মা

ফিরোজ শ্রাবণ ma

‘মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু জেনো ভাই ইহার চেয়ে নাম যে মধুর ত্রিভুবনে নাই।’  শৈশবে এই কবিতা যারা পড়েছে তারা হয়ত তখন বুঝতে পারে নাই যে মা আসলে কি ? মা যেন সকল ছেলে বা মেয়েবেলার  কঠিনতম অভিভাবক নামের একটি চরিত্র । শাসন করা ছাড়া মা যেন আর কিছুই জানে না। যেমন ধরুন সময়মতো পড়তে বসতে হবে, স্কুলে যাওয়া, কারো সাথে মারামারি না করা  । আবার আইসক্রিম খাওয়া যাবে না,  অন্যের ঘরে গিয়ে টিভি দেখা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। অন্যের ঘরে কেন বলছি? কারণ তখন সবার ঘরে টিভি ছিল না। শুধুমাত্র যারা সামর্থবান বা সৌখিন তাদের ঘরে টিভি ছিল। এখন সবাই সৌখিন । তখনকার সময়ে টিভিতে একটা বিজ্ঞাপন হতো এইযে, বাচ্চারা বলতো এটা কি? আর সব বাচ্চারা বলে উঠতো, এটা হচ্ছে ওরস্যালাইন।  এমনকি আমরা ও জানতাম ওটা ওরস্যালাইন । আরো জানতাম যে ডায়ারিয়া হলে ওই প্যাকেটের সবটুকু ঔষধ আধা লিটার পানিতে মিশিয়ে খেলে ডায়ারিয়া ভাল হয়। মডেল ছিলেন শ্রদ্ধেয় সুজা খন্দকার। আর এখনকার মডেল এ্যাবরা জ্যাবরা তামিম ইকবাল। তখনকার বিজ্ঞাপন এর ধরন ছিল আমাদের গ্রামের মানুষদের নিয়ে আর এখনকার বিজ্ঞাপন হয় শহুরে মানুষদের নিয়ে । কারণ এখনকার বিজ্ঞাপন বুঝতে অনেক স্মার্ট আর শিক্ষিত হতে হয়।

বর্তমানে যারা গ্রাম থেকে শহরে আসছে তারা পরিষ্কার কাপড় চোপড় পরে নিজেদের শহুরে ভাবতে শুরু করার কারণে এখন গ্রাম  যেন তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলতে বসেছে । তাছাড়া গ্রামেও ইলেকট্রিসিটি, গ্যাস, এবং মটর দিয়ে পানি তোলে।  আমরা গ্রামে থেকেও যেন শহর এর স্বাদ গ্রহণ করছি। আবার কেউ কেউ শহরে থেকেও, ড্রইংরুম গ্রামের দৃশ্য-সম্বলিত পোস্টারে ছেয়ে, গেয়ে উঠছি ”ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা”। তবে আশার কথা হল, গ্রামের ভাষা সংগ্রহ করছে নাট্য নির্মাতারা । ওনাদের ভাষা প্রেম কখনও কখনও দেশ প্রেমকে ও ছাড়িয়ে যাবে নিঃসন্দেহে।

গ্রামের মা পুষ্টি সম্পর্কে হয়ত তখন তেমন জানতো না।  তবে সবসময় কুসুম গরম খাবার, সবুজ শাক সবজি ,খাওয়ানোর চেষ্টা করতো। আর এখন গ্রাম বা শহর সব মায়েরা বাচ্চাদের ফ্রিজের বাসি পঁচা খাবার খাইয়ে ডাক্তার ইনজিনিয়ার বানাতে চায়। আর নামি দামি কোচিং সেন্টারে ভর্তি করিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে ছেলে ইনজিনিয়ার হবে। এ যেন চারা গাছে গরম পানি ঢালার মত। কোন কোন দম্পতি আবার ছেলে মেয়েকে বাড়তি পুষ্টির জন্য কমপ্লান খাওয়ায়। এই কমপ্লান নিয়ে আমার কোন কমপ্লেন নাই। তবে আসলেই কি কমপ্লান সঠিক পুষ্টি দেয় তা নিয়ে কমপ্লেন আছে।

একবার এক দম্পত্তি গেলেন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করতে। ডাক্তার তাদের কনডম ব্যবহার এর পরামর্শ দিলেন এবং ব্যবহার শিখিয়ে দিলেন তর্জনী আঙ্গুল ব্যবহার করেন। দুঃখের বিষয হল, তারা জন্মকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। বাধ্য হয়ে কারো প্ররেচনায় না পড়ে তারা ডাক্তার এর নামে মামলা করলো । তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি ৯ মাসে ২১৬ কর্ম দিবসে রিপোর্ট দিল যে, তারা সঠিক নিয়মে কনডম ব্যবহার করে নাই । তারা কনডম সঠিক জায়গায় ব্যবহার না করে তর্জনী আঙ্গুলে ব্যবহার করেছে । তারা তো বুঝতে পারে নাই, ডাক্তার তাদের যা বলছে তারা তাই করেছে।  ততোদিনে নতুন এক জনগণ তার আগমনী বার্তা দিচ্ছে। সে  কিভাবে পৃথিবীতে আসবে সেটা নিয়ে ও হাজার ও সমস্যা। তাকে কি সিজার করে আনতে হবে নাকি স্বাভাবিক ভাবে আসবে । এখানেও ডাক্তারের ভূমিকা অনেক। ডাক্তাররা সাধারণত সিজার ছাড়া কাউকেই পৃথিবীতে আসতে দিবে না এমন বজ্রকঠিন প্রতিজ্ঞা করে বসে আছে। আর যদি কেউ আসে তো সে বাপের জন্ম। মানে বাপ যদি সিজার করতে রাজি না হয় আর কি। । এই জনগণ জন্মের পরে বাড়ি ফেরার পথে হরতালের মুখোমুখি হল এবং অবাক হলো যে মানুষগুলো তাকে পৃথিবীতে নিয়ে আসলো সেই একই রকম মানুষ আবার তাকে হত্যা করার জন্য রাস্তায় লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। দুর্বল দুটি হাত কিভাবে নিজেকে রক্ষা করবে! সে তো রবীন্দ্রনাথ এর এই কবিতা এখনও মুখস্থ করেনি  ”যে আমি আছি মা ভয় কেন তুমি করো”। মাও যেন কেমন শুধু ভয়ে কাঁদতে জানে আর কাঁপতে জানে । বীরাঙ্গনা হতে চায় না, কারণ বীরাঙ্গনারা নাকি র্নিলজ্জ্ব। গ্রামের মায়েরা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে নীরবে প্রাণ হারায় আর শহুরে মায়েরা সংবাদপত্রের খবর  হয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় তবু বীরাঙ্গনা হতে চায় না, নাকি পারে না তা জানি না।

 মা তুমি শহুরে কিংবা গ্রামের তাতে কিছু আসে যায় না, তুমি মা এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। শুধু এইটুকুই বলবো  মা তোর বদন খানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি।

ফিরোজ শ্রাবন​
ফিরোজ শ্রাবন​

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts