মিতুদির বান্ধবীর স্বর্গ দর্শন -৪

ঢাকেশ্বরী মন্দির সব ধর্মের লোকের উন্মুক্ত প্রবেশাধিকারের জন্যে বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের এক চমৎকার সার্বজনীন প্রকাশ

অনেক পর্যটক এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে মন্দির দেখছেন, কেউ বা প্রণাম করছেন, কেউ বা ধুপ দীপ জ্বালাবার জায়গাটিতে ধুপ, দীপ দিচ্ছেন

মন্দিরে আগত মিতুদির আমন্ত্রিত ভক্তরা সবাই প্রশস্ত চত্বরে বসে নিজেদের মধ্যে গল্প করছিলো। সে গল্প যার যার সংসারের প্রাত্যাহিক জীবনের গল্প।যেখানে কাজের মেয়ে থে্কে শুরুকরে চাল, ডাল, জিনিষপত্রের মূল্য বৃদ্ধি, স্বামীর পকেট কাটা, সিনেমা টিভি, ফ্যাশন ইত্যাদি কিছুই বাদ নেই। জমজমাট সেই গল্পের আসরের অনতিদূরেই আরো অনেকে বসেছিলেন যারা মিতুদির পরিচিত নয়। তারা মাঝে মাঝে এই আসরের উচ্চকিত হাসির শব্দে মুখ ফিরিয়ে তাকাচ্ছিলেন

তাদের আলাপচারিতায় মনেই হচ্ছিলো না এদিনটির সাথে রোজকার দিনের কোন প্রভেদ আছে

দিবসের এই সময়টাতে অনেকেই মন্দিরে আসেন ভোগের প্রসাদ নেবার জন্যে। কারণ প্রতিদিনই কোন না কোন ভক্ত ভোগ দিয়েই থাকেন।অনেক হত দরিদ্র মানুষ আসে শুধুমাত্র একটু ক্ষুন্নিবৃত্তির আশায়

পুরোহিত মন্দিরের দরজা খুলেছে আর ঠিক সেই সময়েই মিতুদির প্রিয় বান্ধবী এসে উপস্থিত হলেন

আমি তাকিয়ে দেখি অনেকটা গজকচ্ছপের মত পৃথুলা এক ভদ্রমহিলা,  টকটকে ফরসা রঙ, বিশাল চওড়া কপাল। চোখে কালো একটা সানগ্লাস।পরণে স্লিভলেস ব্লাউজ আর শিফন শাড়ি

থপাস থপাস করে হেঁটে আসতে আসতে তিনি বাজখাঁই গলায় বলতে শুরু করলেন,’উফ তোমরা এই দেশে কি করে যে থাকো বুঝিনা। রাস্তাঘাট এত নোংরা, ট্র্যাফিক জ্যাম, জাস্ট ডিসগাস্টিং।

উপস্থিত সবাই এর উত্তরে  কিছুই বললো না। কারণ উনি মিতুদির নিজের লোক

সবাই পাথরের ঠান্ডা মেঝেতে বসে আলাপ করছিলো।ভদ্রমহিলা অনেক কসরত করে অবশেষে মেঝেতে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলতে শুরু করলেন,স্বর্গ, স্বর্গ। বুঝলে কিনা আমি যে দেশে আছি সেটা জাস্ট একটা স্বর্গ। কি খাওয়া দাওয়া বল। কি রাস্তা ঘাট, কি চলা ফেরা, সব কিছুই এত সুন্দর, ভাবা যায় না।

প্রসঙ্গত না বললেই নয় যে, বর্তমানে বিদেশ যাওয়া ডাল ভাত হয়ে গেলেও সেই সময়ে মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে এমনভাবে চলে যেত না

একজন বলে উঠলেন, আমেরিকা হয়তো যাইনি কিন্তু শংকরের বই পড়ে বর্তমান আমেরিকা সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা যায়।

ভদ্রমহিলা হো হো করে হেসে উঠে বললেন।লেখকের চোখ দিয়ে দেখা আর নিজের চোখে দেখার মধ্যে কিন্তু অনেক তফাত আছে।সেটা নিজে না গেলে তো বোঝা জাস্ট ইম্পসিবল।

উপস্থিত কেউ আর তার কথার তেমন প্রতিবাদ করলো না।সেই সময়ে আমার বয়স ছিলো কম।কেন জানি এই স্থূল ধারণা নিয়ে উনি স্বর্গের মানে বলে যাবেন তা আমার মন মানতে চাইলো না।  খুব রাগ ধরে গেল ভদ্রমহিলার উপরে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি মন্দিরে কি শুধুমাত্র ভোগের প্রসাদ নেবার জন্যে এসেছেন?’

ভদ্রমহিলা হাতের সানগ্লাসটি এক বিশেষ কায়দায় ঘোরাতে ঘোরাতে  বললেন,না তা কেন হবে?

মন্দিরে এসেছি ঠাকুর দর্শন করে পুণ্য সঞ্চয়ের জন্য। সবাই তো তারই জন্যে আসে তাই নয় কি?’

এর পরে কেমন একটা আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন

আমি বললাম।তার আর দরকার কি ? আপনি তো সে পুণ্য অনেক আগেই সঞ্চয় করে বর্তমানে স্বর্গেই বসবাস করছেন। তাই নয় কি?’

সবার চোখে একটা আনন্দের ঝিলিক দেখতে পেলাম

আমার কথার উত্তরে যুতসই কিছু বলতে না পেরে অপ্রস্তুত হয়ে মিতুদির দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে রইলেন

মিতুদি বললেন, আমার প্রতিবেশি। আমার ছোটবোনের মতো।

এর মধ্যে সবাইকে প্রসাদ নেবার জন্যে আহ্বান করা হল। আমরাও সবাই উঠে পড়লাম প্রসাদ নেবো বলে

আমার কথার উত্তরে ভদ্রমহিলা সেই যে চুপ করে রইলেন,  আর কোন বাগাড়ম্বর তাঁর কথায় আর প্রকাশ পেলো না।চুপচাপ খেতে বসলেন এবং আর কোন কথা না বলে খেয়েই চললেন

(শেষ)

Anupa Dewanji
অনুপা দেওয়ানজী

Author: অনুপা দেওয়ানজী

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts