মৃণাল সেন: নিয়ম না মানই ছিল তাঁর নিয়ম/ আফরোজা পারভীন

মৃণাল সেন

চলে গেলেন মৃণাল সেন। বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর বার্ধক্যজনিত রোগে অনেকদিন ধরেই ভুগছিলেন বাড়িতেই  তাঁর জীবনাবসান হল ৷ স্ত্রী গীতা সেন প্রয়াত হযেছেন গত বছর। শেষ দিনগুলো একাই কাটালেন ‍তিনি।

মৃণাল সেনের জন্ম বাংলাদেশে, ১৯২৩ সালের ১৪  ফরিদপুরে । এখানে হাইস্কুলের পড়াশুনো শেষ করে তিনি কলকাতায় চলে যান।  স্কটিশ চার্চ কলেজে পদার্তবিদ্যায় পড়াশুনা  করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন বির পোস্টারআমৃত্যু বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন মৃণাল সেন। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার সাংস্কৃতিক কাজকর্মের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। কিন্তু কখনও পার্টির সদস্য হননি।  রাষ্ট্রপতির মনোনীত সদস্য হিসেবে তিনি ভারতের পার্লামেন্টেও গেছেন

খাদ্য আন্দোলন থেকে নকশাল আন্দোলন, মানুষের অসহায়ত্ব, স্বৈরাচারি রাষ্ট্রব্যবস্থা মৃণাল সেনকে ব্যথিত করতো্ । করে তোলে প্রতিবাদী। মানুষের স্বার্থে যে নিয়ম পরিচালিত হয় না সেটাকে তিনি নিয়ম মনে করতেন না। নিয়ম ভাঙাই ছিল তাঁর নিয়ম।  তিনি নিজেকে  পার্সোনাল কমিউনিষ্ট বলতেন।  ফরাসী নিউ ওয়েভের আশ্চর্য প্রভাব পড়েছিল তাঁর ওপর। শিল্পের নিয়ম কানুনকে কখনও কেয়ার করেননি। তৈরি করেছিলেন নিজের মতো করে রাজনৈতিক ভাষ্য। সত্যজিৎ, ঋত্বিকের পর ভারতীয় সিনেমার তৃতীয় দিকপাল তিনি । এক অনন্য মহীরুহ

তিনি যে নিজেকে পার্সোনাল কমিউনিস্ট বলতেন সেটা তিনি আচার আচরণে প্রমাণও করতেন। তাঁর সুটিং ইউনিটে সবাই একসাথে বসে এক খাবার খেতেন। কোন আলাদা মেনু বা ভেনুতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। সবার কাঁধে হাত রেখে আন্তরিকভাবে কথা বলতেন। সিগারেট ধরাবার জন্য দিয়াশলাই চেয়ে নিয়ে সে দিয়াশলাই নিজের পকেটে ভরে ফেলতেন।  ব্যক্তিগত প্রোপার্টিতে বিশ্বাসী ছিলেন না । তাই নিজের পরের ব্যপারটা খেয়াল রাখতে পারতেন না।

সত্যজিৎ-এর মৃত্যুর ছাব্বিশ বছর পর চলে গেলেন মৃণাল সেন সত্যজিৎঋত্বিকমৃণাল ভারতীয় সিনেমার তিন দিকপাল কিছুটা সমসাময়িক কিন্তু তাঁরা একে অন্যের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ঘরানার মৃণাল সেনের কাজ তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য! সত্যজিৎ রায়কে  সারা দুনিয়ার মানুষপথের পাঁচালী জন্য চেনে। মৃণাল সেনকে চেনে  ‘ভুবন সোমে’র জন্য

১৯৫৫ সালেরাত ভোরছবির মাধ্যমে পরিচালনা শুরু করেন মৃণাল। পরের ছবি  ‘নীল আকাশের নীচেবাইশে শ্রাবণ‘-এর মাধ্যমে প্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতি  পান তিনিতবে ১৯৬৯ মুক্তিপ্রাপ্তভুবন সোমে মাধ্যমেই জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে যান মৃণাল সেন

মৃণাল সেন পরিচালিত তাহাদের কথা, ভুবন সোম, খারিজ, কলকাতা ৭১, ইন্টারভিউ, পদাতিক, আকালের সন্ধানে, একদিন প্রতিদিন ছবির জগতে এক একটি মাইলফলক   ইন্টারভিউ, ক্যালকাটা একাত্তর, পদাতিক ছবিতে পুরোপুরি এক অন্য ভাষার সন্ধান করছেন তিনি। মৃণাল সেনের আত্মজীবনীতৃতীয় ভুবন

পদ্মভূষণ সম্মান পেয়েছিলেন মৃণাল সেন দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পেয়েছিলেন বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব পুরস্কার পান মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব পুরস্কার পান

অসাধারণ কয়েকটি বই লিখেছেন মৃণাল সেন। তার মধ্যে রয়েছে: Montage: Life, Politics, Cinema, Always Being Born: A Memoir

মৃণাল সেন আড়ম্বরপূর্ণ শেষযাত্রায় বিশ্বাসী ছিলেন না। মৃত্যুর পর ফুল, মালা বা কোথাও দেহ শায়িত রেখে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের বিরোধী ছিলেন মৃণাল সেন তাঁর ইচ্ছে অনুযায়ী কোনও অন্তিম যাত্রার আয়োজন করা হবে না বলে জানিয়েছেন তাঁর পারিবারিক চিকিৎসক।  তাই তাঁর  ইচ্ছানুযায়ী তাঁর দেহ  পিস হাভেনে রাখা হয়েছে।  শিকাগো থেকে তাঁর একমাত্র ছেলে কুনাল সেন ফিরলে শেষকৃত্য হবে তাঁর। মৃণাল সেনের প্রয়াণে বাংলা তথা ভারতের চলচ্চিত্র জগতে একটা অবিস্মরণীয় যুগের অবসান হল। ভারতে ‘প্যারালাল’ বা সমান্তরাল চলচ্চিত্রের জনক ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন প্রতিবাদী চলচ্চিত্রের জনক। এই ব্যতিক্রমী চলচ্চিত্রকারের প্রয়াণে গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

আফরোজা পারভীন​
আফরোজা পারভীন​

 

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts