মেহেরুন দাদী

আমাদের কয়েক বাড়ি পরের বাড়িতে এক দাদী বেড়াতে আসতো। দাদী কথাটা বোধ হয় ঠিক না। পাড়াতুতো দাদার উনি সৎ বোন। সৎ বোন কি করে হলো তাও এক মজার কাহিনি। আমার দাদার চাচা আঁটকুড়ো ছিলেন। মানে ঠিক নিঃসন্তান ছিলেন না, তাঁর সাত সাতটা মেয়ে, কোন পুত্র সন্তান ছিল না। প্রায় আশি বছর বয়সে কিছু ধান চাল বিক্রি করে হজে যাবার সব ব্যবস্থা করেন। যাবার আগে মিলাদ টিলাদ দেওয়া, সবার কাছ থেকে মাফ চাওয়া, বিদায় নেওয়া্র পালাও শেষ হয়েছে আগের রাত পর্যন্ত। সকালে উঠে নাস্তা খাওয়ার পর সবাই যাত্রা পথের বুচকি বোচকা ও আনুসঙ্গিক জিনিষপত্র গুছিয়ে দেবার জন্য ব্যস্ত। ওনার কিন্তু সে সবে তেমন উৎসাহ বা তাড়া দেখা গেল না। একটু পরে উনি সবাইকে ডেকে বললেন, ‘শোন তোমরা, ঐসব বাঁধা ছাঁদা সব খুলে ফেল। হজে আর আমি যাচ্ছি না।’ সবাই বলল, ‘সে কি?’ উনি বললেন, ‘গত রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছি, আমার যাওয়া হবে না।’ ওরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কি এমন স্বপ্ন দেখলেন যাতে আপনাকে হজে যেতে নিষেধ করেছে?’ উনি বললেন, ‘স্বপ্নে বলেছে, আমি উত্তর পাড়ার মর্জিনাকে বিয়ে করলে আমার একটা ছেলে হবে আর  সে বড় হয়ে এই গাঁয়ের মোড়ল হবে।’ শুনে তো সবার মাথায় হাত! লোকটা বলে কি? কোথায় নেতাজী আর কোথায় পেঁয়াজী। কোথায় হজ আর কোথায় বিয়ে? আর এই আশি বছর বয়সে? তাও ঐপাড়ার মর্জিনাকে, যে নিজে ও তার বিধবা মা মিলে ওনাদের বাড়ির ঢেঁকিতে ধান ভেনে পেট চালায়? অন্যান্যরা বলল, ‘নিশ্চয়ই শয়তান পেছনে লেগে আল্লার দ্বীনের কাজে বাধা দিচ্ছে।’ সবাই দৌড়াদৌড়ি করে আশেপাশের গ্রাম থেকে তিনজন মাওলানা হুজুর খুঁজে ঢুঁড়ে আনলো। ওয়াজ নছিহত হলো। কেউ কেউ গুণীণ নিয়ে এসে অনেক ঝাড়ফুঁক করালো। কিন্তু ভবি ভুলবার নয়। কিছুতেই কিছু হলো না।

এদিকে দুটো পক্ষ গেল ভীষণ চটে । একদিকে ওনার সাত জামাই, যারা ওৎ পেতে বসে ছিল, বুড়ো কবে অক্কা পাবে আর তারা ওনার বিশাল সম্পত্তিটা ভাগাভাগি করে নেবে। অন্যদিকে ওনার অন্যান্য আত্মীয়স্বজন ও পাড়া ভর্তি নিজ বংশের সব লোকজন। তাদের সোজা বক্তব্য, ওই রকম একটা খেটে খাওয়া, প্রায় ভিখিরি, নিচু জাতের মেয়েকে কিভাবে এই সম্ভ্রান্ত পরিবারে উঠতে দেওয়া যাবে? ঐ মেয়ে হবে এই বাড়ির বউ? নৈব নৈব চ। সে এক হুলুস্থুল কান্ড। পরের অধ্যায় অবশ্য অনেকটা বাংলা সিরিয়ালের মতই। ইন শর্ট, সংকল্পে অনঢ় বুড়ো বিয়েটা করেই ছেড়েছিলেন এবং যথারীতি কিছু দিনের মধ্যে হজ ভারসাস বিয়ে নিয়ে বাহাছ করতে উপরতলায় ঈশ্বরের কাছে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু বনিয়াদের বীজটা বপন করে যেতে একটুও ভুলে যাননি। সময় মতো ঘর আলো করে  একটা ফুটফুটে ছেলেও এসেছিল । এবং ছেলেটা বড় হয়ে বেশ হ্যান্ডসাম ও অত্যন্ত বিচক্ষণ পুরুষ হয়েছিল। তিনি আমার বাবার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট হলেও আমার দাদার চাচাত ভাই হিসেবে সম্পর্কে তিনি বাবার চাচা হয়ে গিয়েছিলেন এবং সেই হেতু সিনিয়ার ও শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে গেলেন। মোটমাট বাবা মোড়ল হলেও গ্রাম্য শালিসীতে সবাই বিচক্ষণ মানুষ হিসেবে তার মন্তব্যই জানতে চাইত ও তাঁর সিদ্ধান্তই শেষ কথা হতো। যাই হোক, সাইড ট্র্যাক হওয়া থেকে এখন ওনার সৎ বোন, দাদীর কথায় ফিরে আসি।

ঐ দাদার সাত সৎ বোনের ছ’জনই মহামারীতে মারা গিয়েছিলেন। এই এক বোনই মাঝে মাঝে ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। ইনিও বিধবা। আমরা এনাকে মেহেরুন দাদী বলতাম। এই দাদী একাধারে খুবই অস্থির প্রকৃতির ও সুচিবায়ুগ্রস্ত মহিলা ছিলেন। দিনের মধ্যে আশি বার আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যেতেন আসতেন। উদ্দেশ্য শুধুমাত্র শানের পুকুরে গিয়ে পা দুটো ধুয়ে আসা। পা’তে নাকি বার বার নোংরা জিনিস লেগে যেত। পা ধুয়ে ফেরার পথে বার বার পিছন ফিরে দেখতেন আবার কাপড়ে কোথাও কোন ধুলো টুলো লেগে গেল কি না। দেখতেন আর পরণের কাপড়ের নিচের দিকটা বার বার ঝাড়া দিতেন, যাতে ধুলোগুলো পড়ে যায়। কাউকে একটুও বিশ্বাস না করলেও আমার মাকে অনেকটা বিশ্বাস করতেন, তবে পুরোপুরি নয়। দিনে অন্তত চার বার এসে মাকে বলতেন, ‘ও হামিদা, বাক্সটা একবার খোলতো মা, হাতের বালা দুটো, সোনার মাদু্লিটা আর টাকাপয়সা গুলো ঠিকমতো আছে কিনা একবার দেখে যাই।’ মা খুবই বিরক্ত হতন। কিন্তু ‘এমন ভাল মেয়ে আর হয়না’-র সমাজে প্রতিষ্ঠিত তকমা বা ইমেজটা নষ্ট হয়ে যাবে, সেই ভয়ে মা কখনো মুখ খুলতে পারতন না। কেবল খুব নিচু গলায় আমাদের কাছে এসে গজগজ করতস, ‘বিশ্বাস যদি না থাকে তো আমার কাছে রাখা কেন বাপু?’ যাই হোক, মালপত্র দেখা শোনা শেষ হলে প্রতিবারই আমাকে বলতেন, ‘ তা হ্যাঁ ভাই, ক’টা পাশ দিলি?’ বলতাম, ‘বুবু, আমি এখন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হয়ে এসেছি। আর কিছুদিন পর থেকে আমাদের ক্লাশ শুরু হবে’। উনি বললেন, ‘তোরা সব কলি কালের ছেলে, বড় পেঁচিয়ে কথা বলিস। সোজা কথা তোদের মুখে আসে না। বলি শেষ পর্য্যন্ত ‘এন্‌টেরেন্স’ -টা কি পাশ দিতে পেরেছিলি?’

আসলে আগে স্কুল ফাইনালটাকে এন্‌ট্র্যান্স পরীক্ষা বলা হতো। আমাদের বাপ চাচারা তখন এনট্রান্স পাশ করেছিলেন। পরে ওটার নাম হয়েছিল ম্যাট্রিক। আমাদের সময় বোধ হয় ওটার নাম হয়েছিল স্কুল ফাইনাল বা পরে হায়ার সেকেন্ডারি ফাইনাল। তবে ম্যাট্রিক কথাটাও আড়াআড়ি ভাবে সঙ্গে চলতো। তা অত কিছুর মধ্যে না গিয়ে সহজ করে আমি বলি “বুবু, ওসব অনেক আগে পাশ করে আমি এখন……’। আমাকে সপাং করে থামিয়ে দিয়ে রেগে মেগে উনি বেশ জোর গলায় বলে ওঠেন, ‘চুপ, অসভ্য ছেলে, মিথ্যেবাদী। বললেই তো হয় ‘এনটেরেন্‌স্‌টা’ অনেকবার চেষ্টা করেও এখনও পাশ দিতে পারিস নি। এতে লজ্জার কি আছে? আমি জানি ওটা পাশ দেওয়া অত সহজ নয়। অনেক শক্ত। অনেকে সারাজীবন চেষ্টা করেও সারতে পারে না। তবে কথা সেটা না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এই বয়সে অত মিখ্যে কথা বলার ওব্বেশটা একটুও ভাল না। আল্লা না করুক, তবে আমার কোন সন্দেহ নেই যে, বড় হয়ে শেষ পর্য্যন্ত তুই একজন চোর হবি।’

Author: খায়রুল আনাম

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts