপর। ডাকাডাকি করে কালামের মা শিউলি বেগমকে।শোনো কালামের মা, ভীষণ ভয়ের খবর আছে। হারুন কনে? কালাম কনে গেছে? অগোর ডাক দ্যাও। কতা আছে।

সবাই একসাথে হলে ইরফান পণ্ডিত বলেন,  ‘আটে থাইকা আইজ তিন জনেক ধইরা নিয়া গ্যাছে মেলেটারিরা। অবস্থা খুবই খারাপ। আসার সময় দেইখলাম, আংগোর নূরু, পশ্চিম পাড়ার আমজাদ, রফিকুল অরা বন্দ হরকারের বাড়িত বইসা মিটিং কইরত্যাছে। আমি কয়া আছি, নুরু তোরা যা হরার হর আমি তো যুদ্ধে যোগ দিবার পাইরত্যাছি না। চাকরি গেলি খামু কি? তোরা যুদ্ধে যা বন্ধুবান্ধবেক নিয়া’।

বন্দে আলি সরকারকে এখানকার সব লোক আঞ্চলিক ভাষায় বলে বন্দ হরকার। শুভগাছা গ্রামের পাকিস্তানের হাটের অদূরে ওয়াপদার বাঁধের কাছেই তার বাড়ি। বাড়ির সামনে একটি ধান চাল ভাঙ্গানোর মিল ঘর। বন্দে আলি সরকারের বড় পুত্র আমির হোসেন ভুলু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা করেছে। সে এলাকার সবাইকে মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত করছে। তাদের কাচারি ঘরে বসেই সবাই মিটিং করছে।

নুরু কি কইলো?- শিউলি বেগম জিজ্ঞেস করে।

কইলো, ভাইজান, আপনে চিন্তা হইরেন না। যা হরার আমরা হইরত্যাছি। দ্যাশ স্বাধীন হরাই নাইগবো।

কাইলক্যা দুহুরবেলা যহুন অক খাইব্যার দিছিল্যাম,  অক পেরেশানির মইধ্যে দেকছিলাম। কইলো, ভাবী, যুদ্ধ  হরাই নাইগবো, শালা পাকিস্তানি মেলেটারিরা যা আরম্ভ হইরছে – শিউলি বেগম জানায়।

আপনে জানেন, কালামের বাপ, আঙ্গোর নুরুর হাথে পশ্চিমপাড়ার বিশুও মিটিং থাকে। কতা কইবার না পারলি কি অইবো, অর মইধ্যে কিরহম জানি আগুন আছে। আপনে হোনেন নাই, বাওইখোলা গাও থাইকাও তিনদিন আগে দুইজনেক ধইরা নিয়া গ্যাছে, তার মইধ্যে হুরমত ব্যাপারির শালা, ওই বিশুর মামাও আছে। তার পর থাইক্যা বিশু খেইপা গেছে। খালি কইরা কি জানি কয়া মনের ঝাল ঝাড়ে।

হুম, হুনছি আমিও। কিন্তু একটো কতা হোনো, আঙ্গোর গেরামে মেলেটারিরা আইসপ্যার পাইরবো না। কারণ অইল, এই গেরামে আসার কোনো ভাল সড়ক নাই। অরা পাকিস্তানের হাটের উপুর গাড়ি থুইয়া পায়ে আইট্যা এতদূর আসার সাউসই পাইবো না।

কিন্তু আপনে সাবধান থাইকেন, আপনে তো ম্যালা জাগাত যান। আপনে সরকারি চাকরি হরলি কি অইবো, আপনেকও ধইর‍্যা নিয়া যাইব্যার পারে। বিশ্বাস নাই। ব্যাবাকমালাই জাইন্যা গ্যাছে এই বিন্নাপুর গ্রামের ব্যাবাক যুবক ছলপল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য নাম লেহাইছে

হুম, তা ঠিক কইছো। আঙ্গোর ইসকান্দার পণ্ডিত  চাচা আছে না, খুব জ্ঞানী মানুষ। আমাক কইল, দ্যাহো ইরফান, কত কষ্ট কইরা  পাকিস্তান আন্দোলন করছিলাম আমরা। আর শালা পাঞ্জাবী মিলিটারিরা যা কইরত্যাছে, তাতে পাকিস্তান আর টিক্যা থাইকপ্যার  পাইরবো না। আমি সারাজীবন মুসলিম লীগের সমর্থক আছিলাম আর আমার বেটা ঠাণ্ডু মুক্তি যুদ্ধে  নাম লেহাইছে। শয়তান এহিয়া টিক্কা খানেরা দ্যাশটোক ভাইংগাই ফালাইবো।

শরীফ রুহুল আমীন
শরীফ রুহুল আমীন

 

Author: শরীফ রুহুল আমীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts