মেলবন্ধনে রবীন্দ্র- সত্যজিৎ

সত্যজিৎ  রায়ের জন্ম  ১৯২১ সালের ২ মে , মৃত্যু ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল। রবীন্দ্রনাথ  ঠাকুর মৃত্যুবরণ করেন   ১৯৪১ সালে । সেই হিসেবে তিনি যখন মারা যান সত্যজিৎ রায় তখন ১৯ বছরের যুবক। তবে সত্যজিৎ রায়ের পরিবারের সাথে রবীন্দ্রনাথের নিবিড় যোগাযোগ ছিল। সত্যজিৎ এর পিতা ও পিতামহ দুজনই নামকরা শিল্পী ছিলেন। পিতামহের একটি ছাপাখানাও ছিল। সেখানে তিনি মুদ্রাকরের কাজ করতেন। তিনি ছোটদের জন্য একটা পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। সত্যজিৎএর লেখা ও ছবি  সে কাগজে বের হত।  বাবা সুকুমার রায়ও একজন বিখ্যাত শিশু সাহিত্যিক। তার মজার ছড়া পড়েনি সেকালে এমন কোন শিশু খুঁজে পাওয়া যাবেনা ।  সত্যজিৎ এর বয়স তখন দুই বছর, তার পিতা সুকুমার রায় গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর  অল্প কিছুদিন আগে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। তখন তিনি রবীন্দ্রনাথকে তাঁর নিজের লেখা গান গেয়ে শুনাতে অনুরোধ জানালে রবীন্দ্রনাথ  কয়েকটি গান গেয়ে শুনিয়েছিলেন।  সত্যজিৎ এর মা খুব ভাল রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। বাবা একবার সত্যজিৎ রায়কে রবীন্দ্রনাথের সাথে দেখা করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কবিগুরু তখন সত্যজিৎএর হাতে একটি কবিতা লিখে দিয়েছিলেন।  কাজেই শৈশব থেকেই সত্যজিৎ পরিবারের সাথে রবীন্দ্রপরিবারের আন্তরিক  যোগাযোগ ছিল।  ১৯ বছর বয়সে মায়ের এবং কবিগুরুর আগ্রহে সত্যজিৎ শান্তিনিকেতনে যোগ দেন চিত্রকলা শিখতে । কবিগুরুর বযস তখন প্রায় আশি। সত্যজিৎ  চিত্রকলা শেখার পাশাপাশি কবিগুরুর উপন্যাসগুলি পড়েন, তার নাটকের অভিনয় দেখেন, রবীন্দ্রনাথকে নানা দিক থেকে জানার চেষ্টা করেন। ১৯৪১ সালে কবিগুরুর মৃত্যুর অল্প  কিছুদিন পরই সত্যজিৎ রায় শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যান নিজেকে তৈরি করার মানসে, নিজের শেকড়ের সন্ধানে। তিনি ঘুরতে থাকেন পুরো ভারতবর্ষ। একজন মানুষ একসাথে কত রকমের প্রতিভা ধারন করতে পারে , এবং সে প্রতিভাকে পূর্ণরূপে বিকশিত করতে পারে রবীন্দ্রনাথ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

রবীন্দ্র উত্তরকালে আর এক মানুষ জন্ম নিলেন তাঁর নাম সত্যজিৎ। রবীন্দ্রনাথের মতই সত্যজিৎ রায় ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি ছিলেন একাধারে চিত্রকলা, সঙ্গীত  চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ। শেষ জীবনে তিনি পিতামহ প্রতিষ্ঠিত ‘সন্দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন।  ছিলেন জনপ্রিয় লেখক। প্রতিবছর পুজো সংখ্যায় তাঁর কোন না কোন উপন্যাস  প্রকাশ হত।   তিনি বেশ কয়েকটি বইএর মলাটের নকশাও একেছেন। তাঁর সৃষ্ট দুটি মুদ্রাক্ষরের আদল ( টাইপ ফেস) ১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে।  এই ফেস দুটির নামকরণ করা হয়েছে ‘রে রোমান’ ও ‘রে বিজারে। ’ মজার ব্যাপার হচ্ছে , সত্যজিৎ রায় কখনই আনুষ্ঠানিকভাবে কোন চলচ্চিত্র শিক্ষার প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করেননি অথচ তিনি নিজেই চলচ্চিত্রের এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট  সব প্রক্রিয়া তিনি নিজে হাতে করতেন। যেমন  চিত্রনাট্য , চিত্রগ্রহণ , সম্পাদনা , সঙ্গীত,  দৃশ্য সজ্জা ও পরিচালনা। একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় অনেক মানুষের যৌথ প্রচেষ্টায়। তাদের সবার সব বিষয়ে সমান পারদর্শিতা থাকে না। তাই কোন একটি জায়গাতে কিছু ঘাটতি থাকলে সার্বিক নির্মাণ কাজে ঘাটতি থেকে যায় ।  এ বিষয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার, ১৯২০ সালে ফ্রান্সে জন্ম নেয়া  ‘আভা গার্দ ’মতবাদেরঅনত্যম পুরোধা আবেল গাঁস এর উক্তি (  যা বাংলা করলে দাঁড়ায়), ‘ মনে একটা চলচ্চিত্র রূপ নেয়া আর তার বাস্তব রূপায়ণের মধ্যে যেন ভোলটেজ শতকরা কুড়ি ভাগ কমে যায়। ’ তাই সত্যজিৎ প্রায় সমুদয় কাজ নিজেই করতেন। তার অর্থবল কম ছিল,  টিম ছিল ছোট কিন্তু স্থায়ী। তিনি তাঁর ছায়াছবির প্রতিটি খুঁটিনাটি নিজেই দেখতেন।১৯৪৫ সালে  সত্যজিৎ রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ লেখেন। কিন্তু তখন ছবিটি নির্মাণ  করা সম্ভব হয়নি। এর প্রায় ৪০ বছর পর তিনি নতুন করে চলচ্চিত্ররূপ লিখে ছবিটি তৈরি করেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষে তিনি কবিগুরুর তিনটি ছোটগল্প অবলম্বনে তৈরি করেন চলচ্চিত্র ‘তিনকন্যা।’ একইবছর তিনি নির্মাণ করেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তথ্যচিত্র ‘ রবীন্দ্রনাথঠাকুর।’ ১৯৬৪ সালে তিনি রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের কাহিনি অবলম্বনে তৈরি করেন ‘চারুলতা ।’ তবে এই ছবি তৈরি করতে গিয়ে তিনি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বাতন্ত্র বজায় রাখেন ।  সত্যজিৎ রাযের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সততা , নান্দনিকতা আর নৈতিকতা। যা রবীন্দ্রনাথের লেখারও প্রধান বৈশিষ্ট্য।  এ বিষয়গুলি সত্যজিৎ তার চলচ্চিত্রে রোপন করেছেন গভীর নিষ্ঠায়।  হেনরিমিকলি ১৯৮১ সালে সত্যজিৎএর চলচ্চিত্র সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘ তাঁর ছায়াছবিগুলির চিত্রভাষা থেকেই বোঝা যায়, তার কাছে চলচ্চিত্র নৈতিকতার বিষয়। তারা প্রকাশ করে হারানো পবিত্রতার জন্য স্মৃতিমেদুর ব্যাকুলতা, যে পবিত্রতা শিল্প  প্রকাশের মুহূর্তেই ফিরিয়ে আনতে পারে কলকাতাবাসী । এই মহান শিল্পী যে প্রাথমিকভাবে একজন মহান নীতিবাদী, এ সত্য নজর এড়াবে কি করে?’ রবীন্দ্রনাথের মত সত্যজিৎও বিশ্বাস করতেন, শিল্পীর কাজ হয় তার শিল্পের মাধ্যমে। গান্ধীজী একবার রবীন্দ্রনাথকে রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দিতে বললে  রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘ আপনি সুতো কাটেন, আমি কথার জাল বুনি। যার যা কাজ। ’ রবীন্দ্রনাথ আমৃত্যু তার নিজের কাজ নিয়ে থেকেছেন।অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হননি। সত্যজিৎও গভীর নিষ্ঠায় তার কাজটি করে গেছেন। কেউ তাকে প্রলোভিত করতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথ চিলেন গভীর মানবতাবদিী্ তার প্রতিটি লেখা সে গল্প, উপন্যাস,  কবিতা গান সবকিছুতেই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর মানবপ্রেম। । সত্যজিৎও ছিলেন তােই। তিনিও ছিলেন গভীর মানবতাবাদী। তাঁর এই দরদ ছিল গভীর ভালবাসায় সিক্ত। এ প্রসঙ্গে পথের পাঁচালরি কথা বলা যায়। পথের পাঁচালীতে দুর্গার বিরুদ্ধে একটি পুঁতির হার চুরির অভিযোগ উঠেছিল। অপু সেই হারটি দেখতে পেল। দুর্গা তখন মৃত।  অপু হারটা বাড়ি সংলগ্ন পুকুরে ফেলে দিল। পুকুরটি ছিল পানায় ভর্তি। হার ফেলার সাথে সাথে পানি সরে গিয়ে হারটা পুকুরের পানিতে টুপ করে ডুবে গেল। পানা এসে আবার জায়গাটা ভরে দিল। পুকুরে স্থান পেল অপুর গোপন কথা। অপু বিষয়টা কাউকে জানালো না, আলোচনা করল না, দোষ দিলোনা , নিন্দে করল না। সে ক্ষমা ভালবাসা আর দরদের সাথে হারটা ছুঁড়ে দিলো পুকুরে। সতজিৎএর ভাষায় আনুগত্য ক্ষমা আর ভালবাসা জীবনকে এক সূত্রে গেঁথে রাখে।

আগেই বলেছি, সত্যজিৎ তাঁর ছবির কাজ নিজেই করতেন। ‘তিন কন্যা’ থেকে ছবির সঙ্গীতও তিনি নিজেই রচনা করতেন। ‘চারুলতার’ পর থেকে প্রায়ই তিনি ক্যামেরার কাজ নিজেই করতেন।সিনেমার স্ত্রিপ্টি নিজে লিখতেন। অনেক চিত্রনাট্য তার মৌলিক সৃষ্টি। এর মধ্যে রয়েছে ছযটি কাহিনিত্র, পাঁচটি তথ্যচিত্র ও দুটি মৌলিক ছায়াছবি।সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র জীবন চছিল ব্যতিক্রমী। তিনি তাঁর প্রথম চলচ্চিত্রের জন্য ‘কান চলচ্চিত্র উৎসব’ থেকে বিশেষ পুরস্কার পান। সেটা ১৯৫২ সালের কথা। ফরাসিরা তাঁকে দিয়েছিল ‘লিজন ডি অনার’ আর হলিউড তাঁকে ১৯৯২ সালে দিয়েছিল অস্কার। এছাড়াও তিনি পেয়েছেন অজস্র পুরস্কার। এক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথের সাথে তার মিল। রবীন্দনাথ নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৩৯ সালে, তাঁর জীবনের শেষাংশে। আর সত্যজিৎ অস্কার পেলেন তার মুমূর্ষু অবস্থায়। এই পুরস্কারটি তাঁর পাবার কথা ছিল অনেক আগে।

তবে কোন পুরস্কার বা অস্কার দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বা সত্যজিৎকে মূল্যায়ন করা যায় না। তাদের যে কীর্তি সে কীর্তির কোন মূল্যাযন হয় না। সে কীর্তির মূল্যায়ন হয় মানুষের ভালবাসায়। সে  ভালবাসা তারা পেয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের প্রতি সত্যজিৎএর ছিল গভীর শ্রদ্ধাবোধ। এ শ্রদ্ধার প্রমাণ পাওয়া যায় সত্যজিৎ নির্মিত ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ তথ্যচিত্রের প্রারম্ভিবক মন্তব্যে।

‘১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট কলকাতা শহরে একজন মানুষের মৃত্যু ঘটিছিল। তাঁর মরদেহ ভস্মীভূত হয়েছে কিন্তু তাঁর উত্তরাধিার কোন আগুনে পুড়বে না। সে উত্তরাধিকার শব্দের, সঙ্গীতের কবিতার, মননের, আদর্শের। তাঁর শক্তি আমাদের বর্তমানে এবং ভবিষ্যতে অভিভূত করবে, অনুগ্রণিত করবে। আমরা তাঁর কাছে বহু  ঋণে ঋণী। তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাই।

সত্যজিৎ এর অনুরাগী ভক্ত ও চলচ্চিত্র বোদ্ধা গাস্তঁ রোবের্জ তাঁর সত্যজিৎ রায় প্রন্থের প্রস্তাবনায় রবীন্দ্রনাথে উদ্দেশ্যে যা লিখেছিলেন সেই একই কথা লেখেন। তবে তারিখটি লেখেন ১৯৪১ এর ৭ আগস্টের স্থলে ১৯৯২ এর ২৩ এপ্রিল। তিনি পুরো মন্তব্যটি তুলে দিয়ে পরিশেষে লেখেন, এই কথা কটি ( তারিখটি ছাড়া) সত্যজিৎ রায়ের, তাঁ  লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে নির্মিত  চলচ্চিত্রের প্রস্তাবনা হিসেবে। আশা করি, তারিখটি বদলে কথাগুলি যদি আমি সত্যজিৎ রায় সম্বন্ধে আমার গ্রন্থের প্রস্তাবনায় ব্যবহার করি, তা ধৃষ্টতা বলে গণ্য হবে না ।  তিনি তাঁর চলচ্চিত্রের নাম দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আমি অামার বইয়ের নাম দিলাম, – ‘সত্যজিৎ রায়।’ তাঁর ঋদ্ধ  ব্যক্তিত্বের সব দিক নিয়ে চর্চা করতে আমার অক্ষমতা বিষয়ে আমি অবহিত।’

এই হল সাহিত্য আর চলচ্চিত্রের  দুই বিজয়ী নাবিক সম্পর্কে সামান্য দুটি কথা, যারা বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন বাংলা সাহিত্য আর চলচ্চিত্রকে।

 

তথ্যসূত্র ১.গাস্তঁ রোবের্জ – সত্যজিৎ রায় ২.সত্যজিৎ রায়- বিষয় চলচ্চিত্র

 

 

Author: আফরোজা পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts