মিতুদির বান্ধবীর স্বর্গদর্শন-২

(পূর্ব প্রকাশিতর পর)

মিতুদি আমার প্রশ্নের জবাবে বললে্‌, ‘তা করেছি, কিন্তু বাড়ি ফিরে রাতের রান্নার জন্যে আবার ঝামেলা কে করতে যাবে বলো! তাই হাঁড়ি দুটো নিয়ে নিলাম।’
মিতুদির কথা শুনে আমি কি বলবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একদিন ঠাকুরের ভোগ চড়াতে গিয়ে কেউ এত বৈষয়িক চিন্তা করতে পারে!
কিন্তু তারপরেও আমি মিতুদিকে বলতে পারলাম না যে,  প্রসাদ নেয়ার অর্থ রোজকার মত পেট ভরে খাওয়া বা বাড়িতে এক বেলা অন্ন সংস্থানের জন্যে মন্দির থেকে হাঁড়ি ভরে বাড়ি নিয়ে আসা নয়।
প্রসাদ শব্দের অর্থ হচ্ছে অনুগ্রহ। তা কিঞ্চিৎ পরিমান হলেই চলে।
মন্দিরে আগত ধনী, দরিদ্র, কাঙ্গাল, নির্বিশেষে সর্ব শ্রেণীর ভক্তদের মধ্যে তা বিলিয়ে এক সাথে গ্রহণ করার মধ্যেই প্রসাদ গ্রহণের আনন্দ।
কিন্তু মিতুদি না হলেও আমার চেয়ে প্রায় দশ বছরের বড়। কি করে বলি কথাটা!
আমি যখন মনে মনে এসব কথা ভাবছি মিতুদি ততক্ষণে অনেকটা পথ এগিয়ে গিয়ে এক রিকশাওয়ালাকে ডাকতে শুরু করেছেন। ‘ এই রিকশ যাবে?’
রিকশাওয়ালা এগিয়ে এসে বললো, ‘হ যামু।কই যাইবেন?’
‘ ঢাকেশ্বরী মন্দির। কত নেবে?’
আমাদের বাসা থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত  ভাড়া সেই সময়ে ছিলো পাঁচ টাকা।  কিন্তু মিতুদি কিছুতেই রিকশাওয়ালাকে পাঁচ টাকা দিতে রাজি নন।
মিতুদি বললেন। ‘তিন টাকায় গেলে চলো।’  রিকশাওয়ালাও কম পাজি নয় । সে বলে উঠলো, ‘ আপা আর দশ মিনিট হাঁইট্যা গেলেই আপনি তিন টেহা দিয়া যাইতে পারবেন।’
মিতুদি রিকশাওয়ালার কথাটা শুনেও না শোনার ভঙ্গীতে হাঁড়ি দুটি ঝোলাতে ঝোলাতে হাঁটতে লাগলেন। এবং কয়েকটা রিকশাওয়ালার সঙ্গে দর কষাকষির পরে অবশেষে চার টাকায় একজন যাবে বলাতে তার রিকশায় উঠে বসলেন।
দু’জনে রিকশায় উঠে বসেছি। মাঝখানে পলিথিনে মোড়া হাঁড়ি দুটো শোভা পাচ্ছে। তার চেয়েও বড় মুস্কিল হল আমি কিছুতেই পা দু’খানি স্বস্তিতে রাখতে পারছিলাম না।
মিতুদি আমাকে বললেন,’ সাবধানে বসো, হাঁড়িতে যেন পা না লাগে।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হাঁড়িতে কি মন্দিরে দেবার জন্যে কিছু নিয়েছেন?’
মিতুদি বললেন, ‘ না হাঁড়িতে কিছু নেই তবে ওতে আজ ভোগের প্রসাদ আনা হবে কিনা তাই। পা লাগলে হাঁড়ি আর শুদ্ধ থাকবে না।’
আমি বললাম, ‘ কিন্ত আপনি তো পাদানিতেই হাঁড়ি রেখেছেন।’
এ কথা শুনেই মিতুদি বললেন, ‘তাইতো! ঠিকই বলেছো তুমি।’
বলেই হাঁড়ি দুটো নিজের কোলে তুলে নিলেন।
আমি এবারে পা দুখানি আরাম করে রেখে বসলাম।
রিকশা চলতে শুরু করলো।
(চলবে)

Anupa Dewanji

Author: অনুপা দেওয়ানজী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment