বীরাঙ্গনা : বিড়ম্বনা ও স্বাধীন বাংলাদেশ

বীরাঙ্গনা শব্দের আভিধানিক অর্থ  ‘বীর নারী’। যুদ্ধকালীন সময়ে যে সকল নারীরা লাঞ্ছিত,  নির্যাতিত, নিপীড়িত হয়েছেন তাঁরাই বীরাঙ্গনা।  নির্মম জঘন্য যৌন অত্যাচার নীরবে সহ্য করে জীবনকে রক্ষা করেছেন যারা তাঁরাই বীরাঙ্গনা। যুদ্ধের পর স্বাধীন দেশে বীর নারীদেরকে ধর্ষিতা রমণী, দুঃস্থ রমণী’ ক্ষতিগ্রস্ত মহিলা, ধর্ষণের শিকার, যৌন নির্যাতনের শিকার, ভাগ্যবিম্বিতা ইত্যাদি নামে  অভিহিত করা হত। কিন্তু  জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই সমস্ত ভাগ্যহীনা, ভাগ্যবিড়ম্বিতা নারীদেরকে বীরাঙ্গনা খেতাবে ভূষিত করেন। তিনি তাদের মর্যাদা সমুন্নত করেন।

১৯৭২ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি সরকার ‘বাংলাদেশ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড’ গঠনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্যাতিত ধর্ষিতা মহিলাদের জাতীয় পর্যায়ে তাঁদের ত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতি প্রদানস্বরূপ বীরাঙ্গনা খেতাব দান করেন। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধকালীন সময়ে বহু সংখ্যক বাঙালি নারী সম্ভ্রম হারায় যার সঠিক হিসাব আজও জানা যায়নি।  তবে ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে প্রায় দুই লক্ষ নারী ধর্ষিতা হন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে। তাঁদের মধ্যে অনেকের গর্ভে যুদ্ধশিশু জন্ম নেয়।  আবার অনেকেই গর্ভপাত করিয়ে নিজেকে মুক্তি দেন। এরকম বীর বাঙালি বীরাঙ্গনার অভাব নাই । আমরা ক’জনের সন্ধান পাই!  ক’জনার সাক্ষাৎকার নিতে পারি? অনেকেই তো আত্মগোপন করে থাকতে চান। অনেকে হয়তো নিরবে না ফেরার দেশে চলে গেছেন । আমরা কি তাঁদের জন্য যা করণীয় তা যথাযথ করতে পেরেছি? কতটা করা প্রয়োজন আর কতটুকুই বা করতে পেরেছি? প্রায় দুই লক্ষ মা-বোন ধর্ষিত হয়েছিলন।  কত জন মা বোনকে আমরা সামনে আনতে পেরেছি? কতজনকে আমরা সম্মানিত করতে পেরেছি? অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা সেবা, শিক্ষা কতজনের পাশে পৌঁছে দিতে পেরেছি?

একাত্তরে ধর্ষিতা ও নির্যাতিত নারীদের ওপর পরিচালিত গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে অধ্যাপক  মুনতাসীর মামুন স্যারের লেখা বীরাঙ্গনা ১৯৭১ বইটি থেকে।

 

দেশের বিয়াল্লিশটি জেলার ৮৫টি থানার মাঠ পর্যায়ে গবেষণা চালিয়ে নির্বাচিত ২৬৭ জনের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ধর্ষিতা ও নির্যাতিত নারীর সংখ্যা পাওয়া গেছে দুই লাখ দুই হাজার পাঁচশ সাতাশজন।  নির্যাতিত নারীদের মধ্যে মুসলমান৫৬.৫০%, হিন্দু৪১.৪৪% খ্রিস্টান ও অন্যান্য ২.০৬%

নির্যাতিতা নারীদের বৈবাহিক পরিসংখ্যান

ক. বিবাহিত>৬৬.৫০%

খ. অবিবাহিত>৩৩.৫০%

গ. ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী নির্যাতিতা ও ধর্ষিতা হিন্দু নারীদের মধ্যে অবিবাহিত/কুমারী>৪৪%।

ঘ. যৌন দাসী, কমফোর্ট গার্ল ও সন্তানসম্ভবা অধিকাংশ বীরাঙ্গনাই ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। অধিকাংশ যুদ্ধশিশুর মায়েরাও ছিল এই সম্প্রদায়ভুক্ত।

৪. স্বামী বা নিকট আত্মীয়স্বজনকে নির্যাতিতাদের সম্মুখে হত্যা ও নির্যাতন করা হয়েছে >৭০%।

৫. নির্যাতনের ধরণ

ক. স্পট ধর্ষণ (Spot Rape) স্পট গণধর্ষণ (Spot Ganns Rape) > ৭০%।

খ. কারাগার ও ক্যাম্পে নারী নির্যাতন ১৮%।

গ. অন্যান্য অবস্থায় নির্যাতন ১২%।

৬. নির্যাতন পরবর্তী সময়ে নারীদের স্বাস্থ্য সমস্যা: যৌনরোগ

ক. শ্বেতঃস্রাব >৮০%।

খ. তলপেট ব্যথা> ৬৬%।

গ. রক্তস্রাব > ৩৪%।

ঘ. মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তস্রাব (মেনোরেজিয়া) > ২০%।

মাসিকের সমস্যা (দীর্ঘকালব্যাপী)

ক. বিষাদগ্রস্ততা > ৮০%।

খ. মাথাব্যথা, অস্থিরতা, নৈরাশ্য ইত্যাদি > ৮০%।

গ. গ্লানিতে ভুগছেন > ৯০%।

ঘ. দুঃস্বপ্ন দেখছেন> ৯০%।

ঙ. মনসম্পর্কিত দৈহিক রোগ (Psychosomatic disorder) > ৮০%।

স্থায়ী ক্ষতচিহ্ন > ৭%।

ল্যাবে ও নির্বাচিত হাসপাতালে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে নির্যাতিতা নারীদের ওপর চালিত শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ফলাফলের ভিত্তিতে নির্ণিত।

নির্যাতন পরবর্তী সময়ে নারীদের সামাজিক অবস্থা

ক. নির্যাতনের কারণে স্বামী কর্তৃক লাঞ্ছিত বা পরিত্যক্ত> ৭%।

খ. আত্মীয় বা পরিজনদের দ্বারা লাঞ্ছিত> ৯০%।

গ. গ্রামের নির্যাতিত নারীদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্বামীর সহানুভূতি পেয়েছেন।

ঘ. শহর অঞ্চলে স্বামী ও পরিবার কর্তৃক নির্যাতিত মেয়েরা অপেক্ষাকৃত কম সাপোর্ট পেয়েছেন।

ঙ. গ্রামাঞ্চলের নির্যাতিত নারীদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সবকিছু জানিয়ে বিয়ে দিতে হয়েছে।

চ. শরণার্থী হয়ে যারা দেশত্যাগ করেছিলেন কিংবা যারা শহরাঞ্চলে বাস করতেন তাদের বিয়ের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছে।

ছ. বিবাহিত নারীরা খুব কমক্ষেত্রেই স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত, হয়েছে সকল গবেষণার ফলাফল একশ’ তিনশ’ ও পাঁচশ জন নির্যাতিত নারী পরীক্ষা নিরীক্ষা ও জরিপভিত্তিক।

একাত্তরের এপ্রিল থেকে আগষ্ট পর্যন্ত পাঁচ মাসে শরণার্থীর সংখ্যা হিন্দু৬৯.৭১ লাখ, মুসলিম ৫.৪১ লাখ অন্যান্য ০.৪৪ লাখ।

যাইহোক সেদিন একটি অনুষ্ঠানে কয়েকজন  বীরাঙ্গনার সাথে কথা বলার পরে ৭১ এর বীরাঙ্গনা সম্পর্কে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে।  এবং আমি জানার জন্য বিভিন্ন ধরনের পত্রিকা এবং বিভিন্ন মাধ্যমে চেষ্টা করি। তারই ফলশ্রুতিতে পড়েছি মুসলিম বীরাঙ্গনা ,খান মুহাম্মদ মঈনূদ্দীন, মুনতাসীর মামুন- বীরাঙ্গনা ১৯৭১। স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষের আত্মজীবনী জানার চেষ্টা করেছি সাধ্যমত। যখন বীরাঙ্গনাদের সাক্ষাৎকারমূলক লেখা পড়েছি তখন কষ্টে একাকী কেঁদেছি আর ভেবেছি এই ত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজ স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। কি মর্মান্তিক নির্দয় নির্মম নিষ্ঠুর সময় অতিক্রম করে আজকের সোনালী সূর্যের বাংলাদেশ স্বাধীন বাংলাদেশ। তবুও আসল স্বাধীনতার সুখ থেকে আমরা প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছি। তা*দের অবর্ণনীয় ত্যাগের বিনিময়ে এই মুক্ত আকাশ পেয়েছি আমরা। আমরাই গর্বিত আমরাই অনুভবে শান্তির বার্তা শুনতে পাই কালের যাত্রায়। বীরাঙ্গনাদের ত্যাগ আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের সূচক।  আমরা তাদের কাছে চির ঋণী।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যে সব বীর নারী তা*দের দানের মাধ্যমে আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কিছু নাম সম্মানের সাথে স্মরণ করছি। অত্যাচারী নারীদের বয়ান আমরা প্রথম পাই হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘স্বাধীনতার ইতিহাস : দলিলপত্রে’। সাক্ষাৎকার বয়ানে ধর্ষিতা নারীরা ধর্ষণের বদলে অত্যাচার শব্দটি ব্যবহার করতেন। যাইহোক, যাদের কথা বলছিলাম তাঁদের মধ্যে নাজমা বেগম রোকেয়া খাতুন, ফাতেমা খাতুন, হালিমা পারভিন, ভাস্কর ফেরদৌসী রয়েছেন। তিনিই প্রথম বীরাঙ্গনা যিনি বীরদর্পে বীর নারীর মতই রক্ষণশীলতাকে ভেঙ্গে নিজেদের প্রাপ্য সম্মান অর্জনের জন্য সোচ্চার হন এবং বীরাঙ্গনা খ্যাতি অর্জন করেন। ডা. এম হাসান নির্যাতিত ও ধর্ষিত নারীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে রচনা করছেন ‘যুদ্ধ ও নারী’ । সেখানে ২৫ জন বীরাঙ্গনার সাক্ষাৎকার উঠে এসেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র প্রকাশ করে ৭১ ও যুদ্ধ পরবর্তী কথ্য কাহিনী । সেখানে ৫ জন বীরাঙ্গনার সাক্ষাৎকার আছে। তাছাড়া আরো সাক্ষাৎকার আছে ‘অবরুদ্ধ নারী’ ‘স্বজনহারা নারী ও শহীদদের সন্তান’। সুরমা জাহিদের ‘বীরাঙ্গনাদের কথা’ । সেখানে তিনি ৫০ জন বীরাঙ্গনার কথা টেনেছেন। সবকিছু মিলে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ বীরাঙ্গনার কাহিনি হয়তো লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে । আমাদের  সকল বরিাঙ্গনার জন্য কাজ করা । তাঁদের অবদান সম্পর্কে জাতিকে জানানো । তবেই তাদের দান সার্থক হবে, তাদের আত্মা শান্তি পাবে।

আজ এই স্বাধীনতার মাসে জানা অজানা বীরাঙ্গনার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানাই।
ছবি: নায়েব উদ্দিন আহমেদ

ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী
ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী

 

Author: ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts