বিশ্বকবির চরণে ‘মুগ্ধ জননীর’  প্রণাম

সাগর সৈকতে অধিষ্ঠিত  থেকে নিশি অবসানে, নির্ঘুম নয়নে, অরুণরবির  রাজসিক উদয় অবলোকনের  বিরল সৌভাগ্য  আজও আসেনি অধমের অর্জনে।তবে  আমি  দেখেছি গোধূলির রক্তিম আকাশ।দেখেছি অনশ্বর সৌররাজের  ধীর গম্ভীর অস্তাচল নির্গমন।দমিত নমিত হয়ে জল ছুঁয়ে মহর্ষির পদস্পর্শ করে প্রণাম  জানাবার নিরন্তর প্রয়াস পেয়েছি বারবার শতবার ! আটলান্টিক আমার নাগালের ভিতর  প্রায় একযুগ।সাগরের স্বাদ পেতে আকন্ঠ জলপান অনাবশ্যক ! অসম্ভবও বটে !অনাবশ্যক একারণে যে একবিন্দু জল আস্বাদন করলেই  অনন্ত অসীম বারিরাশির স্বাদ অনুভবে  লব্ধ হয়। সীমাহীন অন্তহীন অতলান্ত মহাসলিলকে আত্মস্থ করাও  সম্ভব না। কেবল অঞ্জলি ভরে তারে ক্ষণকাল অন্তরীণ করা যায়।সাগরে অবগাহন করে  সীমার মাঝে অসীমকে  অনুধাবন  করা যায়্ । চেতনাকে শাণিত করা যায়। আনন্দের লীলাময়তাকে  অনুভব করা যায়। বেদনাকে বিস্মরণে আবৃত করাও হয়ত সম্ভব হয়।বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাখ ঠাকুরও তেমনি মহাসাগরের মত বিস্তীর্ণ অতলান্ত এক অস্তিত্ব।আকাশের মত  অনন্ত অসীম তার পরিধি। আমি তার বেলাভূমিতে বিচরণ করে, মুক্তো হরণে ব্যার্থ হয়ে, অকিঞ্চিতকর  নুড়ি পাথর ও শূন্যগর্ভ শুক্তো আহরণ করেছি মাত্র।

আমি এক দীন, আবাল, কিন্তু অসীমেরে নিজ বাহুতে  বেষ্টনের অলীক বাসনায় নিমজ্জিত নির্বোধ নই। “সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর /আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর/ কতবর্ণে কত গন্ধে কত গানে কত ছন্দে  অরূপ তোমার রূপের লীলায় জাগে হৃদয়পুর !” কবিগুরু ব্যতীত আর কে সে অরূপ রূপের লীলাকে আপনা মাঝে প্রকাশ করতে পারে ?

“ O World invisible, we view thee/O World intangible  we touch thee/O World unknowable ,we know thee/ inapprehensible we clutch thee”  কবি ট্রানসিস টমসনের  এই কবিতায় যে প্রগাঢ় বিস্মিত কাব্যচেতনা, কবিন্দ্র রবীন্দ্রনাখের গীতাঞ্জলিতে তাই সহজ মাধুর্যে বিকাশিত। ১৫৭টি কবিতা নিয়ে গীতাঞ্জলির প্রথম প্রকাশ ১৩১৭ বঙ্গাব্দের  ভাদ্র মাসে।  এই ১৫৭ টি  রচনার মধ্যে ৮৫টি গান। বাকী ৭২ টিতে কোন সুরাশ্রয় নেই।

‘গীতিমাল্য’ প্রকাশিত হয় ১৩২১ বঙ্গাব্দের  ১৮ ই আষাঢ়।সেখানে মোট ১১১ টি গান ।আর ‘গীতালি’ প্রকাশ পায় ১৩২১ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে। সেখানে ১১৯ টি গান  লিপিবদ্ধ। কবি এক জায়গায় লিখেছেন “ আমি যখন গান বাঁধি তখনই  সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই।যখন প্রবন্ধ লিখি, বক্তৃতা দি, কর্তব্য করি  সবই তার কাছে তুচ্ছ” । কবি এক সময় লিখেছিলেন,“যবে কাজ করি, প্রভু দেয় মোরে মান/যবে গান করি  ভালোবাসে ভগবান” ।

