মানবাধিকার : নারী ও স্বাধিকার

মানবাধিকার

প্রতিটি মানুষের এক ধরনের অধিকার থাকে যা জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য। যা মানুষ স্ব-অধিকার বলে ভোগ করবে, চর্চা করবে, হৃদয়ে লালন করবে নির্ভয়ে স্বগৌরবে, স্বদর্পে । কিন্তু কোন অবস্থাতেই তা অন্যের ক্ষতি কিংবা প্রশান্তি নষ্ট করে নয়। মানবাধিকার সব জায়গায় সবার জন্য সমান প্রযোজ্য এ বিশ্বাসে আমাদের বলিয়ান হওয়া একান্ত প্রয়োজন। মানবাধিকার একই সাথে সহজাত ও আইনগত অধিকার প্রতিটি মানুষের জন্য। যদিও অধিকার প্রকৃতপক্ষে কি তা এখনো দর্শনগত বিতর্কের বিষয় তবুও আমার মতে মানবাধিকার বলতে আমরা যাই বুঝি না কেন তাই স্থানীয়, জাতীয়, আঞ্চলিক, সর্বোপরি সকল আইনের অন্যতম দায়িত্ব হল তা রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং আমদের প্রত্যেকের উচিৎ মানবাধিকার লঙ্ঘন নয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

স্বঅধিকারকে সত্যিকার চর্চা করা এবং ভোগ করার মাধ্যমে মানবাধিকারকে শক্তিশালী করা। শুধু বিশ্ব মানবাধিকার দিবসেই নয় প্রতিদিন আমরা প্রতিজ্ঞা করতে পারি, স্বঅধিকার থেকে, মানবাধিকার লঙ্ঘন নয় মানবতার হোক জয়। আমরা প্রত্যেকে মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ সমুন্নত মানুষ হই। সুনাগরিক হই। সমৃদ্ধ দেশ গড়ি। নারী পুরুষ ভেদাভেদ বন্ধ করি। সকল প্রকার নির্যাতন পরিহার করি। স্বঅধিকারে বলিষ্ঠ হই, স্বাধীন হই। সর্বোপরি মানবাধিকারকে সম্মান করে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করি প্রত্যেক মানুষের জন্য সমানভাবে। উঁচু-নিচু, ছোট-বড়, জাত-বেজাত, ধার্মিক-অধার্মিক, এসব কিছু নয় ‘মানুষ’ এই হোক পরিচয়। মানুষের জন্যইতো মানবাধিকার। আমরা মানুষ আমাদের অধিকার আমাদেরকেই রক্ষা করতে হবে।

মানবাধিকার কারো কারো জন্য আলাদা আলাদা হতে পারে না। সুশীল সমাজের যারা কর্ণধর তারা সোচ্চার হলেই মানবাধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং স্বঅধিকারে প্রত্যেকেই স্বস্তি পাবে। প্রত্যেকের মানবাধিকার রক্ষা হবে। জাতিসংঘের নির্দেশনায় ১০ ডিসেম্বর ১৯৪৮ সাল থেকেই বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উদযাপন করা হয় বিশ্বের সকল দেশে। শুধুমাত্র দক্ষিণ আফ্রিকার শার্পেভিন গণহত্যাকে স্মরণ করে ২১ মার্চ এই দিবসটি উদযাপন করা হয়। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মানবাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষে মানবাধিকার সনদে ঘোষণা করা হয়। সনদে লেখকগণ ছিলেন জন পিটার্স হামফ্রে (কানাডা), রেনে ক্যাসিন (ফ্রান্স), স্টিফানে হেসেল (ফ্রান্স), পি.সি. চ্যাং (চীন), চার্লস মালিক  (লেবানন), এলিয়ানির রুজভেল্ট (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)সহ আরো অনেকেই। সকলের উদ্দেশ্য ছিল মানবাধিকার। এই ঘোষণা পত্রে ৩০টি অনুচ্ছেদে ব্যাখ্যা করা হয়েছে মানবাধিকার সম্পর্কে। এই প্রস্তাবটির পক্ষে ৪৮টি দেশের ভোট পড়ে, বিপক্ষে কোন ভোট পড়েনি । তবে ৮টি দেশ ভোট প্রদান থেকে বিরত থাকে। দেশগুলো হল : ইউক্রেন, যুগোস্লাভিয়া, পোল্যান্ড, সৌদি আরব, চেকোস্লোভাকিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, বেলাসুর ও সোভিয়েট ইউনিয়ন। সত্য বলতে মানবাধিকার সম্পর্কে যে বিস্তারিত আলোচনা সমালোচনা ও বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তা পরিপূর্ণভাবে যদি পালন করা হত, পৃথিবী হত সত্যিকারের শান্তি স্বস্তি আর ভালবাসার আবাসন। আমাদের সামনে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে আমরা দেখেও না দেখার ভান করি, শুনেও না শোনার ভান করি স্বীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে। আমরা অনেক কিছু থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখতে পারলেই জাত বাঁচে এমন একটা ভাব করে সরে থাকি। এটাই কি হওয়ার জন্য মানবাধিকার? সুশীল সমাজের পরিচালকদের কাছে প্রশ্ন, সামাজিক উন্নয়ন এবং পারিবারিক উন্নয়ন সাধনের জন্য মানবাধিকার কি আবশ্যক নয়? মানবিক উন্নয়ন করতে হলে প্রত্যেক মানুষের আগে জানতে হবে তাঁর অধিকার, দায়িত্ব কর্তব্য, পালন, বর্জন, গ্রহণ এবং নিজেকে জানতে পারলেই মানবাধিকার লঙ্ঘন নয় মানবতার জয় হবেই হবে। প্রত্যেক নাগরিককে জানতে হবে মানবাধিকার সনদ এর ৩০টা অনুচ্ছেদ সম্পর্কে। তাহলে মানবাধিকার সমৃদ্ধ হবে অতি সহজে। থাকবে না কোন ভেদাভেদ। ন্যায় বিচার সবার জন্য সমান হওয়া উচিৎ। অর্থের কাছে বিত্তের কাছে আমরা আজ আমাদের মানবিক গুণাবলীকে বিক্রি করতে বসেছি। মানবিক মূল্যবোধকে বিকৃত না করে সমৃদ্ধ করব এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

মানবাধিকারের জয হোক, মানবতা মুক্তি পাক, মানবাধিকার সমৃদ্ধ হোক, সংগ্রামী মানষের সফলতা আসুক। মেহনতি মানুষ সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বাঁচার স্বপ্ন দেখুক। নির্যাতনের সময় শেষ, নির্ভয়ে পথ চলার ব্রত নিয়ে অগ্রসর হই সকল মানবজাতি একসাথে । মানুষের অধিকার সর্বক্ষেত্রে অক্ষুণ থাকুক। সমবন্টনের মাধ্যমে দেশ হয়ে উঠুক সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী। মানুষ হয়ে উঠুক স্বনির্ভর সাহসী, কর্মময় জীবনের বাহক। নারীকে অবহেলা নয়, নারী নির্যাতন নয়। নারী শিশুদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হই। নারীদের অবলা অসহায় না ভেবে মানুষ ভাবতে শিখি। স্ব স্ব অধিকার সম্পর্কে সোচ্চার হই। স্ব অধিকার প্রতিষ্ঠা করি। তবেই মানবাধিকারের সুফল সবাই ভোগ করতে পারবো স্বচ্ছ আর সুন্দরভাবে। জীবন হয়ে উঠবে প্রশান্তিময় স্বস্তিময় দুর্দান্ত গতিময়। পৃথিবী হয়ে উঠবে নির্ভয়ে বসবাসের আবাসন।

ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী
ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী

 

Author: ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment