যৌবন-বার্ধক্য

রবি ঠাকুর বলেছেন, যৌবনে মানুষ ভোগ এবং বার্ধক্যে করে স্মৃতিচারণ। তাঁর এ কথাটি ভাবায়। ভাবছি যৌবনে আমি ভোগ করেছি কি না। যৌবন কালটা এতো তাড়াতাড়ি যে কিভাবে চলে গেলো তা বুঝতেই পারলাম না।

এই সেদিনের কথা মনে হয় নতুন বউকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি হতে বাড়ি ফিরছি। বিয়ের আগে ভাবতাম, বিয়ে করলে মানুষ আপনা আপনি বাবা হয়ে যায়। ছেলেবেলায় নিজের বাবা-মা সম্পর্কে ধারণা ছিল তাঁরা বাবা-মা হয়েই জন্মগ্রহণ করেছেন। বাবা  হওয়ার পর বুঝতে পারলাম বাবা হওয়াটা কতো সহজ। সন্তান উৎপাদনের কৌশলটা আমি ঠেকে শিখেছি। এর সাথে নিশ্চয়ই ভোগের একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।

যৌবনে আমি খাওয়াকে ভোগ করা মনে করতাম। যারা বেশি খেতে পারতো মনে করতাম তারা জীবনকে বেশি ভোগ করছে। আমিও খেয়ে জীবনকে ভোগ করতে চেয়েছি। শুনেছি চিনারা  সব কিছু খায়। খোঁজ নিয়ে দেখলাম তারাও কিছু জিনিস খায় না। কিন্তু আমি সর্বভূক ছিলাম। আমার খাওয়ার পাতে যাই এসেছে তাই আমি খেয়েছি। সাধ জেগেছিল হাতির মাংস খাওয়ার। ইচ্ছে হতো হাতির একটা পা সংগ্রহ করে সেটা খন্ডখন্ড করে কেটে ফ্রিজে রাখতে। এটা করতাম শিককাবাব বানাবার জন্যে। আমা দৃঢ় বিশ্বাস ছিল হাতির মাংসের শিককাবাব হবে অতুলনীয়। সে বিশ্বাস এখনো আমার অটুট রয়েছে। দুর্ভাগ্য, এ পর্যন্ত আমি হাতির মাংস জোটাতে পারলাম না। একবার কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে একটা প্রায় দেড়’শ ফুট লম্বা তিমি মাছকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছিলাম। এই তিমি মাছটি দেখতে তখন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে মানুষ ছুটে এসেছে। আমার খুব ইচ্ছে হতো এর শরীরের একটি অংশ কেটে এনে তা শুকিয়ে শুটকি করতে। কেন জানি মনে হতো তিমি শুটকির স্বাদ সব শুটকির স্বাদকে হার মানাবে। কিন্তু এ শুটকির স্বাদ গ্রহণ করবার সুযোগ এখনো আমার ঘটেনি। তিমি শুটকি যদি খেতে না পারি তবে মনে হবে জীবনটা বৃথা গেলো।

আমি একবার উতলা হয়েছিলাম চা বাগানের সাঁওতাল রমণীদের লোভনীয় দেহ সৌষ্ঠব দেখে। ওদের দিকে আমি লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম। বলতে দ্বিধা নেই, আমার দৃষ্টি কামনা শূন্য ছিল না। ওরা এতোই সরল ছিল যে, আমার এ দৃষ্টিকে বুঝতে না পেরে আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি হাসতো। এ হাসি ছিল আমার জন্যে পরম প্রাপ্তি। সাঁওতাল রমনীরা এখনো আমার কাছে মধুর স্মৃতি হয়ে রয়েছে। আমি মনে করি বার্ধক্যে মানুষ স্মৃতিচারণের চাইতে গরুর মতো জাবর কাটে বেশি। আমিও স্মৃতির জাবর কাটছি। বয়স যে বেড়েছে এটা টের পাই তরকারি ও মাছ বিক্রেতা যখন আমাকে চাচা, মেশো বলে ডাকে। কলা বিক্রেতা সেদিন আমাকে নানা বলে  ডাকলো। বুঝতে পারলাম এখন আমি নানার স্তরে এসে পৌঁছেছি। এর পরেও এখনো অনেকে আমাকে দাদা বলে ডাকে। এ জন্যে আমার খুশির অন্ত থাকে না।

বুড়ো বয়সে অনেকে সুন্দর হয়ে যায়। আমি যৌবনেও সুন্দর ছিলাম না। এখন আরও অসুন্দর হয়েছি। নিজের চেহারা তাই আয়নায় দেখি না। চুল আঁচড়াই আয়না ছাড়াই। অনেকদিন পর সেদিন কৌতূহলী হয়ে নিজের চেহারা আয়নায় দেখলাম। দেখে নিজেকেই নিজে চিনতে পারলাম না। অনেকে বলে থাকে বার্ধক্যে মানুষের জ্ঞান পরিপক্ক হয়। আমি মনে করি অর্জিত জ্ঞানে পচন ধরে। এ কারণেই চেনা মানুষকে দেখে মনে হয় অচেনা আর অচেনা মানুষকে দেখে মনে হয় অনেকদিনের চেনা মানুষ। ভাগ্নেকে দেখে মনে হয় ভাইপো। সেদিন স্ত্রীকে রাস্তায় দেখে মনে হলো, ভদ্রমহিলাকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে। এলবামে যখন তরুণ বয়সের ছবি দেখি তখন বুঝতে পারি যৌবন বলে একটা কাল আমার ছিল। যৌবন যদি ভোগের হয় তবে বার্ধক্য উপদেশের। আমি এখন খালি বিনামূল্যে উপদেশ দিচ্ছি। 

Author: সত্যব্রত বড়ুয়া

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Related posts