রবীন্দ্রনাথ শুধু যে বাঙালির মনোজগতের অধিশ্বর এবং ভাবজগতের  মুকুটহীন সম্রাট তাই না।বস্তু জগতেও তিনি বাতিঘর।অসাম্প্রদায়িক চেতনার ঋষি কবিগুরু কাব্যদেবীর চরণে মাথা রেখে ঐশী ভালোবাসা অর্জন করেছেন।কিন্তু তিনি তাঁর প্রেমিক ঈশ্বরকে খুঁজেছেন মানুষের মাঝে।“ মোকো কাঁহা  ঢুন্ডোরে বান্দে, ম্যায় তো এঁহা তেরে পাস মে…….মোকো কাঁহা ঢুন্ডোরে বান্দে, ম্যায় তে এঁহা তেরে পাসমে ”। কবিগুরু তাঁর অসাম্প্রদায়িক মানসের ছবি এঁকেছেন “চতরঙ্গ” উপন্যাসের এক সংলাপে, ঠিক এভাবে,“তাগা তাবিজ শান্তি শস্তায়ন করে পেট মোটা পুরুত পান্ডাদের পিছনে তোমরা যে টাকা খরচ করেছ, সে জাগায় আমার খরচটা  উঠে আসুক তার পরে দেখা যাবে…. তোমার ঠাকুরকে ভোগ তুমি রোজ রোজ দাও । তাতে আমি কিছু বলি? আমার ঠাকুরকে ( ম্লেচ্ছ মোসলমান) আমি একদিন ভোগ দেবো, তাতে তুমি বাধা দেবে ?(কট্টর হিন্দুত্ববাদী  টিকি  পৈতা তিলকধারী  সাত্বিক ব্রাহ্মণ কনিষ্ঠ সহোদরকে বলছেন ব্রাহ্ম সমাজের  সদস্য, পেশায় শিক্ষক, জেষ্ঠ ভ্রাতা )।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গোঁড়া হিন্দু সমাজের কুসংস্কারের অন্ধকার  থেকে বেরিয়ে আসা আলোকিত ব্রাহ্ম সমাজের  আচার্যের আসনে উপবিষ্ট থেকেই বলছেন, ব্রাহ্মরা যে নিরাকারকে মানে  তাকে চোথে দেখা যায় না। হিন্দুরা যে সাকারকে মানে তাকে আবার  কানে শোনা যায়না। আমরা কাহাকে কে মানি ?(সংলাপের অংশ)- সজীবকে মানি ! তাকে চোখেও দেখা যায়, কানেও শোনা যায়!  (দৃশ্যপট- চতুরঙ্গ :  ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য  জেষ্ঠ ভ্রাতা পৈতৃক বাড়ির একতালায় নিজ অংশে  মুসলমান অতিথিদের ভুরি ভোজে আপ্যায়ন করছেন ।তাই নিয়ে দুই পরিবারে হাতাহাতির জোগাড়)। দেখো আমার অতিথি নারায়ণ কেমন হাত তুলে খাচ্ছে ! পারবে? তোমার ঠাকুর পারবে ? পারবে এ ভাবে খেতে? এই পর্যায়ে  কবির সামনে পাল্টা প্রশ্ন, কী করতে চাও ? কবি বলছেন জবাবে, “GREATEST GOOD FOR THE GREATEST NUMBER”, মানে “প্রচুরতম লোকের প্রভুততম সুখ সাধন “।এটাই কবির জীবন দর্শন।

“মংপুতে রবীন্দ্রনাথ” গ্রন্থে  কবি লিখেছেন “ আমি কোন দেবতা সৃষ্টি করে প্রার্থনা করতে পারিনি।নিজের কাছ থেকে নিজের যে মুক্তি, সেই দুর্লভ মুক্তির জন্যে চেষ্টা করি। সে চেষ্টা প্রত্যহ করতে হয়, না হলে আবিল  হয়ে ওঠে দিন। যাওয়ার আগে সেই বড় আমিকেই জীবনে প্রধান করে তুলতে হবে। সেটাই আমার সাধনা।”

১৯০৮ এর ভরা বর্ষাকাল।কবি শিলাইদহে “পদ্মা” নামের বজরায় বাস করছিলেন। তখন তিনি লিখলেন,“…এ দ্যুলোক মধুময়, পৃথিবীর ধূলি অন্তরে নিয়েছি আমি তুলি /এই মহামন্ত্রখানি চরিতার্থ জীবনের বাণী /দিনে দিনে পেয়েছিল সত্যের যা কিছু উপহার / মধুর সে, ক্ষয় নাই তার /দেখেছি নিত্যের জ্যোতি / দুর্যোগের মায়ার আড়ালে  সত্যের আনন্দরূপ/ এই ধূলিতে মূরতি এই জেনে এই ধূলায় রাখিনু প্রণতি “

মহাভারতের ২ লক্ষ ১৪ হাজার ৭৭৮ টি পদের তুলনায় , রামায়নের ৪৮ হাজার পদের তূলনায় “গীতাঞ্জলির” ছোট আয়তন দেখে  ও   ইংরেজী গীতাঞ্জলির “ O LIGHT  WHERE IS THE LIGHT (ও লাইট হোয়ার ইস দি লাইট-কোথায় আলো কোথায় ওরে আলো)কবিতা পড়ে, ফরাসী সাহিত্যিক আঁদ্রেজিত লিখেছিলেন,“ সর্বপ্লাবী এই যে উজ্জ্বল আনন্দের স্রোত, কোথায় তার উৎস ? কী এই সত্য যা একাধারে অন্তরকে পুষ্ট করে তোলে, আবার মাতাল করে!একী বৈষ্ণবদের  আরাধনার রীতি না এই হ’ল সেই দর্শনের প্রেম?”

১৯১২ সালে প্রকাশিত হয় ইংরেজী গীতাঞ্জলি । তার নাম দিয়েছিলেন কবিগুরু “SONG OFFERINGS” । সে গ্রন্থে গ্রথিত হয় গীতাঞ্জলি , গীতালি ও গীতিমাল্যের  অনেকগুলি কবিতা। সেই সঙ্গে কবিগুরুর বিভিন্ন কাব্য গ্রন্থের কিছু বিশেষ কবিতা।এসবকিছুর ইংরেজী অনুবাদ কবিগুরু নিজেই করেছিলেন।সেই SONG OFFERINGS কাব্যগ্রন্থ পাশ্চাত্যে অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আর সেই আলোড়ন ও মুগ্ধতাই    ১৯১৩ সালে  বিশ্বকবির হাতে এনে দেয় মহার্ঘ নোবেল পুরস্কার !গীতাঞ্জলি প্রসঙ্গে কবিগুরু নিজে বলেছেন,“এ আমার নিজের ভিতরের জিনিস। এ আমার সত্যকার আত্মনিবেদন, যার মধ্যে  আমার জীবনের সমস্ত সুখ দুঃখ, সমস্ত সাধনা বিগলিত হয়ে আপনি আকার ধারণ করেছে।”

নোবেল প্রাপ্তি নিয়ে কবিগুরু কোন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেননি।মার্কসবাদীরা বাঁকাচোথে দেখেছে।তবে কবি এই অর্জন দিয়ে বিশ্বসভায় বাংলাভাষা ও সাহিত্য সংস্কৃতিকে মহান এক উচ্চতায় স্খাপন করেছেন, সে কথা সবাই অবলীলায় স্বীকার করেছে।নোবেল পুরস্কার দিয়ে “সাম্রাজ্যবাদ মাথা ও কলম কিনে ফেলে” বলে দাবি করেন বামপন্থীরা। বিশ্ববরেণ্য দার্শনিক জাঁপল সাঁত্রে ১৯৬৪ সালে  নোবেল পুরষ্কার  প্রত্যাখ্যান করেছিলেন “নিজেকে বিকিয়ে দেওয়া হবে “ বলে যুক্তি দিয়ে।“পুনরুত্থান”, “যুদ্ধ ও শান্তি, “আন্না কারেনিনা”  প্রভৃতি গ্রন্থ রচয়িতা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, রুশ সাহিত্যিক  লিও তলস্তয়(১৮২৮-১৯১০) পুঁজিবাদের ধামা ধরেননি,  তা্ই যোগ্যতা ও বিশ্বময় আশাবাদ সত্ত্বেও  নোবেল প্রাপ্ত হননি বলেও কথা আছে।এতদসত্বেও কবিগুরু তোর এই বিরল  ও মহার্ঘ্য অর্জন  শিরধার্য করেছেন এবং প্রাপ্তির সবটাই বাংলা সাহিত্য- সংস্কৃতির কল্যাণার্থে বিশ্বভারতীকে উৎসর্গ করেছেন।

“বিশ্বকবির  সমগ্র সৃজনকে ভালোভাবে অনুধাবন করলে দেখা যাবে, তিনি  তাঁর সমস্ত রচনার প্রেরণা সংগ্রহ করেছেন প্রেম ও আনন্দের অনুভব থেকে”।পুঁজিবাদ বিরোধী বাম চেতনাকে সেভাবে ধারণ না করলেও ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক কূপমন্ডুকতার বিরুদ্ধে, সামন্তবাদী শোষণ পীড়ণ  ও উচ্ছোষণের বিরুদ্ধে, পরাধীনতার  বেদনা ও গ্লানির বিরুদ্ধে, দ্রোহ-সংগ্রাম এবং স্বরাজের সপক্ষে কবিগুরুর প্রতিবাদী কন্ঠ সদা সোচ্চার থেকেছে।

এবার ফিরাও মোরে কবিতায় জমিদার তনয় লিখছেন,  “ ..ওরে তুই ওঠ আজি।/ আগুন লেগেছে কোথা !/ কার শঙ্খ উঠিয়াছে বাজি জাগাতে জগৎজনে !”এ গান গেয়ে কবি বলেছেন,“স্ফীতকায় অপমান  অক্ষমের বক্ষ হতে রক্ত শুঁষি করিতেছে পান লক্ষ মুখ দিয়া ।….. এই সব মূঢ় ম্লান মূক মুখে দিতে হবে ভাষা,/এইসব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা/  ডাকিয়া বলিতে হবে, মুহূর্ত তুলিয়া শির/ একত্র  দাঁড়াও দেখি সবে ,/ যার ভয়ে ,তুমি ভীত সে অন্যায় ভীরু তোমা- চেয়ে,/যখনই জাগিবে তুমি  তখনই সে পালাইবে ধেয়ে।/যখনই  দাঁড়াবে তুমি সম্মুখে তাহার তখনই সে পথকুক্কুরের মত  সঙ্কোচ সত্রাসে  যাবে মিশে ”…..পরক্ষণেই আবার  বলেছেন,“অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো  চাই  মুক্ত বায়ু / চাই বল চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ-উজ্জল পরমায়ু্”।বহু পঠিত “দুবিঘা জমি” তে ভূস্বামী রবীন্দ্রনাথ,…“এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি/রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি” লিখে  সামন্তবাদী  শোষণ ও লুব্ধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসর শহরের “জালিয়ানওয়ালাবাগ” নামের একটি বদ্ধ উদ্যানে  ইংরেজ সেনানায়ক ব্রিগেডিয়ার রেগিনাল্ড ডায়ারের হুকুমে ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়্।গণহত্যাতূল্য সেই নির্মম হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  ব্রিটিশের দেওয়া “নাইট”(স্যার উপাধি)বিসর্জন দিয়ে দেশপ্রেম ও সাম্রাজ্যবাদ উপনিবেশবাদ বিরোধী মননের জ্বলন্ত স্বাক্ষর রাখেন। তবুও মার্কসবাদী কবিরা তাঁকে বুর্জোয়া কবি বলতে ছাড়েননি। গোঁড়া হিন্দুরা বলেছে নাস্তিক । ধর্মান্ধ মুসলমানরা বলেছে মালাউন কবি।মূর্খরা আজও সে মূদ্রা ত্যাগ করতে পারেনি রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশেও।

শিলাইদহ পর্বে জমিদারি দেখাশুনার ছলে কবি ঘুরে বেড়িয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামে।ভরা বর্ষায় ১৩১৭ সনের আষাড়ে, বড় নদী ছোট নদী খাল বিল , নানাপথে বিচরণ করে জোড়াসাকোর রাজনন্দন সোনার বাংলোর উদার আকাশ, উন্মুক্ত প্রান্তর, ধানভরা মাঠ পেরিয়ে, গ্রামীণ মানুষের নিতান্ত সাধারণ জীবন যাপন মুগ্ধ চিত্তে অবলোকন করেছেন। কবির সৃজনী শক্তি আরও প্রাণিত হয়েছে। এই পর্বে কত যে গান, কত যে অনুভবের সাঙ্গীতিক বিস্ফোরণ ঘটেছে  তা ভাবলে অবাক হতে হয়্।“ এই মোর সাধ যেন, এই জীবন মাঝে, তব আনন্দ মহাসঙ্গীত বাজে/ তোমার আকাশ উদার আলোকধারা দ্বার ছোট দেখে ফেরেনা যেন তারা/ছয় ঋতু যেন সহজ নৃত্যে অন্তরে মোর পশে নিত্য নতুন সাজে/ এই মোর সাধ যেন এই জীবন মাঝে তব আনন্দ মহাসঙ্গীত বাজে “। কবি লিখেছেন,সৌন্দর্য যেদিন অন্তরাত্মাকে প্রত্যক্ষ স্পর্শ করে সেদিন তার মধ্য থেকে অসীম একেবারে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।আজীবন কবিগুরু তাঁর ঋদ্ধ অনুভূতির বহুবর্ণ রঞ্জিত  ছবি এঁকেছেন গল্প, উপন্যাস, কাব্য চিত্রকলা এবং গানে।প্রকৃতির নানা রূপ তাকে কেবল বিস্ময়ে ভরিয়ে তোলেনি,সৃষ্টির নানা শক্তিতে করেছে ভরপুর। অসংখ্য গানের ছত্রে ছত্রে বন্দী রয়েছে তাঁর জীবন সাধনার বহুবিধ ব্যঞ্জনা।“ নহে নহে এ শুধু গান নহে, গন্ধ নহে/ এইতো অমৃত /এইতো তাহার  বিশ্বব্যাপী প্রসাদের ধারা”।

কবিগুরু  তাঁর  সাধনা দিয়ে, সাগরতূল্য  প্রতিভার বিস্ফোরণ  ঘটিয়ে  দানবের পদভারে  দলিত মথিত সবুজ শ্যামল সোনার বাংলাকে  আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা দিয়েছেন । বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে হিমালয়তূল্য  অলঙ্ঘনীয় উচ্চতা দিয়েছেন।  শোষিত বঞ্চিত বাঙালিকে বিশ্বসভায়  সিংহশাবকের  সম্মানে ভূষিত করেছেন। সেই মহিমাকে ধারণ করে জর্জ হ্যারিসন গাইলেন  মুক্তিযুদ্ধের গান।৩০ লক্ষ বাঙালি সেই গর্ব অহঙ্কারকে  শিরোপা করে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিলো।তিন লক্ষ নারী  অম্লান বদনে দিলো তার সম্ভ্রম।দুর্বিনীত অগণিত মুক্তিযোদ্ধা “আমার সোনার বাংলা  আমি  তোমায় ভালোবাসি”বলে দক্ষের কারাগার থেকে লাঞ্ছিত বঙ্গ জননীকে মুক্ত করতে নির্ভয়ে অন্ধ পতঙ্গের মত ঝাপ দিলো  আগ্রাসী ধর্মান্ধ শক্তির হিংস্র জিঘাংসার  সর্বগ্রাসী অনলে।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফিনিক্স পাখির মত নবজীবনে প্রাণিত হয়ে বিশ্বকবির  চরণে “মুগ্ধজননীর” প্রণাম রেখে বললেন, ১০ জানয়ারি ৭২, “কবিগুরু তুমি লিখেছিলে, “সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি”, কবিগুরু তুমি   চেয়ে দেখো তোমার বাঙালি আজ  মানুষ হয়েছে!”কিন্তু অদৃষ্টের কী নির্মম পরিহাস, যাঁর উজ্জীবনী মন্ত্রে ষাটের দশকে ঝিমিয়ে পড়া বাঙালি জেগে উঠলো, যার ভালোবাসার অমিয় ধারায় বঙ্গবন্ধু ভাসালেন ৬-দফার পাল তোলা রণতরী, যার ভালোবাসার গান গেয়ে বাঙালি ১১দফার ভেলায় চড়ে ৭১ এর উত্তাল সাগর পাড়ি দিলো, দক্ষযজ্ঞে বিক্ষত, রবির কীরণে স্নাত সোনার বাংলার উপকূলে  বিজয় বিষান বাজালো, সেই বন্ধু দার্শনিক পথপ্রদর্শক  শুকতারাকে পুরনো শকুনগুলো আবার খামচে ধরেছে। হে পচিশে বৈশাখ ! তুমি বাঙালিকে  দেবে  কী আবার সেই জীয়ন কাঠির মহেন্দ্র পরশ ?

শামসুল আরেফিন খান
শামসুল আরেফিন খান

 

Author: শামসুল আরেফিন খান

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts