মৃত্যুসনদ

এইমাত্র অফিসে এলেন তিনি। চেয়ারে বসে প্রতিদিনের মতো সুরা ফাতেহা পাঠ করে মোনাজাত করলেন। ফাইলপত্র দেখার পূর্বে এক কাপ চা খাওয়া তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। কিন্তু আজ চা খেতে ইচ্ছা করছে না। সকালবেলা অফিসে আসার পূর্বে চারটা পত্রিকা পড়েন তিনি। একটি পত্রিকায় জাতীয় পরিচয়পত্র সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিবেদন বেরিয়েছে। সেটা তার শির:পীড়ার কারণ। প্রতিবেদন সত্য হলে আপত্তির কিছু ছিল না। কিন্তু প্রতিবেদনটি নিতান্তই মনগড়া। তা পড়ে মেজাজ ঠিক রাখা দায়। প্রতিবেদককে অবশ্য তিনি চিনতে পারলেন না। নতুন কেউ হবে হয়ত।

আগারগাঁওয়ের এই অফিসে তাঁর দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় পরিচয়পত্র কর্মযজ্ঞের তিনি শীর্ষ ব্যক্তিদের একজন। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক সকল নাগরিককে এনআইডি বা জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া তাঁর কাজ। দেশের মানুষ প্রথম দিকে এর গুরুত্ব ততটা অনুধাবন করতে পারেনি। আজকাল জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, জন্ম তারিখ, ঠিকানা ইত্যাদি সামান্য কয়েকটি তথ্য যে মানুষের জীবনে এত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে, পূর্বে তা ছিল ধারণারও অতীত। এখন অনেকগুলো ক্ষেত্রে এনআইডি ছাড়া কাজ হয় না।

এই মুহূর্তে পরিচয়পত্রের ব্যাপারটি আরো এক ধাপ এগিয়ে গেছে। প্রত্যেক নাগরিককে স্মার্টকার্ড দিতে হবে। যারা নগরবাসী নন, তারাও নাগরিক। সুতরাং কাজের পরিধি সহজেই অনুমেয়। তবে সবকিছুর পরেও এই দায়িত্ব পালনে এক ধরনণর আত্মতৃপ্তি আছে। কাজটা যতটা চ্যালেঞ্জিং, ততটাই আÍতৃপ্তি। মনে মনে আত্মপ্রসাদ অনুভব করলেন আজিমুদ্দীন সরকার।

অফিসকক্ষের বাইরে উচ্চকণ্ঠের কথাবার্তা শোনা গেল। এখানে তো কোনো ঝামেলা হওয়ার কথা নয়। কঠোর নিরাপত্তার বেষ্টনীতে থাকেন তিনি। তাহলে এত হৈচৈ কিসের ? কলিংবেল টিপে বেয়ারারকে ডাকলেন। সে ভেতরে এসে বলল, একটা লোক জোর করে ভেতরে ঢুকতে চাচ্ছে। আমি বলেছি, স্যার খুব ব্যস্ত। এখন দেখা হবে না। কেন দেখা করতে এসেছে, তা বলছে না। কেবল বলছে, আপনি ছাড়া আর কারো সঙ্গে কথা বলবে না। অযথা চেঁচামেচি করছে স্যার !

ভাবনায় নাড়া পড়ল তাঁর। তিনি যে খুব ব্যস্ত তা তিনি নিজেই জানতেন না। এই অফিসের প্রবেশ মুখে বড় করে লেখা আছে, ‘নির্বাচন ভবনে আপনাকে স্বাগতম’। কিন্তু ভবনের ভেতরে যিনি রিসেপশনে বসে আছেন, তিনি প্রয়োজনবোধে অভ্যাগতদের শতসহস্র প্রশ্নবানে জর্জরিত করার জন্য সদাপ্রস্তুত। কিন্তু বাইরে যার উচ্চকণ্ঠ শোনা গেল, তিনি কেবল তাঁর সঙ্গেই দেখা করতে চাওয়ার কারণ কী ?

যিনি সাক্ষাৎ করতে এসেছেন, তাঁকে ডাক। বললেন আজিমুদ্দীন।

ডাকব স্যার ? বেয়ারা আবার জানতে চাইল।

বললাম তো !

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুরে যিনি এলেন, তিনি একজন বৃদ্ধ মানুষ। চেহারা বা বেশভূষায় বিশেষত্ব কিছু নেই। সম্ভবত গ্রাম থেকে এসেছেন। কী বলতে চান তিনি ?

স্যার ! আপনি আমাকে একটা সনদ দেন।

কিসের সনদ ?

আমি যে বেঁচে আছি, সেটা প্রমাণ  করার জন্য।

আপনি তো বেঁচে আছেন।

না স্যার ! কাগজপত্রে আমি মৃত। আপনার সনদ পেলে আমি প্রমাণ করতে পারব যে আমি জীবিত।

আজিমুদ্দীন সরকার আরেকবার পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন আগন্তকের দিকে। বয়স কত হতে পারে তার ? সত্তর থেকে পঁচাত্তরের মধ্যে হতে পারে। এই বয়সে সত্তর বা পঁচাত্তরের মধ্যে তেমন ফারাক নেই। হঠাৎ তাঁর নিজের বাবার কথা মনে পড়ল। বাবা বেঁচে থাকলে তাঁরও বয়স পঁচাত্তর হতো। মুক্তিযুদ্ধের সময় মারা গেছেন তিনি। শুধু মারা গেছেন বললে সবটা বলা হয় না। হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। তাঁর দোষ ছিল তিনি যথাসময়ে আত্মরক্ষার জন্য ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারেননি বা যাননি।

আপনি বসুন। বললেন আজিমুদ্দীন।

আগন্তুক বসতে ইতস্থত করলেন, আপনার সামনে বসব স্যার ! আমার দাঁড়িয়ে থাকতে অসুবিধা নাই।

আমি আপনাকে বসতেই বলেছি।

বসলেন তিনি। তবে তাঁর মুখ দেখে মনে হলো এক ধরনের চরম অস্বস্তির ছাপ ফুটে উঠেছে চোখে মুখে।

কোত্থেকে এসেছেন ? বাড়ি কোথায় ?

জেলা নেত্রকোনা, থানা পূর্বধলা, গ্রাম হাপানিয়া।

কি করেন আপনি ?

কিছু করি না। শরীরে তাগদ নাই।

এবার বলুন, আপনার সমস্যা কি ?

আমার নাম বলব না ? আমার নাম তো জিজ্ঞাসা করলেন না ?

নাম বলুন ।

মোহাম্মদ ওমর আলী তালুকদার।

আপনি তালুকদার ?

আমি না, আমার বাপ-দাদা তালুকদার ছিল। এখন কেবল নামের মধ্যে তালুকদারি আছে। কামে নাই।

আপনি কি যেন বলছিলেন, আপনি মারা গেছেন !

আমি যে বেঁচে আছি, তার প্রমাণ কী ?

বেঁচে থাকার কোনো প্রমাণ লাগে নাকি ? মৃত ব্যক্তির জন্য ডেথ সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা আছে। আপনার শারীরিক উপস্থিতিই তো আপনার বেঁচে থাকার প্রমাণ।

স্যার ! আপনি বুঝবেন না। আমি যে বেঁচে আছি তা প্রমাণ করতে পারছি না। সেটা প্রমাণ করতে গিয়ে আমি কে, সেটা প্রমান করা লাগবে। আমি থানায় গিয়েছিলাম। থানার বড়সাহেব বলছেন, আপনি কে ? বললাম, আমার নাম ওমর আলী তালুকদার। স্যার বললেন, মুখে বললে হবে না। প্রমাণ কি ? সেজন্যই তো আপনার কাছে আসা।

তার মানে আপনি একটা জাতীয় পরিচয়পত্র চান ?

জ্বি। তাতে লিখে দেবেন যে আমি বেঁচে আছি।

পরিচয়পত্র পাওয়া মানেই বেঁচে থাকা। কিন্তু আপনাকে মারল কে ?

আমার ছেলেরা।

মানে ?

আমার দুই ছেলে কাগজপত্রে আমাকে মৃত দেখিয়ে জায়গা জমি সব ভাগাভাগি করে নিয়েছে। আমি যে মৃত সেটা আগে টের পাই নাই।

কখন টের পেলেন যে আপনি মৃত ?

দিন দুই আগে, যখন ওরা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল।

বাড়ি থেকে বের করে দিল কেন ?

আমাকে ঠিকমত খাওন দেয় না। বড় ছেলে বলে, তুমি ঢাকা চইলা যাও। ঢাকায় বুড়াদের জন্য বিনাপয়সায় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। কি যেন নাম ?

বৃদ্ধাশ্রম !

ঠিক। আমাকে সেখানে যেতে বলে। আমি বলি, জমি-জমা আমার। আমাকে ঠিকমত খেতে দিবি না কেন ? আসলে সব দুই ছেলের বউদের কারসাজি।

তারপর ?

আমি রাগ করে জমি বিক্রি করে দেয়ার কথা ভেবেছি। তহশিল অফিসে যেতে তহশিলদার বলল, আপনি আবার কে ? কোত্থেকে এলেন ? আমি বললাম, আমি ওমর আলী তালুকদার।

তারপর ?

তহশিলদার আরো বলল,  ওমর আলী তালুকদার তো মারা গেছে,  অনেকদিন আগে। আপনি কোন ওমর আলী তালুকদার ? আমি তাকে বোঝাতে পারলাম না আমার পরিচয়।

তারপর ?

শেষে একজনের পরামর্শে আমি ঢাকায় এলাম। এখানে দালাল ধরলাম। দালাল বলল, মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করা নাকি কঠিন ব্যাপার। এ কাজ করতে দুই হাজার টাকা লাগবে। তা, দুই হাজার টাকা আমি পাব কোথায় ? শেষে ঠিক করলাম, মরি আর বাঁচি আমি অফিসের বড় সাহেবের সঙ্গে দেখা করব। তাই আপনার কাছে এলাম। আপনি আমাকে বাঁচান স্যার।

আপনি যা করেছেন, ঠিকই করেছেন। আজিমুদ্দীন বললেন, আপনি ঠিক জায়গাতেই এসেছেন। একটু বিরতি নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি চা খাবেন ? চা না কফি ?

আমি কোনোদিন কফি খাই নাই। কফি কি চায়ের মতো স্বাদ ?

বেল টিপে বেয়ারারকে কফি ও বিস্কুট আনতে বললেন তিনি। বেয়ারার সবিনয়ে আদেশ পালন করল। তবে বিস্কুটের প্লেট সে আজিমুদ্দীনের সামনে রেখেছিল। তিনি সেটা ওমর আলীর দিকে এগিয়ে দিলেন। বললেন, আমি আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। এতে আপনার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তবে এজন্য আপনার কিছু কাগজপত্রের প্রয়োজন হবে। আশা করি কোনো অসুবিধা হবে না।

ওমর আলী তালুকদার ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বিষয়টি নিয়ে চিন্তায় পড়লেন তিনি। একজন বৃদ্ধকে মৃত দেখিয়ে তাঁর সন্তানরা পৈত্রিক জমি ভাগাভাগি করে নিয়েছে। এমন অমানবিক ঘটনা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তবে উনি যা-কিছু বলেছেন, সবটাই তাঁর কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। ওর মুখের ভঙ্গি আর মনের আর্তি মেশানো কথাগুলো বলে দিচ্ছিল, তাঁর বক্তব্যের সবটুকুই সত্য। সত্য কত নিষ্ঠুর হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’

কয়েকটা ফাইল বগলদাবা করে ঘরে ঢুকল তারিক সুজাত। এই অফিসে তাঁর পরবর্তী সহকর্মী। আজিমুদ্দীন তাকে বসার ইঙ্গিত করে বললেন, কি খবর তারিক ?

স্যার ! আমরা একটা প্রতারণার ফাঁদে পড়ে গেছি।

মানে ? আমরা প্রতারণার ফাঁদে পা বাড়াতে যাব কেন ? ব্যাপারটা কী ?

দু’জন লোক তাদের বয়স কমানো বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছিল। ওরা বলেছে, ভুলক্রমে তাদের বয়স পাঁচ বছর কম লেখা হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্রে আমরা তা সংশোধন করে দিয়েছি।

নিশ্চয়ই আমরা তা নিজের থেকে করিনি। সাপোর্টিং কাগজপত্র কি ছিল না ?

সবই ছিল।

তাহলে অসুবিধা কী ?

স্যার ! যে সময়ে তার জন্ম তারিখ লেখা হয়েছে, ঐ সময়ে তার মা-বাবার বিয়েই হয়নি।

মাই গড ! সেটা ধরা পড়ল কী করে ?

ওরা মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নাম গেজেটভুক্ত করতে চেয়েছিল। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সভায় যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে ব্যাপারটা ধরা পড়েছে।

এখন আমাদের করণীয় কী ?

আমরা এ বিষয়ে বিধি অনুযায়ী যা করার করব। জন্ম তারিখ পরিবর্তনের জন্য যাদের কাগজপত্র পেশ করা হয়েছিল, সেগুলো আবার যাচাই করব। লোক দুজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ওরা দুজনে একই সময়ে কি জন্ম তারিখ পরিবর্তন করতে চেয়েছিল ?

জ্বি স্যার। ওরা দুই ভাই।

দুজন কি একই দিনে জন্মেছে ?

হ্যাঁ। ওরা যমজ। আমরা ওদের তলব করেছি।

ঠিক আছে। কী হলো, আমাকে জানিও।

অবশ্যই স্যার।

তারিক সুজাত চলে যাওয়ার পর অফিসের ফাইলে মনোনিবেশ করলেন তিনি। নথিগুলোকে কখনো কাগজের বান্ডিল মনে হয় না তাঁর কাছে। প্রতিটি নথিকেই জীবন্ত মনে হয়। এর পাতায় পাতায় অক্ষরে অক্ষরে মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। চাকরিক্ষেত্রে চিরকাল তিনি মানুষের উপকার করতে চেয়েছেন। আইন-কানুন ও বিধি-বিধানের মধ্যে থেকে সংবেদনশীল মন নিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। কিন্তু তারিক সুজাত আজ কী শুনিয়ে গেল ? ‘প্রতারণার ফাঁদ’ ! নথিগুলোর অভ্যন্তরে গোপনে বা তাঁর অগোচরে প্রতারণার ফাঁদ পাতা আছে। প্রতিটি নথি সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে কারো প্রতারণার ফাঁদে পা দিতে চাননা তিনি। আত্মরক্ষা করে চলার কোনো বিকল্প নেই।

তারিক সুজাত আবার এল। একটা নথি এগিয়ে দিয়ে বলল, স্যার ! এই ফাইলটা দেখুন।

কী আছে এতে ?

এটা একটা ধর্ষণের ব্যাপার। আমরা বিষয়টাতে জড়িয়ে গেছি।

মানে ? আমরা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত হতে যাব কেন ?

ঘটনাটা বেশ ইন্টরেস্টিং। নীলুফা খাতুন নামে একজন মহিলা চৌদ্দ বছরের একটি ছেলেকে ধর্ষণ করেছে।

কী আজেবাজে কথা বলছ ?

স্যার ! আগেই বলেছি, ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং। প্রাপ্তবয়স্ক একজন মহিলা একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক নাবালককে ধর্ষণ করেছে।

বুঝলাম। এতে অসুবিধা কোথায় ? আর ধর্ষককে তুমি মহিলা বলছ কেন ? ধর্ষক তো ধর্ষকই। বাই দ্যা ওয়ে, ধর্ষকের কোনো স্ত্রী লিঙ্গ আছে নাকি ?

আছে কিনা জানি না। থাকা উচিত। ধর্ষকের স্ত্রী লিঙ্গ ধর্ষিকা হতে পারে। যাকে ধর্ষণ করা হলো সে অবশ্য ধর্ষিতা। তবে ধর্ষিকা কথাটা অভিধানে নেই।

ধর্ষণের পর কী হলো বলো ?

যে ধর্ষণ করেছে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

হওয়া উচিত। তারপর ?

যে ধর্ষক বা ধর্ষিকা সে আমাদের স্মার্টকার্ড দেখিয়ে বলছে তার নাম নীলুফা খাতুন নয়, নীলুফার খাতুন।

হতেই পারে।

আমরা তাকে নীলুফা থেকে নীলুফার করে দিয়েছি। আমাদের কাছে নাম সংশোধনের জন্য সে আবেদন করেছিল। বলেছিল, মূল নাম থেকে ‘র” বাদ পড়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে তার নাম নীলুফার খাতুন। নামে মিলছে না বলে আদালত তাকে খালাস দিয়ে দিয়েছে।

আদালতের কাজ আদালত করেছে। আমরা কী করব ?

ধর্ষিত ছেলেটির বাবা উচ্চআদালতে আপীল করায় আদালত জানতে চেয়েছে নীলুফাকে আমরা কীভাবে নীলুফার বানালাম ? নীলুফা আর নীলুফার একই ব্যক্তি কিনা ?

হুঁ। আচ্ছা, ব্যক্তি কথাটার কোনো স্ত্রী লিঙ্গ আছে কী ?

কি জানি স্যার ! আমার মনে হয় নেই। এর স্ত্রী লিঙ্গ ব্যক্তিনী হতে পারে। ব্যক্তির স্ত্রী লিঙ্গ ব্যক্তিনী হিসেবে কথাটা চালু হওয়া দরকার।

এই পর্যায়ে নিজেকে মনে মনে সংযত করলেন আজিমুদ্দীন সরকার। লিঙ্গ নিয়ে এত ভাবনার কী আছে ? মূল ঘটনার সঙ্গে তাঁর এই চিন্তার কোনো সম্পর্ক নেই। আসলে ভাবনাগুলো মানুষের মনে উদিত হয়, বা অস্ত যায়।    চিন্তাগুলো আপনা থেকে মনে জেগে ওঠে বা বিলীন হয়ে যায়। অদ্ভুত আচরণ এই মন নামক বস্তুটির। তবে মনকে বস্তু বলা সম্ভবত ঠিক নয়। অফিসে বসে কী সব আজেবাজে কথা ভাবছেন তিনি !

এই মুর্হূর্তে ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে স্মার্টকার্ড। তারেক সুজাতকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে বিদায় করার পর স্মার্টকার্ডের দুটো নথি টেনে নিলেন তিনি। পত্রিকাগুলো এ বিষয়ে সমালোচনার জন্য যেন মুখিয়ে আছে। রাতারাতি এত অসংখ্য লোককে স্মার্টকার্ড বিতরণ কী সম্ভব ? তবু তিনি আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাতে এ বিষয়ে নেতিবাচক রিপোর্ট  কম হয়। কিন্তু পত্রিকার সাংবাদিকরা বাস্তব অবস্থা মোটেই বুঝতে চায় না। সম্ভবত ওদের ধারনা নেতিবাচক বিষয়  লিখলেই পাবলিকে খায় বেশি। পাবলিকের খাওয়ার কথা মাথায় নিয়ে কাজ করলে শেষপর্যন্ত তারা কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে ? যাকগে। ওদের কথা ভেবে ভেবে নিজের মাথাব্যথা বাড়ানোর মানে হয় না।

অফিসের দিনগুলো প্রায় একই রকম বয়ে চলে তাঁর। সকাল নটার মধ্যে অফিসে আসেন তিনি। মধ্যাহ্ন বিরতিটুকু ছাড়া একনাগাড়ে কাজ করে যান। কখন বিকেল পাঁচটা বাজবে, তার জন্য ঘড়ি ধরে বসে থাকেন না। ঘড়ির কাঁটা দেখেন সকালে, বিকেলে নয়। বেশির ভাগ সময় অফিসে থেকে বেরুতে সন্ধ্যা পার হয়ে যায়। এভাবেই বয়ে চলছে দিনগুলো।

কয়েকদিন পরে কনফারেন্স রুমে মিটিং সেরে নিজের টেবিলে এসে বসতেই বেয়ারার বলল, আপনার সেই লোক এসে বসে আছে অনেকক্ষণ।

আমার সেই লোক মানে ?

সেদিন আপনি যাকে কফি খাওয়ালেন। ডাকব স্যার ?

ডাকো।

ঘরে ঢুকলেন ওমর আলী তালুকদার। নামটা মনে করতে পারছেন তিনি। মাঝে মধ্যে স্মৃতিশক্তি যতটা লোপ পাওয়ার কথা ভেবে উদ্বিগ্ন থাকেন, ততটা নিশ্চয়ই হয়নি। তাঁকে বসতে বলে বললেন, কী খবর আপনার ?

আমি আর বাঁচতে পারলাম না স্যার !

কেন ? কী হয়েছে ?

আপনি আমাকে সে সনদ দিয়েছেন, তাতে আমি জিন্দা আছি। কিন্তু কেউ আমাকে জিন্দা থাকতে দেবে না।

আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। ব্যাপারটা খুলে না বললে আমি কী করে বুঝব ?

আমার ছেলেরা আমাকে ওসমান আলী তালুকদার বানাতে চায়।

ওসমান আলী তালুকদার কে ?

কে, তা আমিও জানি না। ওই নামে কোনো মানুষ নাই। খালি নামটাই আছে।

এর অর্থ কী ? এই নামে কোনো মানুষ কখনো ছিল না ?

জ্বি না।

তাহলে ? ছেলেরা আপনাকে ওসমান আলী তালুকদার বানাতে চায় কেন ?

ওদের কথা, বেঁচে থাকতে হলে ওমর আলী তালুকদারের ভাই ওসমান তালুকদার হিসেবে বেঁচে থাকতে হবে। নিজের নাম নিয়ে বাঁচা যাবে না। দীঘির পাড়ে ওমর আলী তালুকদারের নামে একটা কবরও তারা বাঁধিয়ে রেখেছে। আমি যদি বলি, আমি ওমর আলী তালুকদার, তাহলে আমি খতম।

খতম মানে ?

খতম মানে, আমার নামে কুলখানি করে চল্লিশা পড়ানো হবে। আমার নাম নিয়ে আমি বেঁচে থাকলে আমার জমি-জিরাতগুলো ওরা তো ভোগদখল করতে পারবে না। তাই আমাকে শাসানী দিয়ে বলেছে, আমি কি মরতে চাই, নাকি একটা ভুয়া নামে বেঁচে থাকতে চাই ?

একটা কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। ওরা ওদের নামে সাকসেশন সার্টিফিকেট করালো কী ভাবে ?

টাকা থাকলে এ দেশে সবই হয় স্যার ! কেউ টাকা খাওয়ার জন্য হা করে থাকে, আবার কেউ টাকা খাওয়ানোর জন্য সবসময় তৈরী থাকে।

আপনাকে কী কেউ টাকা খেতে বলেছে ?

আমি গরীব মানুষ। টাকা দিয়ে কী করব ?

আপনাকে হয়ত টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করার কথা ভাবতে পারে !

সেটা সম্ভব না। কিন্তু আমার ব্যাপারটা অন্য। আমার ছেলেদের আমি বলেছিলাম, আমি মারা গেলে     বিষয়-সম্পত্তি তারাই পাবে। কিন্তু তাদের তর সইল না। বিশ্বাসও করল না আমাকে।

বিশ্বাস করল না কেন ?

হঠাৎ আমি অসুখে পড়ে গেলাম। ক্যান্সার। ওরা ভাবল, জমিজমা বিক্রি করে আমি ক্যান্সারের চিকিৎসা করাব। আমি অত বোকা নই যে টাকাপয়সা খরচ করে ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে যাব। আপনিই বলেন, ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে ডাক্তারদের টাকা দেয়ার কোনো মানে হয় ?

চিকিৎসার ব্যাপারে নিজেকে বোকা ভাবছেন কেন ?

কী লাভ এই অসুখের চিকিৎসা করে শুধু শুধু টাকা খরচ করার ? ডাক্তার বলেছে এই অসুখ কখনো ভালো হবে না। আপনি হয়ত বলবেন, তাহলে ছেলেদের কাজের ব্যাপারে আমি চুপ করে থাকলাম না কেন ? আমার কথা হলো, আমি মারা যাওয়ার আগেই ছেলেরা আমাকে মেরে ফেলল কেন ? কেন ওদের এতটুকু ধৈর্য্য হলো না !

এখন কী অবস্থা ?

বড় ছেলে বলেছে, যদি বাঁচতে চাও, তাহলে ওসমান আলী তালুকদার নামে বাঁচো। জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে  জমিজমার ব্যাপারে ভেজাল লাগাবে, তা হবে না। ওরা বড় সাংঘাতিক ! পারলে আমাকে মেরেই ফেলে। ওদের মতিগতি ভালো ঠেকছে না। আগে তো কাগজপত্রে মেরেছিল। আমি পরিচয় সনদপত্র পাওয়ার পর ওরা খুব ক্ষেপে গেছে। আমাকে সত্যি সত্যি মেরে ফেলবে মনে হচ্ছে।

এখন কী করতে চান ? জিজ্ঞাসা করলেন আজিমুদ্দীন।

আপনি আমাকে বাঁচান স্যার। আমি যে মৃত, তেমন একটা সনদ দেন। আপনার দেওয়া এই পরিচয়পত্রটা ফিরিয়ে নেন স্যার । আমি বাঁচতে চাই।

ওমর আলী তালুকদার অফিসে বসে তাঁর সামনে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।

মাহবুব তালুকদার
মাহবুব তালুকদার

 

 

Author: মাহবুব তালুকদার

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment