ম্যাজিক মেডেল

ম্যাজিক মেডেল

মাহফুজা নামটির প্রতি কি যেন এক সান্ধ্যকালীন ছাতিম সন্ধ্যার দরদ আজীবন চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ে। শুধু আদর কেন? যখন কবিতার লাইন হয়ে ওঠে মাহফুজার প্রেম ও বন্দনার একমাত্র শব্দ তখন অন্য এক আবহ তৈরি হয় আজীবন।

 

‘মাহফুজা তোমার শরীর আমার তসবির দানা

আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়।’

 

কিন্তু আজ হঠাৎ মাহফুজা নামের ওপর আরশ হতে কি এক লানত বর্ষিত হতে থাকে! অথচ মাহফুজা যখন এসএ ফেডারেশনের প্রশিক্ষণে ঢুকছিল তখনও ওর মন ছিল চনমনে। শরীর ছিল ঝরঝরে। ও সকালে ঘড়ি ধরে এক ঘন্টা ঘাম ঝরিয়ে হেঁটেছে আজ। যদিও অন্যদিন ঘরোয়া প্রশিক্ষণের সময় সকালে আলাদা করে হাঁটতে বের হয় না। কিন্তু এখন ওর ছিল বাড়তি মনোযোগ। যে করেই হোক ওকে ডিঙোতে হবে বাঁধার প্রাচির!

অনুশীলনের পুরো সময়টা জুড়েই ছিল আলাদা রকম কারসাজি। মনের ওপর চাপবিহীন ভারমুক্ত অবস্থায় ও অনুশীলন করেছে এবং সর্বক্ষেত্রেই ও হায়েষ্ট স্কোর নিয়ে প্রশিক্ষকদের হাসিমুখের জবাবে প্রতিবারই হাসিমুখ দেখাতে পেরেছে। ও প্রায় সিওর। অলিম্পিকে যাচ্ছে অভয়কন্যা মাহফুজা।

 

কিন্তু শেষ মূহুর্তের কানাঘুষা ‘মাহফুজা বুড়িয়ে গেছে’! ওর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ওর বাঁধহীন চক্ষু মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত আনে। ছলাৎ ছলাৎ গড়িয়ে পড়ে অভিমানের- কষ্টের- লজ্জার- অশ্রু। ওর চিরচেনা কবিতার লাইনগুলো কুঁঁকড়ে যায়!

ওর খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ও  এ কথাও জানে, কান্না করবার মত বিশ্বস্ত একটি কাঁধ লাগে। যেটি এই মূহুর্তে ওর কাছে নেই। তবে ওর ইদানীং কান্নার জন্য কাঁধ লাগে না। আর কান্নার মাধ্যমে সে নিঃস্ব হয় না। বরং শক্তিশালী হয়। শক্তি সঞ্চয় করে। ইদানিং কান্নার জন্য ধাতব পদার্থই যথেষ্ট। রক্তমাংসের কাঁধের যে বড় অভাব! তাই ধাতব পদার্থের তৈরি মেডেলটা ধরেই তার কান্নার আয়োজন শুরু হয়। শেষ হয়। মেডেলের কথা মনে আসতেই ওর চোখে হাজার ঝরনা সিরিয়াল দেয়। হাজির হয়। ১৯৯৯ সালে পাওয়া শিশু একাডেমীর প্রতিযোগিতায় জীবনের প্রথম বড় মেডেল। এটি শুধু সোনার একটি ধাতব মেডেলই ছিল না। বরং সেটি ছিল ওর জীবনের মোড় ঘোরানোর ম্যাজিক মেডেল। লড়াই করা শিখতে পারার মেডেল। যুদ্ধ যুদ্ধ জীবনের মধ্যে ঢুকে পড়ার মেডেল। যুদ্ধে জয়ী হবার মেডেল। সব মিলিয়ে জীবনটার প্লাটফর্ম চেঞ্জ করার মেডেল। সেটি ধরে সে তার কান্নার শখ মেটাতো। কান্নার দুঃখ ঘোঁচাতো। কান্নার তৈজস আঞ্জাম দিতো। সে মেডলটির কথা মনে হতেই আবার মাহফুজার চোখে বাণ ডাকে। শত চেষ্টাতেও জীবনের প্রথম পাওয়া মেডেলটি ও আর ফিরে পাবে না। কারণ তার মা করিমুন্নেসা বাধ্য হয়ে মেডেলটি বিক্রি করে দিয়েছেন। বাবা আলী আহমেদ গাজী অসুস্থ হয়ে খুলনার হাসপাতালে জীবন মৃত্যূর সন্ধিক্ষণে পড়ে ছিলেন দীর্ঘদিন। বাবার চিকিৎসার টাকা যোগাড় করতে যেয়ে মা হিমসিম খেয়েছেন। অবশেষে  বাধ্য হয়েই মেয়ের জেতা জীবনের প্রথম পথ প্রদর্শক পরশ পাথর হীরক খণ্ডের ঔজ্জ্বল্যে বিচ্ছুরিত সোনার মেডেলটি বিক্রি করে দিয়েছেন।

 

খবরটি প্রথম শুনে মাহফুজা বাকরুদ্ধ হয়ে অনেক কান্না কাটি করে। পরে সে এক সময় টের পায়,  যদি মায়ের কাছে তখন তার বিশেষ কারো দেয়া কোন লকেটও থাকতো কিংবা ছবির ফ্রেম। সেটিও বেঁচতে মায়ের কুণ্ঠা হতো না। কারণ সবকিছু ছাড়িয়ে বাবার সুস্থতা ছিল মায়ের কাছে সবচেয়ে আকাঙিক্ষত। সে জানে জীবন সব কিছুকেই হার মানিয়ে ছুটে চলে তারই নির্ধারিত গন্তব্যে। জীবন সাহিত্যকেও হার মানায়। ও কয়েকদিন আগে একজন বিখ্যাত লেখকের একটি উপন্যাস পড়ছিলো। সেখানে ও দেখেছিল নায়িকার মা কিভাবে তার অভাবের সংসারে তার প্রথম প্রেমিকের দেয়া সোনার ছবির ফ্রেমটি অবলীলায় পানির দরে বিক্রি করে তার সন্তানের চিকিৎসা করেছিল। যখন মাহফুজা উপন্যাসটি পড়ছিলো, তখন তার মধ্যে এক ধরনের ক্ষরণ হচ্ছিল। জীবন কি এতটা নিষ্ঠুর!

কিন্তু বাস্তব জীবনে যখর ওর নিজের মেডেলটি বিক্রি হবার কথা শুনলো ততক্ষণে ও বেশ খানিকটা ধাতস্থ হয়েছে, নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে। ওর দুঃখ কিছুটা হলেও লাঘব করেছে ওর পঠিত উপন্যাস। ওর পঠিত উপন্যাসের সাথে আগেই ভাগ করে নিয়েছিল ওর বোধের গভীরতা। তাই উপন্যাসটি পড়ে তখন ওর যতটা কষ্ট হয়েছিল, তার মেডেল বিক্রির দুঃখের ভার ততটা হয় নি। ও আগেই যেহেতু উপন্যাস পড়াকালীন সময়ে সেটি পেয়েছিল তাই সহজেই মেডেল হারানোর দুঃখ নিজে নিজে সামলে নেয়। কারণ জীবনের অপর পৃষ্ঠা- অন্য রূপের নামই তো সাহিত্য!

তাছাড়া চিকিৎসা বলে কথা! বাবা না থাকলে কি কখনো কোনদিন ওর পক্ষে এখানে আসা সম্ভব ছিল। ও বাবার অসুস্থতা নিয়ে শংকিত হয়ে পড়ে। বাবার চেয়ে কি মেডেলের গুরুত্ব তার কাছে বেশি! বাবা যদি সুস্থ হয়ে ওঠে তো সে আবার এ রকম সোনার মেডেল দেশ বিদেশ থেকে বহুবার বহুভাবে অর্জন করতে পারবে।     

 

মেডেলের কথা মনে আসতেই আবারও ওর বর্তমান ছিটকে পড়ে শৈশবের ঝিনুক মুঠোয়। সেখানে বহুবর্ণিল সংগ্রাম আর কষ্টের ঝিলিকে নিজেকে আবার ঝলসে নেয়। ওর জন্ম হয়েছিল যশোরের অভয়নগরের এক কৃষক পরিবারে। বাবা একজন সামান্য বর্গাচাষী। মা বাবা, পাঁচটি ছেলেমেয়েসহ নিজেরা দুজন। মোট নয়জনের সংসার চালাতে বাবা সারাদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে। সেখানে বড় মেয়ে মাহফুজা হতে চায় সাঁতারু। গ্রামবাসীর চোখে যা গরিবের ঘোড়া রোগ। আহ্লাদ!

 

যেখানে আজীবন মেয়েরা গোসল সারে পর্দার ঘেরাটোপে। সেখানে এই মেয়েটা আঁটসাঁট হাফ-প্যান্ট,  গেঞ্জি পড়ে হদ্দমদ্দ হয়ে সাঁতার কাটে পুকুরে। সারা গ্রাম রাষ্ট্র হয়ে গেল। মেয়ে কোথায় যায়, না যায়। ছেলেদের মত ছোট করে চুল ছাটে। বুক উঁচু করে হাঁটে। হাতের পেশি ছেলেদের মতো, পায়ের মাসল ছেলেদের মতো, বুকের গভীরে ছেলেদের রেখা! বলে কি- এই মেয়েকে কে বিয়ে করবে?

সেটাই মাহফুজার কাছে শিকল ভাঙার গান! সামাজিক বঞ্চনা আর দারিদ্রের মহাসাগর পাড়ি দিয়ে তাঁকে হতে হবে সাঁতারু। সাঁতারের মধ্যেই সে খুঁজে পায় প্রাণ। খুঁজে পায় জীবনের ঘ্রাণ! এর জন্য অভয়নগর থেকে প্রতিদিন আঠার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে নওয়াপাড়া শহরে এসে শুরু হলো নতুন অভিযান। শুরুটা ছিল লুকোচুরি করেই। খেলাধুলা- সাঁতারের পোশাক ট্রাউজার- টি শার্ট গায়ে জড়িয়ে বাড়ি থেকে বেরোনোর কোন উপায় নেই। তাই সাধারণ পোশাক পরেই চলতে থাকলো অভয়নগর টু নওয়াপাড়া সাঁতার অভিযান। তবুও কি থেমে থাকে গ্রামের মানুষের কটু কথার অমানিশা?

 

মেয়ে কোথায় যায় রোজ ব্যাগ ঘাড়ে করে? খোঁজ খবর রাখো না কি, শিলার বাপ?

শিলা মাহফুজার ডাক নাম। বাবা মা তাকে আদর করে শিলা নামেই ডাকে।

হ, জানি তো। মেয়ে আমার সাঁতার শিখে।

ও বাবা! সে ডলফিন নাকি? সারাদিন পানিতে ভিজে থাকে? এই গ্রামের মেয়ে হয়ে অর্ধ উলঙ্গ সেজে সাঁতার শিখবে? এ রকম চলতে পারে না। মেয়েকে ঠেকাও। এ রকম বেপরোয়া চলতে থাকলে তোমার মেয়েকে তো বিয়ে দিতে পারবা না। সমাজ নষ্ট হবে। কে বিয়ে করবে তোমার ঐ পুরুষালি মেয়েকে?

মেয়ে আমার এখনো ছোট। এখনি ওর বিয়ের কথার কি হলো?

কি কথা বলো মুখে মুখে শিলার বাপ? মেয়ে এখন ছোট তা বড় কি হবে না? তাকে কি বুড়ি বানাতে চাও?

মেয়ের আমার সাঁতার শেখার ইচ্ছে। সবার তো সব রকম ইচ্ছা থাকে না। তাছাড়া…

গ্রামের নানা জনের নানান কথা- প্রশ্নের মধ্যে আলী আহমেদ গাজী খেঁই হারিয়ে ফেলেন।

নানান কথার মাঝেই তার মনে হয় নিজের জীবনের কথা। শৈশবে সেও ভাল হা-ডু-ডু খেলতো। তারও ইচ্ছে ছিল দিগি¦জয়ী  খেলোয়াড় হবার। কিন্তু কঠিন জীবন তাকে তার স্বপ্নের দুয়ার খুলতে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তো সে তার লড়াকু মেয়েটার দু’চোখের স্বপ্ন পড়তে পারে। স্বপ্নের মাঠে হেঁটে বেড়ায়। পূর্ণতা দিতে চায়। সে বুঝতে চায়, যে কোন মূল্যে তার লড়াকু মেয়ের স্বপ্নের দরজায় পৌঁছে দেবার দায়িত্ব তার। তাই তো সে গ্রামের মুরব্বীদের অকারণ নানা প্রশ্নের জবাব দেয়, আবার দেয়ও না। এ কান দিয়ে শোনে আর ও কান দিয়ে বের করে দেয়। খুঁজতে থাকে অন্য পথ। এ ভাবে বাড়ি থেকে আসা যাওয়া সম্ভব নয়।

 

তাই তো ওর জন্মদাত্রী মা- বাবা বেঁচে থাকতেও ওর আশ্রয় হলো এতিমখানায়। বেঁচে বর্তে থাকা মা বাবাকে ছেড়ে জায়গা করে নিতে হলো অনাথ আশ্রমে। ও নিজের কাছেই নিজে কৈফিয়ত দেয়। স্বপ্ন পূরণের জন্য মানুষ কত ত্যাগই তো করে। যে নারী অন্দরমহল ছেড়ে পথে নামে, সেই জানে তাকে ঠিক কতটা বাঁধন ছিড়তে হয়! আর এ তো মাত্র বাবা মা থাকতেও অনাথ আশ্রমে জায়গা পাওয়া! কে দেবে তাকে এইখানে থাকা খাওয়ার খরচ। কে দেবে তাকে নিরাপত্তার চাদর। কারণ এ সমাজ পারতপক্ষে কাউকে নিরাপত্তা দেয় না। খুবলে খায়। এক মুহূর্ত সময় পেলে খুবলে খায়। এই তো মাত্র সেদিন। মেধাবী এম. এ পাশ রুপা। মেধাবী রুপা। ঢাকায় একটি এনজিওতে চাকরিরত রুপা শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে বাসের মধ্যেই খুন হয়। রুপা নামের মেধাবী, শিক্ষিত নারী শরীরটি চলন্ত বাসেও অরক্ষিত হয়ে খুন হয়েছে। শুধু কি খুন! তার আগে তাকে ধর্ষণ করেছে সামান্য বাসের শ্রমিক। হেলপার, কনডাকটর, ড্রাইভার। নিশ্চয় তারা রুপার চেয়ে বেশি শিক্ষিত, বেশি মেধাবী ছিল না! তারপরেও তার চেয়ে কম শিক্ষিত কম মেধাবী সামান্য শ্রমিক শ্রেণীর পুরুষ দ্বারা ধর্ষিত হয়ে খুন হতে হয়েছে তাকে! মাত্র কয়েক মাইল পথের, কয়েক মিনিটের মধ্যে। তখনও কিন্তু সে বাঁচার জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছিল। চেষ্টা করেছিল। তার কাছে থাকা দামী মোবাইল ফোন এবং নগদ পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেছিল। হাতে পায়ে ধরেছিল। (এই কথাগুলো পরে আসামীরা নিজেরাই আদালতে স্বীকার করেছে।) কিন্তু তারা তা শুনবে কেন? এই তো আমাদের সমাজ। মাহফুজা ভাবে আর নিজেকে প্রবোধ দেয়। কেঁদো না, মাহফুজা! বেঁচে যে আছো এর জন্য শুকরিয়া আদায় করো। এই সমাজ যে অন্তত তোমাকে বেঁচে থাকতে দিচ্ছে! তুমি তো মানুষ নও। জীবন্ত ডলফিন! যে পানিতে উপুড় হয়ে বাঁচতে চায়! জীবন চায়!  

 

তো এত ত্যাগ, এত সংগ্রাম বৃথা যাবার নয়। সাফল্য ধরা দেয় জালে মাছ আটকে পড়বার মতো আনন্দে। ঢাকায় ১৯৯৯ সালে শিশু একাডেমী আয়োজিত আন্তঃজেলা মহিলা সাঁতারে চ্যাম্পিয়ন হলেন মাহফুজা। জয় করলেন সোনার মেডেল। বয়স তখন মাত্র নয় বছর। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার কারণেই তাকে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) সাঁতার প্রশিক্ষণে ভর্তির সুযোগ করে দেয়। সেই জলভরা সাঁতারের সমুদ্রে মাহফুজা সাঁতরায় আর ভাবে-আহা! জলপূর্ণ সাঁতারের নদীতে সাঁতার কাটবার মত জলহীন এক ঝাঞ্ঝার জীবন সাগরে সাঁতরানো এত সহজ নয় কেন?

 

সব ঠিকঠাক। কিন্তু ভর্তির টাকা? কে দেবে তাকে এত টাকা? জলপূর্ণ সাঁতারের এত পানির মতো জীবনের সাতারে এত পানির অভাব কেন?

না! জোয়ারের পানি যেমন নির্ধারিত সমুদ্রের পানির সকাল সন্ধ্যা বৃদ্ধি ঘটায় সে রকম জীবন নদীতেও কি কখনো সময় মেপে মেপে জোয়ার কিংবা শুকনো নদীতে ঢল ঢল করে উছলে ওঠে জোয়ারের পানি? নাকে মুখে ঢোকে অন্তহীন। হাবুডুবু খায়। তারপর সব কিছুর মধ্যে থিতু হয়ে ভাসতে থাকে সে উচ্ছ্বল পানির বন্যায়? হ্যাঁ। কখনো সখনো। তাই তো জীবন এতো মধুর। জীবন এতো সাফল্যমন্ডিত! জীবন এতো ব্যাপক! জীবন এতো অর্থময়!

 

চাচা চিন্তা করবেন না। শিলার ভর্তির টাকা আমি দেবো। বিকেএসপি তে ভর্তি হতে কত টাকা লাগবে, চাচা?

কি বলো বাবা? তুমি দেবে আমার শিলার ভর্তি খরচ?

হ্যাঁ চাচা। শুধু ভতির্র খরচ নয়। আমি ওর যাবতীয় খরচের ভার নিতে চাই।

কি বলে যে তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানাবো, বাবা। মহাচিন্তায় ছিলাম।

কোন কৃতজ্ঞতা নয় চাচা। এতো আমাদের দায়িত্ব। শিলার মত এ গ্রামের হাজারো মেয়ে আমার গার্মেন্টস-এ সেলাই করে সুঁইতে সুতো ভরে জীবন পার করে দিচ্ছে। সেখানে আমাদের শিলা যদি সাঁতরে আমাদের গ্রামের, আমাদের জেলার, আমাদের বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে তো আমরা হবো সত্যিকার অর্থেই গর্বিত।

সেই থেকে শিলার জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। কিন্তু এখানেও আসে কত রকম নোংরামি। কত রকম কুৎসা?

ফেরদৌসের কি এমন লাভ আছে আলী আহমেদের মেয়ের পড়ার খরচ যোগানোর? আর মেয়েই বা এইখান ছেড়ে, যশোর ছেড়ে ঢাকায় থাকে? কি এমন কাজ তার? ঢাকায় মেয়ে কি করে? আরও কত কি?…

 

সময় এক সময় শান্ত হয়!

যখন সে ২০০৩ এর বয়সভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক জিতে নেয়। জিতে নেয় জাতীয় প্রতিযোগিতায় জ্যেষ্ঠ সাঁতারুদের পেছনে ফেলে।    

টিভির স্ক্রীনে দশমুখে হেসে ওঠে মাহফুজা। যখন হেসে ওঠে তার হাতের ফুলের গুচ্ছ, হেসে ওঠে তার গলার সোনার মেডেল, হেসে ওঠে তার চুলের গুচ্ছ, চোখের দ্যুতি এবং দাতের হীরক। তখন হেসে ওঠে তার গ্রামের সেই সারাজীবনের সমালোচনায় ব্যস্ত মানুষগুলোও।

যারা কোনদিন তার সাথে কথা বলে নি,  তারাই সেধে এসে কথা বলতে শুরু করল।

তারাও আড়ালে আবডালে আলী আহমেদের কাছে খোঁজ নেয়, কি করে তাদের মেয়েকেও সাঁতারু বানানো যায়।  বিশ্বব্যাপী টিভির পর্দায় ফুলের ঘ্রাণে ঢেকে থাকা হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখানো যায়। সোনার মেডেলের চমকে চমকিত করাতে পারে সারা দেশ। সারা বিশ্ব!

এবার গ্রামের মানুষের ভুল ভাঙলো। অপবাদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকা মাহফুজা রাতারাতি হয়ে ওঠে সে গ্রামের গর্ব। এভাবেই এগিয়ে যায় মাহফুজার দিন রাত। বুনতে থাকে স্বপ্ন। বাড়তে থাকে স্বপ্নের বী তলা। ২০০৬ এর কলম্বো সাফ গেমসে প্রথমবার পুলে নেমেই জিতে নিল দুটি ব্রোঞ্জ। আন্তর্জাতিক মে  মাহফুজার প্রথম প্রতিভার ঝলক। এবার তার লক্ষ্য। ব্রোঞ্জকে বানাতে হবে খাঁটি সোনা।

 

তাই তো কঠোর পরিশ্রম শুরু করলেন মাহফুজা। দিনকে রাত। রাতকে দিন। চললো এভাবেই প্রতিদিন।

 

ভর্তি হলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাংবাদিকতা বিভাগে শুরু হলো নতুন অধ্যায়। পড়াশুনা চালিয়ে নেবার জন্য নতুন সংগ্রাম হাসিমুখে মেনে নিলেন। জীবন, সাঁতারের পুল আর পড়াশোনা। তিনটি একইসাথে চালিয়ে নিতে বিকেলে প্রতিযোগিতা করে রাতের বাসে চট্টগ্রাম যেতেন। সকালে পরীক্ষা দিয়েই ঢাকায় ফিরে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন আবার। আলস্য কখনো তাকে ছুঁতে পারে নি। না পেরেছে ক্লান্তি! টাইমিংয়ের প্রভাব পড়তে দেননি জীবনের কোন অসতর্ক মুহূর্তে। টাইমিংয়ের টাইটানিক ঠিক ঠিক ভেসে চলেছে জীবনের গভীর সমুদ্রে।

 

শুরু হলো এসএ গেমস্। মেলে ধরলেন নিজেকে। ২০০৬ এ জিতেছিলেন দুটি ব্রোঞ্জ। এবার জিতে নিলেন দুটি সোনা! উন্নতির গ্রাফটা ঠিকপথেই চলছিল। কিন্তু তৃপ্ত ছিল না সে। তার স্বপ্ন ছিল আন্তর্জাতিক আসরে সোনা জেতার আকাঙক্ষা। এরইমধ্যে একটি ইভেন্টে ফটোফিনিশিংয়ে সোনা হাতছাড়া হয়েছে। এই দুঃখবোধ মাহফুজাকে আরও তাতিয়ে দিল। কে যেন বলল-

মেয়েটার উচ্চতা কম। অত খাটো না হলে ফটোফিনিশিংয়ে সেই এগিয়ে থাকতো।

কানে ভেসে বেড়াতে লাগলো সহমর্মিতার সুর! না কি তার সামর্থ্য? নাকি খোঁটা?

এই উচ্চতা দিয়ে কত কত বাঁধার দেয়াল টপকেছেন! আর আজ? তাকে যোগ্য জবাব দিতেই হবে। প্রতিক্ষায় থাকেন সুযোগের! প্রতিক্ষায় থাকলে আসলেই সুযোগ এসে ধরা দেয় একদিন। মাহফুজার ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তার সুযোগ এসেছে দীর্ঘ ছয় বছর পর ২০১৬ তে।

 

৬ ফেব্রুয়ারি। ২০১৬ খ্রি.। সেদিনও গুয়াহাটির সোনামাখা সূর্য রং টকটকে লাল ছিল। ছিল অবারিত প্রান্তরে নানা রংয়ের বর্ণিল প্রভা! সূর্যের সোনা মাখা রং যখন চারিদিকে চিকচিক হেসে উঠছিল তখন সারুসাজাই স্পোর্টস কমপ্লেক্সের জাকির হোসেন সুইমিংপুলে বাংলাদেশের সাঁতারুদের নিয়ে কারো তেমন কোন আগ্রহ নেই। তারা তো এসেছে ‘অংশগ্রহণই বড় কথা’ এই শ্লোগানে মাতোয়ারা হতে- অন্যদের ভাবখানা এমনই! কিন্তু মাইকের একটি ঘোষণা চারিদিকে অন্য রকম সুরের মোহনীয় উচ্ছ্বাসে ভেসে গেল। চারিদিক নিস্তব্ধ। সবাইকে স্তব্ধ করে দিলো একটি ঘোষণা। ‘১০০ মিটার ব্রেষ্ট ষ্ট্রোকে সোনা জিতেছেন বাংলাদেশের মাহফুজা খাতুন।’ সময় নিলেন মাত্র ১ মিনিট ১৭ দশমিক ৮৬ সেকেন্ড। গেমসে সোনাজয়ী বাংলাদেশের প্রথম নারী সাতারু! একদিন পরেই সেই সুইমিংপুলে ৫০ মিটার ব্রেষ্ট ষ্ট্রোকে রেকর্ড গড়ে সোনা জিতলেন আবারো। ভাঙলেন ১০ বছর পুরনো গেমস রেকর্ড।

 

অথচ এখানে পাঠানো নিয়েই কর্তৃপক্ষ ঘোলা করেছিল জল। ‘মাহফুজা বুড়িয়ে গেছে!’ ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ভারতে আনা হয়েছে তাকে।’ ইত্যাদি শুনতে শুনতে তার মাথায় বিজয়ের মুকুট রেখা তড়পরায় রাতদিন। অবশেষে জীবনের শেষ জ্বালানিটুকু দিয়ে লড়াই করার তাগিদ অনুভব করে সে। এবং এক সময় নিজের দিকে ফিরে তাকাবার অবকাশ পায় এক সন্ধ্যায় সময় করে একান্ত নিজের জন্য। কথা হয় একান্ত একান্তজনের সাথে। সে কি আজ বড় বেশি অসহিষ্ণু?

আর কত অপেক্ষা পৃথিবী?

আর একটু সূর্য!

অস্ত যে যেতে চায় সূর্য, তর সয়না আর আমার পৃথিবী। গনণগণন তাপ যে আমার মাথায়। সে শান্তি চায়, শান্ত হতে চায়।

দিনের শুরুতেই অস্ত যেতে চাইলে পৃথিবী যে কোনদিন পরিপূর্ণ অন্তর আলোয় নিমজ্জ্বিত হতে পারে না সূর্য!

আজ চৌদ্দ বছর ধরে অপেক্ষার পর আজ পৃথিবীর কি কথা শুনি?

তাই! ওভাবে ঘড়ির আহ্নিক গতির রেখা ধরে হিসাবে বসিনি কোনদিন।

মেঘে মেঘে বেলা তো অনেক হলো। এখন সময় হিসাবের।

বাহ! ভারী হিসাব শিখে যাচ্ছো মনে হচ্ছে।

শিখে যাচ্ছো মানে কি? শিখে ফেলেছি ঠিকঠাক। আর নয় কোন অজুহাত। এবার তাড়া আমার তাড়া করে ফেরে। কিছু বলো পৃথিবী।

চৌদ্দ বছর সংগ্রাম করে মাহফুজার শরীর আজ ধারণ করে পৃথিবীর রং। আর সূর্য তো অপেক্ষায় থাকে অনন্তদিন!

আর অপেক্ষা নয়। এবার নতুন জীবনের শুরু।

চলো রচি নতুন জীবনের গন্তব্য এক! সূর্যের সাথে তাল মেলায় পৃথিবীর কণ্ঠস্বর।

 

অতঃপর এক শুভ ক্ষণে চৌদ্দবছর ধরে ভালবাসার মানুষ আরেক সোনাজয়ী সাতারু শাজাহান আলী রনির সঙ্গে বিয়ের পিড়িতে বসলেন মাহফুজা। যোগ দিলেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে চিফ পেটি অফিসার পদে। দিন গড়াতে থাকে তার আপন মহিমায়।

 

আজ সকাল থেকেই অভয়নগরের আকাশে বাতাশে এক নতুন আশা- নতুন গুঞ্জন- নতুন শব্দধ্বনি। জড়ো হয়েছে হাজারো মানুষ। তারা এক নজর দেখতে চায় এ গ্রামেরই গর্ব অহঙ্কার শিলাকে। শিলা আজ আসছে অভয়নগরের মাটিকে ধন্য করতে। নিজেকে ধন্য করতে। তার ধুলোবালির গ্রামের মানুষের চেয়ে তাকে আর কে ভাল চেনে?

যারা একদিন তার নামে নাক সিটকাতো তারাই আজ গোলাপ-বকুলের মালা নিয়ে অপেক্ষা করছে রোদ বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে মাইলের পর মাইল, তার আঙিনায়! অদূরে দাঁড়িয়ে আছে এ গ্রামের সম্ভ্রান্ত অভিভাবক লিয়াকত চাচা। পাশে তার সুন্দরী শিক্ষিত মেয়ে নাজনীন। হাজারো ভিড় ঠেলে মাহফুজার চোখ যায় নাজনীনের দিকে। হাত ইশারায় কাছে ডাকে তাকে। সে ধীর পায়ে ছুটে আসে মাহফুজার কাছে। আর তার বাবা অদূরে দাঁড়িয়ে থাকে। নিমগ্ন। একদিন সেও যে তাকে অপমান করতে এতটুকু পিছপা ছিল না কখনো! অথচ মাহফুজার চোখ যায় সেখানেই আগে।

আসুন চাচা। কেমন আছেন? কিভাবে যাচ্ছে দিনকাল।

লজ্জায় সমস্ত রক্ত মুখে উঠে আসে লিয়াকত চাচার।

এই তো মা। তোমাকে দেখতে এলাম। তুমি আজ গর্ব আমাদের!

মাহফুজার নির্মল, গর্বের, বিজয়ের হাসিতে লিয়াকত চাচার মুখের সমস্ত রক্ত নামিয়ে সেখানে দরদ এনে দেয়।

ভালো আছি মা। তুমিও ভালো থেকো চিরদিন এভাবেই।

নিন্দা আর শ্লাঘার ঝড়কে জয় করে আজ চারিদিকে মাহফুজার জয়গান- দরদের দাপাদাপি- অভয়নগর গ্রামে ভেসে বেড়ায়। আসলে সময় এরকমই। সুসময় এবং দুঃসময় সব সময় শত্রুকে বন্ধু বানায়। মানুষ ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একাকার হয়। তাই তো অভয়নগর গ্রামের সব মানুষ আজ একে অপরের বন্ধু হয়ে যায়। সব কিছু সম্ভব করে মাহফুজার ম্যাজিক মেডেল! মাহফুজা হঠাৎ খেয়াল করে তার ম্যাজিক মেডেলের দ্যুতি ঝিলিক দেয় চারিদিক– অভয়নগরের সমস্ত ধুলোমাটি, আকাশ, বাতাস, নদী, সমুদ্র, মানুষের মুখ আর বৃক্ষের বাকলে বাকলে।     

ড. শাহনাজ পারভীন
শাহনাজ পারভীন

 

Author: ড. শাহনাজ পারভীন

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts

মতামত দিন Leave a comment