ব্ল্যাক প্যান্থার/ নাসরীন মুস্তাফা

ছেলের বিয়ে দিয়ে দাও।

সমস্যার এই একটাই সমাধান, এরকমভাবেই কথা শেষ করলেন রুচিয়া বেগম। সমাধানে আপত্তির কোন কারণ খুঁজে পেলেন না বাবেলান খান। ছেলেটা নিজে নিজে কিছুই করতে পারল না, বিয়েটাও না। কাজেই, ছেলের বিয়ে নিয়ে তাকেই ভাবতে হবে।

বাবেলান খান ভাবলেন। বিজ্ঞাপন দাঁড় করালেন ছোটমোট একটা। পাত্রী চাই বিজ্ঞাপন, যার কথাগুলো খসড়া আকারে দাঁড়াল এরকম-

“পাত্রী চাই। পাত্রী চাই। পাত্রী চাই।

অভিজাত পরিবারের ৫’-৮” লম্বা সুদর্শন, সম্পূর্ণ সুস্থতার যাচাইপূর্বক পরীক্ষাগারের সনদপ্রাপ্ত, ব্যবসায়ী তরুণের (২৫) জন্য কুচকুচে কালো গায়ের রঙের পাত্রী চাই। স্ট্যান্ডার্ড ফাইভ স্কেলে কুচকুচে কালো গাত্রবর্ণ ছাড়া পাত্রীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, পারিবারিক বংশমর্যাদা কিংবা স্থানকালপাত্র বিবেচনাবোধের মতো যাবতীয় বিষয় অনাবশ্যক বলিয়া বিবেচিত হইবে।”

রুচিয়া বেগমেরও পছন্দ হ’ল বিজ্ঞাপনের ভাষা। কেবল শিরোনামটায় হাত লাগালেন। পাত্রী চাই না লিখে লিখলেন কুচকুচে কাল গাত্রবর্ণের পাত্রী চাই। শিরোনাম দেখেই যাতে বোঝা যায়, আসলে তারা কি চাচ্ছেন। তারা তো আসলেই কালো গায়ের রঙের মেয়ে ছাড়া আর কিছুই চাচ্ছেন না। মেয়ের বাপের একটা সুতোও তাদের দরকার নেই। বিয়ের সব খরচ দিয়ে মেয়েকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত সাজিয়ে তবে নিয়ে আসবেন। নিয়ে আসার সময় পাত্রীর কালো সোনার মতো পা যেন মাটিতে না পড়ে, সে দিকে খেয়াল রাখতে দরকার হলে নাসা থেকে মিনি সসার হায়ার করে আনবেন। একটা মাত্র ছেলের বিয়ের জন্য হাত খুলে খরচ করতে এক সেকেন্ডও ভাবতে হবে না তাদের। তবুও ছেলেটা সুখি হোক। তবুও রক্ষা হোক বংশ।

বাবেলান খান আলাপচারিতার এই পর্যায়ে এসে হু হু করে কেঁদে ফেলেন। বংশরক্ষার মতো গুরুদায়িত্ব পালন না করে তিনি যে মরেও শান্তি পাবেন না।

বিজ্ঞাপন ছাপা হ’ল। দিনরাত খবর আসছে নানান উৎস থেকে। হলোগ্রাফে চড়ে বিয়ের পাত্রীরা নিজেরাই হাজির হয়ে যাচ্ছে সামনে। বাবেলান খান আর রুচিয়া বেগম প্রাথমিক বাছাইটা করবেন বলে ভেবেছেন। ছেলেটাকে চূড়ান্ত পর্যায়ের বিচারক বানালেই চলবে। বেচারা যেভাবে আছে, থাকুক না।

পাত্রী বাছতে বাছতে ক্লান্ত হতে হ’ল। কুচকুচে কালো রঙের ত্বক যাচাইয়ের জন্য স্ট্যান্ডার্ড বাঁধা রুলার হাতে আর চোখে দিয়ে মাপতে মাপতে বয়স যেন বেড়ে যাচ্ছে হু হু করে। স্ট্যান্ডার্ড ফাইভ স্কেলে কুচকুচে কালো রঙের খোঁজ এখনো মেলেনি। সত্যি বলতে কি, বাটপাড়ি আর জোচ্চুরিতে ভরে গেছে দুনিয়া। গায়ে কালো রঙ মেখে এসে মেয়েগুলো নির্লজ্জের মতো নিজেকে রূপসী দাবি করছে। রুচিয়া বেগমও কম যান না। মেয়ের জামাকাপড় সরিয়ে অজায়গা-বেজায়গায় উঁকি মেরে ধরে ফেলছেন কারসাজি। রঙ কালো করার ফেসপাউডার-লোশন বা ক্রিম, যা-ই মাখুক না কেন, রুচিয়া বেগম হাউন্ডের মতো গন্ধ শুকেই খুঁজে বের করেন অপরাধীকে। আর সনাক্তমাত্রই প্রতিযোগিতা থেকে বাদ। অনেক উপর মহল থেকে তদবির আসছে, আসুক, কুছ পরোয়া নেই। কালো মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দিয়ে বংশরক্ষা করা বলে কথা, তদবিরে গললে তো চলবে না।

উপযুক্ত পাত্রীর সন্ধানে বেশ কিছু খ্যাতিমান এজেন্সিকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই রকম এক এজেন্সি ব্ল্যাক প্যান্থারের কৌটো এগিয়ে দিয়ে সাথে উপদেশ-পরামর্শ যা দিলো, তার মধ্যে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটা, তা হচ্ছে, আজকাল নাকি বিয়ের বাজারে কালো মেয়ের মতো কালো ছেলেদেরও খুব চাহিদা। সাদাদের দিকে কেউ ফিরে তাকাচ্ছে না। আসলে তাকাতে চাইছে না।

হায় হায়! কবে থেকে ঘুরে গেল দুনিয়া ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে?

সেই এজেন্সির কমবয়েসী এক্সিকিউটিভ মেয়েটা ফিকফিক হাসি হেসে বলল, শুরুটা সেই ব্ল্যাক প্যান্থার থেকে।

কোন্ ব্ল্যাক প্যান্থার?

ঐ যে মার্ভেল ছেড়েছিল ব্ল্যাক প্যান্থার নামে হলিউডি ছবি, যেখানে কালো তরুণ টি’চাল্লা বাবার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসতে ওয়াকান্ডা নামের আফ্রিকান দেশটিতে ফিরলেন। বিপদে পড়লে টি’চাল্লা ব্ল্যাক প্যান্থার হয়ে সর্বশক্তি দিয়ে বিপদ ঠেকাতে পারে। তার সারা শরীরে তখন শক্তির বান ডাকে। টানটান ঋজু শরীরে সাহস আর শক্তি তাজ্জব করেছিল দর্শকদের।

হ্যাঁ, হ্যাঁ। মনে পড়েছে। ব্ল্যাক প্যান্থার নামের কালো তরুণকে সুপার হিরোর মত সম্মান দিল হলিউড। ব্যবসাসফলও হ’ল। এর পেছনে কারণ খুঁজে বলা হয়েছিল, চলচ্চিত্র দর্শক হিসেবে কালো মানুষরা ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। চলচ্চিত্র দর্শক যখন কেবলি পুরুষ, তখন নগ্ন হতে হয় নারীকে, কেননা দর্শক যা চায় তা তো দিতে হবে। কালো নায়ক দর্শক টানতে পারে, আরও বেশি করে টানবে ভবিষ্যতে, কেননা, দর্শক হিসেবে কালো মানুষের সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে এবং এরা নায়ক হিসেবে নিজেদের মতো কালো গায়ের মানুষকেই চায়।

কালো নায়ক এসে গেছে। কালো নায়িকাও। ওয়াকান্ডা কালো মানুষের দেশ, যেখানে কেবলি কালো মানুষরা থাকে। ইদানিং এই রকম শ্লোগানও কানে আসে, আমরা হবো টি’চাল্লা, পৃথিবী হবে ওয়াকান্ডা। পৃথিবীর সব মানুষ টি’চাল্লা হতে চায় আর পৃথিবীটাকে বানাতে চায় ওয়াকান্ডার মতো!

সাদা চামড়ার কদর কমতে কমতে এখন একেবারে নেগেটিভ পয়েন্টে। হবে না-ই বা কেন? বায়ুমন্ডলের ওজন স্তর ফুটো হয়ে হু হু করে অতিবেগুনি রশ্মি ঢুকছে, যা ঠেকাতে সাদা চামড়া একেবারেই নাজেহাল হয়ে গেছে। ত্বকের ক্যান্সার ঘটানোর কাজটা তো পুরনো ব্যাপার। ইদানিং এর সাথে যুক্ত হয়েছে নানা রকমের ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। নিত্য নতুন আক্রমণ চলছে মানুষের শরীরের ভেতরে আর বাইরে। বেগুনি জ্বরের প্রকোপটা এর মধ্যে সবচেয়ে সাংঘাতিক। সারা শরীর বেগুনি বানিয়ে জ্বরের আঁচে ভাজতে ভাজতে বড় জোর তিন দিন, তারপর সব শেষ। ইউরোপ প্রায় পুরোটাই উজাড় হওয়ার পথে। সাদা মানুষ এখন আর দেখা যায় না, একটা যদি চোখে পড়ে তো ভয়ে চোখ বন্ধ করে ছুটে পালাতে হয় বহু দূরে।

বাবেলান খান এবং তার মতো টাকাওয়ালা মানুষরাই পারল ব্ল্যাক প্যান্থার কিনতে। এক কৌটায় চব্বিশটা বড়ি, কাল কুচকুচে রঙের। ত্বকের মেলানিনের ঘনত্ব বাড়িয়ে তোলে বলে ত্বক কালো হতে থাকে। চব্বিশ মাসের গ্যারান্টি দিয়েছে কোম্পানি। চব্বিশ মাস পর যে কোন সাদা মানুষও নাকি কালো গায়ের রঙ নিয়ে অহংকার করতে পারবে। দেখা যাক্, সালেহান খানের কপাল খোলে কি না।

বাবেলান খানের একমাত্র ছেলে সালেহান খান। দিন রাত মুখ-গায়ে রঙ কালো করার ক্রিম মেখে আয়নায় নিজেকে খুঁজে বেড়ানো ওর একদম পছন্দ নয়। জন্মসূত্রে ধবধবে সাদা ও নয়, বাদামিও বলা যায়, তবে এই রঙ বিয়ের জন্য মোটেও উপযুক্ত নয় বলে ক্রিমের কৌটা নিয়ে রুচিয়া বেগম দিনরাত ওর পেছনে লেগে থাকেন আর ঘ্যানঘ্যান করে বলতে থাকেন, মেখে নে বাপ্, কালো হ’।

সালেহান খান ধমক না দিয়ে পারে না এক এক দিন। বলে, এক কালে নাকি মায়েরা মেয়েদের বলতো, ফর্সা হ’। ছেলেদের বলতো, মানুষ হ’। এখন যে কী হচ্ছে!

রুচিয়া বেগম হাসেন। বলেন, ছেলেমেয়ের ভেদাভেদ যে আর নাই বাপ্। এখন সবার জন্যই এক কথা। কালো হ’। কালো হ’। মানুষ সব কালো হবে। ঠিক মানুষের অতীতের মতো। সব মানুষ কাল।

কালো হচ্ছে বটে সালেহান খান। আন্তর্জাতিক মানে আড়াই পর্যন্ত উঠে গেছে ওর গায়ের কালোত্ব। ডাক্তার খুব আশাবাদী। ঠিক এই রকম সময়ে সালেহান খানের জন্য উপযুক্ত পাত্রী পাওয়া গেল। আন্তর্জাতিক মানে পাঁচ তার গায়ের কালোত্ব, বিজ্ঞাপনে ঠিক যেমনটি চাওয়া হয়েছিল। এর বাইরে আর কোন খোঁজখবর নেওয়ার শর্ত ছিল না, তার কোন দরকারও নেই বলে মনে করছেন রুচিয়া বেগম এবং বাবেলান খান। সালেহান খানের হাতটা কালো সুন্দরীর সাথে মেলাতে পারলেই তারা খুশি।

বিয়ের পর সালেহান খান আর মৌতাত হানিমুনে যাবে। এ কালে হানিমুন মানে ঘর ছেড়ে বের হওয়া নয়, ঘরের দরজা-জানালা আটকে এর ভেতরে থাকা। সালেহান খান সেভাবেই মুখোমুখি হ’ল মৌতাতের।

কুচকুচে কালো মুখটায় জ্বলজ্বল করে জ্বলছে চোখ দু’টি। হাসতে গিয়ে বেরিয়ে পড়ল ধবধবে সাদা দাঁতগুলো। সুঁচালো-ধারাল। মৌতাতের বাড়িয়ে দেওয়া হাত সালেহানের সামনে বাতাসে ভাসে বাঁকানো নখের বাহুল্য নিয়ে। পায়ের পাতায় একটুও আওয়াজ না তুলে একটু এগিয়ে এসে ঝোঁকে আর তখন পাতলা কোমরে বাঁক খেলে যায় কালো বিদ্যুৎ। যেন অপেক্ষায় আছে ও, ঝাঁপ দেবে সামনে, দুরন্ত গতিতে। কালো হতে গিয়ে জিনগত নানা পরিবর্তনের ফাঁদে পড়ে যাওয়া মানুষ এখন শিখে গেছে কোমরের বাঁকে কীভাবে পাশবিক ঢেউ খেলানো যায়। আগেকার মানুষের সাদা আর ‘পাতলি কোমর’ওয়ালা নারীর স্বপ্নসাধ পিএইচ প্রভাবে পড়ে এভাবে নিজেকেই বাঁক খাওয়াবে, কে ভেবেছিল কবে! এই বাঁকে আনন্দ কই? সালেহান খানের তো ভয় লাগছে। গায়ের রঙ কালোতে বদলে দিতে দিতে বদলানোর সামগ্রিকতা এতটা হবে, তা নিজে বুঝেসুজে এগুলেই বোধহয় ভালো হ’ত।

জিভ দিয়ে নিজের দাঁত মেপে আর মৌতাতের বাড়ানো হাতের সামনে হাত মেলতে গিয়ে নখের চেহারা দেখে দমে যায় সালেহান। বিড়বিড় করে নিজেকেই বলে, চব্বিশ মাসের কোর্স শেষ করে মৌতাতের মুখোমুখি হতে পারলে বোধহয় ভালো হ’ত।

বিষয়টা সালেহান খান নিশ্চিত হয়ে যায় কয়েক সেকেন্ডেই।

তীক্ষ্ম গোঙানির স্বর বুক ফুঁড়ে বের হয়ে আটকানো দরজা-জানালা ভেদ করে পৌঁছে যায় বাবেলান খান আর রুচিয়া বেগমের কানে। প্রখর গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে মেঘ ডাকলেই বুঝি এমন করে খুশি হয় মানুষ, ঠিক তেমন করেই তৃপ্তির হাসি হেসে চোখের পানি মুছেছিলেন বাবেলান খান আর রুচিয়া বেগম।

নাসরীন মুস্তাফা
নাসরীন মুস্তাফা

Author: নাসরীন মুস্তাফা

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts